ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের প্রতিবাদে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার বক্তব্যকে ইসলাম ধর্মের অবমাননাকর ও উসকানিমূলক দাবি করে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে হেফাজতে ইসলাম ও স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের একটি অংশ।
মঙ্গলবার বিকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ‘সচেতন ইসলামপ্রিয় জনতা’র ব্যানারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
বক্তাদের অভিযোগ
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন হেফাজতে ইসলামের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির যুববিষয়ক সম্পাদক জুনায়েদ কাসেমী, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক এরশাদ উল্লাহ কাসেমী এবং সরাইল উপজেলা হেফাজতে ইসলামের সহসভাপতি হাজী মহিবুল ইসলাম।
বক্তারা দাবি করেন, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের প্রতিবাদে আয়োজিত এক কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় রুমিন ফারহানা ইসলামের আজান ও ওয়াজ সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটিতে কোনো ধরনের অপসংস্কৃতি মেনে নেওয়া হবে না এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন বক্তব্য থেকেও সবাইকে বিরত থাকতে হবে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া নেতারা রুমিন ফারহানাকে সতর্ক করে বলেন, ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করা হলে তার বিরুদ্ধে জনগণ প্রতিবাদ জানাবে এবং এ ধরনের বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিতর্কের সূত্রপাত যেভাবে
সোমবার বিকালে সরাইলের শাহবাজপুর এলাকায় ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের প্রতিবাদে একটি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রুমিন ফারহানা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।
রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে বাংলাদেশের সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ক্রমাগত বাধার মুখে পড়ছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০২১ সালে সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সংগীতাঙ্গনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল এবং বর্তমানে জেলায় কার্যকর কোনো সিনেমা হলও নেই।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে দেখার উপযোগী একটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী কেন বন্ধ করে দেওয়া হলো। তার মতে, যারা দেশকে পিছিয়ে নিতে চায় এবং সাংস্কৃতিক চর্চার পথ সংকুচিত করতে চায়, তারাই এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি নিয়ে মন্তব্য
রুমিন ফারহানা তার বক্তব্যে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, যখন সমাজে ধর্ষণ, দুর্নীতি, অর্থপাচার ও নানা অনিয়ম রোধ করা যাচ্ছে না, তখন একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধে রাষ্ট্রীয় সহায়তা কেন থাকবে—সেই প্রশ্ন জনগণের সামনে রয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতি বহুমাত্রিক। দেশের মানুষ যেমন আজানের সুর শুনেছে, তেমনি বাউলগান ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক ধারার সঙ্গেও পরিচিত হয়েছে। তার মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
চলচ্চিত্র প্রদর্শনী বন্ধের পটভূমি
গত শনিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছিল। এর আগে জেলার কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের ব্যানারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন না করার আহ্বান জানিয়ে প্রচারণা চালানো হয়।
পরে কসবা উপজেলায় ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি স্কুল মাঠে চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হলেও পুলিশ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সেই আয়োজনও বন্ধ হয়ে যায়। এসব ঘটনার পরই চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
রুমিন ফারহানার বক্তব্য ঘিরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নতুন করে শুরু হওয়া এই বিরোধ এখন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















