ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। এর একদিন আগে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশমুখের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মায়ুন দ্বীপ দখল করে। একই সময়ে ইয়েমেনের উপকূলীয় শহর মোকাও হুথিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ড্রোন হামলার পর নিরাপত্তার স্বার্থে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, হামলায় ব্যবহৃত কয়েকটি ড্রোন ইরাক থেকে এসেছিল। তবে তাৎক্ষণিক পাল্টা হামলা না চালিয়ে ইরাক সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে রিয়াদ। ইরাকও হামলার নিন্দা করে তদন্তের ঘোষণা দিয়েছে।
লোহিত সাগরে হুথিদের নতুন অগ্রগতি
হুথিদের মায়ুন দ্বীপ দখল বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বাব এল-মান্দেব প্রণালির ভেতরে অবস্থিত আগ্নেয় দ্বীপটি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের এক কর্মকর্তা এবং হুথিদের একজন প্রতিনিধি দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
![]()
হুথিরা বৃহস্পতিবার বাব এল-মান্দেব থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বন্দরনগরী মোকাও দখল করে। পরে হুথি-মাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, সৌদি বাহিনী মোকা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালায়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমেছে
১৯৮০-এর দশকে নির্মিত ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন সৌদি আরবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প তেল পরিবহন ব্যবস্থা। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনা বাড়ায় সৌদি আরব লোহিত সাগরপথে তেল পরিবহনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জুনের শুরু নাগাদ পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে সৌদি তেল রপ্তানি দৈনিক ৫০ লাখ ব্যারেলের বেশি হয়েছিল, যা আগের মাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি।
তবে হুথিদের হামলা ও হুমকিতে বাব এল-মান্দেব দিয়ে নৌ চলাচল প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ দিকে নির্দিষ্ট জাহাজে হুথিদের হামলা শুরুর পর থেকেই এই পতন দেখা যায়।
ইরানের আহ্বান, আলোচনায় ফিরুক সৌদি-হুথি
শুক্রবার ইরান সৌদি আরবকে হুথি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের অঞ্চলগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও হুথিদের আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ডের এক মুখপাত্র বুধবার ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যেকোনো চুক্তিতে ইয়েমেনের বিষয়ও থাকা উচিত। অন্যদিকে সৌদি আরব বলেছে, তারা সংলাপের সুযোগ দিয়ে আসছে, তবে আত্মরক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে।
নতুন সংঘাতে মানবিক সংকট বাড়ার আশঙ্কা
লোহিত সাগরের উপকূলে হুথিদের অগ্রযাত্রা ২০২২ সাল থেকে চলা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং পরের বছর সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে।
সাম্প্রতিক এক সপ্তাহেই ৪৬ হাজারের বেশি মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা। চিকিৎসাকর্মীরাও পালাতে বাধ্য হয়েছেন। মোকা শহরের হাসপাতাল চালু রাখার চেষ্টা করছে চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স।
বিশ্ববাজারেও উদ্বেগ বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে অপরিশোধিত তেলের দাম আবার ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। হুথিদের অনিশ্চিত পদক্ষেপ, লোহিত সাগরের নৌপথে ঝুঁকি এবং সৌদি তেল পরিবহনের বিকল্প পথ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















