০৮:১৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভানুয়াতুতে ফেরি ডুবে নিখোঁজ ৩০, উঠছে অতিরিক্ত বোঝাইয়ের প্রশ্ন ব্যাটারি চালিত রিক্সার জন্য ব্যয় হয় মাত্র ৫% বিদ্যুৎ হোটেলের কক্ষে মিলল এয়ার ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেনের মরদেহ, ভেতর থেকে বন্ধ ছিল দরজা ‘বারবার মামলা না দিয়ে আমাকে গুলি করে মেরে ফেলেন’, আদালতে মিষ্টি সুভাষ হুথিদের দখলে কৌশলগত দ্বীপ, বাব আল-মান্দাব ঘিরে বাড়ছে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি ব্রিকসে ঐক্যের বার্তা, বৈশ্বিক দক্ষিণের শক্তি বাড়ানোর ডাক মোদি-শি-পুতিনের জাভা সাগরে ফেরি উল্টে নিখোঁজ ১৩০, উদ্ধার ১০৭ সংস্কারবিরোধী সংবিধান? হামসদৃশ উপসর্গে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু, দেশে মৃতের সংখ্যা ১,০২২ ডেঙ্গুতে আরও ৬ মৃত্যু, দেশে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৯

ব্রিকসে ঐক্যের বার্তা, বৈশ্বিক দক্ষিণের শক্তি বাড়ানোর ডাক মোদি-শি-পুতিনের

ভারতের নয়াদিল্লিতে দুই দিনব্যাপী ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার, বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ জোটের সদস্য দেশগুলোর নেতারা অংশ নেন।

শনিবার সম্মেলনে সর্বসম্মতভাবে ১৪০ দফার ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গ্রহণ করা হয়। এতে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ, বাণিজ্য, জলবায়ু, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ঘোষণায় স্থান পেয়েছে।

ভারতের সভাপতিত্বে এবারের ব্রিকস সম্মেলনের মূল ভাবনা ছিল—স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন। দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ব্রিকসের সদস্যদের সহযোগিতায় ভারত এই অভিন্ন লক্ষ্যকে বাস্তবভিত্তিক ও পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

মোদি বলেন, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে ব্রিকসের প্রতি আস্থা বেড়েছে। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভূস্থানিক প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা এবং নতুন উদ্যোগ বা স্টার্টআপে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। সংক্রামক রোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নতুন নির্দেশিকাও ঘোষণা করেন তিনি।

সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল বৈশ্বিক দক্ষিণের বৃহত্তর ভূমিকা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ব্রিকসকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সক্রিয় ও স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।

শি পাঁচটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে উদীয়মান বাজারগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা, উন্মুক্ত ও পারস্পরিক কল্যাণভিত্তিক সহযোগিতা বজায় রাখা, শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বৃহৎ ও সমন্বিত বাজার গড়ে তোলার বিষয় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার বিষয়েও শক্ত অবস্থান তুলে ধরেন শি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়মহীন বিশ্ব বিশৃঙ্খলার দিকে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক নিয়ম সব দেশের অংশগ্রহণে তৈরি হওয়া উচিত এবং শক্তিশালী দেশই সব সিদ্ধান্ত নেবে—এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করা প্রয়োজন। সার্বভৌম সমতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির মতো নীতিকে সম্মান করার আহ্বান জানান তিনি।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও ব্রিকস সম্মেলনে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক, জনমিতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ১৯৪৫ সালের মতো নেই। তাই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং ব্রেটন উডস ব্যবস্থাসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।Modi, Putin seek stronger ties as Russia calls for Brics to counter West |  The Business Standard

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্মেলনে অংশ নিয়ে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে আলোচনা করেন। সম্মেলন শেষে পুতিন নয়াদিল্লি ছাড়েন। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও পরে ভারত ছাড়েন।

মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকও সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল। দুই নেতা সীমান্তে শান্তি, বাণিজ্য, ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। সাত বছর পর শির ভারত সফর হওয়ায় বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ব্রিকসের অর্থনৈতিক ভূমিকা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আর্থিক ও বাণিজ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে রাজনৈতিক ধাক্কার কাছে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তাই জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

একতরফা নিষেধাজ্ঞারও সমালোচনা করেন পেজেশকিয়ান। তাঁর দাবি, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ও মানুষের কল্যাণে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ইরানের অর্থনীতি, জ্বালানি ও উন্নয়ন অবকাঠামোর ওপর হামলা শুধু দেশটির জন্য নয়, পুরো অঞ্চল ও বিশ্বের জন্যও প্রভাব তৈরি করতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিও সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ব্রিকস সংলাপ, কূটনীতি ও সংযমের মাধ্যমে অঞ্চলটির সংঘাত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। যুদ্ধবিরতি এবং রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে জোটটি।

সম্মেলনের বাইরে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিদের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ আল নাহিয়ান ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার আলোচনা সামনে আসে। তবে ইরান জানিয়েছে, কোনো সমঝোতা হলেও সেটি প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার অর্থ হবে না এবং কোন জাহাজ চলাচল করবে সে বিষয়ে ইরানের ভূমিকা থাকবে।

ওমানও ব্রিকসে মতপার্থক্যের মধ্যেও ঐকমত্য তৈরিতে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। ভারতে নিযুক্ত ওমানের রাষ্ট্রদূত ইসা আলশিবানি বলেন, বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণে সফল হয়েছে। তাঁর মতে, বিভিন্ন দেশকে ঐকমত্যে আনার ক্ষেত্রে ভারতের সক্ষমতা নতুন কিছু নয়।

ব্রিকসের নয়াদিল্লি ঘোষণায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ভারতের পহেলগাম হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিরোধিতা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন ইস্যুতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে জোটটি।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এবারের সম্মেলনে ব্রিকসের নিজস্ব কোনো অভিন্ন মুদ্রা চালুর ঘোষণা আসেনি। বরং সদস্য দেশগুলোর জাতীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানো এবং আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা আরও উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য ১১টি দেশ—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ভারতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব দেশ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে মোদি কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র এবং উগান্ডার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেসিকা আলুপোর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

ব্রিকস সম্মেলনের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী, পরিপূরক ও সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থার আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভারতের আয়ুশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নয়াদিল্লি ঘোষণায় এ ধরনের চিকিৎসাব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব স্বীকৃত হয়েছে এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

সব মিলিয়ে নয়াদিল্লি সম্মেলনে ব্রিকসকে শুধু অর্থনৈতিক জোট হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক দক্ষিণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরও শক্তিশালী করার বার্তা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের মধ্যেও ঐকমত্য তৈরির মাধ্যমে জোটটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের ভূমিকা বাড়াতে চাইছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভানুয়াতুতে ফেরি ডুবে নিখোঁজ ৩০, উঠছে অতিরিক্ত বোঝাইয়ের প্রশ্ন

ব্রিকসে ঐক্যের বার্তা, বৈশ্বিক দক্ষিণের শক্তি বাড়ানোর ডাক মোদি-শি-পুতিনের

০৭:১৬:২০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতের নয়াদিল্লিতে দুই দিনব্যাপী ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার, বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সম্মেলনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ জোটের সদস্য দেশগুলোর নেতারা অংশ নেন।

শনিবার সম্মেলনে সর্বসম্মতভাবে ১৪০ দফার ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গ্রহণ করা হয়। এতে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা, সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ, বাণিজ্য, জলবায়ু, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি ও উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, সন্ত্রাসবাদ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ঘোষণায় স্থান পেয়েছে।

ভারতের সভাপতিত্বে এবারের ব্রিকস সম্মেলনের মূল ভাবনা ছিল—স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন। দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, ব্রিকসের সদস্যদের সহযোগিতায় ভারত এই অভিন্ন লক্ষ্যকে বাস্তবভিত্তিক ও পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

মোদি বলেন, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে ব্রিকসের প্রতি আস্থা বেড়েছে। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃষিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি, ভূস্থানিক প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা এবং নতুন উদ্যোগ বা স্টার্টআপে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। সংক্রামক রোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নতুন নির্দেশিকাও ঘোষণা করেন তিনি।

সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল বৈশ্বিক দক্ষিণের বৃহত্তর ভূমিকা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ব্রিকসকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও সক্রিয় ও স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।

শি পাঁচটি উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে উদীয়মান বাজারগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা, উন্মুক্ত ও পারস্পরিক কল্যাণভিত্তিক সহযোগিতা বজায় রাখা, শিল্প ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বৃহৎ ও সমন্বিত বাজার গড়ে তোলার বিষয় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার বিষয়েও শক্ত অবস্থান তুলে ধরেন শি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়মহীন বিশ্ব বিশৃঙ্খলার দিকে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক নিয়ম সব দেশের অংশগ্রহণে তৈরি হওয়া উচিত এবং শক্তিশালী দেশই সব সিদ্ধান্ত নেবে—এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করা প্রয়োজন। সার্বভৌম সমতা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির মতো নীতিকে সম্মান করার আহ্বান জানান তিনি।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও ব্রিকস সম্মেলনে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক, জনমিতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ১৯৪৫ সালের মতো নেই। তাই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এবং ব্রেটন উডস ব্যবস্থাসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।Modi, Putin seek stronger ties as Russia calls for Brics to counter West |  The Business Standard

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্মেলনে অংশ নিয়ে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে আলোচনা করেন। সম্মেলন শেষে পুতিন নয়াদিল্লি ছাড়েন। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও পরে ভারত ছাড়েন।

মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকও সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল। দুই নেতা সীমান্তে শান্তি, বাণিজ্য, ব্যবসায়িক সম্পর্ক এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। সাত বছর পর শির ভারত সফর হওয়ায় বৈঠকটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ব্রিকসের অর্থনৈতিক ভূমিকা আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক আর্থিক ও বাণিজ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে রাজনৈতিক ধাক্কার কাছে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। তাই জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

একতরফা নিষেধাজ্ঞারও সমালোচনা করেন পেজেশকিয়ান। তাঁর দাবি, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ও মানুষের কল্যাণে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ইরানের অর্থনীতি, জ্বালানি ও উন্নয়ন অবকাঠামোর ওপর হামলা শুধু দেশটির জন্য নয়, পুরো অঞ্চল ও বিশ্বের জন্যও প্রভাব তৈরি করতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতিও সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। ব্রিকস সংলাপ, কূটনীতি ও সংযমের মাধ্যমে অঞ্চলটির সংঘাত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। যুদ্ধবিরতি এবং রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছে জোটটি।

সম্মেলনের বাইরে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিদের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ আল নাহিয়ান ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন। একই সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার আলোচনা সামনে আসে। তবে ইরান জানিয়েছে, কোনো সমঝোতা হলেও সেটি প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার অর্থ হবে না এবং কোন জাহাজ চলাচল করবে সে বিষয়ে ইরানের ভূমিকা থাকবে।

ওমানও ব্রিকসে মতপার্থক্যের মধ্যেও ঐকমত্য তৈরিতে ভারতের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। ভারতে নিযুক্ত ওমানের রাষ্ট্রদূত ইসা আলশিবানি বলেন, বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নয়াদিল্লি একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণে সফল হয়েছে। তাঁর মতে, বিভিন্ন দেশকে ঐকমত্যে আনার ক্ষেত্রে ভারতের সক্ষমতা নতুন কিছু নয়।

ব্রিকসের নয়াদিল্লি ঘোষণায় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ভারতের পহেলগাম হামলার নিন্দা জানানো হয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদ ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের বিরোধিতা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন ইস্যুতে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে জোটটি।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এবারের সম্মেলনে ব্রিকসের নিজস্ব কোনো অভিন্ন মুদ্রা চালুর ঘোষণা আসেনি। বরং সদস্য দেশগুলোর জাতীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানো এবং আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা আরও উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য ১১টি দেশ—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। ভারতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব দেশ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে মোদি কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র এবং উগান্ডার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেসিকা আলুপোর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

ব্রিকস সম্মেলনের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী, পরিপূরক ও সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থার আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ভারতের আয়ুশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নয়াদিল্লি ঘোষণায় এ ধরনের চিকিৎসাব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব স্বীকৃত হয়েছে এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

সব মিলিয়ে নয়াদিল্লি সম্মেলনে ব্রিকসকে শুধু অর্থনৈতিক জোট হিসেবে নয়, বরং বৈশ্বিক দক্ষিণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আরও শক্তিশালী করার বার্তা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের মধ্যেও ঐকমত্য তৈরির মাধ্যমে জোটটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেদের ভূমিকা বাড়াতে চাইছে।