০৪:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাজার সংকট এখন জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্ন

ভুটানের ফুয়েন্তশোলিং থেকে ভারতের জয়গাঁওয়ে ক্রেতাদের চলে যাওয়া এখন আর দুই সীমান্তবর্তী শহরের বাজার প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ধীরে ধীরে সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠছে। সীমান্তের ওপারে একই বা কাছাকাছি পণ্য কম দামে পাওয়ায় ফুয়েন্তশোলিংয়ের বাসিন্দারা নিয়মিত জয়গাঁওমুখী হচ্ছেন। ফলে স্থানীয় ব্যবসা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ভুটানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও অর্থের প্রবাহ কমছে।

ভুটানের বাণিজ্য, শিল্প ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিযোগিতা ও ভোক্তা বিষয়ক কর্তৃপক্ষের (সিসিএএ) করা ক্রস-বর্ডার রিটেইল কম্পিটিটিভনেস স্টাডিতে উঠে এসেছে এই চিত্র। জরিপে অংশ নেওয়া ফুয়েন্তশোলিংয়ের ৯৪.৯ শতাংশ বাসিন্দা জানিয়েছেন, তারা কেনাকাটার অন্তত কিছু অংশের জন্য জয়গাঁওয়ের ওপর নির্ভর করেন। ৭৫.৯ শতাংশের কাছে জয়গাঁওই প্রধান কেনাকাটার গন্তব্য।

মূল কারণ দাম

দুই বাজারের মধ্যে দামের পার্থক্যই ক্রেতাদের সীমান্ত পার হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। জরিপে অংশ নেওয়া ৩১২ জনের ৯০.১ শতাংশ কম দামকে জয়গাঁওয়ে কেনাকাটার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৭০.৫ শতাংশ বাসিন্দা সপ্তাহে অন্তত একবার সীমান্ত পার হন এবং ৩৮.৫ শতাংশ সপ্তাহে দুইবার বা তারও বেশি জয়গাঁও যান।

অর্থাৎ সীমান্তপারের কেনাকাটা এখন আর বিশেষ প্রয়োজনে করা বিচ্ছিন্ন কোনো আচরণ নয়। এটি ফুয়েন্তশোলিংয়ের বহু পরিবারের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

৯১টি পণ্য ও ১০টি শ্রেণির তুলনামূলক মূল্য বিশ্লেষণও সমস্যাটির গভীরতা দেখিয়েছে। বিশেষ করে ফল ও সবজির ক্ষেত্রে ব্যবধান অত্যন্ত বেশি। জরিপে অন্তর্ভুক্ত তাজা কৃষিপণ্যের গড় দাম ফুয়েন্তশোলিংয়ে জয়গাঁওয়ের তুলনায় ১৫৫.৪৭ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে। তালিকাভুক্ত প্রতিটি ফল ও সবজিই ভুটানের বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল।

টমেটোর দাম ছিল ২৩৭.৪ শতাংশ বেশি, আলু ২৩২ শতাংশ, বাঁধাকপি ২২২.৯ শতাংশ এবং লাল পেঁয়াজ ১৩১.৮ শতাংশ বেশি। কলা ও কমলার ক্ষেত্রেও ব্যবধান ছিল যথাক্রমে ৬০ শতাংশ ও ৪৮.৭ শতাংশ।

এ ধরনের পার্থক্য একটি পরিবারের মাসিক বাজেটে দ্রুত চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সবজি ও ফলের মতো প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে দামের ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদে বড় ব্যয়ে পরিণত হয়।

সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা

মূল্য ব্যবধানের পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখছে। শীত ও বসন্তে ভুটানকে কৃষিপণ্যের আমদানির ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। কিন্তু স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীদের অনেকেই ভারতের পাইকারি বাজার থেকে সরাসরি পণ্য কেনার সুযোগ পান না। একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর হাত ঘুরে পণ্য ফুয়েন্তশোলিংয়ে পৌঁছায়। প্রতিটি স্তরে যুক্ত হয় অতিরিক্ত মুনাফা ও পরিবহন ব্যয়।

একই সমস্যা অন্যান্য পণ্যেও দেখা যায়। গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি গড়ে ১৯.৭ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল ফুয়েন্তশোলিংয়ে। ১৯৪ লিটারের একটি গডরেজ ফ্রিজের দাম ছিল ৪৪.৬ শতাংশ বেশি। বৈদ্যুতিক কেটলি ৩২.৯ শতাংশ এবং ইন্ডাকশন কুকার ২৯ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল।

স্কুলের সামগ্রীতেও একই প্রবণতা রয়েছে। জরিপে অন্তর্ভুক্ত ১৩টি পণ্যের মধ্যে ১২টির দাম ফুয়েন্তশোলিংয়ে বেশি। গড় ব্যবধান ১০.৮৬ শতাংশ। স্কুলের মোজার দাম ৪১.৪ শতাংশ বেশি এবং কিছু নোটবুকের ক্ষেত্রে ব্যবধান ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।

পরিবারের পাশাপাশি ছোট ব্যবসাও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। হার্ডওয়্যার পণ্যের দাম গড়ে ১২.৩১ শতাংশ বেশি এবং মাহিন্দ্রা পিকআপের যন্ত্রাংশ ১০.৪ শতাংশ বেশি। পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের জন্য এসব অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ব্যবসার খরচ এবং ভোক্তার ওপর চাপ—দুইভাবেই ফিরে আসে।

যেখানে ফুয়েন্তশোলিং এগিয়ে

তবে পুরো চিত্র একতরফা নয়। ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের ক্ষেত্রে ফুয়েন্তশোলিং বরং জয়গাঁওয়ের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক। এই শ্রেণির পণ্যে ভুটানের বাজারে গড় দাম ৬.৩২ শতাংশ কম পাওয়া গেছে। ভিভো টি৪এক্স ৫জি ফোন ১৩.৪ শতাংশ এবং স্যামসাংয়ের ৪৩ ইঞ্চি টেলিভিশন ৬.৮ শতাংশ কম দামে পাওয়া গেছে।

এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, ভুটানের বাজারে কম দামে পণ্য দেওয়া অসম্ভব নয়। যেসব ক্ষেত্রে অনুমোদিত পরিবেশক এবং তুলনামূলক সরাসরি আমদানি ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমে আসে এবং দামও প্রতিযোগিতামূলক থাকে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইলেকট্রনিকস এমন একটি শ্রেণি যেখানে সীমান্তপারের কেনাকাটা তুলনামূলকভাবে কম। বিপরীতে তাজা কৃষিপণ্য ও স্কুলের সামগ্রীর মতো যেসব পণ্যে দামের ব্যবধান বেশি, সেগুলোই জয়গাঁওয়ে বেশি কেনা হয়।

অর্থাৎ ক্রেতারা কেবল অভ্যাসের কারণে সীমান্ত পার হচ্ছেন না। যেখানে স্থানীয় বাজার ভালো দাম দিতে পারছে, সেখানে তারা ফুয়েন্তশোলিংয়েই কেনাকাটা করছেন।

Cost of living crisis – managing and forecasting costs for clients - Neuro  Rehab Times

ব্যবসার ওপর বাড়তি চাপ

ফুয়েন্তশোলিংয়ের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমস্যার আরেকটি দিক হলো ব্যয়ের কাঠামো। পণ্য আমদানির সঙ্গে কর, বার্ষিক আয়কর, সীমান্ত-সংক্রান্ত বিভিন্ন চার্জ, এমডিপি ফি, কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্টের খরচ, পরিবহন, দোকান ভাড়া ও কর্মীদের বেতন যুক্ত হয়।

অন্যদিকে জয়গাঁওয়ের ব্যবসায়ীরা ভারতের বৃহৎ পাইকারি বিতরণব্যবস্থার কাছাকাছি অবস্থান করার সুবিধা পান। তারা তুলনামূলক ছোট পরিমাণেও প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন।

ভুটানের ব্যবসায়ীদের অনেক সময় ভারতীয় মধ্যস্বত্বভোগী ও দ্বিতীয় স্তরের পাইকারদের ওপর নির্ভর করতে হয়। ছোট বাজার হওয়ায় সরাসরি প্রস্তুতকারক বা প্রাথমিক পরিবেশকের কাছ থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ন্যূনতম অর্ডারের শর্তও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অনেক ব্র্যান্ডের অনুমোদিত পরিবেশক না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও একই পরিবেশক পাইকারি সরবরাহের পাশাপাশি সরাসরি খুচরা ব্যবসায়ও যুক্ত। এতে যেসব খুচরা ব্যবসায়ী তাদের কাছ থেকে পণ্য কেনেন, তাদের সঙ্গেই অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।

অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের চাপ

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত গাড়িতে করে কিছু পণ্য সীমান্ত পেরিয়ে আসে, কিন্তু সেগুলো সবসময় যথাযথ কাস্টমস পরিদর্শন বা কর ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। লাইসেন্সবিহীন ঘরে ঘরে বিক্রি, অনানুষ্ঠানিক অনলাইন বিক্রেতা এবং ব্রিফকেস ব্যবসায়ীরাও আনুষ্ঠানিক বাজারের বাইরে কার্যক্রম চালান।

এর ফলে নিবন্ধিত ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। যারা নিয়ম মেনে কর দেন এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক ব্যয় বহন করেন, তারা স্বাভাবিকভাবেই এমন দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সমস্যায় পড়েন যেখানে এসব খরচের বড় অংশই নেই।

শুধু দাম কমালেই হবে না

তবে জয়গাঁওয়ের প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণের কারণ শুধু কম দাম নয়। জরিপে ৬২.২ শতাংশ উত্তরদাতা বেশি পণ্যের বৈচিত্র্যকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৩৯.৭ শতাংশ ভালো গ্রাহকসেবা এবং ৩০.৪ শতাংশ সুবিধাজনক কেনাকাটার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।

এখানেই ফুয়েন্তশোলিংয়ের জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে। স্থানীয় বাজারকে টিকিয়ে রাখতে শুধু কর কমানো বা পণ্যের দাম কমানো যথেষ্ট হবে না। ক্রেতার কাছে বাজারকে একই সঙ্গে সাশ্রয়ী, বৈচিত্র্যময় এবং সুবিধাজনক করে তুলতে হবে।

করণীয় কী

এই সমস্যার সমাধান কোনো একক ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারকদের কর, এমডিপি ফি, কাস্টমস ক্লিয়ারিং চার্জ এবং আমদানি-সংক্রান্ত অন্যান্য ব্যয় পর্যালোচনা করতে হবে। কোথায় অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো যায়, সেটি চিহ্নিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়িতে বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশের বিষয়টি আরও কার্যকরভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। তবে প্রকৃত ব্যক্তিগত আমদানি ও বাণিজ্যিক পরিমাণে পণ্য আনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখাও জরুরি।

মাঝারি মেয়াদে ভুটানের ছোট খুচরা ব্যবসায়ীদের ভারতীয় পাইকারি বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। যৌথভাবে পণ্য কেনার ব্যবস্থা বা স্থানীয় সমবায়ী ক্রয়ব্যবস্থা ছোট ব্যবসায়ীদের ন্যূনতম অর্ডারের বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করতে পারে।

ভুটানে অনুমোদিত ব্র্যান্ড পরিবেশকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি পাইকারি বিতরণ ও খুচরা বিক্রির স্বার্থের সংঘাত কমানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

একই সঙ্গে ফুয়েন্তশোলিংয়ের বাজারব্যবস্থাকে আধুনিক করা প্রয়োজন। দোকান ও কেনাকাটার এলাকা আরও সুশৃঙ্খল করা, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, ব্যবসায়ীদের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ উন্নত করা এবং কর্মীদের গ্রাহকসেবা, পণ্যজ্ঞান, মজুত ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল পেমেন্টে দক্ষ করে তোলা যেতে পারে।

প্রতি বছর একই ধরনের মূল্য জরিপ চালানোও গুরুত্বপূর্ণ। তাতে বোঝা যাবে, নেওয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবে জয়গাঁও ও ফুয়েন্তশোলিংয়ের দামের ব্যবধান কমাতে পারছে কি না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু জয়গাঁওয়ে ক্রেতা হারানোর নয়। একটি পরিবার যখন কম দামে সবজি, স্কুলের সামগ্রী বা গৃহস্থালি পণ্য কিনতে সীমান্ত পার হয়, তখন সেই অর্থ স্থানীয় দোকান, কর্মী ও সরবরাহব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ঘুরে অর্থনীতিতে ফেরার বদলে দেশের বাইরে চলে যায়।

ফুয়েন্তশোলিংয়ের খুচরা বাজারকে তাই শুধু ব্যবসায়ীদের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি পরিবারের ব্যয়, ক্ষুদ্র ব্যবসার সক্ষমতা এবং স্থানীয় অর্থনীতির গতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

যেখানে সরবরাহব্যবস্থা দক্ষ, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রিত এবং বাজারে প্রতিযোগিতা আছে, সেখানে ফুয়েন্তশোলিংয়ের ব্যবসায়ীরাও জয়গাঁওয়ের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারেন—ইলেকট্রনিকসের বাজার তারই প্রমাণ।

এখন চ্যালেঞ্জ হলো সেই সক্ষমতাকে আরও বেশি পণ্যের ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়া। ক্রেতাদের সীমান্ত পার না হওয়ার জন্য শুধু তাদের বোঝানো যথেষ্ট নয়। এমন একটি স্থানীয় বাজার তৈরি করতে হবে, যেখানে পরিবারের বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম, পর্যাপ্ত পণ্যের বৈচিত্র্য এবং ভালো কেনাকাটার অভিজ্ঞতা—তিনটিই একসঙ্গে পাওয়া যায়। তাহলেই ফুয়েন্তশোলিংয়ের খুচরা বাজার শুধু টিকে থাকবে না, স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও আরও কার্যকর ভিত্তি হয়ে উঠবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বাজার সংকট এখন জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্ন

০৫:৫২:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

ভুটানের ফুয়েন্তশোলিং থেকে ভারতের জয়গাঁওয়ে ক্রেতাদের চলে যাওয়া এখন আর দুই সীমান্তবর্তী শহরের বাজার প্রতিযোগিতার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ধীরে ধীরে সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠছে। সীমান্তের ওপারে একই বা কাছাকাছি পণ্য কম দামে পাওয়ায় ফুয়েন্তশোলিংয়ের বাসিন্দারা নিয়মিত জয়গাঁওমুখী হচ্ছেন। ফলে স্থানীয় ব্যবসা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি ভুটানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও অর্থের প্রবাহ কমছে।

ভুটানের বাণিজ্য, শিল্প ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিযোগিতা ও ভোক্তা বিষয়ক কর্তৃপক্ষের (সিসিএএ) করা ক্রস-বর্ডার রিটেইল কম্পিটিটিভনেস স্টাডিতে উঠে এসেছে এই চিত্র। জরিপে অংশ নেওয়া ফুয়েন্তশোলিংয়ের ৯৪.৯ শতাংশ বাসিন্দা জানিয়েছেন, তারা কেনাকাটার অন্তত কিছু অংশের জন্য জয়গাঁওয়ের ওপর নির্ভর করেন। ৭৫.৯ শতাংশের কাছে জয়গাঁওই প্রধান কেনাকাটার গন্তব্য।

মূল কারণ দাম

দুই বাজারের মধ্যে দামের পার্থক্যই ক্রেতাদের সীমান্ত পার হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। জরিপে অংশ নেওয়া ৩১২ জনের ৯০.১ শতাংশ কম দামকে জয়গাঁওয়ে কেনাকাটার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৭০.৫ শতাংশ বাসিন্দা সপ্তাহে অন্তত একবার সীমান্ত পার হন এবং ৩৮.৫ শতাংশ সপ্তাহে দুইবার বা তারও বেশি জয়গাঁও যান।

অর্থাৎ সীমান্তপারের কেনাকাটা এখন আর বিশেষ প্রয়োজনে করা বিচ্ছিন্ন কোনো আচরণ নয়। এটি ফুয়েন্তশোলিংয়ের বহু পরিবারের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক জীবনের অংশ হয়ে গেছে।

৯১টি পণ্য ও ১০টি শ্রেণির তুলনামূলক মূল্য বিশ্লেষণও সমস্যাটির গভীরতা দেখিয়েছে। বিশেষ করে ফল ও সবজির ক্ষেত্রে ব্যবধান অত্যন্ত বেশি। জরিপে অন্তর্ভুক্ত তাজা কৃষিপণ্যের গড় দাম ফুয়েন্তশোলিংয়ে জয়গাঁওয়ের তুলনায় ১৫৫.৪৭ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে। তালিকাভুক্ত প্রতিটি ফল ও সবজিই ভুটানের বাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল।

টমেটোর দাম ছিল ২৩৭.৪ শতাংশ বেশি, আলু ২৩২ শতাংশ, বাঁধাকপি ২২২.৯ শতাংশ এবং লাল পেঁয়াজ ১৩১.৮ শতাংশ বেশি। কলা ও কমলার ক্ষেত্রেও ব্যবধান ছিল যথাক্রমে ৬০ শতাংশ ও ৪৮.৭ শতাংশ।

এ ধরনের পার্থক্য একটি পরিবারের মাসিক বাজেটে দ্রুত চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সবজি ও ফলের মতো প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে দামের ব্যবধান দীর্ঘমেয়াদে বড় ব্যয়ে পরিণত হয়।

সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা

মূল্য ব্যবধানের পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখছে। শীত ও বসন্তে ভুটানকে কৃষিপণ্যের আমদানির ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। কিন্তু স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীদের অনেকেই ভারতের পাইকারি বাজার থেকে সরাসরি পণ্য কেনার সুযোগ পান না। একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর হাত ঘুরে পণ্য ফুয়েন্তশোলিংয়ে পৌঁছায়। প্রতিটি স্তরে যুক্ত হয় অতিরিক্ত মুনাফা ও পরিবহন ব্যয়।

একই সমস্যা অন্যান্য পণ্যেও দেখা যায়। গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি গড়ে ১৯.৭ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল ফুয়েন্তশোলিংয়ে। ১৯৪ লিটারের একটি গডরেজ ফ্রিজের দাম ছিল ৪৪.৬ শতাংশ বেশি। বৈদ্যুতিক কেটলি ৩২.৯ শতাংশ এবং ইন্ডাকশন কুকার ২৯ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছিল।

স্কুলের সামগ্রীতেও একই প্রবণতা রয়েছে। জরিপে অন্তর্ভুক্ত ১৩টি পণ্যের মধ্যে ১২টির দাম ফুয়েন্তশোলিংয়ে বেশি। গড় ব্যবধান ১০.৮৬ শতাংশ। স্কুলের মোজার দাম ৪১.৪ শতাংশ বেশি এবং কিছু নোটবুকের ক্ষেত্রে ব্যবধান ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত।

পরিবারের পাশাপাশি ছোট ব্যবসাও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। হার্ডওয়্যার পণ্যের দাম গড়ে ১২.৩১ শতাংশ বেশি এবং মাহিন্দ্রা পিকআপের যন্ত্রাংশ ১০.৪ শতাংশ বেশি। পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের জন্য এসব অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ব্যবসার খরচ এবং ভোক্তার ওপর চাপ—দুইভাবেই ফিরে আসে।

যেখানে ফুয়েন্তশোলিং এগিয়ে

তবে পুরো চিত্র একতরফা নয়। ভোক্তা ইলেকট্রনিকসের ক্ষেত্রে ফুয়েন্তশোলিং বরং জয়গাঁওয়ের তুলনায় প্রতিযোগিতামূলক। এই শ্রেণির পণ্যে ভুটানের বাজারে গড় দাম ৬.৩২ শতাংশ কম পাওয়া গেছে। ভিভো টি৪এক্স ৫জি ফোন ১৩.৪ শতাংশ এবং স্যামসাংয়ের ৪৩ ইঞ্চি টেলিভিশন ৬.৮ শতাংশ কম দামে পাওয়া গেছে।

এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, ভুটানের বাজারে কম দামে পণ্য দেওয়া অসম্ভব নয়। যেসব ক্ষেত্রে অনুমোদিত পরিবেশক এবং তুলনামূলক সরাসরি আমদানি ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কমে আসে এবং দামও প্রতিযোগিতামূলক থাকে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইলেকট্রনিকস এমন একটি শ্রেণি যেখানে সীমান্তপারের কেনাকাটা তুলনামূলকভাবে কম। বিপরীতে তাজা কৃষিপণ্য ও স্কুলের সামগ্রীর মতো যেসব পণ্যে দামের ব্যবধান বেশি, সেগুলোই জয়গাঁওয়ে বেশি কেনা হয়।

অর্থাৎ ক্রেতারা কেবল অভ্যাসের কারণে সীমান্ত পার হচ্ছেন না। যেখানে স্থানীয় বাজার ভালো দাম দিতে পারছে, সেখানে তারা ফুয়েন্তশোলিংয়েই কেনাকাটা করছেন।

Cost of living crisis – managing and forecasting costs for clients - Neuro  Rehab Times

ব্যবসার ওপর বাড়তি চাপ

ফুয়েন্তশোলিংয়ের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমস্যার আরেকটি দিক হলো ব্যয়ের কাঠামো। পণ্য আমদানির সঙ্গে কর, বার্ষিক আয়কর, সীমান্ত-সংক্রান্ত বিভিন্ন চার্জ, এমডিপি ফি, কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্টের খরচ, পরিবহন, দোকান ভাড়া ও কর্মীদের বেতন যুক্ত হয়।

অন্যদিকে জয়গাঁওয়ের ব্যবসায়ীরা ভারতের বৃহৎ পাইকারি বিতরণব্যবস্থার কাছাকাছি অবস্থান করার সুবিধা পান। তারা তুলনামূলক ছোট পরিমাণেও প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন।

ভুটানের ব্যবসায়ীদের অনেক সময় ভারতীয় মধ্যস্বত্বভোগী ও দ্বিতীয় স্তরের পাইকারদের ওপর নির্ভর করতে হয়। ছোট বাজার হওয়ায় সরাসরি প্রস্তুতকারক বা প্রাথমিক পরিবেশকের কাছ থেকে পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ন্যূনতম অর্ডারের শর্তও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অনেক ব্র্যান্ডের অনুমোদিত পরিবেশক না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও একই পরিবেশক পাইকারি সরবরাহের পাশাপাশি সরাসরি খুচরা ব্যবসায়ও যুক্ত। এতে যেসব খুচরা ব্যবসায়ী তাদের কাছ থেকে পণ্য কেনেন, তাদের সঙ্গেই অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।

অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের চাপ

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত গাড়িতে করে কিছু পণ্য সীমান্ত পেরিয়ে আসে, কিন্তু সেগুলো সবসময় যথাযথ কাস্টমস পরিদর্শন বা কর ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। লাইসেন্সবিহীন ঘরে ঘরে বিক্রি, অনানুষ্ঠানিক অনলাইন বিক্রেতা এবং ব্রিফকেস ব্যবসায়ীরাও আনুষ্ঠানিক বাজারের বাইরে কার্যক্রম চালান।

এর ফলে নিবন্ধিত ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। যারা নিয়ম মেনে কর দেন এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক ব্যয় বহন করেন, তারা স্বাভাবিকভাবেই এমন দামের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সমস্যায় পড়েন যেখানে এসব খরচের বড় অংশই নেই।

শুধু দাম কমালেই হবে না

তবে জয়গাঁওয়ের প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণের কারণ শুধু কম দাম নয়। জরিপে ৬২.২ শতাংশ উত্তরদাতা বেশি পণ্যের বৈচিত্র্যকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৩৯.৭ শতাংশ ভালো গ্রাহকসেবা এবং ৩০.৪ শতাংশ সুবিধাজনক কেনাকাটার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।

এখানেই ফুয়েন্তশোলিংয়ের জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে। স্থানীয় বাজারকে টিকিয়ে রাখতে শুধু কর কমানো বা পণ্যের দাম কমানো যথেষ্ট হবে না। ক্রেতার কাছে বাজারকে একই সঙ্গে সাশ্রয়ী, বৈচিত্র্যময় এবং সুবিধাজনক করে তুলতে হবে।

করণীয় কী

এই সমস্যার সমাধান কোনো একক ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারকদের কর, এমডিপি ফি, কাস্টমস ক্লিয়ারিং চার্জ এবং আমদানি-সংক্রান্ত অন্যান্য ব্যয় পর্যালোচনা করতে হবে। কোথায় অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো যায়, সেটি চিহ্নিত করা জরুরি।

একই সঙ্গে ব্যক্তিগত গাড়িতে বাণিজ্যিক পণ্য প্রবেশের বিষয়টি আরও কার্যকরভাবে নজরদারির আওতায় আনতে হবে। তবে প্রকৃত ব্যক্তিগত আমদানি ও বাণিজ্যিক পরিমাণে পণ্য আনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখাও জরুরি।

মাঝারি মেয়াদে ভুটানের ছোট খুচরা ব্যবসায়ীদের ভারতীয় পাইকারি বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। যৌথভাবে পণ্য কেনার ব্যবস্থা বা স্থানীয় সমবায়ী ক্রয়ব্যবস্থা ছোট ব্যবসায়ীদের ন্যূনতম অর্ডারের বাধা অতিক্রম করতে সাহায্য করতে পারে।

ভুটানে অনুমোদিত ব্র্যান্ড পরিবেশকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি পাইকারি বিতরণ ও খুচরা বিক্রির স্বার্থের সংঘাত কমানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

একই সঙ্গে ফুয়েন্তশোলিংয়ের বাজারব্যবস্থাকে আধুনিক করা প্রয়োজন। দোকান ও কেনাকাটার এলাকা আরও সুশৃঙ্খল করা, পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, ব্যবসায়ীদের ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ উন্নত করা এবং কর্মীদের গ্রাহকসেবা, পণ্যজ্ঞান, মজুত ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল পেমেন্টে দক্ষ করে তোলা যেতে পারে।

প্রতি বছর একই ধরনের মূল্য জরিপ চালানোও গুরুত্বপূর্ণ। তাতে বোঝা যাবে, নেওয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবে জয়গাঁও ও ফুয়েন্তশোলিংয়ের দামের ব্যবধান কমাতে পারছে কি না।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু জয়গাঁওয়ে ক্রেতা হারানোর নয়। একটি পরিবার যখন কম দামে সবজি, স্কুলের সামগ্রী বা গৃহস্থালি পণ্য কিনতে সীমান্ত পার হয়, তখন সেই অর্থ স্থানীয় দোকান, কর্মী ও সরবরাহব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ঘুরে অর্থনীতিতে ফেরার বদলে দেশের বাইরে চলে যায়।

ফুয়েন্তশোলিংয়ের খুচরা বাজারকে তাই শুধু ব্যবসায়ীদের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি পরিবারের ব্যয়, ক্ষুদ্র ব্যবসার সক্ষমতা এবং স্থানীয় অর্থনীতির গতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

যেখানে সরবরাহব্যবস্থা দক্ষ, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রিত এবং বাজারে প্রতিযোগিতা আছে, সেখানে ফুয়েন্তশোলিংয়ের ব্যবসায়ীরাও জয়গাঁওয়ের চেয়ে কম দামে পণ্য বিক্রি করতে পারেন—ইলেকট্রনিকসের বাজার তারই প্রমাণ।

এখন চ্যালেঞ্জ হলো সেই সক্ষমতাকে আরও বেশি পণ্যের ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়া। ক্রেতাদের সীমান্ত পার না হওয়ার জন্য শুধু তাদের বোঝানো যথেষ্ট নয়। এমন একটি স্থানীয় বাজার তৈরি করতে হবে, যেখানে পরিবারের বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম, পর্যাপ্ত পণ্যের বৈচিত্র্য এবং ভালো কেনাকাটার অভিজ্ঞতা—তিনটিই একসঙ্গে পাওয়া যায়। তাহলেই ফুয়েন্তশোলিংয়ের খুচরা বাজার শুধু টিকে থাকবে না, স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও আরও কার্যকর ভিত্তি হয়ে উঠবে।