ফেনীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় করা মামলার আসামি গাজী এনামুল হক সুজনকে যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সমালোচনার মুখে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একইসঙ্গে ফেনী পৌর যুবদলের কমিটি সাময়িকভাবে স্থগিত করে সংশ্লিষ্ট নেতাদের কেন্দ্রে জরুরি তলব করা হয়েছে। রবিবার (৩ মে) কেন্দ্রীয় যুবদলের সহদফতর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৩০ এপ্রিল ফেনী পৌর যুবদলের সভাপতি জাহিদ হোসেন বাবলু ও সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী রাসেল পাটোয়ারী স্বাক্ষরিত পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের আট সদস্যবিশিষ্ট একটি আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে এনামুল হক সুজনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। যিনি আগে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার মামলার আসামি হিসেবে অভিযুক্ত ছিলেন। কমিটি ঘোষণার পর স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। ঘোষিত কমিটির আট সদস্যের মধ্যে ছয়জনই পদত্যাগ করেন। তারা হলেন—নতুন কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি গাজী আবদুল কাদের নয়ন, সহসভাপতি মো. সবুজ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মিল্লাত হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জাহিদ, প্রচার সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন রুবেল ও দফতর সম্পাদক ডালিম মজুমদার। তারা পদত্যাগপত্রে বলেন, আওয়ামী লীগের বি-টিমকে যুবদলের দায়িত্ব দেওয়ায় তারা পদত্যাগ করেছেন। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও দলীয় অঙ্গনে আলোচনা সৃষ্টি করলে কেন্দ্রীয় যুবদল ক্ষোভ প্রকাশ করে ব্যবস্থা নেয়। সমালোচনার মুখে পৌর যুবদলের কমিটি বাতিল করা হয়। বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় পৌর যুবদল ঘোষিত ১২টি ওয়ার্ড কমিটিও। একইসঙ্গে পৌর যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা মামলার আসামি গাজী এনামুল হকের যুবদলের প্রাথমিক সদস্যপদ স্থগিত করা হয় এবং তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, এনামুল হক বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি। কমিটি গঠনের পর তার নাম প্রকাশ্যে এলে জেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বিতর্কের জের ধরে কমিটি ঘোষণার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ২ মে রাতে ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের কমিটির ছয়জন সদস্য পদত্যাগ করেন।
যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ফেনী পৌর যুবদলের কমিটি স্থগিতের পাশাপাশি সব ওয়ার্ড কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয়, ফেনী পৌর যুবদলের বিদ্যমান কমিটি স্থগিত থাকবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এর কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
অভিযুক্ত গাজী এনামুল হক তথ্য গোপন করে দলের পদ গ্রহণ করায় তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বহিষ্কৃতদের কোনো ধরনের অপকর্মের দায় দল নেবে না। যুবদলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের তাদের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বিজ্ঞপ্তিতে ফেনী পৌর যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ফেনী পৌরসভার ঘোষিত ওয়ার্ড কমিটিতে ২০১৭ সালে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় করা মামলার আসামি এনামুল হককে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়েছে। এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করায় ফেনী পৌর যুবদলের সভাপতি এ কে এম জাহিদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক হায়দার আলী রাসেল পাটোয়ারীকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সামনে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া এনামুল হক বলেন, ‘সদ্য ঘোষিত ওয়ার্ড কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি গাজী আবদুল কাদের আমার জ্যাঠাতো ভাই। তিনি এই কমিটিতে আমার পদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন। আমাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক জমিসংক্রান্ত বিরোধ চলছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় মামলাটি দায়ের করা হয়। ওই মামলায় আমাকে আসামি করা হয়। এ ঘটনায় দল থেকেও তখন প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। এখন আমাকে কমিটিতে পদ দেওয়ার পর পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। পুরো ঘটনা মূলত পারিবারিক প্রতিহিংসার ফল।’
এনামুলের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘোষিত ওই কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি গাজী আবদুল কাদের বলেন, ‘এনামুল হক আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি শুধু নন, তার পরিবারের সদস্যরাও ওই দলের রাজনীতিতে সক্রিয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এনামুল বিএনপিতে যোগ দেন। কমিটিতে আমি সভাপতি পদপ্রত্যাশী ছিলাম। কিন্তু কমিটিতে এমন ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ ধরনের ব্যক্তির নেতৃত্বে রাজনীতি করা সম্ভব নয় বলেই আমরা তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগ করেছি।’
কমিটিতে বিতর্কিত ব্যক্তিকে স্থান দেওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফেনী পৌর যুবদলের সভাপতি জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর শ্রমিক লীগ নেতা আবুল কাশেম মিলন বাদী হয়ে খালেদা জিয়ার ওপর হামলার অভিযোগে একটি মামলা করেন, যেখানে এনামুলকে আসামি করা হয়। তখন এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল। বিষয়টি জেলা বিএনপি ও যুবদল অবগত রয়েছে। ওয়ার্ড কমিটি ঘোষণা করার পর সদস্যদের পদত্যাগ ও বিতর্কের সৃষ্টি হওয়া ঘটনাটি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
জেলা যুবদলের সদস্য (দফতরের দায়িত্বে নিয়োজিত) মো. আল ইমরান বলেন, ‘কেন্দ্রীয় যুবদলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফেনী পৌর যুবদলের ১২টি ওয়ার্ডের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ফেনী পৌর যুবদলের কমিটি স্থগিত করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে শোকজ এবং সুজনকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।’
২০১৭ সালে ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়ার পথে ফেনীর মহিপাল এলাকায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা চালায় তৎকালীন সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা। ওই ঘটনায় সাত বছর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর যমুনা হাই ডিলাক্স পরিবহনের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মিলন বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর দায়ের করা মামলায় এজাহারভুক্ত ২৮ জন আসামির তালিকায় এনামুল হক সুজনের নাম ২৫ নম্বরে রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















