০৭:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৩ মে ২০২৬
দিল্লির বিবেক বিহারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু, বহু মানুষ উদ্ধার নরম-তুলতুলে স্কোনের গোপন রেসিপি: ৩০ বছরের পরীক্ষায় পাওয়া ‘পারফেক্ট’ স্বাদ খুলনায় বাড়ির ভেতর ঝুলন্ত অবস্থায় যুবকের মরদেহ উদ্ধার, নিখোঁজ থাকার পর মিলল লাশ ঢাকাসহ চার বিভাগে ভারী বৃষ্টির সতর্কতা, দেশজুড়ে বজ্রসহ বৃষ্টির আভাস ইরান যুদ্ধের চাপে ট্রাম্প কোণঠাসা, ২৫ বিলিয়ন ডলারের বোঝা, জনসমর্থন তলানিতে ময়মনসিংহে রেললাইনে হাঁটার সময় ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ গেল অজ্ঞাত ব্যক্তির চাঁপাইনবাবগঞ্জে ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী দুইজন নিহত ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে গাজার মতো ধ্বংসযজ্ঞ, ভস্মীভূত গ্রাম আর লাখো মুসলিম ঘরছাড়া মাগুরায় বাস-ট্রাক সংঘর্ষে প্রাণ গেল বৃদ্ধের, সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি লভ্যাংশ শূন্য, শেয়ারবাজারে চাপ: ১১ ব্যাংক সংকটে, ১০টি নামল ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে

পার্লামেন্টে বসে রাষ্ট্রপতিকে অপমান কি রাষ্ট্র ধ্বংসের চেষ্টা নয়?

ইউনূস শুধু বাংলাদেশের রাষ্ট্রের নয়, সমাজের যে ক্ষতি করে গেছে তার মূল্য এ জাতিকে যে কত বছর দিতে হবে তা বলা কষ্টকর। অত্যন্ত স্নেহের ছোট ভাই সাংবাদিক আনিস আলমগীর ইউনূস সম্পর্কে “বাটপার”, “মহা বাটপার” শব্দ ব্যবহার করছেন। বাস্তবে বাংলা ভাষায় ইউনূসের মতো লোকের জন্যে ব্যবহার করার মতো এছাড়া তেমন শব্দ আর নেই। বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক, বন্ধু নাদিরা মজুমদার ব্যক্তিগত আলাপে বলেন, আসলে চোর ডাকাতের মতো জোচ্চুরি, বাটপারি এগুলোও তো এক ধরনের পেশা। তারাও একটা পরিমাপের মধ্যে থাকে। ইউনূস যে কাজ করেছে, বিশেষ করে একটি “অভিশপ্ত প্রজন্ম” তৈরি করেছে; তাদের মুখে যে ভাষা সে তুলে দিয়েছে, তাদের দিয়ে শিক্ষকদের গায়ে হাত দেওয়ার মতো কাজ করিয়েছে, তাই ইউনূসকে “বাটপার” বা “জোচ্চোর” বললেও তাকে সম্মান দেখানো হয়।

বাঙালি সমাজে বস্তির ঝগড়ার ভাষা ছিল, গ্রাম্য কাইজ্যার ভাষা ছিল, কলতলার ঝগড়ার ভাষা ছিল কিন্তু বাঙালি সমাজে যে এ ধরনের একটা পরিবার থাকতে পারে—সেখান থেকে এই ভাবে একটি প্রজন্মের ভাষা, শিষ্টাচার নষ্ট করে দেওয়ার মতো ইউনূসের মত কেউ বেড়ে উঠতে পারে—এটা বাঙালি কখনও ভাবেনি। তাই সত্যই ইউনূসকে বাটপার বা জোচ্চোর শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। তার জন্য একটি আলাদা শব্দের প্রয়োজন আছে বাংলা ভাষায়, আবার যদি সৈয়দ মুজতবা আলী বা কাজী আব্দুল ওদুদের মতো কোনও পণ্ডিত লেখক জন্মান বাংলাদেশে তিনি হয়তো একটি শব্দ সৃষ্টি করতে পারবেন, যে শব্দ দিয়ে ইউনূসকে প্রকাশ করা যাবে। আর যতক্ষণ সে শব্দটি তৈরি না হচ্ছে ততক্ষণ এ শব্দটি “ইউনূস”। যেমন বেঈমানের থেকে বড় কিছু হলে তাকে “মীরজাফর” বলা হয়।

চিত্র:Flag of the President of Bangladesh.svg - উইকিপিডিয়া

যাহোক, ইউনূসের সৃষ্ট তরুণ নাহিদ এখন পার্লামেন্টে। এই পার্লামেন্ট নিয়ে অনেক প্রশ্ন এখনও আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, যিনি শুধু রাজনীতিক নন, তার পেশাজীবনের একটা বড় সময় কেটেছে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দেশে ও বিদেশে বড় বড় পদে কাজ করে। বর্ষীয়ান এই বিজ্ঞানের ছাত্র অঙ্কের হিসাব দিয়ে তাঁর লেখায় স্পষ্ট করেছে, এবার ভোটারের সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭ শত ৯৩ জন। এর বিপরীতে ভোট দেওয়ার জন্যে বুথের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬’শ ৫৯টি। ভোট দেওয়ার সময় ছিল ৯ ঘণ্টা। একটি ভোট দিতে যদি সর্বনিম্ন ৪ মিনিট সময় লাগে (যদিও বুথে ঢোকা, ভোট দেওয়া, বের হয়ে আসা সব মিলে ৪ মিনিটে সম্ভব নয়) তাহলে বিরতিহীনভাবে নয় ঘণ্টা একের পর একজন ভোট দিলে ভোট পড়ে ২৫.৮৬%। যেহেতু অর্ধেক সময় ভোট কেন্দ্র ফাঁকা ছিল—তাই স্বাভাবিকই ভোট পড়েছে ১২.৯৩%।

২০২৪-এর নির্বাচনেও ভোটার সংখ্যা এবারের থেকে কম ছিল, বুথের সংখ্যা বেশি ছিল। তারপরেও সে সময়ের সরকার দাবি করেছিল ৪৪% এর ওপরে ভোট পড়েছে। জনাব কাদের ওই সময়ে একইভাবে হিসাব করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে লিখে জাতিকে জানিয়েছিলেন, এই ভোট পড়া সম্ভব নয়। তাই তিনি যে শুধু ভোটের হিসাবটি এ সময়ে দিচ্ছেন তা নয়। তিনি সব আমলেই সত্য প্রকাশের চেষ্টা করেছেন।

বিদেশে বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশন থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর নির্দেশ - The Bangladesh Today

যাহোক, স্বাভাবিকই ধরে নেওয়া যায় এই সংসদে যারা আছেন তারা সর্বোচ্চ ১২ থেকে ১৩ ভাগ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন। কিন্তু এরপরেও এ সত্য মানতে হবে জাতীয় সংসদ শুধু মাত্র গুরুত্বপূর্ণ নয়—একটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক স্থানও। যেভাবেই যে ব্যক্তিই এ সাংবিধানিক স্থানে প্রবেশ করুন না কেন, তাকে এই স্থানের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। তা না হলে দেশের সংবিধানকে অবমাননা করা হয়। শুধু সংসদ কক্ষ নয়, যারা পার্লামেন্ট কভার করেন বা প্রতিটি সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ জানেন, ওই সংসদ ভবনটির মধ্যে হাঁটা-চলার, প্রবেশাধিকারেরও একটি নিয়মনীতি আছে। সব জায়গায় সকলে যেতে পারেন না। ইচ্ছে করলেই এক জায়গা দিয়ে ক্রস করে অন্য জায়গায় যাওয়া যায় না। এর সঙ্গে কিছুটা মেলে ক্রিকেট মাঠের ও খেলার নিয়মনীতি। যে কারণে কেউ যদি স্বাভাবিক আচরণের লিমিট ক্রস করে, তখন কিন্তু তাকে ভদ্র ভাষায় বলা হয়, বিহেভ লাইক এ পার্লামেন্টারিয়ান, অথবা বিহেভ লাইক এ ক্রিকেটার।

বাস্তবে রাষ্ট্র মানে কখনই একটি ভূখণ্ড নয়, রাষ্ট্র সব সময় রাষ্ট্রের অধিকারী হওয়ার মানের একটি একটি সুশৃঙ্খল জনগোষ্ঠীর মিলিত আকাঙ্ক্ষা। আর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর, তার নাগরিকদের চরিত্রের ওপর। রাষ্ট্রে সব নাগরিকের চরিত্র যদি ইউনূসের চরিত্রের মতো হয় ওই রাষ্ট্র তৎক্ষণাৎ ভেঙে পড়ে। আর একটি রাষ্ট্র বা দেশ ধ্বংস করার জন্য প্রথম কাজ কিন্তু ওই রাষ্ট্রের বা দেশের মানুষের চরিত্র নষ্ট করা। ইউনূস তার মেটিকুলাস ডিজাইন দিয়ে সেই কাজটিই করেছে।

সংসদ ভবনের চেয়ারে বসে ধূমপান

কারণ, বাঙালির চরিত্রে কম বেশি একটা আদব ছিল। কিন্তু ২০২৪-এ বাঙালি যখন দেখল গণভবন লুঠ করার সময় একজন সিনিয়র সিটিজেন, একজন প্রধানমন্ত্রী, একজন মাতৃসমা নারীর অন্তর্বাস নিয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস করল, প্রধানমন্ত্রীর বসার সোফায় গিয়ে ওই সব সন্ত্রাসীরা বসে সিগারেট খেল, পায়ের ওপর পা তুলে দিল। আর সর্বশেষ যখন দেশের পার্লামেন্টে ঢুকে শুধু পার্লামেন্ট কক্ষের ভাঙচুর নয়, পার্লামেন্ট কক্ষে পার্লামেন্ট মেম্বারদের চেয়ারে বসে এক শ্রেণীর তরুণ (নাদিরা মজুমদারের ভাষায় “অভিশপ্ত প্রজন্ম”) সিগারেট খেল—তখন বোঝা গেল এরা কারা, এরা আর যাই হোক দেশ ও দেশের সংবিধানকে সম্মান করে না।

যাহোক, এই তরুণদের নেতা হিসেবেই যত পার্সেন্ট মানুষের ভোট পাক না কেন, নাহিদ ইসলাম পার্লামেন্ট মেম্বার হয়েছেন। এবং জামাত জোটের চিফ হুইপও।

নাহিদ ইসলাম পার্লামেন্টে যে ভাষায় দেশের রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে কথা বলেছেন, সে সব কথা উল্লেখ করা বাস্তবে রাষ্ট্রবিরোধী ও দেশের নাগরিক হিসেবে অপরাধ। এবং একজন সাংবাদিককে যেহেতু সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মত প্রকাশ করতে হয়—তাই সেগুলো এ লেখায় উল্লেখ করা সম্ভব নয়। কারণ, রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে এ ধরনের বাক্য ব্যবহারের অর্থই হলো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কটুক্তি করা। যা এখানে উল্লেখ করাও সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাংবাদিকের জন্যেও অপরাধ।

ঠিক তেমনিভাবে সংবিধান সংসদ সদস্যকেও পার্লামেন্টের ভেতর ও বাইরে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কথা বলারও একটি বিধিবদ্ধতা দিয়েছে। তার বাইরে কেউ যেতে পারেন না। যে কারণে কোনও পার্লামেন্টারিয়ান যদি অসংসদীয় কথা পার্লামেন্টে বলেন, স্পিকার স্বপ্রণোদিত হয়ে সেটা এক্সপাঞ্জ করে দেন। অনেক সময় বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানরা ওই সব অসংসদীয় শব্দকে এক্সপাঞ্জ করার জন্যে সংসদের স্পিকারের কাছে দাবি জানান। এবং স্পিকার সে অনুরোধ তাদের বিধির ভেতর থেকেই বিবেচনা করেন।

শিক্ষককে মারধর | The Daily Star

এমনকি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতিষ্ঠান যেমন রাষ্ট্রপতি, বিচার বিভাগ বা প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে কোনও অসংসদীয় কথা বললে অন্য বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানরা তাকে বাধা দেন। তাকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন।

নাহিদ ইসলাম ও তার সহযাত্রীদের কাজ ও ভাষা গত দুই বছর দেশের মানুষ শুনেছে। তাই নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে কীভাবে পার্লামেন্টে রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে ওই সব অশালীন কথা বলার সুযোগ তিনি পেলেন এ প্রশ্ন যে কেউ করতে পারে? কিন্তু গত দুই বছরের বাংলাদেশকে দেখার পরে পৃথিবীর কোনও ভদ্র লোক আর এ প্রশ্ন করবেন না।

তারপরেও বিএনপি’র সংসদ সদস্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিনকে ধন্যবাদ দিতে হয়, তিনি অন্তত বলেছেন, ২০২৪-এর ৫ থেকে ৮ আগস্ট অবধি রাষ্ট্রপতি দেশের অভিভাবক ছিলেন।

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সব সময়ই দেশের অভিভাবক। এবং শুধু ওই চারদিন নয়, গত দুই বছর তিনিই জীবন বাজি রেখে সেই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আবার যে কোনও মুহূর্তে দেশ কোনও ক্রাইসিসে পড়লে শেষ প্রতিষ্ঠান তিনি। বিচার বিভাগকে কোনও সমাধান দেওয়ার জন্য বলার এখতিয়ার তারই আছে।

সংসদে ৩৪ মিনিটের বক্তব্যে যা বললেন নাহিদ ইসলাম

 

এ কারণে নাহিদ ইসলাম যে জোটের সঙ্গে আছেন এবং সংসদে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ তাদের উচিত শুধু নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য সংসদীয় রীতি অনুযায়ী এক্সপাঞ্জ করানো নয়—সংসদীয় রীতি অনুযায়ী অন্য ব্যবস্থা নেওয়াও।

আর সত্যি ভাবতে অবাক লাগে, দেশে যখন প্রতিদিন শিশু মারা যাচ্ছে—আর যার জন্যে গত দুই বছরের সরকারই দায়ী। এ বিষয় নিয়ে নাহিদ ইসলামের মতো “শিশু” পার্লামেন্টারিয়ানদের কোনও মাথাব্যথা নেই। “বিশেষ শিশুরা” এখনও ব্যস্ত ২০২৪-এর আগস্টের পর থেকে তারা যে কাজ করেছিল অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ও জাতির সর্বোচ্চ পরিচয়গুলোকে ধ্বংস করা—এখন পার্লামেন্টে বসেই একই কাজে ব্যস্ত।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।

জনপ্রিয় সংবাদ

দিল্লির বিবেক বিহারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৯ জনের মৃত্যু, বহু মানুষ উদ্ধার

পার্লামেন্টে বসে রাষ্ট্রপতিকে অপমান কি রাষ্ট্র ধ্বংসের চেষ্টা নয়?

০৫:৫৩:৩৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ মে ২০২৬

ইউনূস শুধু বাংলাদেশের রাষ্ট্রের নয়, সমাজের যে ক্ষতি করে গেছে তার মূল্য এ জাতিকে যে কত বছর দিতে হবে তা বলা কষ্টকর। অত্যন্ত স্নেহের ছোট ভাই সাংবাদিক আনিস আলমগীর ইউনূস সম্পর্কে “বাটপার”, “মহা বাটপার” শব্দ ব্যবহার করছেন। বাস্তবে বাংলা ভাষায় ইউনূসের মতো লোকের জন্যে ব্যবহার করার মতো এছাড়া তেমন শব্দ আর নেই। বিশিষ্ট বিজ্ঞান লেখক, বন্ধু নাদিরা মজুমদার ব্যক্তিগত আলাপে বলেন, আসলে চোর ডাকাতের মতো জোচ্চুরি, বাটপারি এগুলোও তো এক ধরনের পেশা। তারাও একটা পরিমাপের মধ্যে থাকে। ইউনূস যে কাজ করেছে, বিশেষ করে একটি “অভিশপ্ত প্রজন্ম” তৈরি করেছে; তাদের মুখে যে ভাষা সে তুলে দিয়েছে, তাদের দিয়ে শিক্ষকদের গায়ে হাত দেওয়ার মতো কাজ করিয়েছে, তাই ইউনূসকে “বাটপার” বা “জোচ্চোর” বললেও তাকে সম্মান দেখানো হয়।

বাঙালি সমাজে বস্তির ঝগড়ার ভাষা ছিল, গ্রাম্য কাইজ্যার ভাষা ছিল, কলতলার ঝগড়ার ভাষা ছিল কিন্তু বাঙালি সমাজে যে এ ধরনের একটা পরিবার থাকতে পারে—সেখান থেকে এই ভাবে একটি প্রজন্মের ভাষা, শিষ্টাচার নষ্ট করে দেওয়ার মতো ইউনূসের মত কেউ বেড়ে উঠতে পারে—এটা বাঙালি কখনও ভাবেনি। তাই সত্যই ইউনূসকে বাটপার বা জোচ্চোর শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। তার জন্য একটি আলাদা শব্দের প্রয়োজন আছে বাংলা ভাষায়, আবার যদি সৈয়দ মুজতবা আলী বা কাজী আব্দুল ওদুদের মতো কোনও পণ্ডিত লেখক জন্মান বাংলাদেশে তিনি হয়তো একটি শব্দ সৃষ্টি করতে পারবেন, যে শব্দ দিয়ে ইউনূসকে প্রকাশ করা যাবে। আর যতক্ষণ সে শব্দটি তৈরি না হচ্ছে ততক্ষণ এ শব্দটি “ইউনূস”। যেমন বেঈমানের থেকে বড় কিছু হলে তাকে “মীরজাফর” বলা হয়।

চিত্র:Flag of the President of Bangladesh.svg - উইকিপিডিয়া

যাহোক, ইউনূসের সৃষ্ট তরুণ নাহিদ এখন পার্লামেন্টে। এই পার্লামেন্ট নিয়ে অনেক প্রশ্ন এখনও আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। ইতোমধ্যে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান, যিনি শুধু রাজনীতিক নন, তার পেশাজীবনের একটা বড় সময় কেটেছে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দেশে ও বিদেশে বড় বড় পদে কাজ করে। বর্ষীয়ান এই বিজ্ঞানের ছাত্র অঙ্কের হিসাব দিয়ে তাঁর লেখায় স্পষ্ট করেছে, এবার ভোটারের সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭ শত ৯৩ জন। এর বিপরীতে ভোট দেওয়ার জন্যে বুথের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬’শ ৫৯টি। ভোট দেওয়ার সময় ছিল ৯ ঘণ্টা। একটি ভোট দিতে যদি সর্বনিম্ন ৪ মিনিট সময় লাগে (যদিও বুথে ঢোকা, ভোট দেওয়া, বের হয়ে আসা সব মিলে ৪ মিনিটে সম্ভব নয়) তাহলে বিরতিহীনভাবে নয় ঘণ্টা একের পর একজন ভোট দিলে ভোট পড়ে ২৫.৮৬%। যেহেতু অর্ধেক সময় ভোট কেন্দ্র ফাঁকা ছিল—তাই স্বাভাবিকই ভোট পড়েছে ১২.৯৩%।

২০২৪-এর নির্বাচনেও ভোটার সংখ্যা এবারের থেকে কম ছিল, বুথের সংখ্যা বেশি ছিল। তারপরেও সে সময়ের সরকার দাবি করেছিল ৪৪% এর ওপরে ভোট পড়েছে। জনাব কাদের ওই সময়ে একইভাবে হিসাব করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে লিখে জাতিকে জানিয়েছিলেন, এই ভোট পড়া সম্ভব নয়। তাই তিনি যে শুধু ভোটের হিসাবটি এ সময়ে দিচ্ছেন তা নয়। তিনি সব আমলেই সত্য প্রকাশের চেষ্টা করেছেন।

বিদেশে বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশন থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর নির্দেশ - The Bangladesh Today

যাহোক, স্বাভাবিকই ধরে নেওয়া যায় এই সংসদে যারা আছেন তারা সর্বোচ্চ ১২ থেকে ১৩ ভাগ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন। কিন্তু এরপরেও এ সত্য মানতে হবে জাতীয় সংসদ শুধু মাত্র গুরুত্বপূর্ণ নয়—একটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক স্থানও। যেভাবেই যে ব্যক্তিই এ সাংবিধানিক স্থানে প্রবেশ করুন না কেন, তাকে এই স্থানের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। তা না হলে দেশের সংবিধানকে অবমাননা করা হয়। শুধু সংসদ কক্ষ নয়, যারা পার্লামেন্ট কভার করেন বা প্রতিটি সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ জানেন, ওই সংসদ ভবনটির মধ্যে হাঁটা-চলার, প্রবেশাধিকারেরও একটি নিয়মনীতি আছে। সব জায়গায় সকলে যেতে পারেন না। ইচ্ছে করলেই এক জায়গা দিয়ে ক্রস করে অন্য জায়গায় যাওয়া যায় না। এর সঙ্গে কিছুটা মেলে ক্রিকেট মাঠের ও খেলার নিয়মনীতি। যে কারণে কেউ যদি স্বাভাবিক আচরণের লিমিট ক্রস করে, তখন কিন্তু তাকে ভদ্র ভাষায় বলা হয়, বিহেভ লাইক এ পার্লামেন্টারিয়ান, অথবা বিহেভ লাইক এ ক্রিকেটার।

বাস্তবে রাষ্ট্র মানে কখনই একটি ভূখণ্ড নয়, রাষ্ট্র সব সময় রাষ্ট্রের অধিকারী হওয়ার মানের একটি একটি সুশৃঙ্খল জনগোষ্ঠীর মিলিত আকাঙ্ক্ষা। আর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর, তার নাগরিকদের চরিত্রের ওপর। রাষ্ট্রে সব নাগরিকের চরিত্র যদি ইউনূসের চরিত্রের মতো হয় ওই রাষ্ট্র তৎক্ষণাৎ ভেঙে পড়ে। আর একটি রাষ্ট্র বা দেশ ধ্বংস করার জন্য প্রথম কাজ কিন্তু ওই রাষ্ট্রের বা দেশের মানুষের চরিত্র নষ্ট করা। ইউনূস তার মেটিকুলাস ডিজাইন দিয়ে সেই কাজটিই করেছে।

সংসদ ভবনের চেয়ারে বসে ধূমপান

কারণ, বাঙালির চরিত্রে কম বেশি একটা আদব ছিল। কিন্তু ২০২৪-এ বাঙালি যখন দেখল গণভবন লুঠ করার সময় একজন সিনিয়র সিটিজেন, একজন প্রধানমন্ত্রী, একজন মাতৃসমা নারীর অন্তর্বাস নিয়ে প্রকাশ্যে উল্লাস করল, প্রধানমন্ত্রীর বসার সোফায় গিয়ে ওই সব সন্ত্রাসীরা বসে সিগারেট খেল, পায়ের ওপর পা তুলে দিল। আর সর্বশেষ যখন দেশের পার্লামেন্টে ঢুকে শুধু পার্লামেন্ট কক্ষের ভাঙচুর নয়, পার্লামেন্ট কক্ষে পার্লামেন্ট মেম্বারদের চেয়ারে বসে এক শ্রেণীর তরুণ (নাদিরা মজুমদারের ভাষায় “অভিশপ্ত প্রজন্ম”) সিগারেট খেল—তখন বোঝা গেল এরা কারা, এরা আর যাই হোক দেশ ও দেশের সংবিধানকে সম্মান করে না।

যাহোক, এই তরুণদের নেতা হিসেবেই যত পার্সেন্ট মানুষের ভোট পাক না কেন, নাহিদ ইসলাম পার্লামেন্ট মেম্বার হয়েছেন। এবং জামাত জোটের চিফ হুইপও।

নাহিদ ইসলাম পার্লামেন্টে যে ভাষায় দেশের রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে কথা বলেছেন, সে সব কথা উল্লেখ করা বাস্তবে রাষ্ট্রবিরোধী ও দেশের নাগরিক হিসেবে অপরাধ। এবং একজন সাংবাদিককে যেহেতু সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মত প্রকাশ করতে হয়—তাই সেগুলো এ লেখায় উল্লেখ করা সম্ভব নয়। কারণ, রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে এ ধরনের বাক্য ব্যবহারের অর্থই হলো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কটুক্তি করা। যা এখানে উল্লেখ করাও সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাংবাদিকের জন্যেও অপরাধ।

ঠিক তেমনিভাবে সংবিধান সংসদ সদস্যকেও পার্লামেন্টের ভেতর ও বাইরে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কথা বলারও একটি বিধিবদ্ধতা দিয়েছে। তার বাইরে কেউ যেতে পারেন না। যে কারণে কোনও পার্লামেন্টারিয়ান যদি অসংসদীয় কথা পার্লামেন্টে বলেন, স্পিকার স্বপ্রণোদিত হয়ে সেটা এক্সপাঞ্জ করে দেন। অনেক সময় বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানরা ওই সব অসংসদীয় শব্দকে এক্সপাঞ্জ করার জন্যে সংসদের স্পিকারের কাছে দাবি জানান। এবং স্পিকার সে অনুরোধ তাদের বিধির ভেতর থেকেই বিবেচনা করেন।

শিক্ষককে মারধর | The Daily Star

এমনকি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতিষ্ঠান যেমন রাষ্ট্রপতি, বিচার বিভাগ বা প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে কোনও অসংসদীয় কথা বললে অন্য বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানরা তাকে বাধা দেন। তাকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন।

নাহিদ ইসলাম ও তার সহযাত্রীদের কাজ ও ভাষা গত দুই বছর দেশের মানুষ শুনেছে। তাই নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে কীভাবে পার্লামেন্টে রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে ওই সব অশালীন কথা বলার সুযোগ তিনি পেলেন এ প্রশ্ন যে কেউ করতে পারে? কিন্তু গত দুই বছরের বাংলাদেশকে দেখার পরে পৃথিবীর কোনও ভদ্র লোক আর এ প্রশ্ন করবেন না।

তারপরেও বিএনপি’র সংসদ সদস্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিনকে ধন্যবাদ দিতে হয়, তিনি অন্তত বলেছেন, ২০২৪-এর ৫ থেকে ৮ আগস্ট অবধি রাষ্ট্রপতি দেশের অভিভাবক ছিলেন।

সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সব সময়ই দেশের অভিভাবক। এবং শুধু ওই চারদিন নয়, গত দুই বছর তিনিই জীবন বাজি রেখে সেই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আবার যে কোনও মুহূর্তে দেশ কোনও ক্রাইসিসে পড়লে শেষ প্রতিষ্ঠান তিনি। বিচার বিভাগকে কোনও সমাধান দেওয়ার জন্য বলার এখতিয়ার তারই আছে।

সংসদে ৩৪ মিনিটের বক্তব্যে যা বললেন নাহিদ ইসলাম

 

এ কারণে নাহিদ ইসলাম যে জোটের সঙ্গে আছেন এবং সংসদে যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ তাদের উচিত শুধু নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য সংসদীয় রীতি অনুযায়ী এক্সপাঞ্জ করানো নয়—সংসদীয় রীতি অনুযায়ী অন্য ব্যবস্থা নেওয়াও।

আর সত্যি ভাবতে অবাক লাগে, দেশে যখন প্রতিদিন শিশু মারা যাচ্ছে—আর যার জন্যে গত দুই বছরের সরকারই দায়ী। এ বিষয় নিয়ে নাহিদ ইসলামের মতো “শিশু” পার্লামেন্টারিয়ানদের কোনও মাথাব্যথা নেই। “বিশেষ শিশুরা” এখনও ব্যস্ত ২০২৪-এর আগস্টের পর থেকে তারা যে কাজ করেছিল অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ও জাতির সর্বোচ্চ পরিচয়গুলোকে ধ্বংস করা—এখন পার্লামেন্টে বসেই একই কাজে ব্যস্ত।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।