ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধারা লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালির কৌশলগত পারিম দ্বীপে পৌঁছেছে। ১১ সেপ্টেম্বর ইয়েমেন সরকারের চারটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স। এর আগে ইয়েমেনের সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের দুটি সূত্র জানায়, সরকারি বাহিনী দ্বীপটি থেকে সরে গেছে। একই সময়ে মূল ভূখণ্ডের উপকূলীয় শহর ধুবাবও হুথিদের দখলে গেছে বলে জানানো হয়।
পারিম দ্বীপের অবস্থান এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালির গুরুত্বের কারণে হুথিদের এই অগ্রগতি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাব আল-মান্দাবে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ার আশঙ্কা
বাব আল-মান্দাব বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর একটি। প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে আরও শক্তিশালী হলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে তেহরানের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে। আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে অবস্থিত হরমুজ প্রণালির সঙ্গে বাব আল-মান্দাবেও বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যপথ একসঙ্গে চাপের মুখে পড়বে।
হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ কার্যত বাধাগ্রস্ত হওয়ার পর সৌদি আরব লোহিত সাগরভিত্তিক রুটের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
সৌদি তেল পরিবহনে নতুন চাপ
সৌদি আরবের জন্য আরেকটি উদ্বেগের বিষয় সামনে এসেছে ১০ সেপ্টেম্বর। সেদিন স্যাটেলাইট ছবিতে দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কাছে ধোঁয়া দেখা যায়। হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে সৌদি আরবের জন্য এই পাইপলাইন গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে দেশটির পূর্বাঞ্চল থেকে পশ্চিমে লোহিত সাগর উপকূলে অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা সম্ভব হয়। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ ওই ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয়নি।
ছয় মাস আগে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরুর পর সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগর উপকূলে তেল পরিবহনের পরিমাণ বাড়িয়েছে। এর পরই ইরান হরমুজ প্রণালিতে কার্যত চলাচল বন্ধ করে দেয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জানিয়েছে, আগস্টে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দৈনিক ২.৩ মিলিয়ন ব্যারেল কমে ৬ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমেছে। তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি দেশটির সর্বনিম্ন উৎপাদন। বাব আল-মান্দাব দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হুথি-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর হামলাও উৎপাদন কমার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
হুথিদের দখল ঠেকাতে পাল্টা অভিযানের প্রস্তুতি
এদিকে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের সাম্প্রতিক দ্রুত অগ্রযাত্রায় দখল হওয়া এলাকাগুলো পুনর্দখলের চেষ্টা করা হবে। সামরিক মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আল-নাজিলি তাইজ ও মোখা সড়ক এড়িয়ে চলতে এবং হুথিদের সামরিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকতে বেসামরিক নাগরিকদের সতর্ক করেছেন।
সৌদি আরব ইয়েমেনে হুথি লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে চলতি সপ্তাহে হুথিদের দখলে যাওয়া কৌশলগত এলাকাগুলোতে এখনো হামলা চালায়নি দেশটি।
মার্কিন সরাসরি সামরিক পদক্ষেপে আপাতত অনীহা
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে দুইবার কথা বলেছেন এবং হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে হামলা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ট্রাম্প সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা আপাতত ওয়াশিংটনের নেই।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাজারেও স্পষ্ট হচ্ছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম মে মাসের মাঝামাঝির পর প্রথমবারের মতো প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে সপ্তাহ শেষ করার পথে ছিল। ১১ সেপ্টেম্বর দাম সামান্য কমলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাময়িক ব্যবস্থার বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আলোচনা করছিলেন বলে জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।
হুথিদের পারিম দ্বীপে পৌঁছানোয় বাব আল-মান্দাব ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে, যা বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল ও তেল সরবরাহের ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















