০১:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
ফরিদপুরে রেললাইনে প্রাণ গেল যমজ শিশুর, ক্রোধে রেলপথ অবরোধ করলেন বাসিন্দারা ট্রাম্পের দাবি ‘লক্ষ্য প্রায় পূরণ’, তেহরানের পাল্টা জবাব: ইরান যুদ্ধের ৩৩তম দিনে কী হচ্ছে  ইরান যুদ্ধের আঁচ বাংলাদেশে: সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন ধ্বংসাবশেষে বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত ইরান যুদ্ধকে জ্বালানি যুদ্ধে পরিনত করতে সমর্থ হয়েছে দুবাইয়ে মাত্র ২৫ হাজার টাকায় ছোট ঘরে জীবন: নেটিজেনদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া চীনের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান-আফগানিস্তান নতুন শান্তি আলোচনা, যুদ্ধবিরতি ও সীমান্ত খুলতে জোর চেষ্টা জন্মসূত্রে নাগরিকত্বে ট্রাম্পের বিধিনিষেধে সুপ্রিম কোর্টের সংশয়, শুনানিতে তীব্র প্রশ্নবাণ স্পেসএক্স আইপিও ঝড়: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজারে নামতে যাচ্ছে মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য ইরান যুদ্ধ থামাতে সক্রিয় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, পাকিস্তান হয়ে গোপন বার্তা আদান-প্রদান ন্যাটো ছাড়ার হুমকি ট্রাম্পের: আইনি জটিলতায় কি সত্যিই বের হতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র?

ইরান যুদ্ধকে জ্বালানি যুদ্ধে পরিনত করতে সমর্থ হয়েছে

  • স্বদেশ রায়
  • ১১:৪৮:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬
  • 76

আমেরিকা ও ইরান যুদ্ধ অসম সামরিক শক্তির লড়াই। এই অসম দুই সামরিক শক্তির যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা এ মুহূর্তে কেউ বলতে পারছে না। যুদ্ধ যে অন্ধকার টানেলে ঢুকে গেছে তার শেষ প্রান্ত কেউ দেখতে পাচ্ছে না।

আমেরিকার সামরিক শক্তি ও এ আই
আমেরিকার সামরিক শক্তি অসীম ও অপ্রকাশ্য। তাই কী বিপুল সামরিক শক্তি তার আছে তার সঠিক হিসাব কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তাছাড়া এটা পৃথিবীর সর্বোচ্চ গোপনীয় বিষয়গুলোর একটি।

তবে ভেনেজুয়েলার অপারেশন রিজলভডের মাধ্যমে আমেরিকা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে এখনও এআই নির্ভর সামরিক শক্তিতে তার সমকক্ষ কেউ নয়। অন্যদিকে আমেরিকা ইরান আক্রমণ করার পরপরই বেশ কয়েকজন চাইনিজ সামরিক বিশেষজ্ঞ সে দেশের সরকার পরিচালিত মিডিয়ায় বলেছেন, আমেরিকা যে এআই দিয়ে যুদ্ধ করছে এটা তারা নিশ্চিত। আর চীনের বিশেষজ্ঞরাই বিষয়টি সব থেকে ভালো বুঝবেন—কারণ, ভেনেজুয়েলাতে তাদের এআই নির্ভর সিস্টেম শতভাগ নষ্ট করতে সমর্থ হয় আমেরিকা মুহূর্তের মধ্যে বলে অনেকের ধারনা।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল-খার্গ দ্বীপ দখলে নিতে সক্ষম : ট্রাম্প

অন্যদিকে আমেরিকা ও ইরান পাশাপাশি দেশ নয়। এবং ইরানের উদ্দেশ্য নয় আমেরিকা জয় করা। তাই আমেরিকার ভৌগলিক শক্তি এই যুদ্ধে আমেরিকার সামরিক শক্তির সঙ্গে যোগ হবে না।

ইরানের ভৌগলিক শক্তি
ইরান আক্রান্ত। এবং ইরানকে জয় করতে চাচ্ছে আমেরিকা। তাই ইরানের সামরিক শক্তির সঙ্গে যোগ হবে তার ভৌগলিক শক্তি বা ভৌগলিক গঠনের শক্তি। পৃথিবীর কয়েক হাজার বছরের যুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করে নানান যুদ্ধ বিশ্লেষকরা বলেছেন, কোনো আগ্রাসী যুদ্ধের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে সবথেকে প্রাকৃতিকভাবে ভৌগলিক শক্তিতে সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ আফগানিস্তান ও ইরান।

ইরানের ভৌগলিক শক্তির মধ্যে রয়েছে তার তিন পাশ জুড়ে জাগ্রোস ও এলবুর্জের মতো পর্বতমালা। অন্যদিকে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর সংযোগ শাত আল-আরব ওয়াটারওয়ে ইরাক ইরান সীমান্তে। এছাড়া মরুভূমি দাশ্ত-এ-কাভির বা সল্ট ডেজার্টও তার আরেকটি ভৌগলিক শক্তি। তাই আফগানিস্তানের মতো ইরানও ন্যাচারাল ফোর্টের (প্রাকৃতিক দুর্গ) অধিকারী দেশ। এছাড়া যে কোনো দেশের আয়তনও তার ভৌগলিক শক্তির একটি বড় বিষয়। ইরানের আয়তনও ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স এই তিন দেশের মিলিত আয়তনের সমান। তাই আয়তনের শক্তিতেও ইরান কম শক্তিশালী নয়।

Iran is defended by this geography, with mountains on three sides,  swampland and water on the fourth. The Mongols were the last force to make  any progress through the territory in 1219-21

অন্যদিকে নিজেকে রক্ষা করা ছাড়া বিশ্বকে নাড়া দেওয়ার মতো ভিন্ন কিছু ভৌগলিক শক্তির অধিকারী যে ইরান, তা ইতোমধ্যে দেখা গেছে। তা হলো ইরানের অধীনে থাকা হরমুজ প্রণালী। যা নিয়ে বিস্তারিত কিছু লেখার দরকার নেই। গোটা বিশ্ব ইতোমধ্যে তার ধাক্কা সহ্য করতে শুরু করেছে। এছাড়া রেড সিতে বাব এল-মান্দেব প্রণালীও ইরানের সহযোগী ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের দখলে। যা প্রায় হরমুজের মতোই ইরানের এ যুদ্ধে আরেকটি বাড়তি সহযোগী ভৌগলিক শক্তি।

ইরানের ভৌগলিক শক্তির বাইরে সামরিক শক্তি ও এ আই
আমেরিকার তুলনায় ইরানের সামরিক শক্তি যে অনেক কম তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তারপরেও ইরানের সামরিক শক্তি কতটুকু তাও সকলের অজানা। এমনকি পৃথিবীর অনেক অসমর্থিত সূত্র থেকে জানা যায়, ইরানের সামরিক শক্তির একটা অংশ আমেরিকা বা অনেক বড় শক্তি তাদের স্যাটেলাইট বা অন্যান্য পরিমাপক যন্ত্রেও ধরা সম্পূর্ণরূপে সম্ভব নয়। কারণ, ইরানের বর্তমান ক্ষমতাসীনরা শুরু থেকেই জানে আমেরিকা তাদের আক্রমণ করবে—এ কারণে তারা দীর্ঘ প্রচেষ্টার ভেতর দিয়ে পাহাড়ের মধ্যস্থল কেটে সেখানে অস্ত্রাগারসহ হয়তো সুরক্ষিত স্থানও তৈরি করে রেখেছে—আত্মরক্ষা, যুদ্ধ করা ও যুদ্ধাস্ত্র সংরক্ষণের জন্য। এর অনেকগুলোই অজানা থাকা সম্ভব।

এছাড়া আমেরিকার মতো ইরানও গত এক মাস এআই-এর সহযোগিতায় যুদ্ধ করছে এমনটা অনেক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ মনে করছেন। তার প্রমান হিসেবে আনছেন তাদের সিলেকটিভ নিখুঁত নিশানা নির্ভর আক্রমণ। একটি ভিন্নমত রয়েছে—ইরানকে তথ্য দিয়ে অন্য কোনো বড় রাষ্ট্র সহায়তা করছে। হয়তো হতে পারে। তবে নিজস্ব প্রযুক্তি নির্ভরতা ছাড়া তথ্য প্রযুক্তিকে এতটা নিখুঁত বিশ্লেষণ করা যায় না।

ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ে ইরানের ড্রোন হামলা

ইরানের সামরিক শক্তিতে এআই যোগ হওয়া
ইরানের সামরিক শক্তিতে নিজস্ব তথ্য প্রযুক্তিসহ এআই যোগ করার সক্ষমতা থাকার আরো একটি  হিসেবে সামনে আসছে, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরানে ইসরায়েলি হামলার অন্যতম একটি লক্ষ্য ছিল ইরানের বিজ্ঞানী। তাদের একাধিক বিজ্ঞানীকে ইসরায়েল হত্যা করেছে। তাছাড়া যারা ইরান সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন, তারা সকলে জানেন, ইরান তার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ধর্মকে যোগ করেছে ঠিকই। তবে তারা রাষ্ট্রের বিজ্ঞান গবেষণাকে বাদ দেয়নি, ব্যয় কমায়নি বরং বাড়িয়েছে।

এছাড়া অনেক দেশে যেমন ধর্মভিত্তিক দল বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে মিথ ও বিজ্ঞানকে এক করে ফেলে—ইরান সেটা করেনি। তাই ছোট হলেও ইরানের নিজস্ব বিজ্ঞানভিত্তিক সামরিক শক্তি রয়েছে।

স্টাডি নির্ভর যুদ্ধ
ইরান ও আমেরিকার এই যুদ্ধ শুরু থেকেই লক্ষ্য করলে বোঝা যাচ্ছে, আমেরিকাকে মোকাবিলা করার জন্য ইরান যথেষ্ট স্টাডি করেছে। এবং তারা কয়েক স্তরে ভাগ করেছে তাদের পরিকল্পনা। এর বিপরীতে আমেরিকা যে কয়েক ধাপে তাদের যুদ্ধ এগিয়ে নেবে সে পরিকল্পনা আমেরিকার আছে তা বোঝা যাচ্ছে। তবে দুই শক্তির পরিকল্পনা সম্পূর্ণ দুই ধরনের।

প্যারাস্যুটে ইরানে নামতে পারে ২ হাজার মার্কিন সেনা

কনভেনশনাল যুদ্ধের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ইরানের
ইরান আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিডল ইস্টের আমেরিকার বন্ধু রাষ্ট্র ও তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর তেলসম্পদকে প্রধান লক্ষ্য করেছে ইরান। অর্থাৎ আমেরিকা যেমন ইরানের রেজিম চেঞ্জের লক্ষ্যে যুদ্ধ শুরু করে—ইরানও তার প্রতি উত্তর দেয় যুদ্ধকে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্য ও উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পথ নিয়ে। ইরান যে যুদ্ধকে এভাবে কনভেনশনাল যুদ্ধের বাইরে নিয়ে যাবে, এই স্টাডি আমেরিকার ছিল বলে এখনও কোনো প্রমাণ মিলছে না। যার ফলে ইরান যুদ্ধ কনভেনশনাল যুদ্ধ, রেজিম চেঞ্জ বা দেশ দখলের যুদ্ধের থেকে জ্বালানি বাণিজ্যের যুদ্ধের চরিত্র নিয়ে নিয়েছে। জ্বালানিকে অস্ত্র করে এত বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির যুদ্ধ এর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় না। অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকে ১৯৭৩ সালের জ্বালানি যুদ্ধের থেকেও এটা বড়। আর অতীতে ফসিল নির্ভর জ্বালানি এতটা প্রয়োজনীয়ও ছিল না। এখন ফসিল নির্ভর জ্বালানি ছাড়া পৃথিবী অচল। তাই এ যুদ্ধের তীব্রতাও অনেক বেশি।

ইরানের রেজিম চেঞ্জ
ট্রাম্প দাবি করেছেন তিনি ইরানের রেজিম চেঞ্জ করতে সফল হয়েছেন। আমেরিকার সফলতার ফলে হোক বা যুদ্ধের গতি-প্রকৃতির পথ ধরে হোক—ইরানে এক ধরনের রেজিম চেঞ্জ ঘটে গেছে। বাস্তবে গত এক মাসের যুদ্ধের ফলে ইরানের সিভিলিয়ান নেতাদের হাত থেকে মূলত ক্ষমতা চলে গেছে ইরানের সব থেকে শক্তিশালী সামরিক শক্তি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের হাতে। এই ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের তৎকালীন কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জাফারি ২০১৮ সালে বলেছিলেন, “আমরা শত্রুকে বুঝিয়ে দেব—হরমুজ প্রণালী হয় সবাই ব্যবহার করবে, না হয় কেউই করবে না।” এখন ইরানের ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে এই ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড। এবং তারা হরমুজ নিয়ে সে পথই নিয়েছে। তাই ট্রাম্পের যুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপ হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা।

পাকিস্তানকে ব্যবহার ও হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধ
ট্রাম্প গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে ইরানকে আল্টিমেটাম দিচ্ছে। অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ নিষ্পত্তির জন্য পাকিস্তানকে দিয়ে দূতালি করাচ্ছে। ট্রাম্প ও পাকিস্তান যখন এ কথা বলে তখনই টিম মার্শাল লিখেছিলেন, ‘ইউএসএস ট্রিপলি নামে একটি উভচর আক্রমণে সক্ষম সামরিক জাহাজ ইরানের পথে রয়েছে। যা এক সপ্তাহের মধ্যে খার্গ দ্বীপ আক্রমণের জন্য পৌঁছাতে পারে।’ সে সময় পার হয়ে গেছে। এবং আমেরিকার প্যারাট্রুপারসহ জলে ও স্থলে আক্রমণ করার সামরিক জাহাজও পৌঁছে গেছে। তাই স্বাভাবিক এখন পাকিস্তানের দূতালি প্রশ্নের মুখে। মূল উদ্দেশ্য যুদ্ধ বন্ধ করা না আমেরিকাকে যুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপের জন্য সৈন্য ও জাহাজ আনার সময় সৃষ্টি করে দেওয়া।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা ইরানের, তেলের বাজারে অস্থিরতা | The Daily Campus

যুদ্ধ দ্বিতীয় ধাপে
তাই এখন যদি যুদ্ধ দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করে, তখন আমেরিকা শুধু হরমুজ প্রণালী মুক্ত করবে না, খার্গ দ্বীপও দখল করবে—সেটাও বড় প্রশ্ন। আমেরিকা অনেক বড় শক্তি, কিন্তু এই দুই কাজ খুব সহজ নয়। হরমুজ প্রণালীতে ইরানি মাইন, সুইসাইড স্কোয়াড, খার্গ দ্বীপের পাশে কেশম দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের নিচে ইরানের তৈরি মিসাইল সিটি, তাছাড়া সেখানে ইরানি বাহিনীর নিয়মিত ঝাঁকে ঝাঁকে আসা মিসাইল কীভাবে প্রতিহত করতে হবে তার ট্রেনিং, আবার তার সঙ্গে যোগ হওয়া নতুন ড্রোন, আর সর্বোপরি এলবুর্জ পাহাড়ের প্রায় ৩ হাজার মিটার খাড়া পাশ—যা প্রতিরোধ যুদ্ধে ইরানের প্রাকৃতিক শক্তি।

তাই হরমুজ মুক্ত ও খার্গ দ্বীপ দখল করতে হলে ইরানের মূল ভূখণ্ডে ইরানকে পরাজিত না করে করা প্রায় অসম্ভব কাজ। আর তখনই প্রশ্ন আসবে মূল ভূখণ্ডে ইরানকে পরাজিত করা কি সম্ভব হবে? ইরানের ভৌগলিক শক্তি কি সে কাজ সহজে হতে দেবে? বরং তা যুদ্ধকে দীর্ঘ সময়ে ঠেলে দেবে। এমনকি রাজধানীতে যদি কখনও ইরানের সরকারের পরাজয় ঘটে, তাতেও কি যুদ্ধ থামবে?

আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান সীমান্ত
রাজধানীতে পরাজিত হলেও ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের অবশিষ্ট অংশ ও ইরানি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ পরাজয় মেনে নেবে না কখনই। তখন তাদের জন্য বিশাল দেশের ভেতর যেমন অনেক স্থান আছে গেরিলা যুদ্ধের জন্য, তেমনি সব থেকে বড় ন্যাচারাল ফোর্ট হলো তুর্কমেনিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে পাহাড় বক্রাকারে যে ন্যাচারাল বুহ্য তৈরি করে রেখেছে সেটা। তারা সেখানে সরে গিয়ে যুদ্ধ আরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী করবে।

২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫ ভাগ বাস করে আরব বিশ্বে। অথচ পৃথিবীর ৪৫% টেররিস্ট আক্রমণ তাদের মধ্য থেকেই ঘটে। তাই ইরানের যুদ্ধ গেরিলা যুদ্ধে রূপ নিলে—এক মাসের জ্বালানি সংকটে পৃথিবীর যে রূপ হয়েছে—তার সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধের প্রয়োজনে ইরানের প্রশিক্ষিত যোদ্ধারা টেররিজমের পথ নিলে পৃথিবীর রূপ কী দাঁড়াবে?

যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা কী আসন্ন

এক মাসের যুদ্ধে বিপর্যস্ত অর্থনীতি
গালফ নিউজের ১ এপ্রিলের সংবাদ অনুযায়ী ২৮ মার্চ পর্যন্ত এক মাসের যুদ্ধে আরব ওয়ার্ল্ডে ১৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। চাকরি হারিয়েছেন ৩.৯ মিলিয়ন মানুষ। ৩১ মার্চের খালিজ টাইমসের একাধিক রিপোর্টে ফুটে উঠেছে যুদ্ধের ফলে আবুধাবিসহ ওই এলাকার শিশুদের শিক্ষাজীবন, সাধারণ মানুষের চলাফেরা থেকে সে দেশ যারা ছাড়ছে তাদের পশুপাখিদের কষ্ট পর্যন্ত।

এর পাশাপাশি জাপান টাইমস, নিক্কেই এশিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার স্ট্রেইট টাইমসসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় মিডিয়াগুলো জানাচ্ছে, সিঙ্গাপুরও জ্বালানি সংকটে ভুগছে, থাইল্যান্ড লাওস ছাড়া অন্য সবার কাছে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েও জ্বালানি সংকটে পড়ছে। ফিলিপাইন জ্বালানি এমার্জেন্সি জারি করেছে। ইন্দোনেশিয়ার পাম বন থেকে জাপান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া—সকলেই সব ধরনের কৃষিতে সার সংকটে ভুগছে।

এই জ্বালানি ও সার সংকটে বাদ যাচ্ছে না দক্ষিণ এশিয়াও। দক্ষিণ এশিয়ার সব থেকে বড় দেশ ভারতে জ্বালানি অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছু সার ও সিরামিক কারখানা। সেখানকার রান্নার জ্বালানি জোগাড়ের দীর্ঘ লাইন বিশ্ব মিডিয়ার নিত্যদিনের খাদ্য। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের নিউজে জানা যাচ্ছে, ভোপালে রান্নার গ্যাস না পাওয়াতে কাঠের চাহিদা বেড়ে গেছে—যার ফলে বাঘ ও পুলিশের ভয়কে উপেক্ষা করে জঙ্গলে কাঠ জোগাড়ে যাচ্ছে মানুষ। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা জ্বালানি বাঁচাতে সপ্তাহের কাজের দিন পাঁচ থেকে চার দিনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ সার কারখানা বন্ধ করে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেল রেশনিং করে শহরকে সচল রেখেছে, তবে এর পরোক্ষ প্রভাব কৃষি, শিল্প, ব্যবসা—সবখানে পড়তে শুরু করেছে।

কোভিড পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকটের থেকে বড় সংকট শুরু
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ৪ মার্চে একটি লেখায় লিখেছিলাম, ইরান যুদ্ধ পরবর্তী অর্থনীতি কোভিড পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকটের থেকেও বড় সংকট হতে পারে। গত এক মাসের যুদ্ধ পৃথিবীর অর্থনীতিকে কোভিডের থেকেও বড় সংকটে নিয়ে গেছে। এই এক মাসের ক্ষতি আগামী তিন বছরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়, তারপরেও যুদ্ধ দীর্ঘ হতে যাচ্ছে।

তাই জ্বালানি আমদানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য তো অর্থনীতি রেড লাইন ক্রস করে যাচ্ছে। অন্যদিকে চীনও জ্বালানি থেকে রেয়ার আর্থ বিক্রি ও ব্যবহারের ধারা বদলে দিচ্ছে। জাপান বাজেটের ধরন বদল করতে যাচ্ছে। এমনকি ভারতের তৈরি অ্যাপল স্মার্টফোনেরও বিক্রি নেমে গেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির উপর থেকে নিচে সব স্তরেই চরম ধাক্কা লেগেছে।

লেখকঃ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.

জনপ্রিয় সংবাদ

ফরিদপুরে রেললাইনে প্রাণ গেল যমজ শিশুর, ক্রোধে রেলপথ অবরোধ করলেন বাসিন্দারা

ইরান যুদ্ধকে জ্বালানি যুদ্ধে পরিনত করতে সমর্থ হয়েছে

১১:৪৮:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল ২০২৬

আমেরিকা ও ইরান যুদ্ধ অসম সামরিক শক্তির লড়াই। এই অসম দুই সামরিক শক্তির যুদ্ধ কবে শেষ হবে তা এ মুহূর্তে কেউ বলতে পারছে না। যুদ্ধ যে অন্ধকার টানেলে ঢুকে গেছে তার শেষ প্রান্ত কেউ দেখতে পাচ্ছে না।

আমেরিকার সামরিক শক্তি ও এ আই
আমেরিকার সামরিক শক্তি অসীম ও অপ্রকাশ্য। তাই কী বিপুল সামরিক শক্তি তার আছে তার সঠিক হিসাব কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তাছাড়া এটা পৃথিবীর সর্বোচ্চ গোপনীয় বিষয়গুলোর একটি।

তবে ভেনেজুয়েলার অপারেশন রিজলভডের মাধ্যমে আমেরিকা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে এখনও এআই নির্ভর সামরিক শক্তিতে তার সমকক্ষ কেউ নয়। অন্যদিকে আমেরিকা ইরান আক্রমণ করার পরপরই বেশ কয়েকজন চাইনিজ সামরিক বিশেষজ্ঞ সে দেশের সরকার পরিচালিত মিডিয়ায় বলেছেন, আমেরিকা যে এআই দিয়ে যুদ্ধ করছে এটা তারা নিশ্চিত। আর চীনের বিশেষজ্ঞরাই বিষয়টি সব থেকে ভালো বুঝবেন—কারণ, ভেনেজুয়েলাতে তাদের এআই নির্ভর সিস্টেম শতভাগ নষ্ট করতে সমর্থ হয় আমেরিকা মুহূর্তের মধ্যে বলে অনেকের ধারনা।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল-খার্গ দ্বীপ দখলে নিতে সক্ষম : ট্রাম্প

অন্যদিকে আমেরিকা ও ইরান পাশাপাশি দেশ নয়। এবং ইরানের উদ্দেশ্য নয় আমেরিকা জয় করা। তাই আমেরিকার ভৌগলিক শক্তি এই যুদ্ধে আমেরিকার সামরিক শক্তির সঙ্গে যোগ হবে না।

ইরানের ভৌগলিক শক্তি
ইরান আক্রান্ত। এবং ইরানকে জয় করতে চাচ্ছে আমেরিকা। তাই ইরানের সামরিক শক্তির সঙ্গে যোগ হবে তার ভৌগলিক শক্তি বা ভৌগলিক গঠনের শক্তি। পৃথিবীর কয়েক হাজার বছরের যুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করে নানান যুদ্ধ বিশ্লেষকরা বলেছেন, কোনো আগ্রাসী যুদ্ধের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে সবথেকে প্রাকৃতিকভাবে ভৌগলিক শক্তিতে সুবিধাপ্রাপ্ত দেশ আফগানিস্তান ও ইরান।

ইরানের ভৌগলিক শক্তির মধ্যে রয়েছে তার তিন পাশ জুড়ে জাগ্রোস ও এলবুর্জের মতো পর্বতমালা। অন্যদিকে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর সংযোগ শাত আল-আরব ওয়াটারওয়ে ইরাক ইরান সীমান্তে। এছাড়া মরুভূমি দাশ্ত-এ-কাভির বা সল্ট ডেজার্টও তার আরেকটি ভৌগলিক শক্তি। তাই আফগানিস্তানের মতো ইরানও ন্যাচারাল ফোর্টের (প্রাকৃতিক দুর্গ) অধিকারী দেশ। এছাড়া যে কোনো দেশের আয়তনও তার ভৌগলিক শক্তির একটি বড় বিষয়। ইরানের আয়তনও ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স এই তিন দেশের মিলিত আয়তনের সমান। তাই আয়তনের শক্তিতেও ইরান কম শক্তিশালী নয়।

Iran is defended by this geography, with mountains on three sides,  swampland and water on the fourth. The Mongols were the last force to make  any progress through the territory in 1219-21

অন্যদিকে নিজেকে রক্ষা করা ছাড়া বিশ্বকে নাড়া দেওয়ার মতো ভিন্ন কিছু ভৌগলিক শক্তির অধিকারী যে ইরান, তা ইতোমধ্যে দেখা গেছে। তা হলো ইরানের অধীনে থাকা হরমুজ প্রণালী। যা নিয়ে বিস্তারিত কিছু লেখার দরকার নেই। গোটা বিশ্ব ইতোমধ্যে তার ধাক্কা সহ্য করতে শুরু করেছে। এছাড়া রেড সিতে বাব এল-মান্দেব প্রণালীও ইরানের সহযোগী ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের দখলে। যা প্রায় হরমুজের মতোই ইরানের এ যুদ্ধে আরেকটি বাড়তি সহযোগী ভৌগলিক শক্তি।

ইরানের ভৌগলিক শক্তির বাইরে সামরিক শক্তি ও এ আই
আমেরিকার তুলনায় ইরানের সামরিক শক্তি যে অনেক কম তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তারপরেও ইরানের সামরিক শক্তি কতটুকু তাও সকলের অজানা। এমনকি পৃথিবীর অনেক অসমর্থিত সূত্র থেকে জানা যায়, ইরানের সামরিক শক্তির একটা অংশ আমেরিকা বা অনেক বড় শক্তি তাদের স্যাটেলাইট বা অন্যান্য পরিমাপক যন্ত্রেও ধরা সম্পূর্ণরূপে সম্ভব নয়। কারণ, ইরানের বর্তমান ক্ষমতাসীনরা শুরু থেকেই জানে আমেরিকা তাদের আক্রমণ করবে—এ কারণে তারা দীর্ঘ প্রচেষ্টার ভেতর দিয়ে পাহাড়ের মধ্যস্থল কেটে সেখানে অস্ত্রাগারসহ হয়তো সুরক্ষিত স্থানও তৈরি করে রেখেছে—আত্মরক্ষা, যুদ্ধ করা ও যুদ্ধাস্ত্র সংরক্ষণের জন্য। এর অনেকগুলোই অজানা থাকা সম্ভব।

এছাড়া আমেরিকার মতো ইরানও গত এক মাস এআই-এর সহযোগিতায় যুদ্ধ করছে এমনটা অনেক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ মনে করছেন। তার প্রমান হিসেবে আনছেন তাদের সিলেকটিভ নিখুঁত নিশানা নির্ভর আক্রমণ। একটি ভিন্নমত রয়েছে—ইরানকে তথ্য দিয়ে অন্য কোনো বড় রাষ্ট্র সহায়তা করছে। হয়তো হতে পারে। তবে নিজস্ব প্রযুক্তি নির্ভরতা ছাড়া তথ্য প্রযুক্তিকে এতটা নিখুঁত বিশ্লেষণ করা যায় না।

ইসরায়েলের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ে ইরানের ড্রোন হামলা

ইরানের সামরিক শক্তিতে এআই যোগ হওয়া
ইরানের সামরিক শক্তিতে নিজস্ব তথ্য প্রযুক্তিসহ এআই যোগ করার সক্ষমতা থাকার আরো একটি  হিসেবে সামনে আসছে, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ইরানে ইসরায়েলি হামলার অন্যতম একটি লক্ষ্য ছিল ইরানের বিজ্ঞানী। তাদের একাধিক বিজ্ঞানীকে ইসরায়েল হত্যা করেছে। তাছাড়া যারা ইরান সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন, তারা সকলে জানেন, ইরান তার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ধর্মকে যোগ করেছে ঠিকই। তবে তারা রাষ্ট্রের বিজ্ঞান গবেষণাকে বাদ দেয়নি, ব্যয় কমায়নি বরং বাড়িয়েছে।

এছাড়া অনেক দেশে যেমন ধর্মভিত্তিক দল বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে মিথ ও বিজ্ঞানকে এক করে ফেলে—ইরান সেটা করেনি। তাই ছোট হলেও ইরানের নিজস্ব বিজ্ঞানভিত্তিক সামরিক শক্তি রয়েছে।

স্টাডি নির্ভর যুদ্ধ
ইরান ও আমেরিকার এই যুদ্ধ শুরু থেকেই লক্ষ্য করলে বোঝা যাচ্ছে, আমেরিকাকে মোকাবিলা করার জন্য ইরান যথেষ্ট স্টাডি করেছে। এবং তারা কয়েক স্তরে ভাগ করেছে তাদের পরিকল্পনা। এর বিপরীতে আমেরিকা যে কয়েক ধাপে তাদের যুদ্ধ এগিয়ে নেবে সে পরিকল্পনা আমেরিকার আছে তা বোঝা যাচ্ছে। তবে দুই শক্তির পরিকল্পনা সম্পূর্ণ দুই ধরনের।

প্যারাস্যুটে ইরানে নামতে পারে ২ হাজার মার্কিন সেনা

কনভেনশনাল যুদ্ধের বাইরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ইরানের
ইরান আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিডল ইস্টের আমেরিকার বন্ধু রাষ্ট্র ও তেলসমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোর তেলসম্পদকে প্রধান লক্ষ্য করেছে ইরান। অর্থাৎ আমেরিকা যেমন ইরানের রেজিম চেঞ্জের লক্ষ্যে যুদ্ধ শুরু করে—ইরানও তার প্রতি উত্তর দেয় যুদ্ধকে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্য ও উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পথ নিয়ে। ইরান যে যুদ্ধকে এভাবে কনভেনশনাল যুদ্ধের বাইরে নিয়ে যাবে, এই স্টাডি আমেরিকার ছিল বলে এখনও কোনো প্রমাণ মিলছে না। যার ফলে ইরান যুদ্ধ কনভেনশনাল যুদ্ধ, রেজিম চেঞ্জ বা দেশ দখলের যুদ্ধের থেকে জ্বালানি বাণিজ্যের যুদ্ধের চরিত্র নিয়ে নিয়েছে। জ্বালানিকে অস্ত্র করে এত বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির যুদ্ধ এর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায় না। অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকে ১৯৭৩ সালের জ্বালানি যুদ্ধের থেকেও এটা বড়। আর অতীতে ফসিল নির্ভর জ্বালানি এতটা প্রয়োজনীয়ও ছিল না। এখন ফসিল নির্ভর জ্বালানি ছাড়া পৃথিবী অচল। তাই এ যুদ্ধের তীব্রতাও অনেক বেশি।

ইরানের রেজিম চেঞ্জ
ট্রাম্প দাবি করেছেন তিনি ইরানের রেজিম চেঞ্জ করতে সফল হয়েছেন। আমেরিকার সফলতার ফলে হোক বা যুদ্ধের গতি-প্রকৃতির পথ ধরে হোক—ইরানে এক ধরনের রেজিম চেঞ্জ ঘটে গেছে। বাস্তবে গত এক মাসের যুদ্ধের ফলে ইরানের সিভিলিয়ান নেতাদের হাত থেকে মূলত ক্ষমতা চলে গেছে ইরানের সব থেকে শক্তিশালী সামরিক শক্তি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের হাতে। এই ইসলামিক বিপ্লবী গার্ডের তৎকালীন কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জাফারি ২০১৮ সালে বলেছিলেন, “আমরা শত্রুকে বুঝিয়ে দেব—হরমুজ প্রণালী হয় সবাই ব্যবহার করবে, না হয় কেউই করবে না।” এখন ইরানের ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে এই ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড। এবং তারা হরমুজ নিয়ে সে পথই নিয়েছে। তাই ট্রাম্পের যুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপ হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা।

পাকিস্তানকে ব্যবহার ও হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধ
ট্রাম্প গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে ইরানকে আল্টিমেটাম দিচ্ছে। অন্যদিকে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ নিষ্পত্তির জন্য পাকিস্তানকে দিয়ে দূতালি করাচ্ছে। ট্রাম্প ও পাকিস্তান যখন এ কথা বলে তখনই টিম মার্শাল লিখেছিলেন, ‘ইউএসএস ট্রিপলি নামে একটি উভচর আক্রমণে সক্ষম সামরিক জাহাজ ইরানের পথে রয়েছে। যা এক সপ্তাহের মধ্যে খার্গ দ্বীপ আক্রমণের জন্য পৌঁছাতে পারে।’ সে সময় পার হয়ে গেছে। এবং আমেরিকার প্যারাট্রুপারসহ জলে ও স্থলে আক্রমণ করার সামরিক জাহাজও পৌঁছে গেছে। তাই স্বাভাবিক এখন পাকিস্তানের দূতালি প্রশ্নের মুখে। মূল উদ্দেশ্য যুদ্ধ বন্ধ করা না আমেরিকাকে যুদ্ধের দ্বিতীয় ধাপের জন্য সৈন্য ও জাহাজ আনার সময় সৃষ্টি করে দেওয়া।

হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা ইরানের, তেলের বাজারে অস্থিরতা | The Daily Campus

যুদ্ধ দ্বিতীয় ধাপে
তাই এখন যদি যুদ্ধ দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করে, তখন আমেরিকা শুধু হরমুজ প্রণালী মুক্ত করবে না, খার্গ দ্বীপও দখল করবে—সেটাও বড় প্রশ্ন। আমেরিকা অনেক বড় শক্তি, কিন্তু এই দুই কাজ খুব সহজ নয়। হরমুজ প্রণালীতে ইরানি মাইন, সুইসাইড স্কোয়াড, খার্গ দ্বীপের পাশে কেশম দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের নিচে ইরানের তৈরি মিসাইল সিটি, তাছাড়া সেখানে ইরানি বাহিনীর নিয়মিত ঝাঁকে ঝাঁকে আসা মিসাইল কীভাবে প্রতিহত করতে হবে তার ট্রেনিং, আবার তার সঙ্গে যোগ হওয়া নতুন ড্রোন, আর সর্বোপরি এলবুর্জ পাহাড়ের প্রায় ৩ হাজার মিটার খাড়া পাশ—যা প্রতিরোধ যুদ্ধে ইরানের প্রাকৃতিক শক্তি।

তাই হরমুজ মুক্ত ও খার্গ দ্বীপ দখল করতে হলে ইরানের মূল ভূখণ্ডে ইরানকে পরাজিত না করে করা প্রায় অসম্ভব কাজ। আর তখনই প্রশ্ন আসবে মূল ভূখণ্ডে ইরানকে পরাজিত করা কি সম্ভব হবে? ইরানের ভৌগলিক শক্তি কি সে কাজ সহজে হতে দেবে? বরং তা যুদ্ধকে দীর্ঘ সময়ে ঠেলে দেবে। এমনকি রাজধানীতে যদি কখনও ইরানের সরকারের পরাজয় ঘটে, তাতেও কি যুদ্ধ থামবে?

আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান সীমান্ত
রাজধানীতে পরাজিত হলেও ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের অবশিষ্ট অংশ ও ইরানি জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ পরাজয় মেনে নেবে না কখনই। তখন তাদের জন্য বিশাল দেশের ভেতর যেমন অনেক স্থান আছে গেরিলা যুদ্ধের জন্য, তেমনি সব থেকে বড় ন্যাচারাল ফোর্ট হলো তুর্কমেনিস্তান ও আফগানিস্তান সীমান্তে পাহাড় বক্রাকারে যে ন্যাচারাল বুহ্য তৈরি করে রেখেছে সেটা। তারা সেখানে সরে গিয়ে যুদ্ধ আরও বেশি দীর্ঘস্থায়ী করবে।

২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫ ভাগ বাস করে আরব বিশ্বে। অথচ পৃথিবীর ৪৫% টেররিস্ট আক্রমণ তাদের মধ্য থেকেই ঘটে। তাই ইরানের যুদ্ধ গেরিলা যুদ্ধে রূপ নিলে—এক মাসের জ্বালানি সংকটে পৃথিবীর যে রূপ হয়েছে—তার সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধের প্রয়োজনে ইরানের প্রশিক্ষিত যোদ্ধারা টেররিজমের পথ নিলে পৃথিবীর রূপ কী দাঁড়াবে?

যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা কী আসন্ন

এক মাসের যুদ্ধে বিপর্যস্ত অর্থনীতি
গালফ নিউজের ১ এপ্রিলের সংবাদ অনুযায়ী ২৮ মার্চ পর্যন্ত এক মাসের যুদ্ধে আরব ওয়ার্ল্ডে ১৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। চাকরি হারিয়েছেন ৩.৯ মিলিয়ন মানুষ। ৩১ মার্চের খালিজ টাইমসের একাধিক রিপোর্টে ফুটে উঠেছে যুদ্ধের ফলে আবুধাবিসহ ওই এলাকার শিশুদের শিক্ষাজীবন, সাধারণ মানুষের চলাফেরা থেকে সে দেশ যারা ছাড়ছে তাদের পশুপাখিদের কষ্ট পর্যন্ত।

এর পাশাপাশি জাপান টাইমস, নিক্কেই এশিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার স্ট্রেইট টাইমসসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বড় মিডিয়াগুলো জানাচ্ছে, সিঙ্গাপুরও জ্বালানি সংকটে ভুগছে, থাইল্যান্ড লাওস ছাড়া অন্য সবার কাছে জ্বালানি বিক্রি বন্ধ করে দিয়েও জ্বালানি সংকটে পড়ছে। ফিলিপাইন জ্বালানি এমার্জেন্সি জারি করেছে। ইন্দোনেশিয়ার পাম বন থেকে জাপান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া—সকলেই সব ধরনের কৃষিতে সার সংকটে ভুগছে।

এই জ্বালানি ও সার সংকটে বাদ যাচ্ছে না দক্ষিণ এশিয়াও। দক্ষিণ এশিয়ার সব থেকে বড় দেশ ভারতে জ্বালানি অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছু সার ও সিরামিক কারখানা। সেখানকার রান্নার জ্বালানি জোগাড়ের দীর্ঘ লাইন বিশ্ব মিডিয়ার নিত্যদিনের খাদ্য। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের নিউজে জানা যাচ্ছে, ভোপালে রান্নার গ্যাস না পাওয়াতে কাঠের চাহিদা বেড়ে গেছে—যার ফলে বাঘ ও পুলিশের ভয়কে উপেক্ষা করে জঙ্গলে কাঠ জোগাড়ে যাচ্ছে মানুষ। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা জ্বালানি বাঁচাতে সপ্তাহের কাজের দিন পাঁচ থেকে চার দিনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ সার কারখানা বন্ধ করে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেল রেশনিং করে শহরকে সচল রেখেছে, তবে এর পরোক্ষ প্রভাব কৃষি, শিল্প, ব্যবসা—সবখানে পড়তে শুরু করেছে।

কোভিড পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকটের থেকে বড় সংকট শুরু
ইরান যুদ্ধ নিয়ে ৪ মার্চে একটি লেখায় লিখেছিলাম, ইরান যুদ্ধ পরবর্তী অর্থনীতি কোভিড পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকটের থেকেও বড় সংকট হতে পারে। গত এক মাসের যুদ্ধ পৃথিবীর অর্থনীতিকে কোভিডের থেকেও বড় সংকটে নিয়ে গেছে। এই এক মাসের ক্ষতি আগামী তিন বছরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়, তারপরেও যুদ্ধ দীর্ঘ হতে যাচ্ছে।

তাই জ্বালানি আমদানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য তো অর্থনীতি রেড লাইন ক্রস করে যাচ্ছে। অন্যদিকে চীনও জ্বালানি থেকে রেয়ার আর্থ বিক্রি ও ব্যবহারের ধারা বদলে দিচ্ছে। জাপান বাজেটের ধরন বদল করতে যাচ্ছে। এমনকি ভারতের তৈরি অ্যাপল স্মার্টফোনেরও বিক্রি নেমে গেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির উপর থেকে নিচে সব স্তরেই চরম ধাক্কা লেগেছে।

লেখকঃ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.