যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কর্মকর্তা ডেভিড রাশের বিরুদ্ধে ওঠা বিপুল অর্থ ও সোনা আত্মসাতের অভিযোগে আদালতের বাইরে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মার্কিন বিচার বিভাগের সঙ্গে রাশের একটি সম্ভাব্য দোষ স্বীকার চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। এই চুক্তি হলে প্রকাশ্য বিচার এড়ানো সম্ভব হতে পারে এবং মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্যও জনসমক্ষে আসা থেকে রক্ষা পেতে পারে।
রাশ একসময় সিআইএর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন এবং তার কাছে ছিল সর্বোচ্চ গোপনীয়তার অনুমতিপত্র। কিন্তু অভ্যন্তরীণ তদন্তে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও মার্কিন নৌবাহিনীতে চাকরির বিষয়ে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর গত মে মাসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তার ভার্জিনিয়ার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তদন্তকারীরা বিপুল পরিমাণ সম্পদের সন্ধান পান। সেখানে মোট ৩০৩টি এক কেজি ওজনের সোনার বার পাওয়া যায়। এসব সোনার আনুমানিক মূল্য ৪ কোটি ডলারের বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া প্রায় ২০ লাখ ডলার নগদ অর্থ এবং ৩৫টি বিলাসবহুল ঘড়িও উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে এত বিপুল সোনা ও সম্পদের সন্ধান পাওয়ার পরও এখন পর্যন্ত রাশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা তুলনামূলকভাবে সীমিত। তার বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সামরিক ছুটির ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ৭৭ হাজার ডলার পাওয়ার জন্য তিনি বেতনসংক্রান্ত নথিতে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন।
মামলাটি এখনো কেন্দ্রীয় সরকারের ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরির সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। শুক্রবার আদালতে যৌথভাবে দাখিল করা এক আবেদনে রাশের আইনজীবী এবং ফেডারেল প্রসিকিউটররা জানান, তারা নীতিগতভাবে একটি দোষ স্বীকার চুক্তিতে পৌঁছেছেন। চূড়ান্ত কাগজপত্র প্রস্তুত করার জন্য তারা আদালতের কাছে অভিযোগপত্র দাখিলের সময়সীমা বাড়ানোর আবেদন করেন।
আগে ১৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অভিযোগপত্র দাখিলের সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও তা বাড়িয়ে ৮ অক্টোবর করার আবেদন করা হয়েছে। অর্থাৎ বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য উভয় পক্ষ আরও ২১ দিন সময় চেয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় আইনি কাগজপত্র প্রস্তুত করতে আরও সময় দরকার। পাশাপাশি অভিযোগপত্র ও প্রকাশ্য বিচার হলে বিপুল পরিমাণ গোপনীয় তথ্য নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে আগেই সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করলে সরকারের পাশাপাশি আদালতের সময় ও অর্থও সাশ্রয় হবে বলে প্রসিকিউটর ও রাশের আইনজীবী যুক্তি দিয়েছেন।
তবে রাশ ঠিক কোন অভিযোগে দোষ স্বীকার করতে পারেন, সে বিষয়ে আদালতে দাখিল করা নথিতে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। একইভাবে তার সম্ভাব্য সাজা কী হতে পারে বা প্রসিকিউটররা কী ধরনের সাজা সুপারিশ করবেন, তাও জানা যায়নি।
মামলাটির সবচেয়ে রহস্যজনক দিক হলো বিপুল পরিমাণ সোনা ও বিদেশি মুদ্রা কীভাবে রাশের হাতে পৌঁছেছিল। আদালতের নথি অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর থেকে রাশ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খরচ হিসেবে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা এবং কয়েক কোটি ডলারের সোনা চেয়েছিলেন এবং তা পেয়েছিলেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশ একটি বিশেষ গোপন অভিযান বা ‘সরকারের ধারাবাহিকতা’ কার্যক্রমের কথা তৈরি করেছিলেন। তার দাবি ছিল, এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক যুদ্ধ বা বড় ধরনের কোনো বিপর্যয়ের সময় যাতে মার্কিন সরকারের কার্যক্রম চালু রাখা যায়, সেই প্রস্তুতি নেওয়া।
তদন্তকারীদের সন্দেহ, এই কথিত বিশেষ অভিযান বাস্তবে ছিল না এবং এর নাম ব্যবহার করেই রাশ বিপুল পরিমাণ সরকারি সম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন। তবে মামলার গোপনীয়তার কারণে অভিযোগগুলোর বিস্তারিত এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ নজরদারি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তের আলোচনায় এসেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী স্টিফেন ফেইনবার্গও। তিনি একজন ধনকুবের ও বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি পেন্টাগনের প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলারের সামরিক গোয়েন্দা বাজেট তদারকির সঙ্গে যুক্ত।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ফেইনবার্গ রাশকে সংবেদনশীল দায়িত্বের জন্য সুপারিশ করেছিলেন এবং সিআইএর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে তার কাজের প্রশংসা করেছিলেন। এমনকি রাশ যে সরকারি সংশ্লিষ্ট একটি আবাসনে থাকতেন, সেখানে দুজনকে একসঙ্গে দেখা যাওয়ার ভিডিও থাকার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে স্টিফেন ফেইনবার্গের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি। পেন্টাগনও তার সঙ্গে রাশের ঘনিষ্ঠ পেশাগত সম্পর্কের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য অস্বীকার করেছে। প্রতিরক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে এসব প্রতিবেদনকে ‘মিথ্যা ও অতিরঞ্জিত’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
ফলে ডেভিড রাশের মামলাটি এখন শুধু একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিপুল সরকারি সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ যাচাই, গোপন অভিযান পরিচালনার নামে সরকারি সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নজরদারি নিয়ে প্রশ্নও।
সম্ভাব্য দোষ স্বীকার চুক্তি হলে রাশের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিচার নাও হতে পারে। একই সঙ্গে মামলার যেসব অংশ গোপনীয় গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলোর বড় অংশও জনসমক্ষে প্রকাশের প্রয়োজন নাও হতে পারে। এখন নজর রয়েছে ৮ অক্টোবরের মধ্যে প্রসিকিউটর ও রাশের আইনজীবীরা চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন কি না এবং শেষ পর্যন্ত রাশের বিরুদ্ধে কী ধরনের অভিযোগ আনা হয় তার ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















