১১:৩৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চাঁদেও এবার চালু হচ্ছে ‘আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ’ ব্যবস্থা যুদ্ধ থামছে না কেন? অপরাধ যখন ধর্মের পরিচয় পায় ঝলমলে শিল্পে আত্মভালোবাসার বার্তা দিচ্ছেন সারা শাকিল শতায়ু বাবা-মায়ের সন্তানদের আয়ু ও সুস্বাস্থ্যের সম্ভাবনা বেশি শিক্ষিত, দক্ষ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণদেরই ফাঁদে ফেলছে মানবপাচারকারীরা পাকিস্তান-রাশিয়া সম্পর্ক: অবহেলিত হলেও কেন বাড়ছে কৌশলগত গুরুত্ব বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফি দ্বিগুণ-তিনগুণ, সুযোগ নিয়ে থাকছে প্রশ্ন গাজীপুরে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার ২ যাত্রী নিহত তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নতুন তথ্য, জাতিসংঘ অধিবেশনের আগে হচ্ছে না

বাড়ির আঙিনায় সবার জন্য সবজি বাগান, দুবাইয়ে এক আমিরাতির নীরব মানবিক বিপ্লব

দুবাইয়ের এক সাধারণ বাড়ির ভেতরেই গড়ে উঠেছে অসাধারণ এক সবুজ ভাণ্ডার। তাজা শাকসবজি, ভেষজ পাতা আর নিত্যপ্রয়োজনীয় ফসলের এই বাগান এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো পাড়ার জন্য উন্মুক্ত। এই উদ্যোগের নেপথ্যে আছেন মোহাম্মদ আল হাসেমি, যিনি নিজের বাড়ির খালি জায়গাকে রূপ দিয়েছেন সবার জন্য খাদ্য ও শেখার এক জীবন্ত কেন্দ্রে।

শৈশবের স্মৃতি থেকে সবুজের পথে যাত্রা

মোহাম্মদ আল হাসেমির কৃষিপ্রেমের শিকড় গেঁথে আছে পারিবারিক ইতিহাসে। ছোটবেলায় বাবাকে হারালেও তাঁর বাবার কৃষির প্রতি ভালোবাসা আল হাসেমির মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। শুরুতে তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি কেন সবুজ গাছপালা আর মাটির প্রতি তাঁর এমন টান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, গাছের সঙ্গে নয় শুধু, মাটি আর পানির সঙ্গেও তাঁর এক গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

দুই হাজার সাল থেকে এক নিরবচ্ছিন্ন চাষ

Photo: Ruqayya Al Qaydi

দুই হাজার সালে বর্তমান বাড়িতে ওঠার পর ভেতরের খালি জায়গায় প্রথমে ঘাস লাগান তিনি। ধীরে ধীরে সেখানে জন্ম নিতে থাকে রকেট শাক, ওয়াটারক্রেস, শালগম, বিট, লেটুসসহ নানা সবজি। নিজের চোখের সামনে ফসল বেড়ে উঠতে দেখা তাঁকে গভীর আনন্দ দেয় এবং সেখান থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ পথচলা।

নিজ হাতে তৈরি সবুজ ঘর

একই বছরের গ্রীষ্মে স্থানীয় এক কৃষকের পরামর্শে নিজ হাতে তৈরি করেন প্লাস্টিকের সবুজঘর। লোহার কাঠামো, প্লাস্টিকের ছাউনিসহ বাতাস চলাচলের ব্যবস্থায় তিনি এমন পরিবেশ গড়ে তোলেন, যেখানে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এতে সারা বছরই সবজি দ্রুত ও ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। সেচের পানির তাপমাত্রা কম রাখতে তিনি ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংক ব্যবহার করেন, সঙ্গে থাকে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা।

রাসায়নিক নয়, প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষ

আল হাসেমি সবসময় প্রাকৃতিক কৃষিতে বিশ্বাসী। তিনি লাল মাটির সঙ্গে প্রাকৃতিক কাদামাটি মিশিয়ে জমি তৈরি করেন যাতে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে। সার হিসেবে ব্যবহার করেন তাপে প্রক্রিয়াজাত গরু ও মুরগির গোবর। মাঝে মাঝে মাছ ভিত্তিক জৈব সারও যোগ করেন। তাঁর বাগানের সব গাছই নিজের হাতে বীজ থেকে জন্মানো চারা।

Mohammed Al-Hashemi

বীজ বাছাইয়ে সতর্কতা

বাজারের চারা কিনে রোপণের বদলে বীজ থেকেই গাছ  করার ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, বাজারের অনেক চারা ভিন্ন পরিবেশে বড় হওয়ায় রোপণের পর দুর্বল হয়ে পড়ে। সঠিক মানের বীজ নির্বাচন ও সঠিকভাবে রোপণই সফল চাষের চাবিকাঠি।

সবার জন্য উন্মুক্ত সবুজ ভাণ্ডার

আজ আল হাসেমির বাগান এক ধরনের পাড়ার খাবার ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেশীরা, এমনকি তাঁদের গৃহকর্মীরাও এখানে এসে ধনে পাতা, পার্সলে, তুলসী, মরিচসহ প্রয়োজনীয় শাকসবজি তুলে নেন। রান্নার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই নেন সবাই, বিনিময়ে কিছুই দিতে হয় না।

Photo: Ruqayya Al Qaydi

শেখা ও শেখানোর উদ্যোগ

বাগান শুধু ফসলের জায়গা নয়, এটি এখন শেখারও কেন্দ্র। আল হাসেমি নিয়মিত কর্মশালা করেন, যেখানে মাটি ঝুরঝুরে করা, চারা স্থানান্তর, গাছ ছাঁটাইয়ের মতো বিষয় শেখান। সামাজিক মাধ্যমে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। এতে আগ্রহী স্বেচ্ছাসেবকরা এগিয়ে আসেন, স্থানীয় স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরাও বাগানে এসে হাতে-কলমে শিখছে।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন

পোকামাকড়, চরম আবহাওয়া আর নিম্নমানের বীজ—এসব চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করলেও আল হাসেমির স্বপ্ন থেমে নেই। তাঁর লক্ষ্য পুরো পাড়ার জন্য এক সবুজ বাগান গড়ে তোলা, যেখানে সবাই শিখবে, চাষ করবে আর ভাগাভাগি করবে। তাঁর বিশ্বাস, একসঙ্গে চাষ আর ভাগ করে নিলেই গড়ে উঠবে আরও সবুজ ও স্বাস্থ্যকর সমাজ।

Photo: Ruqayya Al Qaydi

 

জনপ্রিয় সংবাদ

চাঁদেও এবার চালু হচ্ছে ‘আকাশপথ নিয়ন্ত্রণ’ ব্যবস্থা

বাড়ির আঙিনায় সবার জন্য সবজি বাগান, দুবাইয়ে এক আমিরাতির নীরব মানবিক বিপ্লব

০১:০০:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

দুবাইয়ের এক সাধারণ বাড়ির ভেতরেই গড়ে উঠেছে অসাধারণ এক সবুজ ভাণ্ডার। তাজা শাকসবজি, ভেষজ পাতা আর নিত্যপ্রয়োজনীয় ফসলের এই বাগান এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো পাড়ার জন্য উন্মুক্ত। এই উদ্যোগের নেপথ্যে আছেন মোহাম্মদ আল হাসেমি, যিনি নিজের বাড়ির খালি জায়গাকে রূপ দিয়েছেন সবার জন্য খাদ্য ও শেখার এক জীবন্ত কেন্দ্রে।

শৈশবের স্মৃতি থেকে সবুজের পথে যাত্রা

মোহাম্মদ আল হাসেমির কৃষিপ্রেমের শিকড় গেঁথে আছে পারিবারিক ইতিহাসে। ছোটবেলায় বাবাকে হারালেও তাঁর বাবার কৃষির প্রতি ভালোবাসা আল হাসেমির মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। শুরুতে তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি কেন সবুজ গাছপালা আর মাটির প্রতি তাঁর এমন টান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, গাছের সঙ্গে নয় শুধু, মাটি আর পানির সঙ্গেও তাঁর এক গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

দুই হাজার সাল থেকে এক নিরবচ্ছিন্ন চাষ

Photo: Ruqayya Al Qaydi

দুই হাজার সালে বর্তমান বাড়িতে ওঠার পর ভেতরের খালি জায়গায় প্রথমে ঘাস লাগান তিনি। ধীরে ধীরে সেখানে জন্ম নিতে থাকে রকেট শাক, ওয়াটারক্রেস, শালগম, বিট, লেটুসসহ নানা সবজি। নিজের চোখের সামনে ফসল বেড়ে উঠতে দেখা তাঁকে গভীর আনন্দ দেয় এবং সেখান থেকেই শুরু হয় দীর্ঘ পথচলা।

নিজ হাতে তৈরি সবুজ ঘর

একই বছরের গ্রীষ্মে স্থানীয় এক কৃষকের পরামর্শে নিজ হাতে তৈরি করেন প্লাস্টিকের সবুজঘর। লোহার কাঠামো, প্লাস্টিকের ছাউনিসহ বাতাস চলাচলের ব্যবস্থায় তিনি এমন পরিবেশ গড়ে তোলেন, যেখানে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে থাকে। এতে সারা বছরই সবজি দ্রুত ও ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। সেচের পানির তাপমাত্রা কম রাখতে তিনি ভূগর্ভস্থ পানির ট্যাংক ব্যবহার করেন, সঙ্গে থাকে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা।

রাসায়নিক নয়, প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষ

আল হাসেমি সবসময় প্রাকৃতিক কৃষিতে বিশ্বাসী। তিনি লাল মাটির সঙ্গে প্রাকৃতিক কাদামাটি মিশিয়ে জমি তৈরি করেন যাতে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে। সার হিসেবে ব্যবহার করেন তাপে প্রক্রিয়াজাত গরু ও মুরগির গোবর। মাঝে মাঝে মাছ ভিত্তিক জৈব সারও যোগ করেন। তাঁর বাগানের সব গাছই নিজের হাতে বীজ থেকে জন্মানো চারা।

Mohammed Al-Hashemi

বীজ বাছাইয়ে সতর্কতা

বাজারের চারা কিনে রোপণের বদলে বীজ থেকেই গাছ  করার ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, বাজারের অনেক চারা ভিন্ন পরিবেশে বড় হওয়ায় রোপণের পর দুর্বল হয়ে পড়ে। সঠিক মানের বীজ নির্বাচন ও সঠিকভাবে রোপণই সফল চাষের চাবিকাঠি।

সবার জন্য উন্মুক্ত সবুজ ভাণ্ডার

আজ আল হাসেমির বাগান এক ধরনের পাড়ার খাবার ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে। প্রতিবেশীরা, এমনকি তাঁদের গৃহকর্মীরাও এখানে এসে ধনে পাতা, পার্সলে, তুলসী, মরিচসহ প্রয়োজনীয় শাকসবজি তুলে নেন। রান্নার জন্য যতটুকু দরকার, ততটুকুই নেন সবাই, বিনিময়ে কিছুই দিতে হয় না।

Photo: Ruqayya Al Qaydi

শেখা ও শেখানোর উদ্যোগ

বাগান শুধু ফসলের জায়গা নয়, এটি এখন শেখারও কেন্দ্র। আল হাসেমি নিয়মিত কর্মশালা করেন, যেখানে মাটি ঝুরঝুরে করা, চারা স্থানান্তর, গাছ ছাঁটাইয়ের মতো বিষয় শেখান। সামাজিক মাধ্যমে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। এতে আগ্রহী স্বেচ্ছাসেবকরা এগিয়ে আসেন, স্থানীয় স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরাও বাগানে এসে হাতে-কলমে শিখছে।

ভবিষ্যতের স্বপ্ন

পোকামাকড়, চরম আবহাওয়া আর নিম্নমানের বীজ—এসব চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করলেও আল হাসেমির স্বপ্ন থেমে নেই। তাঁর লক্ষ্য পুরো পাড়ার জন্য এক সবুজ বাগান গড়ে তোলা, যেখানে সবাই শিখবে, চাষ করবে আর ভাগাভাগি করবে। তাঁর বিশ্বাস, একসঙ্গে চাষ আর ভাগ করে নিলেই গড়ে উঠবে আরও সবুজ ও স্বাস্থ্যকর সমাজ।

Photo: Ruqayya Al Qaydi