০৮:৫১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
নিশ্চিতভাবে যুদ্ধ শেষ হবে না, বদলে যাবে যুদ্ধের ধরন রপ্তানি বাড়ছে, অর্ডার কমছে—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের মুনাফা যাচ্ছে কোথায়? ‘Belonging: A Journey of Love’: সোনিয়া গান্ধীর বহুল আলোচিত স্মৃতিকথা ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশ সিলেটে প্রতিমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কট সাংবাদিকদের, বিএনপির বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ বিএনপির মন্ত্রীদের মান্নার কড়া বার্তা: ‘সত্য বলুন, দম্ভ দেখাবেন না’ ভারী বৃষ্টিতে দিল্লি অচল, কনট প্লেস থেকে বিমানবন্দর পানির নিচে বিশ্বে খাদ্যপণ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ, বাড়ছে সরবরাহ ঝুঁকি বেলুচিস্তানে ৭২ ঘণ্টার অভিযানে ৪৮ ‘সন্ত্রাসী’ নিহত, দাবি পাকিস্তানের হৃদয় থেকে রান্না, স্বাস্থ্য থেকে মানুষের পাশে: উদ্ভিদভিত্তিক খাবারে বদলের গল্প চট্টগ্রামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, ব্যবসায়ীকে ‘ছেলেমেয়ের লাশ ফেলে রাখার’ হুমকি

মুসলিম ভোটার বাদ বিতর্কে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর ঝড়

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে কিছু জেলায় মুসলিম ভোটারদের নাম বেশি হারে বাদ পড়ার অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া বা এসআইআর শুরু হয়েছিল তালিকা পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে, কিন্তু তা এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতের বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

এসআইআর কীভাবে শুরু হলো

২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭.৬৬ কোটি। ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় দেখা যায়, ৬৩ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়েছে, ফলে ভোটারের সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ৭ কোটিতে। এই বাদ পড়া নামগুলোকে অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত এবং ডুপ্লিকেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

তবে খসড়া তালিকায় আরও জটিলতা দেখা দেয়। প্রায় ৩০ লক্ষ ভোটারকে ‘অম্যাপড’ বলা হয়, অর্থাৎ ২০০২ সালের পূর্ববর্তী তালিকার সঙ্গে তাদের কোনও মিল পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি প্রায় ১.২০ কোটি নামকে ‘যুক্তিগত অসামঞ্জস্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

যুক্তিগত অসামঞ্জস্য কী

নির্বাচন কমিশন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে পাঁচ ধরনের অসামঞ্জস্য চিহ্নিত করে। এর মধ্যে ছিল নামের বানান ভিন্নতা, একই পূর্বপুরুষের সঙ্গে অতিরিক্ত সংখ্যক ভোটারের সংযোগ, বাবা-মায়ের বয়সের সঙ্গে অস্বাভাবিক ব্যবধান, দাদা-দাদির বয়সের সঙ্গে অযৌক্তিক পার্থক্য এবং নামের সঙ্গে লিঙ্গের অসামঞ্জস্য।

এই যাচাই প্রক্রিয়ার পর প্রায় ১.৫ কোটি মামলার মধ্যে ৬০ লক্ষের বেশি বিতর্কিত থেকে যায়। নির্বাচন কর্মকর্তাদের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে এসব নাম ‘বিচারাধীন’ তালিকায় রাখা হয় এবং যাচাই না হওয়া পর্যন্ত তাদের ভোটাধিকার স্থগিত করা হয়।

বিচারাধীন ভোটারদের কী হলো

এই অচলাবস্থা দূর করতে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করে। আদালত উল্লেখ করে, নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। ফলে প্রায় ৭০০ জন বিচারক ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারককে এই মামলাগুলোর শুনানির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আদালত জানায়, ফেব্রুয়ারির তালিকাকে চূড়ান্ত ধরা হবে না এবং পরবর্তী তালিকায় যাচাই শেষে নাম যুক্ত করা যাবে। এতে বিচারাধীন ভোটারদের পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়।

Serpentine lines outside tribunal centres in Bengal as deleted voters queue  up to get their names back on voter lists - The Hindu

কত নাম বাদ পড়ল

বিচার প্রক্রিয়ার শেষে ৬০ লক্ষের মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষ নাম বাতিল করা হয়। যাদের নাম বাদ গেছে, তারা এখন নির্বাচন কমিশন গঠিত ১৯টি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে পারেন। তবে ভোটার তালিকা ইতিমধ্যে স্থগিত হয়ে যাওয়ায়, এসব ভোটার আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের আগের তালিকা থেকে মোট প্রায় ৯০.৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। বর্তমানে রাজ্যে বৈধ ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬.৭৭ কোটি।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। বিরোধী দল এই উদ্যোগকে সমর্থন করলেও রাজ্যের শাসক দল সময় ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, দ্রুততার কারণে ভুলের সম্ভাবনা বেড়েছে এবং নির্দিষ্ট ভোটারদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

শাসক দলের দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমর্থকদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা চলছে। বিষয়টি নিয়ে তারা নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টে একাধিকবার আপিল করেছে।

নাগরিক সমাজের অভিযোগ

নাগরিক সমাজের কিছু প্রতিনিধিও এই প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের লক্ষ্য করে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কিছু জেলায়, যেখানে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা বেশি, সেখানে সর্বাধিক নাম বাদ পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া কিছু অঞ্চলে নারীদের নামও তুলনামূলক বেশি বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের কারণে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে।

সার্বিকভাবে, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই উদ্যোগ এখন শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব আসন্ন নির্বাচনে স্পষ্টভাবে পড়তে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

নিশ্চিতভাবে যুদ্ধ শেষ হবে না, বদলে যাবে যুদ্ধের ধরন

মুসলিম ভোটার বাদ বিতর্কে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর ঝড়

০৭:৩০:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে কিছু জেলায় মুসলিম ভোটারদের নাম বেশি হারে বাদ পড়ার অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া বা এসআইআর শুরু হয়েছিল তালিকা পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে, কিন্তু তা এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘাতের বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

এসআইআর কীভাবে শুরু হলো

২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়। তখন ভোটারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭.৬৬ কোটি। ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় দেখা যায়, ৬৩ লক্ষের বেশি নাম বাদ পড়েছে, ফলে ভোটারের সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ৭ কোটিতে। এই বাদ পড়া নামগুলোকে অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত এবং ডুপ্লিকেট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

তবে খসড়া তালিকায় আরও জটিলতা দেখা দেয়। প্রায় ৩০ লক্ষ ভোটারকে ‘অম্যাপড’ বলা হয়, অর্থাৎ ২০০২ সালের পূর্ববর্তী তালিকার সঙ্গে তাদের কোনও মিল পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি প্রায় ১.২০ কোটি নামকে ‘যুক্তিগত অসামঞ্জস্য’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

যুক্তিগত অসামঞ্জস্য কী

নির্বাচন কমিশন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে পাঁচ ধরনের অসামঞ্জস্য চিহ্নিত করে। এর মধ্যে ছিল নামের বানান ভিন্নতা, একই পূর্বপুরুষের সঙ্গে অতিরিক্ত সংখ্যক ভোটারের সংযোগ, বাবা-মায়ের বয়সের সঙ্গে অস্বাভাবিক ব্যবধান, দাদা-দাদির বয়সের সঙ্গে অযৌক্তিক পার্থক্য এবং নামের সঙ্গে লিঙ্গের অসামঞ্জস্য।

এই যাচাই প্রক্রিয়ার পর প্রায় ১.৫ কোটি মামলার মধ্যে ৬০ লক্ষের বেশি বিতর্কিত থেকে যায়। নির্বাচন কর্মকর্তাদের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে এসব নাম ‘বিচারাধীন’ তালিকায় রাখা হয় এবং যাচাই না হওয়া পর্যন্ত তাদের ভোটাধিকার স্থগিত করা হয়।

বিচারাধীন ভোটারদের কী হলো

এই অচলাবস্থা দূর করতে সুপ্রিম কোর্ট হস্তক্ষেপ করে। আদালত উল্লেখ করে, নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকারের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। ফলে প্রায় ৭০০ জন বিচারক ও অবসরপ্রাপ্ত বিচারককে এই মামলাগুলোর শুনানির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আদালত জানায়, ফেব্রুয়ারির তালিকাকে চূড়ান্ত ধরা হবে না এবং পরবর্তী তালিকায় যাচাই শেষে নাম যুক্ত করা যাবে। এতে বিচারাধীন ভোটারদের পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়।

Serpentine lines outside tribunal centres in Bengal as deleted voters queue  up to get their names back on voter lists - The Hindu

কত নাম বাদ পড়ল

বিচার প্রক্রিয়ার শেষে ৬০ লক্ষের মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষ নাম বাতিল করা হয়। যাদের নাম বাদ গেছে, তারা এখন নির্বাচন কমিশন গঠিত ১৯টি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে পারেন। তবে ভোটার তালিকা ইতিমধ্যে স্থগিত হয়ে যাওয়ায়, এসব ভোটার আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের আগের তালিকা থেকে মোট প্রায় ৯০.৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে। বর্তমানে রাজ্যে বৈধ ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬.৭৭ কোটি।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। বিরোধী দল এই উদ্যোগকে সমর্থন করলেও রাজ্যের শাসক দল সময় ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের অভিযোগ, দ্রুততার কারণে ভুলের সম্ভাবনা বেড়েছে এবং নির্দিষ্ট ভোটারদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

শাসক দলের দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমর্থকদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা চলছে। বিষয়টি নিয়ে তারা নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টে একাধিকবার আপিল করেছে।

নাগরিক সমাজের অভিযোগ

নাগরিক সমাজের কিছু প্রতিনিধিও এই প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের লক্ষ্য করে নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কিছু জেলায়, যেখানে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা বেশি, সেখানে সর্বাধিক নাম বাদ পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

এছাড়া কিছু অঞ্চলে নারীদের নামও তুলনামূলক বেশি বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের কারণে এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে।

সার্বিকভাবে, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই উদ্যোগ এখন শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব আসন্ন নির্বাচনে স্পষ্টভাবে পড়তে পারে।