০৬:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শ্রীলঙ্কাকে বাঁচাতে অর্থ নয়, বদলাতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি চীনের দিকে ঝুঁকছে ঢাকা, ভারতনির্ভরতা কমাতে নতুন কৌশল প্রেমভিত্তিক নাটক-সিনেমা নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধ চেয়ে হাইকোর্টে রিট আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি-অর্থপাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক ৯/১১-এর বহু আগেই ভারতকে হামলার লক্ষ্য করেছিলেন ওসামা বিন লাদেন, জানাল সিআইএ নথি ফরিদপুরে চা-দোকানিকে কুপিয়ে হত্যা, আহত ৩ মহাকাশ অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বে দ্বিতীয় চীন, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র কিশোর কুমারের গান গাইলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ভারত সফরে আনোয়ারের অন্যরকম মুহূর্ত ব্রিকসে এক মঞ্চে পুতিন, মোদি ও শি—বদলে যাচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ যুদ্ধের আরেকটি রণক্ষেত্র: মানুষের মনোযোগ কে নিয়ন্ত্রণ করছে?

বোল্টের রেকর্ড ছাড়িয়ে দৌড়, এবার বাস্তব কাজে নামতে চায় চীনের রোবট

মানুষের দ্রুততম দৌড়বিদ উসাইন বোল্টের বিশ্ব রেকর্ডের চেয়েও দ্রুত দৌড়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে চীনের মানবসদৃশ রোবট ‘তিয়ানগং আল্ট্রা’। তবে রেকর্ড গড়ার পরই থেমে থাকতে চাইছে না রোবটটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এবার লক্ষ্য হলো, দৌড়ের গতি থেকে রোবটকে নিয়ে যাওয়া বাস্তব কর্মক্ষেত্রে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশ্ব মানবসদৃশ রোবট গেমসে তিয়ানগং আল্ট্রা ১০০ মিটার দৌড় শেষ করেছে মাত্র ৮ দশমিক ৬৪ সেকেন্ডে। মানবদেহের সর্বোচ্চ গতির প্রতীক উসাইন বোল্টের ১০০ মিটারের বিশ্ব রেকর্ডের তুলনায় এই সময় প্রায় এক সেকেন্ড কম।

তবে এই অসাধারণ সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের কঠোর পরীক্ষা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং প্রতিযোগিতার মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত রোবট মেরামতের নিরলস চেষ্টা। রোবটটির উন্নয়নের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৩৪ বছর বয়সী প্রকৌশলী জ্যাক গুও। তিনি এখন গতি নিয়ে আরও কিছুটা এগোনোর পাশাপাশি রোবটকে নির্ভরযোগ্য ও ব্যবহারযোগ্য করে তোলাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

গুও বলেন, রোবটটি দৌড় শুরুর পর যখন নির্বিঘ্নে ৫০ মিটার পার হয়ে যায়, তখনই তিনি কিছুটা স্বস্তি পান। কারণ এর আগে অসংখ্য পরীক্ষায় রোবটের ভারসাম্য হারানো, পড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক অংশ নষ্ট হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে।

তার ভাষায়, এখন তাদের লক্ষ্য শুধু ‘উচ্চ কর্মক্ষমতা’ নয়, বরং সেই কর্মক্ষমতাকে ‘উচ্চ নির্ভরযোগ্যতা ও ব্যবহারযোগ্যতায়’ রূপ দেওয়া।

বেইজিংয়ের রোবট গবেষণাকেন্দ্র

তিয়ানগং আল্ট্রা তৈরি করছে বেইজিংয়ের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইঝুয়াং এলাকায় অবস্থিত বেইজিং হিউম্যানয়েড রোবট ইনোভেশন সেন্টার, যা ‘এক্স-হিউম্যানয়েড’ নামেও পরিচিত। এলাকাটি চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রোবট প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

একসময় এই এলাকায় মূলত গাড়ি নির্মাণ শিল্পের আধিপত্য ছিল। এখন সেখানে রোবট বিক্রয়কেন্দ্র থেকে শুরু করে রোবটভিত্তিক রেস্তোরাঁ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে। চীনের সরকারও দেশটির রোবট শিল্পকে সামনে আনতে এই ধরনের প্রযুক্তি প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

এক্স-হিউম্যানয়েডের ভবনে ঢুকলেই তিয়ানগং রোবটের বিভিন্ন প্রজন্মের নমুনা দেখা যায়। এর মধ্যে এমন একটি রোবটও রয়েছে, যেটি গত বছর একটি হাফ-ম্যারাথনে জয়ী হয়েছিল।

গবেষণাগারের ভেতরে সাদা রঙের আল্ট্রা ও ওমনি রোবটকে ধাতব কাঠামোর সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। কোথাও প্রকৌশলীরা রোবটের মাথার অংশ খুলে পরীক্ষা করছেন, কেউ পায়ের যন্ত্রাংশ ঠিক করছেন, আবার কেউ রোবটকে হাঁটানোর পরীক্ষা চালাচ্ছেন।

এর পাশের অফিসে সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করেন প্রকৌশলীরা। নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করার পর সেটি বাস্তব রোবটে পরীক্ষা করা হয়।After Outrunning Bolt, China's Robot Champion Races Towards Real-World Work

রাষ্ট্র ও বেসরকারি বিনিয়োগে এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তি

এক্স-হিউম্যানয়েড প্রতিষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে। প্রতিষ্ঠানটির পেছনে রয়েছে সরকারি মালিকানাধীন ও বেসরকারি বিনিয়োগকারী। এর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউবিটেক এবং চীনের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শাওমি ও বাইদু।

প্রতিষ্ঠানটি শুধু নিজেদের রোবট তৈরি করছে না; মানবসদৃশ রোবট শিল্পের জন্য হার্ডওয়্যার, চলাচল নিয়ন্ত্রণের সফটওয়্যার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিও তৈরি করছে।

তবে তারা এখনো নিজেদের কতগুলো রোবট বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগাতে পেরেছে, সে সংখ্যা প্রকাশ করেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পক্ষেত্রে রোবটের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রাহক বা পরীক্ষামূলক অংশীদার হিসেবে রয়েছে।

বেইজিংয়ের ফোটন কামিন্সের ইঞ্জিন কারখানায়ও তাদের রোবট পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে ‘তিয়ানই ২.০’ নামের একটি রোবট ৮ থেকে ১২ কেজি ওজনের বাক্স তুলে তাকের ওপর রাখার কাজ করেছে। কারখানাটিও এটিকে প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষা হিসেবে দেখছে।

দৌড়ের রোবট থেকে কর্মক্ষেত্রের সহকারী

তিয়ানগং আল্ট্রাকে শুরুতে কোনো দৌড় প্রতিযোগিতায় জেতানোর জন্য তৈরি করা হয়নি। মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবসদৃশ রোবট কত দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে চলতে পারে, তার সীমা পরীক্ষা করা।

জ্যাক গুও বর্তমান মানবসদৃশ রোবটকে অতীতের প্রথম দিককার গাড়ির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, প্রথমে গাড়িকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য করতে হয়েছিল। একইভাবে রোবটের ক্ষেত্রেও প্রথম কাজ হচ্ছে এর শরীর ও চলাচলকে নির্ভরযোগ্য করা। এরপর আরও উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে রোবটকে জটিল কাজ নিজে থেকে করার সক্ষমতা দিতে হবে।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রোবটের শরীর এবং চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে তা প্রতিদিনের বাস্তব কাজে স্থিতিশীলভাবে কাজ করতে পারে। আরও জটিল স্বয়ংক্রিয় কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরিতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করেন গুও।

ছোট রোবটের জন্য হালকা শিল্প ও সেবা খাত

দৌড়ানোর সক্ষমতা শুধু গতি দেখানোর জন্য নয়। বিভিন্ন ধরনের মাটিতে ভারসাম্য রেখে চলার ক্ষমতা বাড়াতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।

এরই একটি উদাহরণ হলো ছোট আকারের ‘ওমনি’ রোবট। চলতি বছর এক পরীক্ষায় এটি এক্স-হিউম্যানয়েডের সদর দপ্তরের প্রথম তলা থেকে ১৭ তলা পর্যন্ত উঠে গেছে।

গুও মনে করেন, ছোট আকারের মানবসদৃশ রোবটগুলো প্রথম দিকে বাণিজ্যিক সেবা ও হালকা শিল্পে বেশি ব্যবহার হতে পারে। অন্যদিকে তুলনামূলক বড় ও শক্তিশালী আল্ট্রা ভবিষ্যতে বাইরের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কিংবা জরুরি উদ্ধারকাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে দ্রুত দৌড়ানোর পাশাপাশি রোবটকে নিরাপদে থামানোও বড় সমস্যা।

আল্ট্রার ওজন প্রায় ৭৫ কেজি। সর্বোচ্চ গতিতে এটি প্রতি সেকেন্ডে ১৭ মিটারের বেশি পথ অতিক্রম করতে পারে। প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার দৌড় শেষে থামার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় রোবটগুলোকে অনেক সময় দৌড় শেষে বাধার সঙ্গে ধাক্কা খেতে হয়েছে। এর পেছনে নিরাপত্তার জন্য একটি মোটা গদি রাখা হয়েছিল।

ভবিষ্যৎ সংস্করণে রোবটকে আরও হালকা করার পাশাপাশি দ্রুত ব্রেক করার সক্ষমতা এবং আরও নিরাপদ দেহভঙ্গি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বোল্টকে ছাড়িয়ে যাওয়ার দৌড়

বিশ্ব মানবসদৃশ রোবট গেমসে অংশ নেওয়ার আগে আল্ট্রার জন্য তিনটি ভিন্ন দৌড়ের কৌশল তৈরি করা হয়েছিল। এগুলো সিমুলেশনে প্রশিক্ষিত চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। একটি আগে থেকেই পরীক্ষিত ছিল, আর দুটি কাগজে-কলমে আরও দ্রুত হলেও সেগুলো তুলনামূলকভাবে কম পরীক্ষিত।

এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রোবটের বিভিন্ন জয়েন্ট, ভারসাম্য ও চলাচল একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে কোনো মানুষকে প্রতিটি পদক্ষেপ নির্দেশ না দিয়েও রোবট সোজা হয়ে দৌড়াতে পারে।

প্রাথমিক দৌড়ে আল্ট্রার সময় ছিল ৯ দশমিক ৩৯ সেকেন্ড। সেমিফাইনালে সময় কমে হয় ৮ দশমিক ৮৬ সেকেন্ড। আর ফাইনালে সে আরও গতি বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৬৪ সেকেন্ডে ১০০ মিটার শেষ করে।

প্রতিটি দৌড়ের মধ্যবর্তী সময়ে প্রকৌশলীরা পরীক্ষাগারে ফিরে গিয়ে নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরীক্ষা করেন। কখনো কখনো সারা রাত ধরে পরীক্ষা চালিয়ে পরদিন আবার প্রতিযোগিতার মাঠে ফিরতে হয়েছে তাদের।

সীমা ছাড়িয়ে পরীক্ষা চালানোর সময় অনেক রোবট হোঁচট খেয়েছে, ভারসাম্য হারিয়েছে এবং পড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত রোবটের বদলে কখনো অতিরিক্ত রোবট মাঠে নামাতে হয়েছে। আবার মেরামতকারী দলকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্র ঠিক করতে হয়েছে।

গুও জানান, উন্নয়নের আগের পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন ছিল। কখনো রোবটের পা ভেঙেছে, কখনো কোমরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফাইনালের আগেও চলেছে পরীক্ষা

ফাইনালের দিন সকালেও আল্ট্রার জন্য নতুন একটি দৌড়ের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরীক্ষা করছিলেন প্রকৌশলীরা। পরীক্ষাগারে সেটি বারবার সফল হলেও প্রতিযোগিতার ট্র্যাকে একই ফল পাওয়া যায়নি।

একই মডেলের রোবটগুলোর মধ্যেও সামান্য পার্থক্য থাকায় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। ফলে ফাইনালের আগে দলটির মধ্যে যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল।

আল্ট্রার পা তুলনামূলক ভারী হওয়ায় দৌড়ের শুরুতে তার গতি বাড়তে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ মিটারের বেশি গতিতে পৌঁছানোর পর সে আরও গতি বাড়াতে পারে এবং সামনে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ধরে ফেলতে শুরু করে।

সেমিফাইনালের আগেই দলটি রোবটের শুরুর প্রতিক্রিয়ার সময় প্রায় আধা সেকেন্ড কমিয়ে এনেছিল। এরপর তাদের মূল মনোযোগ ছিল সর্বোচ্চ গতি বাড়ানোর দিকে।

ফাইনালে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং দৌড়ের শেষ পর্যায়ে গতি বাড়ানোর কারণে আল্ট্রা আরও পরিষ্কার ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে জয় পায়।

দৌড় শেষে দলের সদস্যদের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস। পুরস্কার বিতরণীর সময় সারি করে দাঁড় করানো হয় তিয়ানগংয়ের একাধিক মানবসদৃশ রোবটকে। তাদের অনেকের গায়ে ছিল ‘চ্যাম্পিয়ন’ লেখা লাল চাদর, কারও হাতে ছিল উৎসবের সাজসজ্জা।

দীর্ঘ রাতের পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর মেরামতের পর অবশেষে স্বস্তি পান জ্যাক গুও। তার ভাষায়, এবার তিনি শেষ পর্যন্ত ভালোভাবে এক রাত ঘুমাতে পেরেছেন।

তবে এই রেকর্ডের পরও তিয়ানগং আল্ট্রার আসল পরীক্ষা এখনো বাকি। মানুষের চেয়ে দ্রুত দৌড়ানো নিঃসন্দেহে প্রযুক্তিগত সাফল্য, কিন্তু বাস্তব কারখানা, সেবা খাত, উদ্ধারকাজ কিংবা অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারাই হবে মানবসদৃশ রোবটের ভবিষ্যৎ সাফল্যের বড় মাপকাঠি।

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীলঙ্কাকে বাঁচাতে অর্থ নয়, বদলাতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি

বোল্টের রেকর্ড ছাড়িয়ে দৌড়, এবার বাস্তব কাজে নামতে চায় চীনের রোবট

০৫:৪৩:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মানুষের দ্রুততম দৌড়বিদ উসাইন বোল্টের বিশ্ব রেকর্ডের চেয়েও দ্রুত দৌড়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছে চীনের মানবসদৃশ রোবট ‘তিয়ানগং আল্ট্রা’। তবে রেকর্ড গড়ার পরই থেমে থাকতে চাইছে না রোবটটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এবার লক্ষ্য হলো, দৌড়ের গতি থেকে রোবটকে নিয়ে যাওয়া বাস্তব কর্মক্ষেত্রে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশ্ব মানবসদৃশ রোবট গেমসে তিয়ানগং আল্ট্রা ১০০ মিটার দৌড় শেষ করেছে মাত্র ৮ দশমিক ৬৪ সেকেন্ডে। মানবদেহের সর্বোচ্চ গতির প্রতীক উসাইন বোল্টের ১০০ মিটারের বিশ্ব রেকর্ডের তুলনায় এই সময় প্রায় এক সেকেন্ড কম।

তবে এই অসাধারণ সাফল্যের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের কঠোর পরীক্ষা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং প্রতিযোগিতার মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত রোবট মেরামতের নিরলস চেষ্টা। রোবটটির উন্নয়নের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৩৪ বছর বয়সী প্রকৌশলী জ্যাক গুও। তিনি এখন গতি নিয়ে আরও কিছুটা এগোনোর পাশাপাশি রোবটকে নির্ভরযোগ্য ও ব্যবহারযোগ্য করে তোলাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

গুও বলেন, রোবটটি দৌড় শুরুর পর যখন নির্বিঘ্নে ৫০ মিটার পার হয়ে যায়, তখনই তিনি কিছুটা স্বস্তি পান। কারণ এর আগে অসংখ্য পরীক্ষায় রোবটের ভারসাম্য হারানো, পড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন যান্ত্রিক অংশ নষ্ট হওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে।

তার ভাষায়, এখন তাদের লক্ষ্য শুধু ‘উচ্চ কর্মক্ষমতা’ নয়, বরং সেই কর্মক্ষমতাকে ‘উচ্চ নির্ভরযোগ্যতা ও ব্যবহারযোগ্যতায়’ রূপ দেওয়া।

বেইজিংয়ের রোবট গবেষণাকেন্দ্র

তিয়ানগং আল্ট্রা তৈরি করছে বেইজিংয়ের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইঝুয়াং এলাকায় অবস্থিত বেইজিং হিউম্যানয়েড রোবট ইনোভেশন সেন্টার, যা ‘এক্স-হিউম্যানয়েড’ নামেও পরিচিত। এলাকাটি চীনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রোবট প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

একসময় এই এলাকায় মূলত গাড়ি নির্মাণ শিল্পের আধিপত্য ছিল। এখন সেখানে রোবট বিক্রয়কেন্দ্র থেকে শুরু করে রোবটভিত্তিক রেস্তোরাঁ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে। চীনের সরকারও দেশটির রোবট শিল্পকে সামনে আনতে এই ধরনের প্রযুক্তি প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

এক্স-হিউম্যানয়েডের ভবনে ঢুকলেই তিয়ানগং রোবটের বিভিন্ন প্রজন্মের নমুনা দেখা যায়। এর মধ্যে এমন একটি রোবটও রয়েছে, যেটি গত বছর একটি হাফ-ম্যারাথনে জয়ী হয়েছিল।

গবেষণাগারের ভেতরে সাদা রঙের আল্ট্রা ও ওমনি রোবটকে ধাতব কাঠামোর সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। কোথাও প্রকৌশলীরা রোবটের মাথার অংশ খুলে পরীক্ষা করছেন, কেউ পায়ের যন্ত্রাংশ ঠিক করছেন, আবার কেউ রোবটকে হাঁটানোর পরীক্ষা চালাচ্ছেন।

এর পাশের অফিসে সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করেন প্রকৌশলীরা। নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করার পর সেটি বাস্তব রোবটে পরীক্ষা করা হয়।After Outrunning Bolt, China's Robot Champion Races Towards Real-World Work

রাষ্ট্র ও বেসরকারি বিনিয়োগে এগিয়ে যাচ্ছে প্রযুক্তি

এক্স-হিউম্যানয়েড প্রতিষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে। প্রতিষ্ঠানটির পেছনে রয়েছে সরকারি মালিকানাধীন ও বেসরকারি বিনিয়োগকারী। এর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউবিটেক এবং চীনের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শাওমি ও বাইদু।

প্রতিষ্ঠানটি শুধু নিজেদের রোবট তৈরি করছে না; মানবসদৃশ রোবট শিল্পের জন্য হার্ডওয়্যার, চলাচল নিয়ন্ত্রণের সফটওয়্যার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিও তৈরি করছে।

তবে তারা এখনো নিজেদের কতগুলো রোবট বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগাতে পেরেছে, সে সংখ্যা প্রকাশ করেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পক্ষেত্রে রোবটের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের গ্রাহক বা পরীক্ষামূলক অংশীদার হিসেবে রয়েছে।

বেইজিংয়ের ফোটন কামিন্সের ইঞ্জিন কারখানায়ও তাদের রোবট পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে ‘তিয়ানই ২.০’ নামের একটি রোবট ৮ থেকে ১২ কেজি ওজনের বাক্স তুলে তাকের ওপর রাখার কাজ করেছে। কারখানাটিও এটিকে প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষা হিসেবে দেখছে।

দৌড়ের রোবট থেকে কর্মক্ষেত্রের সহকারী

তিয়ানগং আল্ট্রাকে শুরুতে কোনো দৌড় প্রতিযোগিতায় জেতানোর জন্য তৈরি করা হয়নি। মূল উদ্দেশ্য ছিল মানবসদৃশ রোবট কত দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে চলতে পারে, তার সীমা পরীক্ষা করা।

জ্যাক গুও বর্তমান মানবসদৃশ রোবটকে অতীতের প্রথম দিককার গাড়ির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, প্রথমে গাড়িকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য করতে হয়েছিল। একইভাবে রোবটের ক্ষেত্রেও প্রথম কাজ হচ্ছে এর শরীর ও চলাচলকে নির্ভরযোগ্য করা। এরপর আরও উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে রোবটকে জটিল কাজ নিজে থেকে করার সক্ষমতা দিতে হবে।

এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রোবটের শরীর এবং চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে এমনভাবে তৈরি করা, যাতে তা প্রতিদিনের বাস্তব কাজে স্থিতিশীলভাবে কাজ করতে পারে। আরও জটিল স্বয়ংক্রিয় কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরিতে আরও সময় লাগবে বলে মনে করেন গুও।

ছোট রোবটের জন্য হালকা শিল্প ও সেবা খাত

দৌড়ানোর সক্ষমতা শুধু গতি দেখানোর জন্য নয়। বিভিন্ন ধরনের মাটিতে ভারসাম্য রেখে চলার ক্ষমতা বাড়াতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।

এরই একটি উদাহরণ হলো ছোট আকারের ‘ওমনি’ রোবট। চলতি বছর এক পরীক্ষায় এটি এক্স-হিউম্যানয়েডের সদর দপ্তরের প্রথম তলা থেকে ১৭ তলা পর্যন্ত উঠে গেছে।

গুও মনে করেন, ছোট আকারের মানবসদৃশ রোবটগুলো প্রথম দিকে বাণিজ্যিক সেবা ও হালকা শিল্পে বেশি ব্যবহার হতে পারে। অন্যদিকে তুলনামূলক বড় ও শক্তিশালী আল্ট্রা ভবিষ্যতে বাইরের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ কিংবা জরুরি উদ্ধারকাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে দ্রুত দৌড়ানোর পাশাপাশি রোবটকে নিরাপদে থামানোও বড় সমস্যা।

আল্ট্রার ওজন প্রায় ৭৫ কেজি। সর্বোচ্চ গতিতে এটি প্রতি সেকেন্ডে ১৭ মিটারের বেশি পথ অতিক্রম করতে পারে। প্রতিযোগিতায় ১০০ মিটার দৌড় শেষে থামার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় রোবটগুলোকে অনেক সময় দৌড় শেষে বাধার সঙ্গে ধাক্কা খেতে হয়েছে। এর পেছনে নিরাপত্তার জন্য একটি মোটা গদি রাখা হয়েছিল।

ভবিষ্যৎ সংস্করণে রোবটকে আরও হালকা করার পাশাপাশি দ্রুত ব্রেক করার সক্ষমতা এবং আরও নিরাপদ দেহভঙ্গি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বোল্টকে ছাড়িয়ে যাওয়ার দৌড়

বিশ্ব মানবসদৃশ রোবট গেমসে অংশ নেওয়ার আগে আল্ট্রার জন্য তিনটি ভিন্ন দৌড়ের কৌশল তৈরি করা হয়েছিল। এগুলো সিমুলেশনে প্রশিক্ষিত চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। একটি আগে থেকেই পরীক্ষিত ছিল, আর দুটি কাগজে-কলমে আরও দ্রুত হলেও সেগুলো তুলনামূলকভাবে কম পরীক্ষিত।

এই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রোবটের বিভিন্ন জয়েন্ট, ভারসাম্য ও চলাচল একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে কোনো মানুষকে প্রতিটি পদক্ষেপ নির্দেশ না দিয়েও রোবট সোজা হয়ে দৌড়াতে পারে।

প্রাথমিক দৌড়ে আল্ট্রার সময় ছিল ৯ দশমিক ৩৯ সেকেন্ড। সেমিফাইনালে সময় কমে হয় ৮ দশমিক ৮৬ সেকেন্ড। আর ফাইনালে সে আরও গতি বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৬৪ সেকেন্ডে ১০০ মিটার শেষ করে।

প্রতিটি দৌড়ের মধ্যবর্তী সময়ে প্রকৌশলীরা পরীক্ষাগারে ফিরে গিয়ে নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরীক্ষা করেন। কখনো কখনো সারা রাত ধরে পরীক্ষা চালিয়ে পরদিন আবার প্রতিযোগিতার মাঠে ফিরতে হয়েছে তাদের।

সীমা ছাড়িয়ে পরীক্ষা চালানোর সময় অনেক রোবট হোঁচট খেয়েছে, ভারসাম্য হারিয়েছে এবং পড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত রোবটের বদলে কখনো অতিরিক্ত রোবট মাঠে নামাতে হয়েছে। আবার মেরামতকারী দলকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্র ঠিক করতে হয়েছে।

গুও জানান, উন্নয়নের আগের পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও কঠিন ছিল। কখনো রোবটের পা ভেঙেছে, কখনো কোমরের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ফাইনালের আগেও চলেছে পরীক্ষা

ফাইনালের দিন সকালেও আল্ট্রার জন্য নতুন একটি দৌড়ের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরীক্ষা করছিলেন প্রকৌশলীরা। পরীক্ষাগারে সেটি বারবার সফল হলেও প্রতিযোগিতার ট্র্যাকে একই ফল পাওয়া যায়নি।

একই মডেলের রোবটগুলোর মধ্যেও সামান্য পার্থক্য থাকায় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। ফলে ফাইনালের আগে দলটির মধ্যে যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল।

আল্ট্রার পা তুলনামূলক ভারী হওয়ায় দৌড়ের শুরুতে তার গতি বাড়তে কিছুটা সময় লাগে। কিন্তু প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ মিটারের বেশি গতিতে পৌঁছানোর পর সে আরও গতি বাড়াতে পারে এবং সামনে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ধরে ফেলতে শুরু করে।

সেমিফাইনালের আগেই দলটি রোবটের শুরুর প্রতিক্রিয়ার সময় প্রায় আধা সেকেন্ড কমিয়ে এনেছিল। এরপর তাদের মূল মনোযোগ ছিল সর্বোচ্চ গতি বাড়ানোর দিকে।

ফাইনালে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং দৌড়ের শেষ পর্যায়ে গতি বাড়ানোর কারণে আল্ট্রা আরও পরিষ্কার ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে জয় পায়।

দৌড় শেষে দলের সদস্যদের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস। পুরস্কার বিতরণীর সময় সারি করে দাঁড় করানো হয় তিয়ানগংয়ের একাধিক মানবসদৃশ রোবটকে। তাদের অনেকের গায়ে ছিল ‘চ্যাম্পিয়ন’ লেখা লাল চাদর, কারও হাতে ছিল উৎসবের সাজসজ্জা।

দীর্ঘ রাতের পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর মেরামতের পর অবশেষে স্বস্তি পান জ্যাক গুও। তার ভাষায়, এবার তিনি শেষ পর্যন্ত ভালোভাবে এক রাত ঘুমাতে পেরেছেন।

তবে এই রেকর্ডের পরও তিয়ানগং আল্ট্রার আসল পরীক্ষা এখনো বাকি। মানুষের চেয়ে দ্রুত দৌড়ানো নিঃসন্দেহে প্রযুক্তিগত সাফল্য, কিন্তু বাস্তব কারখানা, সেবা খাত, উদ্ধারকাজ কিংবা অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে পারাই হবে মানবসদৃশ রোবটের ভবিষ্যৎ সাফল্যের বড় মাপকাঠি।