যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার চলমান বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে কানাডার সুপারমার্কেটগুলোতে। মার্কিন পণ্য বর্জন করে দেশীয় পণ্য কেনার প্রবণতা দ্রুত বাড়ায় দোকানের তাক, পণ্যের উৎস এবং সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হচ্ছে দেশটির মুদি ব্যবসায়ীদের।
কানাডার ক্রেতারা এখন পণ্য কেনার আগে সেটি কোন দেশের তা জানতে বেশি আগ্রহী। ফলে বড় ও ছোট—দুই ধরনের মুদি বিক্রেতাই পণ্যের উৎপত্তি স্পষ্টভাবে জানানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে নতুন সরবরাহকারী খুঁজছে।
অন্টারিওর স্বাধীন মুদি বিক্রেতা ভিন্সেস মার্কেটের চারটি দোকানে এখন প্রায় ৯০ শতাংশ ফল ও সবজি কানাডার উৎস থেকে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট জিয়ানকার্লো ত্রিমার্কি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য দোকানে রাখার কারণে ক্রেতাদের কাছ থেকে ক্ষুব্ধ ই-মেইল ও মন্তব্য পাওয়ার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানাতে বাধ্য হন যে তাদের তাকের বেশির ভাগ পণ্যই কানাডার।
আগে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে স্ট্রবেরি আনত, এখন তার পরিবর্তে কুইবেক থেকে স্ট্রবেরি সংগ্রহ করছে। তবে দেশীয় পণ্য সংগ্রহের কারণে পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। তাই প্রতিষ্ঠানটি বিজ্ঞাপনের বাজেট কমিয়েছে।
ত্রিমার্কির ভাষায়, আগে মুদি ব্যবসায়ীদের মান ও দামের মধ্যে ভারসাম্য করতে হতো। এখন সেই হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পণ্যের উৎপত্তির দেশও।
তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার মার্কিন পণ্য বর্জনের প্রবণতা অনেক বেশি তীব্র।
কানাডার সবচেয়ে বড় খাদ্যপণ্য বিক্রেতা লব্ল একইভাবে ক্রেতাদের দেশীয় পণ্য চিহ্নিত করার সুযোগ বাড়িয়েছে। আগস্টে প্রতিষ্ঠানটি ফল ও তাজা খাদ্যের বিভাগে কানাডীয় পণ্যের উৎস বোঝাতে ম্যাপল পাতার বড় চিহ্ন আবার চালু করে। পাশাপাশি শুল্কের আওতায় পড়া পণ্য শনাক্ত করতে ‘টি’ চিহ্নও ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম মুদি বিক্রেতা মেট্রো জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা স্থানীয় কানাডীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া অব্যাহত রাখবে।
কানাডার স্বাধীন মুদি বিক্রেতাদের সংগঠনের জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক কর্মকর্তা গ্যারি স্যান্ডসের মতে, এই পরিবর্তন শুধু সাময়িক বয়কট নয়। কানাডীয় ভোক্তাদের মানসিকতায় একটি স্থায়ী পরিবর্তন এসেছে।
কানাডা বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম তাজা সবজি আমদানিকারক। এত দিন দেশটির তাজা সবজি আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস ছিল যুক্তরাষ্ট্র। মোট আমদানির অর্ধেকেরও বেশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসত। তবে এখন সেই নির্ভরতা কমছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে কানাডার সবজি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ৬ শতাংশে। ২০২৩ সালের একই মাসে এই হার ছিল ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে থেকেই যে নির্ভরতা ছিল, তার তুলনায় এখন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
জুলাই পর্যন্ত কানাডার ফল আমদানিরও অর্ধেকের বেশি এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তবে গত ২১ আগস্ট বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর নতুন করে শুল্ক ও পাল্টা শুল্ক আরোপের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস খোঁজার প্রবণতা আরও জোরালো হয়েছে।
ক্রেতাদের আচরণেও বড় পরিবর্তন
টরন্টোর বাসিন্দা ২৭ বছর বয়সী সফটওয়্যার প্রকৌশলী জন অ্যামবার জানান, তিনি সম্ভব হলে মার্কিন পণ্য না কেনার চেষ্টা করছেন। এর বদলে কানাডীয় ব্র্যান্ড ও ব্যবসাকে সমর্থন করছেন।
তিনি পণ্যের লেবেল পরীক্ষা করছেন এবং কোনো পণ্য কানাডায় তৈরি কি না, সেটি জানতে অনলাইনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্যও খুঁজে দেখছেন।
অ্যামবারের মতে, কঠিন সময়ে কানাডীয় পণ্য ও প্রতিষ্ঠানকে সমর্থন করা তার নিজের জায়গা থেকে কিছুটা সহায়তা করার উপায়। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক আচরণে তিনি হতাশ বলেও জানান।
শীতের দেশেও বাড়ছে দেশীয় উৎপাদনের চেষ্টা
কানাডার তীব্র শীত দেশীয়ভাবে সারা বছর তাজা ফল ও সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় বাধা। শীতের সময়ে দেশটির মুদি দোকানগুলো সাধারণত গ্রিনহাউস, সংরক্ষিত মূলজাতীয় সবজি অথবা বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভর করে। অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশ থেকে পণ্য আনা তুলনামূলক সস্তা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে এখন স্থানীয় সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। কানাডা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য সরবরাহে আরও স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা করছে।
কানাডা সরকার আগামী ১০ বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার বিনিয়োগ করছে গ্রিনহাউস স্থাপনে। এর মাধ্যমে শীতের মাসগুলোতেও দেশে ফল ও সবজির উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশটির খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা চলছে। উন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭-এর মধ্যে কানাডায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় স্থানীয় খাদ্য সরবরাহ বাড়ানোকে সরকার গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
নতুন দেশের দিকে ঝুঁকছে ব্যবসায়ীরা
অন্টারিও ও কুইবেকে দোকান পরিচালনা করা মাইক ডিন লোকাল গ্রোসারের মালিক গর্ডন ডিন জানান, তার প্রতিষ্ঠান আগের তুলনায় এখন স্পেন, ব্রাজিল ও হন্ডুরাস থেকে বেশি ফল ও সবজি সংগ্রহ করছে।
তার মতে, একবার নতুন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হয়ে গেলে ব্যবসায়ীরা আর আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর অবস্থায় ফিরে যেতে চাইবেন না। বরং বিভিন্ন দেশের সরবরাহকারীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় তাদের সরবরাহব্যবস্থা আরও বৈচিত্র্যময় ও নিরাপদ হবে।
তবে কানাডার অভ্যন্তরেও খাদ্যপণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে। বিভিন্ন প্রদেশের আলাদা বিধিনিষেধ ও নিয়মকানুনের কারণে এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে খাদ্যপণ্য সরবরাহ করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণেই অনেক মুদি বিক্রেতাকে এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়।
গুয়েলফ বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য, কৃষি ও সম্পদ অর্থনীতির অধ্যাপক মাইক ভন ম্যাসো বলেন, বর্তমানে জাতীয় স্বার্থ ও দেশীয় পণ্য কেনার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক হিসাবকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
তবে তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক ভবিষ্যতে স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতি আবার কিছুটা বদলাতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন প্রশাসন এলে দুই দেশের উত্তেজনা কমলে কানাডার বাজারে আবার মার্কিন পণ্যের চাহিদা বাড়তে পারে। কারণ অনেক মার্কিন পণ্য এখনো অন্যান্য বিকল্প দেশের পণ্যের তুলনায় সস্তা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার ডাবলিনে সাংবাদিকদের বলেন, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে পৌঁছাতে আগ্রহী এবং খুব শিগগিরই সমঝোতা হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি আবারও অভিযোগ করেন, কানাডা মার্কিন কৃষকদের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ করছে এবং দেশটির শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত।
তবে বাণিজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ যা-ই হোক, কানাডার বাজারে এরই মধ্যে একটি পরিবর্তন দৃশ্যমান—ক্রেতারা এখন শুধু পণ্যের দাম ও মান দেখছেন না, পণ্যটি কোন দেশের সেটিও তাদের কেনাকাটার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















