রাশিয়ার অব্যাহত বিমান হামলায় ইউক্রেনের অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি সামনে একটি কঠিন শীতের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। একই সময়ে যুদ্ধের ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং সরকারি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে পড়ায় ইউক্রেনের বাজেট সংকটও আরও গভীর হচ্ছে।
ইউক্রেনের অর্থমন্ত্রী ওলেকসান্দর ক্রাভচেঙ্কো জানিয়েছেন, চলতি বছরে রুশ বিমান হামলায় দেশটির অবকাঠামো ও স্থায়ী সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর পাশাপাশি হামলা এবং কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলোর কার্যত অবরোধের কারণে ইউক্রেনের অর্থনীতিতে মোট ক্ষতির প্রভাব মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কিয়েভে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে বিনিয়োগকারী, কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের উদ্দেশে ক্রাভচেঙ্কো বলেন, ইউক্রেনের জন্য সামনে অত্যন্ত কঠিন একটি শীত অপেক্ষা করছে। একদিকে রুশ হামলায় প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও চাপের মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের সীমিত বাজেট ও আর্থিক সক্ষমতা।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাড়ে চার বছরেরও বেশি সময় পর সামনের সারিতে লড়াই অনেকটা স্থবির হয়ে পড়লেও দুই দেশ এখন একে অপরের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল করতে সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা জোরদার করেছে।
গত দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে রাশিয়া প্রায় নিয়মিতভাবে কিয়েভে দ্রুতগতির জেটচালিত ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়ে আসছে। এসব হামলায় রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পাশাপাশি ব্যবসা ও সরকারি কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। তবে বিমান হামলায় বেসামরিক নাগরিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ উভয় পক্ষই অস্বীকার করে আসছে।
ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে বিমান হামলা বাড়ানোর ফলে দেশটির কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলোও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বলে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন। দেশটির প্রধান রপ্তানি পণ্য কৃষিপণ্য এবং লোহা ও ইস্পাত। এসব পণ্য মূলত কৃষ্ণসাগরের বন্দর ব্যবহার করেই বিদেশে পাঠানো হয়।
ক্রাভচেঙ্কোর হিসাব অনুযায়ী, বন্দর অবরোধের কারণে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ফলে যুদ্ধের সামরিক ক্ষতির পাশাপাশি বাণিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি
রুশ হামলায় অবকাঠামো ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ সরকারি রাজস্বও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কমে যাচ্ছে।
ইউক্রেনের পার্লামেন্টের বাজেট কমিটির প্রধান রক্সোলানা পিদলাসা জানিয়েছেন, বছরের প্রথম আট মাসে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার কম এসেছে। এর প্রায় এক-চতুর্থাংশ ঘাটতি শুধু আগস্ট মাসেই তৈরি হয়েছে।
তার ভাষায়, যুদ্ধের ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে ইউক্রেন আগের মতো শুধু নিজস্ব সম্পদ দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের পুরোটা বহন করতে পারছে না।
চলতি বছরের প্রথম আট মাসে সামরিক সহায়তা হিসেবে পাওয়া সরঞ্জাম ও অন্যান্য সহায়তার হিসাব বাদ দিয়েই ইউক্রেন প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে। বিপরীতে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব এবং স্থানীয়ভাবে ঋণ নেওয়ার মাধ্যমে একই সময়ে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
অর্থাৎ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের তুলনায় নিজস্ব অর্থের জোগানে ইতোমধ্যেই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, এই ব্যবধান আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
প্রতিদিনের যুদ্ধব্যয় ১৯ কোটি ডলার
যুদ্ধ পরিচালনার দৈনিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পিদলাসার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ইউক্রেনের যুদ্ধের দৈনিক ব্যয় প্রায় ১৯ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে এই ব্যয় ছিল দৈনিক প্রায় ১৪ কোটি ডলার।
মূল্যস্ফীতি, সেনাসংখ্যা বৃদ্ধি, নিহত সেনাদের পরিবারের জন্য বাড়তি সামাজিক সহায়তা এবং গোলাবারুদের ব্যবহার বেড়ে যাওয়াকে যুদ্ধের ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা খাতে আরও অর্থের প্রয়োজন হবে। সরকার এখন সামরিক খাতের বাইরে অন্যান্য বাজেট ব্যয় কমানো বা কিছু ব্যয় পরবর্তী সময়ের জন্য স্থগিত করার উপায় খুঁজছে।
একই সঙ্গে পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে আরও আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে কিয়েভ। তবে এখন পর্যন্ত চলতি বছরের অতিরিক্ত অর্থের ঘাটতি দ্রুত পূরণ করার কোনো সুস্পষ্ট ও তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে ইউক্রেনের সামনে এখন একই সঙ্গে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—রুশ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও জ্বালানি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে শীত মোকাবিলা করা এবং ক্রমবর্ধমান যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এই অর্থনৈতিক চাপ দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















