পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে চলাচলকারী জাফফার এক্সপ্রেস শুধু একটি ট্রেন নয়, বরং হাজারো মানুষের জীবনের একমাত্র ভরসা। বারবার হামলা, বিস্ফোরণ ও নিরাপত্তা ঝুঁকি সত্ত্বেও এই ট্রেন থেমে থাকেনি। যাত্রীরা ঝুঁকি জেনেও প্রতিদিন এই ট্রেনে চড়ে ঘরে ফেরার চেষ্টা করেন।
সংঘাতের মাঝেই যাত্রা
প্রায় এক হাজার মাইল দীর্ঘ এই রেলপথ বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটাকে পাকিস্তানের অন্যান্য বড় শহরের সঙ্গে যুক্ত করে। তবে এই পথটি দীর্ঘদিন ধরেই সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর হামলার লক্ষ্য। গত দেড় বছরে অন্তত ২৭ বার ট্রেন বা রেলপথে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা এই রুটকে দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাপথে পরিণত করেছে।

স্টেশনে আতঙ্কের সকাল
ফেব্রুয়ারির এক সকালে কোয়েটা রেলস্টেশনে আচমকা গুলির শব্দে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রীরা দ্রুত আশ্রয় নেন অপেক্ষাকক্ষ বা অফিসে, কেউ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে চলা এই গুলির ঘটনায় অনেকেই যাত্রা বাতিল করেন। পরে জানা যায়, এটি সন্ত্রাসী হামলা নয়, বরং গাড়ি ছিনতাইকারী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি ঘটনা ছিল।
বারবার হামলার ইতিহাস
জাফফার এক্সপ্রেসের ওপর হামলার ইতিহাস দীর্ঘ ও ভয়াবহ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রেললাইনে বিস্ফোরণে ট্রেনের চারটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে বোমা হামলায় অন্তত ১২ জন আহত হন। ২০২৫ সালের মার্চে সশস্ত্র গোষ্ঠী ট্রেন থামিয়ে ৪৪০ যাত্রীকে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা জিম্মি করে রাখে। ওই ঘটনায় বহু মানুষ প্রাণ হারান। ২০২৪ সালের নভেম্বরে কোয়েটা স্টেশনে আত্মঘাতী হামলাতেও প্রাণহানি ঘটে।

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ
এই রুটের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ হলো বোলান পাসের প্রায় ১৫০ মাইল এলাকা। পাহাড়ি গিরিখাত, পুরনো সুড়ঙ্গ ও সেতু পেরিয়ে যেতে হয় এই পথে। ট্রেনের গতি এখানে অত্যন্ত ধীর হওয়ায় যাত্রীরা আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
নিরাপত্তা জোরদার, তবুও শঙ্কা
ট্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নজরদারি ক্যামেরা, সশস্ত্র প্রহরা এবং ট্রেনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে চলা নিরাপত্তা যানবাহনের ব্যবস্থা করেছে। তবুও যাত্রীদের মধ্যে ভয় পুরোপুরি কাটেনি। অনেকেই যাত্রা বাতিল করেন, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই ট্রেনে ওঠেন।
জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি
বেলুচিস্তানে কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিকের জন্য এই ট্রেনই ঘরে ফেরার একমাত্র উপায়। বিমানে ভ্রমণ তাদের নাগালের বাইরে, আর সড়কপথও নিরাপদ নয়। তাই ঝুঁকি জেনেও তারা ট্রেনেই ভরসা রাখেন।

এক যাত্রীর ভাষায়, ট্রেনটি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তাদের কাছে বিকল্প নেই। কখনও হামলা হয়, কখনও চলাচল বন্ধ থাকে, তবুও শেষ পর্যন্ত এই ট্রেনই তাদের বাড়ি পৌঁছে দেয়।
সংকটের মাঝেও চলমান জীবন
সব ভয়, হামলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও জাফফার এক্সপ্রেস থেমে নেই। নির্ধারিত সময়ের কিছুটা দেরি হলেও ট্রেন ছাড়ে, যাত্রীরা উঠে বসেন, আর জীবনের প্রয়োজনে তারা আবারও এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় ফিরে আসেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















