০৭:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
হোটেলের কক্ষে মিলল এয়ার ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেনের মরদেহ, ভেতর থেকে বন্ধ ছিল দরজা ‘বারবার মামলা না দিয়ে আমাকে গুলি করে মেরে ফেলেন’, আদালতে মিষ্টি সুভাষ হুথিদের দখলে কৌশলগত দ্বীপ, বাব আল-মান্দাব ঘিরে বাড়ছে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি ব্রিকসে ঐক্যের বার্তা, বৈশ্বিক দক্ষিণের শক্তি বাড়ানোর ডাক মোদি-শি-পুতিনের জাভা সাগরে ফেরি উল্টে নিখোঁজ ১৩০, উদ্ধার ১০৭ সংস্কারবিরোধী সংবিধান? হামসদৃশ উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, দেশে মৃতের সংখ্যা ১,০২২ ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৯ বিচারকদের শাস্তি, ভেটোর দাপট এবং আন্তর্জাতিক আইনের সংকট শ্রীলঙ্কাকে বাঁচাতে অর্থ নয়, বদলাতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি

শ্রীলঙ্কাকে বাঁচাতে অর্থ নয়, বদলাতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি

একসময় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দেশগুলোর একটি হিসেবে শ্রীলঙ্কাকে দেখা হতো। স্বাধীনতার পর দেশটির ছিল তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, কার্যকর আমলাতন্ত্র, উন্নত অবকাঠামো এবং শক্তিশালী ইংরেজি শিক্ষার ভিত্তি। একই সময়ে সম্পদ ও ভূখণ্ডের দিক থেকে অনেক বেশি সীমাবদ্ধ সিঙ্গাপুর নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য শ্রীলঙ্কার দিকে তাকিয়েছিল। কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই তুলনাটি আজ বিস্ময়করভাবে উল্টে গেছে। সিঙ্গাপুর উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে, আর শ্রীলঙ্কা ঋণ, দেউলিয়াত্ব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার দীর্ঘ ছায়ায় আটকে পড়েছে।

এই বিপরীত যাত্রাকে কেবল ভাগ্য, বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদের ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আসল প্রশ্ন হলো—একই অঞ্চলের দুটি দেশ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এত ভিন্ন পথ বেছে নিল কেন?

সিঙ্গাপুরের সাফল্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কিশোর মাহবুবানি যে তিনটি নীতির কথা সামনে এনেছেন—মেরিটোক্রেসি বা মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা, প্র্যাগম্যাটিজম বা বাস্তববাদ এবং অনেস্টি বা সততা—সেগুলোকে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মেধার বদলে আনুগত্য, বাস্তবতার বদলে রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং জবাবদিহির বদলে দুর্নীতিকে জায়গা দেওয়ার ফল কী হতে পারে, শ্রীলঙ্কা তার কঠিন উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

মেধার জায়গায় যখন পরিচয় ও আনুগত্য

একটি কার্যকর রাষ্ট্রের প্রথম শর্ত হলো—যোগ্য মানুষকে যোগ্য জায়গায় বসানো। প্রশাসন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কূটনীতি কিংবা প্রযুক্তি—কোনো ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক আনুগত্য একজন ব্যক্তির প্রধান যোগ্যতা হতে পারে না। সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতায় এই নীতিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ব্যক্তির পারিবারিক পরিচয়, জাতিগত পটভূমি কিংবা রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে দক্ষতা ও রাষ্ট্রের প্রতি অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে চিত্রটি ক্রমে বিপরীত দিকে গেছে। স্বাধীনতার পর রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক ও ভাষাগত বিভাজনের ব্যবহার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ১৯৫৬ সালের Official Language Act এবং পরবর্তী উচ্চশিক্ষা-সংক্রান্ত নীতিগুলো নাগরিকদের মধ্যে পরিচয়ভিত্তিক বিভাজনকে আরও তীব্র করে। মেধা ও যোগ্যতার বদলে কে কোন ভাষা, অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের—এই প্রশ্ন অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে ওঠে।

এর প্রভাব শুধু সমাজে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একসময় যে সিভিল সার্ভিসকে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দেখা হতো, সেখানেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন, কূটনৈতিক মিশন ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা হারাতে বাধ্য।

এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্যও কম নয়। যখন একটি সমাজ তরুণদের বোঝায় যে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন মেধাবীরা সেই ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার পথ খোঁজে। ফলে দেশ হারায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—মানবসম্পদ। দক্ষ ও শিক্ষিত মানুষের বিদেশমুখিতা তখন কেবল ব্যক্তিগত অভিবাসন থাকে না; তা রাষ্ট্রের সক্ষমতার ওপর সরাসরি আঘাত হয়ে দাঁড়ায়।

বাস্তবতার বদলে নীতির জেদ

রাষ্ট্র পরিচালনায় দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তববাদ। কোনো নীতি ভালো শোনালেই তা ভালো নীতি হয়ে যায় না। তার ফল কী হচ্ছে, মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ছে এবং অন্য দেশ একই সমস্যার কী সমাধান করেছে—এসব প্রশ্ন বিবেচনায় নিতে হয়।

সিঙ্গাপুরের সাফল্যের একটি দিক ছিল এই বাস্তববাদী মনোভাব। কোনো সমস্যার সমাধান অন্য কোথাও সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়ে থাকলে সেটি থেকে শেখা, প্রয়োজন অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়া এবং ফলের ভিত্তিতে নীতি সংশোধন করা—এই পদ্ধতি তাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শ্রীলঙ্কায় বহু সময় এর উল্টো প্রবণতা দেখা গেছে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে কখনো অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, কখনো দ্রুত ও অপর্যাপ্ত প্রস্তুতির বাজারমুখী সংস্কার—দুই ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক বাস্তববাদী নীতির অভাব ছিল। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা, মতাদর্শ এবং তাৎক্ষণিক সুবিধা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে বহুবার ছাপিয়ে গেছে।

২০২১ সালে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ওপর আকস্মিক নিষেধাজ্ঞা এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। শতভাগ জৈব কৃষিতে দ্রুত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ উপেক্ষা করে। এর ফলে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা আসে এবং চা উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি নীতির উদ্দেশ্য ভালো হতে পারে, কিন্তু বাস্তব প্রস্তুতি, বৈজ্ঞানিক পরামর্শ এবং পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন ছাড়া সেই উদ্দেশ্যই বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

বাস্তববাদী সরকারকে তাই নিজের ভুল স্বীকার করার সক্ষমতাও রাখতে হয়। অর্থনৈতিক হিসাব অনুকূলে না থাকলে নীতি বদলাতে হয়; মূল্যস্ফীতি বাড়লে তার কারণ খুঁজতে হয়; বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিলে সংকটকে রাজনৈতিক ভাষণে ঢেকে না রেখে দ্রুত সমাধানের পথে যেতে হয়। কোনো সিদ্ধান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরও শুধু রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য সেটিকে আঁকড়ে থাকা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

দুর্নীতি যখন ব্যবস্থার অংশ হয়ে যায়

মেধা ও বাস্তববাদের পর তৃতীয় স্তম্ভ হলো সততা। কোনো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান যতই শক্তিশালী দেখাক, দুর্নীতি যদি সেখানে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণে পরিণত হয়, তাহলে সেই কাঠামো ধীরে ধীরে ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে।

শ্রীলঙ্কার সংকটের ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিষয়টি তাই বিচ্ছিন্ন কয়েকটি কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। বড় অবকাঠামো প্রকল্প থেকে সরকারি ক্রয়, জ্বালানি, খাদ্য কিংবা অন্যান্য সরবরাহ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, অতিরিক্ত ব্যয় এবং কমিশনভিত্তিক লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

আরও বিপজ্জনক হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। তদন্ত শুরু হলেও তা যদি শেষ পর্যন্ত কার্যকর জবাবদিহিতে না পৌঁছায়, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বার্তা দুর্বল হয়ে যায়। তদন্ত কমিটি গঠন, প্রতিবেদন তৈরি কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্য—কোনোটিই যথেষ্ট নয় যদি আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়।

দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়। এটি মানুষের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা নষ্ট করে। নাগরিক যখন দেখতে পান যে ক্ষমতাবানরা একই আইনের আওতায় কার্যত একইভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি হন না, তখন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আস্থাও ক্ষয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এই আস্থার সংকট অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকেও কঠিন করে তোলে।

নতুন নেতৃত্ব কি সত্যিই পুরোনো পথ থেকে সরে এসেছে?

রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায় না। নতুন সরকার পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিতে পারে এবং আর্থিক শৃঙ্খলার কথা বলতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের পরীক্ষা হয় নিয়োগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সরকারি চুক্তি এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রে।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে? গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন পেশাদারদের জায়গা কতটা বাড়ছে? প্রশাসনিক সংস্কার কি সত্যিই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাচ্ছে? বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে কাঠামোগত পরিবর্তন কতটা হচ্ছে?

একইভাবে জানতে হবে, রাষ্ট্রীয় চুক্তি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান যদি কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু নিজের রাজনৈতিক পরিসরের অনিয়মের ক্ষেত্রে নীরব থাকে, তাহলে সেটি প্রকৃত সংস্কার নয়।

রাষ্ট্রের পুনর্গঠন কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রচারণার বিষয় নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজ। সেখানে ব্যক্তির চেয়ে নিয়ম, আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা এবং গোপন সমঝোতার চেয়ে স্বচ্ছতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।Sri Lanka's economy makes strong rebound after worst financial crisis in decades - TRT World

ফিরে আসার পথ কোথায়?

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে শুধু ঋণ, আন্তর্জাতিক সহায়তা বা আইএমএফ কর্মসূচির মাধ্যমে দেখা যথেষ্ট নয়। এসব উপায় সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেরাই শক্তিশালী করতে পারে না।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত সরকারি নিয়োগব্যবস্থায় প্রকৃত মেধাভিত্তিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইচ্ছাধীন নিয়োগের সুযোগ যতটা সম্ভব কমিয়ে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং যাচাইযোগ্য যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক নীতিতে মতাদর্শের বদলে ফলাফলকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতামত রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হলেও তা শুনতে হবে। অন্য দেশ কীভাবে একই সমস্যার মোকাবিলা করেছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সরকারি সেবাকে ডিজিটাল ও কার্যকর করতে হবে এবং প্রতিটি বড় নীতির ফল পরিমাপের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে। আর্থিক অপরাধে দায়মুক্তির সুযোগ কমাতে হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের মতো ব্যবস্থাকে কার্যকর ও জনসম্মুখে যাচাইযোগ্য করতে হবে।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা একটি কঠিন শিক্ষা দেয়—রাষ্ট্রের পতন একদিনে ঘটে না। বছরের পর বছর ভুল নিয়োগ, ভুল নীতি, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং জবাবদিহির অভাব মিলেই একসময় একটি রাষ্ট্রকে সংকটে ঠেলে দেয়। একইভাবে পুনরুদ্ধারও একদিনে সম্ভব নয়।

সিঙ্গাপুরের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার তুলনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো এই যে, একটি দেশের ভাগ্য শুধু তার ভূগোল বা প্রাকৃতিক সম্পদ নির্ধারণ করে না। ছোট ভূখণ্ড, সীমিত সম্পদ কিংবা প্রতিকূলতা কোনো দেশকে ব্যর্থ হতে বাধ্য করে না। বরং রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে, কতটা বাস্তববাদীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় এবং কতটা কঠোরভাবে সততা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে—তার ওপর ভবিষ্যৎ অনেক বেশি নির্ভরশীল।

শ্রীলঙ্কার সামনে তাই মূল প্রশ্ন নতুন কোনো অর্থনৈতিক মডেল আবিষ্কার করা নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিগুলো ফিরিয়ে আনার রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে কি না।

মেধাকে জায়গা দিতে হবে, বাস্তবতাকে স্বীকার করতে হবে এবং ক্ষমতার ঊর্ধ্বে আইনের অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে একটি দেশ সাময়িকভাবে আশাবাদ তৈরি করতে পারে; কিন্তু স্থায়ী সমৃদ্ধি তৈরি হয় কার্যকর প্রতিষ্ঠান দিয়ে।

শ্রীলঙ্কার জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। অতীতের ভুলের দায় শুধু আগের সরকার বা আগের রাজনৈতিক দলের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি মেধার পরিবর্তে আনুগত্য, বাস্তবতার পরিবর্তে জনপ্রিয়তা এবং সততার পরিবর্তে সুবিধাবাদকে পুরস্কৃত করে, সেটি টিকে থাকলে নেতৃত্ব বদলালেও ফল খুব বেশি বদলাবে না।

সুতরাং প্রকৃত পরিবর্তনের শুরু হতে হবে রাষ্ট্রের কাজ করার পদ্ধতি থেকে। মেধা, বাস্তববাদ ও সততা—এই তিনটি কোনো বিমূর্ত আদর্শ নয়; এগুলো একটি কার্যকর রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত। শ্রীলঙ্কা যদি সত্যিই তার হারানো সম্ভাবনা ফিরে পেতে চায়, তবে তাকে এই তিন ভিত্তির ওপরই নতুন করে রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হবে।

দেশটির সামনে পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। তবে সেই পথের প্রথম শর্ত হলো—নিজেদের ব্যর্থতার কারণ সম্পর্কে আর কোনো আত্মপ্রবঞ্চনা না করা।

জনপ্রিয় সংবাদ

হোটেলের কক্ষে মিলল এয়ার ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেনের মরদেহ, ভেতর থেকে বন্ধ ছিল দরজা

শ্রীলঙ্কাকে বাঁচাতে অর্থ নয়, বদলাতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি

০৬:৪২:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একসময় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দেশগুলোর একটি হিসেবে শ্রীলঙ্কাকে দেখা হতো। স্বাধীনতার পর দেশটির ছিল তুলনামূলকভাবে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী, কার্যকর আমলাতন্ত্র, উন্নত অবকাঠামো এবং শক্তিশালী ইংরেজি শিক্ষার ভিত্তি। একই সময়ে সম্পদ ও ভূখণ্ডের দিক থেকে অনেক বেশি সীমাবদ্ধ সিঙ্গাপুর নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য শ্রীলঙ্কার দিকে তাকিয়েছিল। কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই তুলনাটি আজ বিস্ময়করভাবে উল্টে গেছে। সিঙ্গাপুর উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে, আর শ্রীলঙ্কা ঋণ, দেউলিয়াত্ব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক ব্যর্থতার দীর্ঘ ছায়ায় আটকে পড়েছে।

এই বিপরীত যাত্রাকে কেবল ভাগ্য, বৈশ্বিক পরিস্থিতি কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদের ঘাটতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আসল প্রশ্ন হলো—একই অঞ্চলের দুটি দেশ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এত ভিন্ন পথ বেছে নিল কেন?

সিঙ্গাপুরের সাফল্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কিশোর মাহবুবানি যে তিনটি নীতির কথা সামনে এনেছেন—মেরিটোক্রেসি বা মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা, প্র্যাগম্যাটিজম বা বাস্তববাদ এবং অনেস্টি বা সততা—সেগুলোকে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মেধার বদলে আনুগত্য, বাস্তবতার বদলে রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং জবাবদিহির বদলে দুর্নীতিকে জায়গা দেওয়ার ফল কী হতে পারে, শ্রীলঙ্কা তার কঠিন উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

মেধার জায়গায় যখন পরিচয় ও আনুগত্য

একটি কার্যকর রাষ্ট্রের প্রথম শর্ত হলো—যোগ্য মানুষকে যোগ্য জায়গায় বসানো। প্রশাসন, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, কূটনীতি কিংবা প্রযুক্তি—কোনো ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক আনুগত্য একজন ব্যক্তির প্রধান যোগ্যতা হতে পারে না। সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতায় এই নীতিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। ব্যক্তির পারিবারিক পরিচয়, জাতিগত পটভূমি কিংবা রাজনৈতিক সম্পর্কের চেয়ে দক্ষতা ও রাষ্ট্রের প্রতি অবদানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে চিত্রটি ক্রমে বিপরীত দিকে গেছে। স্বাধীনতার পর রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক ও ভাষাগত বিভাজনের ব্যবহার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করে। ১৯৫৬ সালের Official Language Act এবং পরবর্তী উচ্চশিক্ষা-সংক্রান্ত নীতিগুলো নাগরিকদের মধ্যে পরিচয়ভিত্তিক বিভাজনকে আরও তীব্র করে। মেধা ও যোগ্যতার বদলে কে কোন ভাষা, অঞ্চল বা সম্প্রদায়ের—এই প্রশ্ন অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে ওঠে।

এর প্রভাব শুধু সমাজে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একসময় যে সিভিল সার্ভিসকে এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে দেখা হতো, সেখানেও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, করপোরেশন, কূটনৈতিক মিশন ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা হারাতে বাধ্য।

এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্যও কম নয়। যখন একটি সমাজ তরুণদের বোঝায় যে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তখন মেধাবীরা সেই ব্যবস্থার বাইরে যাওয়ার পথ খোঁজে। ফলে দেশ হারায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—মানবসম্পদ। দক্ষ ও শিক্ষিত মানুষের বিদেশমুখিতা তখন কেবল ব্যক্তিগত অভিবাসন থাকে না; তা রাষ্ট্রের সক্ষমতার ওপর সরাসরি আঘাত হয়ে দাঁড়ায়।

বাস্তবতার বদলে নীতির জেদ

রাষ্ট্র পরিচালনায় দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তববাদ। কোনো নীতি ভালো শোনালেই তা ভালো নীতি হয়ে যায় না। তার ফল কী হচ্ছে, মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ছে এবং অন্য দেশ একই সমস্যার কী সমাধান করেছে—এসব প্রশ্ন বিবেচনায় নিতে হয়।

সিঙ্গাপুরের সাফল্যের একটি দিক ছিল এই বাস্তববাদী মনোভাব। কোনো সমস্যার সমাধান অন্য কোথাও সফলভাবে প্রয়োগ করা হয়ে থাকলে সেটি থেকে শেখা, প্রয়োজন অনুযায়ী মানিয়ে নেওয়া এবং ফলের ভিত্তিতে নীতি সংশোধন করা—এই পদ্ধতি তাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শ্রীলঙ্কায় বহু সময় এর উল্টো প্রবণতা দেখা গেছে। অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে কখনো অতিরিক্ত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, কখনো দ্রুত ও অপর্যাপ্ত প্রস্তুতির বাজারমুখী সংস্কার—দুই ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক বাস্তববাদী নীতির অভাব ছিল। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা, মতাদর্শ এবং তাৎক্ষণিক সুবিধা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনাকে বহুবার ছাপিয়ে গেছে।

২০২১ সালে রাসায়নিক সার ব্যবহারের ওপর আকস্মিক নিষেধাজ্ঞা এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। শতভাগ জৈব কৃষিতে দ্রুত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ উপেক্ষা করে। এর ফলে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা আসে এবং চা উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি নীতির উদ্দেশ্য ভালো হতে পারে, কিন্তু বাস্তব প্রস্তুতি, বৈজ্ঞানিক পরামর্শ এবং পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন ছাড়া সেই উদ্দেশ্যই বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

বাস্তববাদী সরকারকে তাই নিজের ভুল স্বীকার করার সক্ষমতাও রাখতে হয়। অর্থনৈতিক হিসাব অনুকূলে না থাকলে নীতি বদলাতে হয়; মূল্যস্ফীতি বাড়লে তার কারণ খুঁজতে হয়; বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেখা দিলে সংকটকে রাজনৈতিক ভাষণে ঢেকে না রেখে দ্রুত সমাধানের পথে যেতে হয়। কোনো সিদ্ধান্ত ব্যর্থ হওয়ার পরও শুধু রাজনৈতিক ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য সেটিকে আঁকড়ে থাকা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

দুর্নীতি যখন ব্যবস্থার অংশ হয়ে যায়

মেধা ও বাস্তববাদের পর তৃতীয় স্তম্ভ হলো সততা। কোনো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান যতই শক্তিশালী দেখাক, দুর্নীতি যদি সেখানে নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক আচরণে পরিণত হয়, তাহলে সেই কাঠামো ধীরে ধীরে ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে।

শ্রীলঙ্কার সংকটের ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিষয়টি তাই বিচ্ছিন্ন কয়েকটি কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। বড় অবকাঠামো প্রকল্প থেকে সরকারি ক্রয়, জ্বালানি, খাদ্য কিংবা অন্যান্য সরবরাহ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, অতিরিক্ত ব্যয় এবং কমিশনভিত্তিক লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।

আরও বিপজ্জনক হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। তদন্ত শুরু হলেও তা যদি শেষ পর্যন্ত কার্যকর জবাবদিহিতে না পৌঁছায়, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বার্তা দুর্বল হয়ে যায়। তদন্ত কমিটি গঠন, প্রতিবেদন তৈরি কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্য—কোনোটিই যথেষ্ট নয় যদি আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হয়।

দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু সরকারি অর্থের অপচয় নয়। এটি মানুষের রাষ্ট্রের ওপর আস্থা নষ্ট করে। নাগরিক যখন দেখতে পান যে ক্ষমতাবানরা একই আইনের আওতায় কার্যত একইভাবে জবাবদিহির মুখোমুখি হন না, তখন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আস্থাও ক্ষয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এই আস্থার সংকট অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকেও কঠিন করে তোলে।

নতুন নেতৃত্ব কি সত্যিই পুরোনো পথ থেকে সরে এসেছে?

রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায় না। নতুন সরকার পুরোনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিতে পারে এবং আর্থিক শৃঙ্খলার কথা বলতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের পরীক্ষা হয় নিয়োগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সরকারি চুক্তি এবং জবাবদিহির ক্ষেত্রে।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে? গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন পেশাদারদের জায়গা কতটা বাড়ছে? প্রশাসনিক সংস্কার কি সত্যিই আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাচ্ছে? বিদেশি বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে কাঠামোগত পরিবর্তন কতটা হচ্ছে?

একইভাবে জানতে হবে, রাষ্ট্রীয় চুক্তি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান যদি কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু নিজের রাজনৈতিক পরিসরের অনিয়মের ক্ষেত্রে নীরব থাকে, তাহলে সেটি প্রকৃত সংস্কার নয়।

রাষ্ট্রের পুনর্গঠন কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রচারণার বিষয় নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজ। সেখানে ব্যক্তির চেয়ে নিয়ম, আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা এবং গোপন সমঝোতার চেয়ে স্বচ্ছতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।Sri Lanka's economy makes strong rebound after worst financial crisis in decades - TRT World

ফিরে আসার পথ কোথায়?

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে শুধু ঋণ, আন্তর্জাতিক সহায়তা বা আইএমএফ কর্মসূচির মাধ্যমে দেখা যথেষ্ট নয়। এসব উপায় সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেরাই শক্তিশালী করতে পারে না।

প্রথম কাজ হওয়া উচিত সরকারি নিয়োগব্যবস্থায় প্রকৃত মেধাভিত্তিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইচ্ছাধীন নিয়োগের সুযোগ যতটা সম্ভব কমিয়ে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং যাচাইযোগ্য যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক নীতিতে মতাদর্শের বদলে ফলাফলকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতামত রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হলেও তা শুনতে হবে। অন্য দেশ কীভাবে একই সমস্যার মোকাবিলা করেছে, সেখান থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সরকারি সেবাকে ডিজিটাল ও কার্যকর করতে হবে এবং প্রতিটি বড় নীতির ফল পরিমাপের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে কার্যকর ক্ষমতা দিতে হবে। আর্থিক অপরাধে দায়মুক্তির সুযোগ কমাতে হবে এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের মতো ব্যবস্থাকে কার্যকর ও জনসম্মুখে যাচাইযোগ্য করতে হবে।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা একটি কঠিন শিক্ষা দেয়—রাষ্ট্রের পতন একদিনে ঘটে না। বছরের পর বছর ভুল নিয়োগ, ভুল নীতি, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং জবাবদিহির অভাব মিলেই একসময় একটি রাষ্ট্রকে সংকটে ঠেলে দেয়। একইভাবে পুনরুদ্ধারও একদিনে সম্ভব নয়।

সিঙ্গাপুরের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার তুলনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো এই যে, একটি দেশের ভাগ্য শুধু তার ভূগোল বা প্রাকৃতিক সম্পদ নির্ধারণ করে না। ছোট ভূখণ্ড, সীমিত সম্পদ কিংবা প্রতিকূলতা কোনো দেশকে ব্যর্থ হতে বাধ্য করে না। বরং রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে, কতটা বাস্তববাদীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় এবং কতটা কঠোরভাবে সততা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে—তার ওপর ভবিষ্যৎ অনেক বেশি নির্ভরশীল।

শ্রীলঙ্কার সামনে তাই মূল প্রশ্ন নতুন কোনো অর্থনৈতিক মডেল আবিষ্কার করা নয়। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতিগুলো ফিরিয়ে আনার রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে কি না।

মেধাকে জায়গা দিতে হবে, বাস্তবতাকে স্বীকার করতে হবে এবং ক্ষমতার ঊর্ধ্বে আইনের অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে একটি দেশ সাময়িকভাবে আশাবাদ তৈরি করতে পারে; কিন্তু স্থায়ী সমৃদ্ধি তৈরি হয় কার্যকর প্রতিষ্ঠান দিয়ে।

শ্রীলঙ্কার জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। অতীতের ভুলের দায় শুধু আগের সরকার বা আগের রাজনৈতিক দলের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি মেধার পরিবর্তে আনুগত্য, বাস্তবতার পরিবর্তে জনপ্রিয়তা এবং সততার পরিবর্তে সুবিধাবাদকে পুরস্কৃত করে, সেটি টিকে থাকলে নেতৃত্ব বদলালেও ফল খুব বেশি বদলাবে না।

সুতরাং প্রকৃত পরিবর্তনের শুরু হতে হবে রাষ্ট্রের কাজ করার পদ্ধতি থেকে। মেধা, বাস্তববাদ ও সততা—এই তিনটি কোনো বিমূর্ত আদর্শ নয়; এগুলো একটি কার্যকর রাষ্ট্রের মৌলিক শর্ত। শ্রীলঙ্কা যদি সত্যিই তার হারানো সম্ভাবনা ফিরে পেতে চায়, তবে তাকে এই তিন ভিত্তির ওপরই নতুন করে রাষ্ট্র নির্মাণ করতে হবে।

দেশটির সামনে পথ কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। তবে সেই পথের প্রথম শর্ত হলো—নিজেদের ব্যর্থতার কারণ সম্পর্কে আর কোনো আত্মপ্রবঞ্চনা না করা।