কাগজে-কলমে তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী। সরকারি নথিতে দেখা যায়, তিনি এক ডজনেরও বেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। কিন্তু বাস্তবে তিনি বেকার এবং নিজের নাম থেকে সেই পরিচালক পদও সরাতে পারছেন না। এমন অদ্ভুত পরিস্থিতিতে পড়েছেন সিঙ্গাপুরের ৩৭ বছর বয়সী মিশেল ওং।
দুই সন্তানের এই মা নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই চাকরি হারান। কারণ, নতুন নিয়োগকর্তা জানতে পারে যে তিনি একই সময়ে ৩০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিলেন।
পরিচালক পদ থেকে সরে দাঁড়াতে না পারার সংকট
মিশেল ওং করপোরেট সেক্রেটারিয়াল সেবা খাতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। পূর্ববর্তী চাকরির অংশ হিসেবে তিনি বিভিন্ন বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য মনোনীত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। এসব প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় পরিচালক হওয়ার মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের আইনগত শর্ত পূরণ করা হতো।
চাকরি ছাড়ার পরও তার নাম বহু প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে থেকে যায়। বর্তমানে তিনি অন্তত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে সরকারি নথিতে তালিকাভুক্ত রয়েছেন, যদিও তিনি দাবি করেন এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, চাকরি ছাড়ার পর তার নাম সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, আইনজীবী এবং বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, কিন্তু এখনও স্থায়ী সমাধান পাননি।
আইনগত জটিলতায় আটকে আছেন
সিঙ্গাপুরের আইনে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অন্তত একজন স্থানীয় পরিচালক থাকা বাধ্যতামূলক। কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি একজনই স্থানীয় পরিচালক থাকেন, তাহলে তার পদত্যাগের ক্ষেত্রেও বিশেষ সীমাবদ্ধতা থাকে।
এই কারণেই মিশেলের নাম সরানো সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, নতুন পরিচালক নিয়োগের জন্য বিদেশি পরিচালকদের সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো সাবেক কর্মীকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিচালক হিসেবে রেখে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে তিনি যদি আর কোনো পারিশ্রমিক না পান এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে যুক্ত না থাকেন।
ঝুঁকিতে পেশাগত ভবিষ্যৎ
মিশেলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তার ভবিষ্যৎ পেশাজীবন নিয়ে। সিঙ্গাপুরের কোম্পানি আইন অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে তিন বা ততোধিক নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালক পদে অযোগ্য ঘোষিত হতে পারেন।
যদি তার নাম থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে তার পেশাগত ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। করপোরেট সেবাখাতে কাজ চালিয়ে যেতে চাইলে এমন অযোগ্যতা তার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা, আর্থিক অনিয়ম বা অপরাধমূলক অভিযোগ উঠলে সরকারি নথিতে পরিচালক হিসেবে থাকা ব্যক্তিকেও জবাবদিহির মুখে পড়তে হতে পারে।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরও অসহায়
প্রায় ১৭ বছরের কর্মজীবনে মিশেল ১ হাজার ৪০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান গঠনের কাজে যুক্ত ছিলেন। তার ভাষ্য, অতীতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি কখনও হতে হয়নি।
তিনি বলেন, সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ হলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন দ্রুত করা হয়। কিন্তু এবার বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে আছে এবং তার জীবিকা ও সুনাম দুটোকেই হুমকির মুখে ফেলেছে।
সবশেষে তার একটাই দাবি—তার নাম যেন দ্রুত এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক তালিকা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















