আমার বাবা তাঁর কাজে যতটা দক্ষ, তেমন মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। তিনি কঠোর পরিশ্রম করতেন, অফিসের কাজ বাড়িতে নিয়ে আসতেন, দেরি পর্যন্ত থাকতেন এবং নিজের সবটুকু কোম্পানিকে দিতেন।
অনেক দিন ধরে তাঁকে দেখেই আমি বুঝেছি, সাফল্য কাকে বলে। বড় পদবি, এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে আপনার প্রয়োজন আছে, আর এমন কাজ যা আপনাকে সব সময় ঘিরে রাখে—এই ছিল সাফল্যের সংজ্ঞা।
আমিও তাঁর মতো সফল হতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু ২০২৪ সালে আমি চাকরি ছেড়ে দিই।
কারণটা ছিল খুবই সহজ, প্রায় লজ্জাজনকভাবে সহজ—আমি যে কাঠামোর ভেতরে ছিলাম, সেখানে আর নিজের উদ্দেশ্য খুঁজে পাচ্ছিলাম না। আমি লিখতে চেয়েছিলাম, সত্যিকারের লিখতে, জীবন হিসেবে লিখতে। কর্পোরেট সিঁড়ি সেই জীবনের জায়গা ছিল না। তাই আমি সরে দাঁড়ালাম।
যা তখন খোলাখুলি বলিনি, তা হলো—আমি পারতাম বলে এই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছি। চাকরি ছাড়ার পর আমার বাবা-মা আর্থিকভাবে পাশে ছিলেন। সেই নিরাপত্তা না থাকলে এই স্বাধীনতা আমার থাকত না। আমি জানি এর মানে কী।
আমার প্রজন্মের অনেকেরই এমন নিরাপত্তা নেই। অনেকেই নিজের পরিবারের ভরসা। তাদের আয়ে সংসার চলে। তাই নিজের ইচ্ছায় পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ সবার জন্য সমান নয়।
তবুও আমরা অনেকেই সাফল্যকে আর সেই সিঁড়ি দিয়ে মাপি না।
নতুন পথের অভিজ্ঞতা
চাকরি ছাড়ার পরের এক বছরে আমি একটি বইয়ের চুক্তি পেয়েছি, পডকাস্ট শুরু করেছি, টেকসই উন্নয়ন নিয়ে রিপোর্ট করেছি, বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে কাজ করেছি, এমনকি নিজে নিজে ডেটা স্ক্র্যাপিং ও কোডিং শিখেছি।
ধীরে ধীরে আমি সেই লেখক হয়ে উঠেছি, যাকে একসময় কল্পনা করতাম। আর অবাক করা বিষয় হলো—স্বাধীনভাবে কাজ করে আগের চেয়েও বেশি আয় করতে পারছি।
যদি থেকে যেতাম, এসব কিছুই হতো না।
তবে এই পথেরও মূল্য আছে। কাজের প্রস্তাব জোগাড় করা ক্লান্তিকর। নির্দিষ্ট সময় বলে কিছু নেই। কাজ সব সময় মাথার ভেতরে থাকে। কখনো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারি না, কারণ সময়সীমা কাউকে ছাড় দেয় না। কিছু মাসে অনিশ্চয়তা খুব বেশি হয়ে ওঠে।
আমার বাবার সাফল্যের পথেও মূল্য ছিল। তিনি তা দিয়েছেন পরিবারের জন্য, নিজের গড়া জীবনের জন্য।
আমি দিচ্ছি নিজের জন্য, এমন এক জীবনের জন্য যা এখনও গড়ে উঠছে। কোনটা সহজ, তা বলা কঠিন। তবে নিজের মতো করে কাজ করা, নিজের পরিবেশ তৈরি করা এবং নিজের গল্প বলা—এই পথটাই আমার সঙ্গে বেশি মানানসই।
আমরা কী খুঁজছি
অনেকে আমাদের “স্ট্রবেরি প্রজন্ম” বলে—নরম, চাপ সহ্য করতে অক্ষম।
কিছু পরিসংখ্যানও যেন তা-ই বলে। অনেক তরুণ চাকরি ছাড়ছে কাজ ও জীবনের ভারসাম্য খুঁজতে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
২৭ বছর বয়সী ফেবি ইভাঙ্কা, যিনি পাঁচ বছরের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, বলেন তিনি একঘেয়েমির জন্য চাকরি বদলাননি। বরং প্রতিটি জায়গা তাঁকে নিজের সম্পর্কে নতুন কিছু শিখিয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা অলস নই, দায়বদ্ধতার অভাব নেই। বরং আমরা দ্রুত বুঝে ফেলি কোন জায়গা আমাদের জন্য নয়।
একটি প্রতিষ্ঠানে থাকা তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলেছিল। তাই সেখান থেকে বেরিয়ে আসা ছিল স্বস্তির। অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ছেড়েছেন গর্ব নিয়ে, যেন এক ধরনের স্নাতক হওয়া।

এটা দুর্বলতা নয়, আত্মজ্ঞান।
কর্মজীবন বিশেষজ্ঞ ইনা লিয়েম বলেন, সবাই কর্পোরেট পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারে না। অনেক কর্মস্থলের সংস্কৃতিও মানুষকে নিরুৎসাহিত করে।
অনেকেই মনে করেন তাঁদের কাজ মানসিক চাপ বাড়ায়।
প্রত্যেকের কাজের মূল্যবোধ আলাদা—কেউ সময়ের স্বাধীনতা চান, কেউ বেশি আয়, কেউ স্বীকৃতি বা ভালো পরিবেশ। এই অমিল দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
তরুণরা এই অমিল সহ্য করতে রাজি নয়।
ভিন্ন ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা
অনেক তরুণ ব্যবস্থাপক হতে চান না। কিন্তু এর মানে উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাব নয়।
ফেবির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো দক্ষতা—যে কাজ করছে, সেটি ভালোভাবে জানা। নেতৃত্ব তাঁর কাছে পদবি নয়, যোগ্যতার ফল।
তিনি বলেন, শুধু সমাজের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে বড় পদবি নিতে চান না।
আমিও পদবির পেছনে দৌড়াই না। আমি চাই সময়ের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ, নিজের দক্ষতা বাড়ানো এবং নিজের গল্প বলা।
এটা উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাব নয়, বরং অন্যরকম উচ্চাকাঙ্ক্ষা।
মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ আদ্রিয়ানা নোভিতাসারি বলেন, ব্যক্তিগত পরিতৃপ্তিকে গুরুত্ব দিয়ে তরুণরা ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কিন্তু তা খারাপ নয়।
বর্তমান কর্মক্ষেত্র বদলে গেছে। অনেক তরুণ নিজের দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত সময় দিচ্ছে। কেউ কেউ আর্থিক স্বাধীনতার খোঁজে চাকরি ছাড়ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অধিকাংশ তরুণ তাদের কাজে অর্থপূর্ণতা খোঁজে।
সময়ের পরিবর্তন
চাকরি ছাড়ার পর আমি যে দক্ষতাগুলো শিখেছি—কোডিং, ডেটা সাংবাদিকতা, মাল্টিমিডিয়া গল্প বলা—এসবই ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয়।
প্রযুক্তি দ্রুত বদলে দিচ্ছে কাজের ধরন। একই জায়গায় স্থির থাকা এখন ঝুঁকিরও হতে পারে।
আমার বাবার সাফল্যের ধারণা এখনও আমাকে অনুপ্রাণিত করে—নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, কাজের প্রতি গর্ব। তবে আমি সেটাকে নিজের মতো করে বদলে নিয়েছি।
আমি এখন এমন একটি গল্পের জন্য কাজ করছি, যা আমি নিজেই বেছে নিয়েছি।
কখনো তা স্বাধীনতা মনে হয়, আবার কখনো একা বহন করা ভার।
সবাইকে এই পথ নিতে বলব কি না, তা নিশ্চিত নই। তবে এতটুকু বলতে পারি—সাফল্যের যে সংজ্ঞা আমরা পেয়েছি, সেটি একমাত্র পথ নয়। কেউ তাতে সফল হয়, কেউ হয় না। আর এই সত্য অনেক আগেই ছিল, আমাদের প্রজন্ম আসার আগেই।
ইওহানা বেলিন্ডা 


















