০৬:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শ্রীলঙ্কাকে বাঁচাতে অর্থ নয়, বদলাতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি চীনের দিকে ঝুঁকছে ঢাকা, ভারতনির্ভরতা কমাতে নতুন কৌশল প্রেমভিত্তিক নাটক-সিনেমা নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধ চেয়ে হাইকোর্টে রিট আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি-অর্থপাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক ৯/১১-এর বহু আগেই ভারতকে হামলার লক্ষ্য করেছিলেন ওসামা বিন লাদেন, জানাল সিআইএ নথি ফরিদপুরে চা-দোকানিকে কুপিয়ে হত্যা, আহত ৩ মহাকাশ অবকাঠামো নির্মাণে বিশ্বে দ্বিতীয় চীন, শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র কিশোর কুমারের গান গাইলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ভারত সফরে আনোয়ারের অন্যরকম মুহূর্ত ব্রিকসে এক মঞ্চে পুতিন, মোদি ও শি—বদলে যাচ্ছে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ যুদ্ধের আরেকটি রণক্ষেত্র: মানুষের মনোযোগ কে নিয়ন্ত্রণ করছে?

যুদ্ধের আরেকটি রণক্ষেত্র: মানুষের মনোযোগ কে নিয়ন্ত্রণ করছে?

যুদ্ধকে আমরা সাধারণত দেখি অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, যুদ্ধবিমান কিংবা নৌবহরের সংঘাত হিসেবে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখন আর আকাশ, স্থল কিংবা সমুদ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সেটি সংঘটিত হচ্ছে মানুষের চোখের সামনে—মুঠোফোনের পর্দায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে এবং এমন সব অ্যালগরিদমের মাধ্যমে, যেগুলো ঠিক করে দেয় কোন খবরটি আমরা আগে দেখব, কোন ছবিটি বারবার আমাদের সামনে আসবে এবং কোন ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত আমাদের স্মৃতিতে জায়গা করে নেবে।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ সেই পরিবর্তনকে বিশেষভাবে স্পষ্ট করে তুলেছে। এই যুদ্ধের সময়ে তথ্যের প্রবাহ এত দ্রুত যে সংবাদ যাচাই করার প্রচলিত প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনার প্রচারের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে প্রশ্নটি আর শুধু এই নয় যে আমরা যে তথ্যটি পাচ্ছি তা সত্য কি না। তার পাশাপাশি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে—এই তথ্যটি আমার কাছে কীভাবে পৌঁছাল, কেন এটিই আগে দেখলাম এবং আরও অনেক তথ্যের মধ্যে এটিই কেন আমার মনোযোগ কেড়ে নিল?

এখানেই অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়।

কার হাতে রয়েছে তথ্যের প্রবেশদ্বার?

রবার্ট রাইখ যে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, সেটি শুধু কয়েকজন অতিধনী ব্যক্তির হাতে সংবাদমাধ্যমের মালিকানা চলে যাওয়ার গল্প নয়। এর গভীরে রয়েছে আরও বড় একটি গণতান্ত্রিক প্রশ্ন। আজকের পৃথিবীতে জনমত গঠনের অবকাঠামো কার হাতে?

একসময় সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল কিংবা রেডিও স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল গণমাধ্যমের ক্ষমতার প্রধান উৎস। এখন সেই কাঠামো অনেক বিস্তৃত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিন, সংবাদমাধ্যম, বিনোদন প্রতিষ্ঠান, চলচ্চিত্র প্রযোজনা, স্ট্রিমিং সেবা এবং এসবের পেছনে কাজ করা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এমন একটি পরিবেশ, যেখানে তথ্য উৎপাদনের পাশাপাশি তথ্যের দৃশ্যমানতাও ক্ষমতার একটি অংশ।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের কয়েকজন যখন একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদ প্রতিষ্ঠান কিংবা বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানির মালিক হন, তখন প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই ওঠে—একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের হাতে কতটা প্রভাব থাকা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য?

এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা জরুরি। কোনো সংবাদমাধ্যমের মালিক একজন ধনী ব্যক্তি হলেই ধরে নেওয়া যায় না যে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি প্রতিবেদন মালিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতের প্রতিফলন। পেশাদার সাংবাদিকতা, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিমালা অনেক সময় মালিকের ইচ্ছার বিপরীতেও কাজ করতে পারে। ফলে সমস্যাটিকে ষড়যন্ত্রের গল্পে সীমাবদ্ধ করা ভুল হবে।

প্রকৃত উদ্বেগটি আরও কাঠামোগত।

সমস্যা হলো, একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে যখন বিপুল অর্থ, প্রযুক্তি, যোগাযোগমাধ্যম ও দর্শকের কাছে পৌঁছানোর অবকাঠামো একসঙ্গে জমা হয়, তখন তাদের সম্ভাব্য প্রভাবের পরিসর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। তারা প্রতিটি খবরের নির্দেশদাতা না হলেও কোন ধরনের তথ্য দ্রুত ছড়াবে, কোন কণ্ঠস্বর বেশি দৃশ্যমান হবে এবং কোন বিষয়টি জনআলোচনার কেন্দ্রে আসবে—সেই পরিবেশের ওপর তাদের প্রভাব তৈরি হতে পারে।

ইরান যুদ্ধ সেই কাঠামোর একটি বাস্তব পরীক্ষা।

যুদ্ধ যখন সরাসরি পর্দায় আসে

যুদ্ধ শুরুর পর দর্শকরা আর শুধু সংবাদ উপস্থাপকের কাছ থেকে যুদ্ধের খবর পাচ্ছেন না। সরকারি বিবৃতি, রাজনৈতিক নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও, সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত ফুটেজ, উপগ্রহচিত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি করা তথ্য একই সময়ে মানুষের সামনে হাজির হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের একটি সুবিধা আছে। প্রচলিত সংবাদমাধ্যম কোনো তথ্য প্রকাশ না করলে বা বিলম্ব করলে মানুষ অন্য উৎস থেকে সরাসরি তা দেখতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত ঝুঁকিও বড়। একজন রাজনীতিক এখন একই সঙ্গে বক্তব্যদাতা, প্রকাশক এবং নিজের বার্তার প্রচারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে এই প্রবণতাটি স্পষ্ট। প্রেসিডেন্টের একটি পোস্ট প্রথমে সরাসরি তাঁর অনুসারীদের কাছে পৌঁছে যায়, পরে সংবাদমাধ্যম সেটি নিয়ে প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ করে। অর্থাৎ আগে যে পথটি ছিল সংবাদমাধ্যম থেকে জনগণের দিকে, সেটি অনেক ক্ষেত্রে এখন উল্টো হয়ে যাচ্ছে—রাজনৈতিক বার্তা প্রথমে জনগণের কাছে যাচ্ছে, এরপর সংবাদকক্ষে প্রবেশ করছে।

সরাসরি যোগাযোগের এই ক্ষমতা গণমাধ্যমের মধ্যস্থতাকে কমাতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক প্রচারণা, তথ্য এবং সাংবাদিকতার মধ্যে পার্থক্য করার দায়িত্ব আরও বেশি করে নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দেয়।Iran-Israel war shows future wars will be won by thousands of cheap drones  not expensive missiles can India keep up - The Economic Times

সত্যের চেয়েও দ্রুত ছড়ায় যে ছবি

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেকটি বিপজ্জনক সম্ভাবনা। যুদ্ধের বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও ও ছবি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেগুলো বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানোর পর বোঝা যাচ্ছে যে সেগুলো মিথ্যা।

এখানে বিপদের জায়গাটি শুধু মিথ্যা ভিডিও তৈরি করা নয়। বড় সমস্যা হলো, একটি মিথ্যা দৃশ্য যাচাই করার আগেই সেটি মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও রাজনৈতিক আলোচনাকে প্রভাবিত করতে পারে।

যুদ্ধের সময় একটি মিথ্যা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, তেল স্থাপনা ধ্বংসের দৃশ্য কিংবা কোনো সামরিক বিমান ভূপাতিত হওয়ার মিথ্যা ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মানুষ সেটিকে সত্য ধরে নিয়ে রাজনৈতিক মতামত তৈরি করতে পারে, বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, এমনকি সামরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণাও তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ মিথ্যা তথ্য এখন কেবল সাংবাদিকতার সমস্যা নয়। এটি মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের পরিবেশেরও অংশ হয়ে উঠতে পারে।

যুদ্ধ যখন বিনোদনের ভাষা নেয়

আরেকটি পরিবর্তন আরও গভীর। যুদ্ধের ছবি ক্রমে এমন ভাষায় পরিবেশিত হচ্ছে, যার সঙ্গে চলচ্চিত্র ও ভিডিও গেমের দৃশ্যগত সংস্কৃতির মিল রয়েছে। সামরিক হামলার বাস্তব ফুটেজের সঙ্গে বিনোদনধর্মী দৃশ্য বা নাটকীয় উপস্থাপনা যুক্ত হলে যুদ্ধ কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামরিক ঘটনা থাকে না; সেটি পরিণত হয় দর্শনীয় এক ধরনের সামগ্রীতে।

ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত তখন একটি দৃশ্য। বিস্ফোরণ একটি প্রভাব। সামরিক অভিযান হয়ে যায় ভাগ করে নেওয়ার মতো একটি ভিডিও।

এর বিপদ প্রচারণার চেয়েও গভীর। প্রচারণা নতুন কোনো বিষয় নয়; যুদ্ধের ইতিহাসের শুরু থেকেই রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তি মানুষের মন প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। নতুন বিষয় হলো প্রচারণার গতি এবং তার সঙ্গে মনোযোগের অর্থনীতির মিশে যাওয়া।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের হয়ে কাজ না করেও এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। যে বিষয় মানুষকে বেশি উত্তেজিত করে, ক্ষুব্ধ করে, ভয় জাগায় বা বিস্মিত করে, সেটিই বেশি সময় মানুষের দৃষ্টি ধরে রাখে। ফলে সত্যের চেয়ে আকর্ষণীয় মিথ্যা অনেক সময় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এখানে অ্যালগরিদমের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা প্রয়োজন নেই। মনোযোগ ধরে রাখাই যথেষ্ট।

বিলিয়নিয়ার মালিকানা কি সব ব্যাখ্যা করে?

তবু গণমাধ্যমের মালিকানা নিয়ে বিতর্ককে সরল সমীকরণে নামিয়ে আনা ঠিক হবে না। একটি বড় সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মালিক কোনো বিলিয়নিয়ার হলেই প্রতিষ্ঠানটি তাঁর রাজনৈতিক ইচ্ছার অধীন—এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ সবসময় থাকে না।

ওয়াশিংটন পোস্টের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এই জটিলতা দেখা যায়। জেফ বেজোসের মালিকানাধীন পত্রিকাটি ইরান যুদ্ধের ব্যয় এবং মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর এর প্রভাব নিয়ে এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা মার্কিন প্রশাসনের তীব্র অসন্তোষের কারণ হয়েছিল।

এ ধরনের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো দেখায়, বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া আর প্রতিটি সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়।

কিন্তু এতে মৌলিক সমস্যাটি দূর হয় না। বরং প্রশ্নটি আরও সূক্ষ্ম হয়।

গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা উচিত নয় যেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মূলত নির্ভর করবে বর্তমান মালিক কতটা উদার বা হস্তক্ষেপহীন তার ওপর। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক কাঠামোর লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন বহুত্ববাদ তৈরি করা, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগই কম থাকে।

মূল প্রশ্ন তাই একজন বিলিয়নিয়ার কী করেন, সেটি নয়। বরং তিনি কতটা করতে পারেন—সেটিই বড় প্রশ্ন।

নতুন প্ল্যাটফর্মও কি সমাধান?

এই জায়গায় রাইখের সমালোচনার মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য আছে। তিনি যে নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গণমাধ্যমের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, সেসব প্ল্যাটফর্মও শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

সাবস্ট্যাক বা ব্লুস্কাইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো লেখকদের প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের দরজা এড়িয়ে সরাসরি পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়। এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কিন্তু একটি পুরোনো প্রবেশদ্বারের বদলে নতুন প্রবেশদ্বার তৈরি হলেই ক্ষমতার সমস্যা শেষ হয়ে যায় না।

প্রশ্ন থেকে যায়—এই অবকাঠামোর মালিক কে? নিয়ম কে নির্ধারণ করে? ব্যবহারকারীর তথ্য কার নিয়ন্ত্রণে? কোন বিষয়কে বেশি মানুষের সামনে পৌঁছে দেওয়া হবে, সেটি নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে?

তাই পুরোনো সংবাদমাধ্যমকে খারাপ আর নতুন প্ল্যাটফর্মকে মুক্তির পথ হিসেবে দেখলে সমস্যাটির প্রকৃতি বোঝা যাবে না। প্রচলিত সাংবাদিকতার দুর্বলতা আছে, বাণিজ্যিক চাপ আছে, মালিকানার প্রভাবের ঝুঁকি আছে। কিন্তু একই সঙ্গে সেখানে পেশাগত মানদণ্ড, যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে।

নতুন প্ল্যাটফর্ম লেখক ও পাঠকের দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু ক্ষমতাকে বিলীন করেনি। বরং ক্ষমতার কিছু অংশ অন্য জায়গায় সরিয়ে দিয়েছে।

মনোযোগই যখন রাজনৈতিক সম্পদ

ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র, রাজনীতি, বড় পুঁজি, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সংবাদমাধ্যম একই তথ্য-পরিবেশে সক্রিয়।

রাষ্ট্র নিজের বয়ান তৈরি করে। রাজনৈতিক নেতা সরাসরি জনগণের কাছে বার্তা পাঠান। প্রযুক্তি কোম্পানি সেই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার অবকাঠামো সরবরাহ করে। ব্যবহারকারীরা তা আবার নিজেদের নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাস্তবের মতো দেখতে মিথ্যা দৃশ্য তৈরিকে সহজ করে। আর সংবাদমাধ্যমকে সেই বিপুল তথ্যের স্রোতের মধ্যে সত্যতা যাচাই করে অর্থ খুঁজে বের করতে হয়।

এই ব্যবস্থায় তথ্য নিয়ন্ত্রণ করার অর্থ সবসময় তথ্য গোপন করা নয়। কখনো কখনো বিপুল পরিমাণ তথ্যের ভিড়ে সত্যকে এমনভাবে ডুবিয়ে দেওয়া যায় যে মানুষ আর বুঝতে পারে না কোনটি গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি তুচ্ছ, কোনটি সংবাদ এবং কোনটি প্রচারণা।

এটাই মনোযোগের অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক।

আপনাকে সত্য জানতে বাধা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সত্যকে হাজার হাজার প্রতিদ্বন্দ্বী গল্পের মধ্যে একটি গল্পে পরিণত করাই যথেষ্ট।

যুদ্ধের সময় এই বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। কারণ যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অধিকাংশ নাগরিকের হয় না। তারা যুদ্ধকে দেখে এমন এক সংস্করণের মাধ্যমে, যা তাদের পর্দায় পৌঁছেছে। সেই সংস্করণ সত্য হতে পারে, অসম্পূর্ণ হতে পারে, পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে, আবার সম্পূর্ণ মিথ্যাও হতে পারে।

সামরিক শক্তির পাশাপাশি তাই গড়ে উঠছে আরেক ধরনের প্রতিযোগিতা—মানুষের উপলব্ধি নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা।

কে ঠিক করবে আমরা কী দেখব, কী মনে রাখব, কী নিয়ে ভয় পাব এবং কোন ঘটনাকে বিজয় বা পরাজয় হিসেবে বিবেচনা করব?𝗕𝗥𝗘𝗔𝗞𝗜𝗡𝗚 🚨🇮🇷🇺🇸🇨🇳 IRANIAN MISSILES COME CLOSE TO U.S.  WARSHIPS Iranian ballistic missiles have reportedly come dangerously close  to U.S. Navy warships, including an American aircraft carrier, in a major  escalation in the

সত্যের মালিকানা নয়, সত্যের দৃশ্যমানতা

এখানে বিতর্কটি ‘বিলিয়নিয়াররা সত্যের মালিক’—এমন সরল বক্তব্যে আটকে রাখা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুরো সত্যের মালিক হতে পারে না।

কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে যখন একই সঙ্গে বিপুল পুঁজি এবং তথ্য তৈরি ও বিতরণের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম থাকে, তখন তারা একটি বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যায়। তারা ঠিক করতে না পারলেও কোন সত্যটি কখন মানুষের সামনে আসবে, কোন প্রেক্ষাপটে আসবে এবং কতটা দৃশ্যমান হবে—এসবের ওপর তাদের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

আর আধুনিক রাজনীতিতে এটিই ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ।

কারণ মানুষ সব তথ্য মনে রাখে না। মানুষ সব তথ্য দেখে না। যে তথ্য আগে আসে, যে ছবি বেশি দেখা যায়, যে বক্তব্য বেশি আবেগ তৈরি করে—সেটিই অনেক সময় মানুষের উপলব্ধির কাঠামো তৈরি করে।

এই কারণে আজকের গণতন্ত্রের জন্য শুধু স্বাধীন সাংবাদিকতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন তথ্যের অবকাঠামোয় বহুত্ববাদ, প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা, শক্তিশালী যাচাইব্যবস্থা এবং নাগরিকের তথ্য যাচাই ও বিচার করার সক্ষমতা।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই আর শুধু ‘গণমাধ্যমের মালিক কে?’ নয়।

প্রশ্ন হলো—জনগণ যে বাস্তবতাকে বাস্তব বলে দেখতে শিখছে, সেই বাস্তবতার দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কার হাতে?

যে ব্যক্তি সেই ক্ষমতা ধারণ করেন, তিনি সত্যের মালিক নাও হতে পারেন। কিন্তু তিনি ঠিক করে দেওয়ার মতো অবস্থানে থাকতে পারেন—কোন সত্যটি মানুষের কাছে প্রথম পৌঁছাবে।

যুদ্ধের সময়ে সেটিই এক ধরনের শক্তি।

আর তাই ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের ময়দানে লড়া হবে না। এর একটি বড় অংশ লড়া হবে মানুষের মনোযোগের জন্য—কোন ছবি চোখে থাকবে, কোন গল্প মনে থাকবে এবং কোন ব্যাখ্যাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার জায়গা দখল করবে, সেই লড়াইয়ে।

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীলঙ্কাকে বাঁচাতে অর্থ নয়, বদলাতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি

যুদ্ধের আরেকটি রণক্ষেত্র: মানুষের মনোযোগ কে নিয়ন্ত্রণ করছে?

০৫:৫৫:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধকে আমরা সাধারণত দেখি অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, যুদ্ধবিমান কিংবা নৌবহরের সংঘাত হিসেবে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখন আর আকাশ, স্থল কিংবা সমুদ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সেটি সংঘটিত হচ্ছে মানুষের চোখের সামনে—মুঠোফোনের পর্দায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে এবং এমন সব অ্যালগরিদমের মাধ্যমে, যেগুলো ঠিক করে দেয় কোন খবরটি আমরা আগে দেখব, কোন ছবিটি বারবার আমাদের সামনে আসবে এবং কোন ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত আমাদের স্মৃতিতে জায়গা করে নেবে।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধ সেই পরিবর্তনকে বিশেষভাবে স্পষ্ট করে তুলেছে। এই যুদ্ধের সময়ে তথ্যের প্রবাহ এত দ্রুত যে সংবাদ যাচাই করার প্রচলিত প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই ঘটনার প্রচারের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে প্রশ্নটি আর শুধু এই নয় যে আমরা যে তথ্যটি পাচ্ছি তা সত্য কি না। তার পাশাপাশি আরও জরুরি হয়ে উঠেছে—এই তথ্যটি আমার কাছে কীভাবে পৌঁছাল, কেন এটিই আগে দেখলাম এবং আরও অনেক তথ্যের মধ্যে এটিই কেন আমার মনোযোগ কেড়ে নিল?

এখানেই অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়।

কার হাতে রয়েছে তথ্যের প্রবেশদ্বার?

রবার্ট রাইখ যে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, সেটি শুধু কয়েকজন অতিধনী ব্যক্তির হাতে সংবাদমাধ্যমের মালিকানা চলে যাওয়ার গল্প নয়। এর গভীরে রয়েছে আরও বড় একটি গণতান্ত্রিক প্রশ্ন। আজকের পৃথিবীতে জনমত গঠনের অবকাঠামো কার হাতে?

একসময় সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল কিংবা রেডিও স্টেশন নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল গণমাধ্যমের ক্ষমতার প্রধান উৎস। এখন সেই কাঠামো অনেক বিস্তৃত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিন, সংবাদমাধ্যম, বিনোদন প্রতিষ্ঠান, চলচ্চিত্র প্রযোজনা, স্ট্রিমিং সেবা এবং এসবের পেছনে কাজ করা প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এমন একটি পরিবেশ, যেখানে তথ্য উৎপাদনের পাশাপাশি তথ্যের দৃশ্যমানতাও ক্ষমতার একটি অংশ।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের কয়েকজন যখন একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদ প্রতিষ্ঠান কিংবা বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানির মালিক হন, তখন প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই ওঠে—একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের হাতে কতটা প্রভাব থাকা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য?

এখানে অবশ্য একটি সতর্কতা জরুরি। কোনো সংবাদমাধ্যমের মালিক একজন ধনী ব্যক্তি হলেই ধরে নেওয়া যায় না যে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি প্রতিবেদন মালিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতের প্রতিফলন। পেশাদার সাংবাদিকতা, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিমালা অনেক সময় মালিকের ইচ্ছার বিপরীতেও কাজ করতে পারে। ফলে সমস্যাটিকে ষড়যন্ত্রের গল্পে সীমাবদ্ধ করা ভুল হবে।

প্রকৃত উদ্বেগটি আরও কাঠামোগত।

সমস্যা হলো, একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে যখন বিপুল অর্থ, প্রযুক্তি, যোগাযোগমাধ্যম ও দর্শকের কাছে পৌঁছানোর অবকাঠামো একসঙ্গে জমা হয়, তখন তাদের সম্ভাব্য প্রভাবের পরিসর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। তারা প্রতিটি খবরের নির্দেশদাতা না হলেও কোন ধরনের তথ্য দ্রুত ছড়াবে, কোন কণ্ঠস্বর বেশি দৃশ্যমান হবে এবং কোন বিষয়টি জনআলোচনার কেন্দ্রে আসবে—সেই পরিবেশের ওপর তাদের প্রভাব তৈরি হতে পারে।

ইরান যুদ্ধ সেই কাঠামোর একটি বাস্তব পরীক্ষা।

যুদ্ধ যখন সরাসরি পর্দায় আসে

যুদ্ধ শুরুর পর দর্শকরা আর শুধু সংবাদ উপস্থাপকের কাছ থেকে যুদ্ধের খবর পাচ্ছেন না। সরকারি বিবৃতি, রাজনৈতিক নেতাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও, সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত ফুটেজ, উপগ্রহচিত্র এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি করা তথ্য একই সময়ে মানুষের সামনে হাজির হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের একটি সুবিধা আছে। প্রচলিত সংবাদমাধ্যম কোনো তথ্য প্রকাশ না করলে বা বিলম্ব করলে মানুষ অন্য উৎস থেকে সরাসরি তা দেখতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত ঝুঁকিও বড়। একজন রাজনীতিক এখন একই সঙ্গে বক্তব্যদাতা, প্রকাশক এবং নিজের বার্তার প্রচারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে পারেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে এই প্রবণতাটি স্পষ্ট। প্রেসিডেন্টের একটি পোস্ট প্রথমে সরাসরি তাঁর অনুসারীদের কাছে পৌঁছে যায়, পরে সংবাদমাধ্যম সেটি নিয়ে প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ করে। অর্থাৎ আগে যে পথটি ছিল সংবাদমাধ্যম থেকে জনগণের দিকে, সেটি অনেক ক্ষেত্রে এখন উল্টো হয়ে যাচ্ছে—রাজনৈতিক বার্তা প্রথমে জনগণের কাছে যাচ্ছে, এরপর সংবাদকক্ষে প্রবেশ করছে।

সরাসরি যোগাযোগের এই ক্ষমতা গণমাধ্যমের মধ্যস্থতাকে কমাতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক প্রচারণা, তথ্য এবং সাংবাদিকতার মধ্যে পার্থক্য করার দায়িত্ব আরও বেশি করে নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দেয়।Iran-Israel war shows future wars will be won by thousands of cheap drones  not expensive missiles can India keep up - The Economic Times

সত্যের চেয়েও দ্রুত ছড়ায় যে ছবি

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেকটি বিপজ্জনক সম্ভাবনা। যুদ্ধের বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও ও ছবি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেগুলো বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানোর পর বোঝা যাচ্ছে যে সেগুলো মিথ্যা।

এখানে বিপদের জায়গাটি শুধু মিথ্যা ভিডিও তৈরি করা নয়। বড় সমস্যা হলো, একটি মিথ্যা দৃশ্য যাচাই করার আগেই সেটি মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও রাজনৈতিক আলোচনাকে প্রভাবিত করতে পারে।

যুদ্ধের সময় একটি মিথ্যা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, তেল স্থাপনা ধ্বংসের দৃশ্য কিংবা কোনো সামরিক বিমান ভূপাতিত হওয়ার মিথ্যা ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মানুষ সেটিকে সত্য ধরে নিয়ে রাজনৈতিক মতামত তৈরি করতে পারে, বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, এমনকি সামরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণাও তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ মিথ্যা তথ্য এখন কেবল সাংবাদিকতার সমস্যা নয়। এটি মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধের পরিবেশেরও অংশ হয়ে উঠতে পারে।

যুদ্ধ যখন বিনোদনের ভাষা নেয়

আরেকটি পরিবর্তন আরও গভীর। যুদ্ধের ছবি ক্রমে এমন ভাষায় পরিবেশিত হচ্ছে, যার সঙ্গে চলচ্চিত্র ও ভিডিও গেমের দৃশ্যগত সংস্কৃতির মিল রয়েছে। সামরিক হামলার বাস্তব ফুটেজের সঙ্গে বিনোদনধর্মী দৃশ্য বা নাটকীয় উপস্থাপনা যুক্ত হলে যুদ্ধ কেবল একটি রাজনৈতিক বা সামরিক ঘটনা থাকে না; সেটি পরিণত হয় দর্শনীয় এক ধরনের সামগ্রীতে।

ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত তখন একটি দৃশ্য। বিস্ফোরণ একটি প্রভাব। সামরিক অভিযান হয়ে যায় ভাগ করে নেওয়ার মতো একটি ভিডিও।

এর বিপদ প্রচারণার চেয়েও গভীর। প্রচারণা নতুন কোনো বিষয় নয়; যুদ্ধের ইতিহাসের শুরু থেকেই রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক শক্তি মানুষের মন প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। নতুন বিষয় হলো প্রচারণার গতি এবং তার সঙ্গে মনোযোগের অর্থনীতির মিশে যাওয়া।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের হয়ে কাজ না করেও এই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। যে বিষয় মানুষকে বেশি উত্তেজিত করে, ক্ষুব্ধ করে, ভয় জাগায় বা বিস্মিত করে, সেটিই বেশি সময় মানুষের দৃষ্টি ধরে রাখে। ফলে সত্যের চেয়ে আকর্ষণীয় মিথ্যা অনেক সময় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এখানে অ্যালগরিদমের রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকা প্রয়োজন নেই। মনোযোগ ধরে রাখাই যথেষ্ট।

বিলিয়নিয়ার মালিকানা কি সব ব্যাখ্যা করে?

তবু গণমাধ্যমের মালিকানা নিয়ে বিতর্ককে সরল সমীকরণে নামিয়ে আনা ঠিক হবে না। একটি বড় সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মালিক কোনো বিলিয়নিয়ার হলেই প্রতিষ্ঠানটি তাঁর রাজনৈতিক ইচ্ছার অধীন—এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ সবসময় থাকে না।

ওয়াশিংটন পোস্টের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এই জটিলতা দেখা যায়। জেফ বেজোসের মালিকানাধীন পত্রিকাটি ইরান যুদ্ধের ব্যয় এবং মার্কিন সামরিক সক্ষমতার ওপর এর প্রভাব নিয়ে এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা মার্কিন প্রশাসনের তীব্র অসন্তোষের কারণ হয়েছিল।

এ ধরনের ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো দেখায়, বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া আর প্রতিটি সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়।

কিন্তু এতে মৌলিক সমস্যাটি দূর হয় না। বরং প্রশ্নটি আরও সূক্ষ্ম হয়।

গণতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা উচিত নয় যেখানে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মূলত নির্ভর করবে বর্তমান মালিক কতটা উদার বা হস্তক্ষেপহীন তার ওপর। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক কাঠামোর লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন বহুত্ববাদ তৈরি করা, যেখানে কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগই কম থাকে।

মূল প্রশ্ন তাই একজন বিলিয়নিয়ার কী করেন, সেটি নয়। বরং তিনি কতটা করতে পারেন—সেটিই বড় প্রশ্ন।

নতুন প্ল্যাটফর্মও কি সমাধান?

এই জায়গায় রাইখের সমালোচনার মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য আছে। তিনি যে নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গণমাধ্যমের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, সেসব প্ল্যাটফর্মও শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

সাবস্ট্যাক বা ব্লুস্কাইয়ের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো লেখকদের প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের দরজা এড়িয়ে সরাসরি পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়। এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কিন্তু একটি পুরোনো প্রবেশদ্বারের বদলে নতুন প্রবেশদ্বার তৈরি হলেই ক্ষমতার সমস্যা শেষ হয়ে যায় না।

প্রশ্ন থেকে যায়—এই অবকাঠামোর মালিক কে? নিয়ম কে নির্ধারণ করে? ব্যবহারকারীর তথ্য কার নিয়ন্ত্রণে? কোন বিষয়কে বেশি মানুষের সামনে পৌঁছে দেওয়া হবে, সেটি নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে?

তাই পুরোনো সংবাদমাধ্যমকে খারাপ আর নতুন প্ল্যাটফর্মকে মুক্তির পথ হিসেবে দেখলে সমস্যাটির প্রকৃতি বোঝা যাবে না। প্রচলিত সাংবাদিকতার দুর্বলতা আছে, বাণিজ্যিক চাপ আছে, মালিকানার প্রভাবের ঝুঁকি আছে। কিন্তু একই সঙ্গে সেখানে পেশাগত মানদণ্ড, যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে।

নতুন প্ল্যাটফর্ম লেখক ও পাঠকের দূরত্ব কমিয়েছে, কিন্তু ক্ষমতাকে বিলীন করেনি। বরং ক্ষমতার কিছু অংশ অন্য জায়গায় সরিয়ে দিয়েছে।

মনোযোগই যখন রাজনৈতিক সম্পদ

ইরান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমাদের এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র, রাজনীতি, বড় পুঁজি, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সংবাদমাধ্যম একই তথ্য-পরিবেশে সক্রিয়।

রাষ্ট্র নিজের বয়ান তৈরি করে। রাজনৈতিক নেতা সরাসরি জনগণের কাছে বার্তা পাঠান। প্রযুক্তি কোম্পানি সেই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার অবকাঠামো সরবরাহ করে। ব্যবহারকারীরা তা আবার নিজেদের নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাস্তবের মতো দেখতে মিথ্যা দৃশ্য তৈরিকে সহজ করে। আর সংবাদমাধ্যমকে সেই বিপুল তথ্যের স্রোতের মধ্যে সত্যতা যাচাই করে অর্থ খুঁজে বের করতে হয়।

এই ব্যবস্থায় তথ্য নিয়ন্ত্রণ করার অর্থ সবসময় তথ্য গোপন করা নয়। কখনো কখনো বিপুল পরিমাণ তথ্যের ভিড়ে সত্যকে এমনভাবে ডুবিয়ে দেওয়া যায় যে মানুষ আর বুঝতে পারে না কোনটি গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি তুচ্ছ, কোনটি সংবাদ এবং কোনটি প্রচারণা।

এটাই মনোযোগের অর্থনীতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক।

আপনাকে সত্য জানতে বাধা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সত্যকে হাজার হাজার প্রতিদ্বন্দ্বী গল্পের মধ্যে একটি গল্পে পরিণত করাই যথেষ্ট।

যুদ্ধের সময় এই বাস্তবতা আরও ভয়াবহ। কারণ যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অধিকাংশ নাগরিকের হয় না। তারা যুদ্ধকে দেখে এমন এক সংস্করণের মাধ্যমে, যা তাদের পর্দায় পৌঁছেছে। সেই সংস্করণ সত্য হতে পারে, অসম্পূর্ণ হতে পারে, পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে, আবার সম্পূর্ণ মিথ্যাও হতে পারে।

সামরিক শক্তির পাশাপাশি তাই গড়ে উঠছে আরেক ধরনের প্রতিযোগিতা—মানুষের উপলব্ধি নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা।

কে ঠিক করবে আমরা কী দেখব, কী মনে রাখব, কী নিয়ে ভয় পাব এবং কোন ঘটনাকে বিজয় বা পরাজয় হিসেবে বিবেচনা করব?𝗕𝗥𝗘𝗔𝗞𝗜𝗡𝗚 🚨🇮🇷🇺🇸🇨🇳 IRANIAN MISSILES COME CLOSE TO U.S.  WARSHIPS Iranian ballistic missiles have reportedly come dangerously close  to U.S. Navy warships, including an American aircraft carrier, in a major  escalation in the

সত্যের মালিকানা নয়, সত্যের দৃশ্যমানতা

এখানে বিতর্কটি ‘বিলিয়নিয়াররা সত্যের মালিক’—এমন সরল বক্তব্যে আটকে রাখা উচিত নয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুরো সত্যের মালিক হতে পারে না।

কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে যখন একই সঙ্গে বিপুল পুঁজি এবং তথ্য তৈরি ও বিতরণের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম থাকে, তখন তারা একটি বিশেষ সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যায়। তারা ঠিক করতে না পারলেও কোন সত্যটি কখন মানুষের সামনে আসবে, কোন প্রেক্ষাপটে আসবে এবং কতটা দৃশ্যমান হবে—এসবের ওপর তাদের প্রভাব বিস্তারের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

আর আধুনিক রাজনীতিতে এটিই ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ।

কারণ মানুষ সব তথ্য মনে রাখে না। মানুষ সব তথ্য দেখে না। যে তথ্য আগে আসে, যে ছবি বেশি দেখা যায়, যে বক্তব্য বেশি আবেগ তৈরি করে—সেটিই অনেক সময় মানুষের উপলব্ধির কাঠামো তৈরি করে।

এই কারণে আজকের গণতন্ত্রের জন্য শুধু স্বাধীন সাংবাদিকতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন তথ্যের অবকাঠামোয় বহুত্ববাদ, প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা, শক্তিশালী যাচাইব্যবস্থা এবং নাগরিকের তথ্য যাচাই ও বিচার করার সক্ষমতা।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তাই আর শুধু ‘গণমাধ্যমের মালিক কে?’ নয়।

প্রশ্ন হলো—জনগণ যে বাস্তবতাকে বাস্তব বলে দেখতে শিখছে, সেই বাস্তবতার দৃশ্যমানতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কার হাতে?

যে ব্যক্তি সেই ক্ষমতা ধারণ করেন, তিনি সত্যের মালিক নাও হতে পারেন। কিন্তু তিনি ঠিক করে দেওয়ার মতো অবস্থানে থাকতে পারেন—কোন সত্যটি মানুষের কাছে প্রথম পৌঁছাবে।

যুদ্ধের সময়ে সেটিই এক ধরনের শক্তি।

আর তাই ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু অস্ত্রের ময়দানে লড়া হবে না। এর একটি বড় অংশ লড়া হবে মানুষের মনোযোগের জন্য—কোন ছবি চোখে থাকবে, কোন গল্প মনে থাকবে এবং কোন ব্যাখ্যাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার জায়গা দখল করবে, সেই লড়াইয়ে।