ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী শনিবার গভীর রাতে ইরানের রাজধানী তেহরানে একাধিক জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালায়। এতে বিশাল অগ্নিগোলক ও ধোঁয়ার স্তম্ভ আকাশে উঠে যায় এবং তেহরান ও পাশের শহর কারাজ জুড়ে তীব্র বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা।
হামলার নতুন লক্ষ্য জ্বালানি অবকাঠামো
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও বিভিন্ন সূত্র যাচাই করে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত সপ্তাহে ইরানের ওপর যৌথ হামলা শুরু করার পর এই প্রথমবারের মতো সরাসরি জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে।
এর আগে হামলাগুলো মূলত ইরানের নেতৃত্ব, নিরাপত্তা সংস্থা, পুলিশ স্থাপনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও উৎক্ষেপণ সক্ষমতাকে দুর্বল করার দিকে কেন্দ্রীভূত ছিল। পাশাপাশি ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা নষ্ট করার লক্ষ্যও ছিল এসব হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য।

ঘনবসতিপূর্ণ তেহরানে ব্যাপক ক্ষতি
প্রায় এক কোটি মানুষের বাস তেহরানে। শহরটির অনেক এলাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক স্থাপনা পাশাপাশি অবস্থান করছে। ফলে লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পাশাপাশি আশপাশের এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
ইরানের গণমাধ্যম ও স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় বহু আবাসিক বাড়ি, দোকানপাট, সড়ক, পানির পাইপলাইন, এমনকি কয়েকটি হাসপাতাল ও বিদ্যালয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব স্থাপনার অনেকগুলোই হামলার লক্ষ্যবস্তু এলাকার কাছাকাছি ছিল।
তেহরান ও আলবরজে তেলের ডিপোতে আঘাত
ইরানের তেল মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, তেহরান ও আলবরজ প্রদেশে একাধিক তেল সংরক্ষণাগার হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীও বিবৃতিতে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানায়, তেহরানের কয়েকটি জ্বালানি সংরক্ষণ ও শক্তি স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে। তাদের দাবি, এসব স্থাপনা ইরানের সশস্ত্র বাহিনী ব্যবহার করছিল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ভাষায় এটি ছিল সরকারের সামরিক অবকাঠামো ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ হামলা।

তেলের ডিপোর পাশে বিশাল আগুন
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তেহরানের দক্ষিণের শাহর রেই এলাকায় একটি তেল সংরক্ষণাগারের পাশে শহরের প্রধান তেল শোধনাগার অবস্থিত। ওই এলাকায় হামলার পর আকাশে বিশাল আগুনের শিখা ও ধোঁয়ার স্তম্ভ উঠতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও সেই দৃশ্য স্পষ্ট দেখা গেছে।
একই রাতে বিমানবন্দরেও হামলা
শনিবার রাতের বিস্ফোরণের আগে ওই দিন সকালে ইসরায়েল তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরেও হামলা চালায়। এটি ইরানের সবচেয়ে ব্যস্ত অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর।
ইসরায়েলের দাবি, ওই বিমানবন্দরের রানওয়েতে রাখা কিছু বিমান লক্ষ্য করে হামলা করা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ, এসব বিমান ব্যবহার করে ইরান অঞ্চলজুড়ে তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে অর্থ ও অস্ত্র পাঠাত।

বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে শহর
বিমানবন্দর ও জ্বালানি ডিপোর বিস্ফোরণের শব্দ কয়েক মাইল দূরের এলাকাতেও শোনা যায় বলে বাসিন্দারা জানিয়েছেন। বিস্ফোরণের পর অনেক এলাকায় ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে এবং আকাশ ধোঁয়ায় ঢেকে যায়।
তেহরানের একজন ব্যবসায়ী আমির জানান, তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে শহর ছেড়ে গ্রামাঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছেন। পাহাড়ের কাছাকাছি অবস্থান থেকে তারা একটি তেল ডিপোর বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান।
তিনি বলেন, এখন এমন পরিস্থিতি হয়েছে যে কোথাও নিজেকে নিরাপদ মনে হয় না। শহরে ঢোকা বা বের হওয়ার সড়কগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে, কারণ আশপাশের লক্ষ্যবস্তু এলাকায় বারবার হামলা হচ্ছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় আগুন
উত্তর তেহরানের উপকণ্ঠে একটি মহাসড়ক থেকে ধারণ করা ভিডিওতে আরেকটি তেল সংরক্ষণাগারে বিশাল আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। এই সড়কটি অভিজাত উপশহর লাভাসানের দিকে গেছে।
উত্তর-পশ্চিম তেহরানের শাহরান তেল ডিপোতেও আবার হামলা হয়েছে। এই ডিপোটি গত বছরের জুনেও ইসরায়েলের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। নতুন হামলার পর সেখান থেকেও আকাশে ঘন কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়।

কারাজেও হামলার খবর
ইরানের তেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেহরানের পশ্চিমে অবস্থিত কারাজ শহরের একটি জ্বালানি ডিপোতেও হামলা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অগ্নিনির্বাপণ ও জরুরি সেবা কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। একই সঙ্গে তারা আশ্বাস দিয়েছে যে প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া থাকায় জ্বালানি বা শক্তির কোনো ঘাটতি তৈরি হবে না।
ইরানের পাল্টা হামলার ঘোষণা
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলার জবাবে তারা নতুন করে ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ শুরু করেছে।
ভয়ে ঘুম হারাম তেহরানবাসীর
তেহরানের ৩৬ বছর বয়সী এক দন্ত চিকিৎসক শিরিন জানান, তিনি ও তার পরিবার শহর ছেড়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে হামলার তীব্রতা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে।
তিনি বলেন, আমরা ভীষণ আতঙ্কে আছি। রাতে ঘুমাতে পারছি না। আমি শুধু চাই যুদ্ধটা যত দ্রুত সম্ভব শেষ হয়ে যাক।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















