০৭:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব সঙ্কুচিত পোশাক কি নষ্ট না করেই আগের মাপে ফেরানো সম্ভব? ডায়মন্ড লিগের ফাইনালে তৃতীয় অ্যামি হান্ট, দুর্দান্ত ছন্দে ছুটছেন ব্রিটিশ তারকা মারাঠি না জানলে ঝুঁকিতে লাইসেন্স, মহারাষ্ট্রে ট্যাক্সি ও অটোরিকশাচালকদের মিলল আরও এক বছর বয়স বাড়লেই জীবন থেমে যায় না, বরং আসে নিজের মতো বাঁচার স্বাধীনতা: প্রু লেইথ দাঁতের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পথে বজ্রপাতে আহত, ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতার কথা জানালেন নিউইয়র্কের যুবক পেন্টাগনের নিয়ন্ত্রণ কি হারাচ্ছেন পিট হেগসেথ? আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন তুলে ধরা মানচিত্রের পক্ষে জাতিসংঘের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সন্তান হত্যার মামলায় রায় হয়নি, লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র বিতর্ক ক্যানসারে আক্রান্ত ‘ইভিল ডেড’ তারকা ব্রুস ক্যাম্পবেল, বললেন বাঁচার সময় পাঁচ বছর

ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর দক্ষিণ এশিয়ার নতুন শক্তির সমীকরণ

দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান বিমান সংঘাত যে ধরনের কৌশলগত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, তা কেবল দুই দেশের সীমান্ত রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এক বছর পর এসে স্পষ্ট হচ্ছে, এই সংঘাত আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, সামরিক প্রযুক্তির বাজার, এমনকি আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃষ্টিভঙ্গিকেও নতুনভাবে সাজিয়েছে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় দিক ছিল আকাশযুদ্ধের চরিত্র। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক ও কূটনৈতিক পরিসরে নিজেকে আঞ্চলিক প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। সংখ্যাগত সামরিক সক্ষমতা, উন্নত যুদ্ধবিমান এবং আক্রমণাত্মক অবস্থানের কারণে শুরুতে ভারতের কৌশলগত সুবিধা ছিল স্পষ্ট। কিন্তু সংঘাতের গতিপথ দ্রুত বদলে যায় যখন পাকিস্তান বিমানবাহিনী পাল্টা জবাব দিয়ে সেই সুবিধাকে কার্যত ভেঙে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ইতিহাসে এটিই সম্ভবত প্রথম বড় সংঘর্ষ যেখানে ড্রোন প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যযুদ্ধ একসঙ্গে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেয়।

বিশ্বের সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে এই যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—পারমাণবিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও প্রচলিত সামরিক প্রতিরোধের গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়নি। বরং সীমিত সংঘর্ষের নতুন বাস্তবতায় বিমান শক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই নির্ধারণ করছে সংঘাতের ফলাফল। ভারত আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েও দ্রুত কৌশলগত চাপে পড়ে যায়। অন্যদিকে পাকিস্তান দেখিয়েছে, পারমাণবিক ছাতার নিচেও দক্ষ প্রচলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

The Unyielding Tension: India-Pakistan Conflict 2025 | History

তবে এই সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। সমান্তরালে চলেছে বর্ণনা ও তথ্যের যুদ্ধ। ভারতের গণমাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আবেগকে সামনে এনে এক ধরনের বিজয়ের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও স্বাধীন সূত্রগুলো শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের দেওয়া তথ্য ও প্রমাণকেই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেছে। এর ফলে আধুনিক যুদ্ধে “ন্যারেটিভ কন্ট্রোল” যে কেবল প্রচারণা দিয়ে সম্ভব নয়, বরং তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে ওঠে—সেটিও আবার সামনে এসেছে।

এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈশ্বিক শক্তির অবস্থান। চীন প্রকাশ্যে পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নেয়, তুরস্কও সমর্থন জানায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং জাপান সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে সংযমের আহ্বান জানায়। এতে বোঝা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এখন আর কেবল আঞ্চলিক বিষয় নয়; এটি বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাবের অংশ।

বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে চীনা সামরিক প্রযুক্তির প্রশ্ন। পাকিস্তানের ব্যবহৃত জে-১০সি যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। একই সময়ে ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়ে। ফলে প্রতিরক্ষা শিল্পেও নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। চীনা প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর বিক্রি বেড়েছে, ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

South Asia on edge: Kashmir tensions flare again | News.az

ভারতের জন্য এই সংঘাতের রাজনৈতিক দিকটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গত এক দশকে দেশটির রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ ও সামরিক উত্তেজনাকে অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা গেছে। সীমান্ত উত্তেজনা প্রায়ই রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা তৈরির উপাদান হয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালের সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, এমন কৌশল সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। সামরিক ও অর্থনৈতিক মূল্য যখন বেড়ে যায়, তখন তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ তাই এখন নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। এই অঞ্চলে আর শুধু সেনাসংখ্যা বা অস্ত্রের পরিমাণ শক্তির মাপকাঠি নয়। প্রযুক্তি, তথ্যনিয়ন্ত্রণ, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতাই হয়ে উঠছে নতুন শক্তির ভাষা। ২০২৫ সালের সংঘাত সেই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হয়ে থাকবে।

সারা থিংকার গবেষণা সহকারী, সেন্টার ফর অ্যারোস্পেস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (সিএএসএস), ইসলামাবাদ।

জনপ্রিয় সংবাদ

জেন জি-র ‘ফ্রেন্ডস’ বানানোর চেষ্টা চলছে, কিন্তু কেন তা অসম্ভব

ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর দক্ষিণ এশিয়ার নতুন শক্তির সমীকরণ

০৬:১৮:০৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৭ মে ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনা নতুন কিছু নয়। কিন্তু ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান বিমান সংঘাত যে ধরনের কৌশলগত প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, তা কেবল দুই দেশের সীমান্ত রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এক বছর পর এসে স্পষ্ট হচ্ছে, এই সংঘাত আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য, সামরিক প্রযুক্তির বাজার, এমনকি আন্তর্জাতিক কূটনীতির দৃষ্টিভঙ্গিকেও নতুনভাবে সাজিয়েছে।

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় দিক ছিল আকাশযুদ্ধের চরিত্র। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই সামরিক ও কূটনৈতিক পরিসরে নিজেকে আঞ্চলিক প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। সংখ্যাগত সামরিক সক্ষমতা, উন্নত যুদ্ধবিমান এবং আক্রমণাত্মক অবস্থানের কারণে শুরুতে ভারতের কৌশলগত সুবিধা ছিল স্পষ্ট। কিন্তু সংঘাতের গতিপথ দ্রুত বদলে যায় যখন পাকিস্তান বিমানবাহিনী পাল্টা জবাব দিয়ে সেই সুবিধাকে কার্যত ভেঙে দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ইতিহাসে এটিই সম্ভবত প্রথম বড় সংঘর্ষ যেখানে ড্রোন প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং তথ্যযুদ্ধ একসঙ্গে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেয়।

বিশ্বের সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে এই যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—পারমাণবিক অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও প্রচলিত সামরিক প্রতিরোধের গুরুত্ব শেষ হয়ে যায়নি। বরং সীমিত সংঘর্ষের নতুন বাস্তবতায় বিমান শক্তি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই নির্ধারণ করছে সংঘাতের ফলাফল। ভারত আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েও দ্রুত কৌশলগত চাপে পড়ে যায়। অন্যদিকে পাকিস্তান দেখিয়েছে, পারমাণবিক ছাতার নিচেও দক্ষ প্রচলিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

The Unyielding Tension: India-Pakistan Conflict 2025 | History

তবে এই সংঘাত শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল না। সমান্তরালে চলেছে বর্ণনা ও তথ্যের যুদ্ধ। ভারতের গণমাধ্যমে জাতীয়তাবাদী আবেগকে সামনে এনে এক ধরনের বিজয়ের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও স্বাধীন সূত্রগুলো শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের দেওয়া তথ্য ও প্রমাণকেই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করেছে। এর ফলে আধুনিক যুদ্ধে “ন্যারেটিভ কন্ট্রোল” যে কেবল প্রচারণা দিয়ে সম্ভব নয়, বরং তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে ওঠে—সেটিও আবার সামনে এসেছে।

এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বৈশ্বিক শক্তির অবস্থান। চীন প্রকাশ্যে পাকিস্তানের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নেয়, তুরস্কও সমর্থন জানায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং জাপান সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে সংযমের আহ্বান জানায়। এতে বোঝা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এখন আর কেবল আঞ্চলিক বিষয় নয়; এটি বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাবের অংশ।

বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে চীনা সামরিক প্রযুক্তির প্রশ্ন। পাকিস্তানের ব্যবহৃত জে-১০সি যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বাজারে নতুন আগ্রহ তৈরি করেছে। একই সময়ে ভারতের রাফাল যুদ্ধবিমান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়ে। ফলে প্রতিরক্ষা শিল্পেও নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। চীনা প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর বিক্রি বেড়েছে, ড্রোন ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে।

South Asia on edge: Kashmir tensions flare again | News.az

ভারতের জন্য এই সংঘাতের রাজনৈতিক দিকটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গত এক দশকে দেশটির রাজনীতিতে জাতীয়তাবাদ ও সামরিক উত্তেজনাকে অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা গেছে। সীমান্ত উত্তেজনা প্রায়ই রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা তৈরির উপাদান হয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালের সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, এমন কৌশল সবসময় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। সামরিক ও অর্থনৈতিক মূল্য যখন বেড়ে যায়, তখন তার রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ তাই এখন নতুন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। এই অঞ্চলে আর শুধু সেনাসংখ্যা বা অস্ত্রের পরিমাণ শক্তির মাপকাঠি নয়। প্রযুক্তি, তথ্যনিয়ন্ত্রণ, কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতাই হয়ে উঠছে নতুন শক্তির ভাষা। ২০২৫ সালের সংঘাত সেই পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হয়ে থাকবে।

সারা থিংকার গবেষণা সহকারী, সেন্টার ফর অ্যারোস্পেস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (সিএএসএস), ইসলামাবাদ।