বাংলাদেশে আপাদমস্তক রাজনীতিবিদ যে ক’জন ছিলেন তোফায়েল আহমেদ তাদের একজন। তাঁর ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা এগুলো নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। এটা সত্যও তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস লেখা যাবে না। অবশ্য সে কাজ ইতিহাসবিদদের।
দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে পেশাগত কারণে তাঁর অনেক কিছু দেখেছি ও জেনেছি। যেমন ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পরে আওয়ামী লীগ তখন বিরোধী দলে। তোফায়েল আহমেদ ধানমন্ডিতে মেজর জিয়াউদ্দিনের বাসাতে ভাড়া থাকেন। ওই সময়ে প্রায় কেউ তাকে বাসা ভাড়া দিত না। কেন দিত না তা বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে যাদের পরিচয় আছে তারা ভালোভাবে বোঝেন। নির্বাচনের পরপরই একদিন পেশাগত কাজে খুব ভোরে তার বাসায় গেছি। তিনি ঘুম থেকে উঠে স্লিপিং ড্রেসেই ড্রয়িং রুমে বসে ফোন করছেন। যারা তাঁকে কাছের থেকে জানতেন, তারা সকলেই জানেন, তোফায়েল আহমদের কোনো টেলিফোন নোটবুক ছিল না। একবার টেলিফোন নাম্বার শুনলেই ব্যক্তি ও তার ফোন নাম্বার তার মুখস্থ থাকত।
যাহোক ঢুকেই দেখি উনি তখনকার ওই এনালগ ফোন আঙুল দিয়ে ঘোরাচ্ছেন। আর চোখের ইশারায় বসতে বলেন। বসার আগেই শুনি উনি বলছেন,
“সালাম ভাই, (সালাম তালুকদার, তৎকালীন বিএনপির জেনারেল সেক্রেটারি) শুনছি আপনারা নাকি ভোলায় বাই-ইলেকশানে অমুককে (নামটা ঠিক মনে নেই, পুরোনো নোটবুকে ছিল) নমিনেশন দিচ্ছেন।
ও প্রান্ত থেকে কী বলছেন আমি শুনতে পাচ্ছি না।
যাহোক, এ প্রান্ত থেকে তোফায়েল আহমেদ আবার বলেন, দেখেন সালাম ভাই, এবার আপনারা ক্ষমতায় এসেছেন। আগামীতে হয়তো আমরা আসব। বা যদি নাও আসি— তবে এদেশের রাজনীতিটা তো আমরাই করব। এ কারণে আপনাকে বলছি, তাকে নমিনেশন দিলে শুধু ভোলার রাজনীতির পরিবেশ নয়, আপনাদের নিজেদের রাজনীতিরও ক্ষতি হবে। বলে তিনি বলেন, আপনার ওখানে আপনার দলে তো অনেক ভালো ভালো প্রার্থী আছে— বলেই একটানা চার-পাঁচ জনের নাম বলে গেলেন।
ও প্রান্ত থেকে অনেকক্ষণ সালাম তালুকদার কথা বললেন।
তাঁর কথা শেষ হলে তোফায়েল আহমেদ আবার বলেন, দেখেন রাজনীতিতে সন্ত্রাসীরা ঢুকলে, তারা সামনে এলে— শেষ অবধি আপনি আমি আমরা যারা রাজনীতি করি আমরাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। রাজনীতিতে আপনারও গুরুত্ব থাকবে না, আমরাও গুরুত্ব থাকবে না। সন্ত্রাসীরাই নেতা হবে। রাজনৈতিক হত্যা আরও বাড়বে। অনেকদিন পরে দেশে গণতন্ত্র এসেছে। আর রাজনীতিবিদদের জীবন বিপন্ন না হোক, এটাই তো ভালো— না কি?
মনে হলো, ও প্রান্তে সালাম তালুকদার কনভিন্সড। কারণ এর পরে তোফায়েল আহমেদ হাসিমুখে তার সঙ্গে ব্যক্তিগত কথাবার্তা বলা শুরু করলেন। পরে খেয়াল করেছিলাম তোফায়েল আহমেদ যে “অমুক”কে নিয়ে আপত্তি করেছিলেন তাকে বিএনপি নমিনেশন দেয়নি।
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে তোফায়েল আহমদ জেল খেটেছেন পাঁচ বছর। অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের শাসনামলের প্রায় বেশি সময়টা তিনি জেলে ছিলেন। তারপরেও তিনি বিএনপির জেনারেল সেক্রেটারি, প্রাক্তন বনেদি মুসলিম লীগ পরিবারের সন্তান সালাম তালুকদারের কাছে রাজনৈতিক কালচার আশা করছেন এবং সেটা তিনি পেয়েছিলেনও।
এই কালচারে অভ্যস্ত হয়েছিলেন তাঁরা ছাত্র রাজনীতি করার সময় থেকেই। কারণ, তার মূল নেতৃত্বেই এই দেশে সব থেকে বড় গণঅভ্যুত্থান হয়। কিন্তু কোনো “মব ভায়োলেন্স” তার কোনো ছাত্র নেতার নেতৃত্বে হয়নি। বরং রাজনৈতিক শিষ্টাচারটা কোথায় ছিল তা জানা যায়, ১৯৭১ সালের পরে যখন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে মুসলিম লীগ নেতা খাজা খয়েরউদ্দিনের বিচার শুরু হয়। খাজা খয়েরউদ্দিন ঢাকার কোতোয়ালী-সূত্রাপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিপরীতে মুসলিম লীগের প্রার্থী ছিলেন।
যাহোক ওই সময়ের পত্রিকার পাতা খুঁজলে পাবেন, খাজা খয়ের উদ্দিন এজলাসে বলছেন, আমি খাজা খয়েরউদ্দিন স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছি, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করিনি। বরং ২৫ মার্চ রাতে তোফায়েল ও রাজ্জাককে আমি আমার বাসায় রাখি। ২৭ তারিখ তাঁদের কেরাণীগঞ্জ যাওয়ার ব্যবস্থা করি।
বাস্তবে আমরা লিখিত ইতিহাসে পড়ি, ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে শেষ বের হয়ে যান, তাজউদ্দিন আহমেদ, ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম। কিন্তু তোফায়েল আহমদের কাছে যা জেনেছি, তাঁরা বেরিয়ে যাওয়ার পরে তাঁর ও আব্দুর রাজ্জাকের যাওয়ার কথা ছিল। সেই সময়মতোই তাঁরা যান। এবং বঙ্গবন্ধু তাদের কিছু নির্দেশ দেন। (সে সব লিখতে গেলে লেখা বড় হয়ে যাবে।) এবং তাদের হাতে কিছু টাকা দিয়ে দেন একটা ব্যাগে করে। তারা কেরাণীগঞ্জের বোরহানউদ্দিন গগনের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে পুরানঢাকা পর্যন্ত গিয়েই পাকিস্তানি আর্মির গোলাগুলির মধ্যে পড়ে যান। এবং নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিদ্বন্দ্বী মুসলিম লীগ নেতা খাজা খয়েরউদ্দিনের বাড়িতেই আশ্রয় নেন ওই রাতে।
তখনও তোফায়েল আহমদের লেখা বইটি বের হয়নি। সম্ভবত ১৯৮৩ সাল হবে। তোফায়েল আহমেদ মাত্র কয়েকদিন হলো এরশাদের জেল থেকে বের হয়ে এসেছেন। আর তখনকার জেনারেশনের কাছে তোফায়েল আহমেদ অনেক জনপ্রিয়। এলিফ্যান্ট রোডের কোনো দোকানে তিনি শার্ট বা জুতা কিনতে গেলে সেখানে মুহূর্তে তাকে দেখার জন্য ভিড় জমে যায়। তাই সম্পাদককে বলি, তোফায়েল আহমদের একটা সাক্ষাৎকার নেই এ সপ্তাহের জন্য। রাজি হতে, আবারও খুব ভোরবেলা তাঁর বাসায় গিয়ে উপস্থিত হই। তিনি তখনও মেজর জিয়াউদ্দিনের ওই বাসায় আসেননি। বাসা খুঁজছেন। ওই সময়ের ছাত্রলীগের নেতা পরবর্তীতে ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট আব্দুল মান্নানকে বলছেন, তোমরা দেখ তো ধানমন্ডি এলাকায় একটা বাসা পাও কিনা।
তাদের কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছে, খুব বেশি ভাড়া তাঁর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। যে কারণে ধানমন্ডিতে বাসাভাড়া পেতে অসুবিধা হচ্ছে। তবুও তোফায়েল আহমেদ বলছেন, তোমরা চেষ্টা করো। এই এলাকাতেই থাকব। বঙ্গবন্ধু এখানে থাকতেন। ৩২ নম্বর বাড়িটিও এখানে। এর থেকে দূরে থাকতে ইচ্ছে করে না। যাহোক, আব্দুল মান্নান ও আরও কয়েকজন ছাত্র নেতা চলে যাওয়ার পরে তিনি আমাকে সাক্ষাৎকার দিতে শুরু করেছেন, এমন সময় হঠাৎ ফোন তুলে কাকে যেন ফোন করলেন। রাজনৈতিক নেতাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় এটা স্বাভাবিক। ফোনে জানতে চাইলেন, তিনি যাকে কিছু টাকা পৌঁছে দিতে বলেছিলেন, তাকে সেটা দেওয়া হয়েছে কিনা? বুঝলাম ও প্রান্ত থেকে হ্যাঁ-সূচক উত্তর এসেছে। তিনি একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
যদিও এটা সাংবাদিকের কাজ নয়, তারপরেও অনেকটা বাঙালি স্বভাবেই প্রশ্ন করে বসি, ভাই কোনো সমস্যা? উনি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন। বুঝতে পারি তাঁর চোখের সামনে দিয়ে সিনেমার রিলের মতো হয়তো বেশ কিছু দৃশ্য চলে যাচ্ছে।
তারপরে একটু ভারী গলায় বললেন, ১৯৭৫ সালে ময়মনসিংহ জেলে যখন আমাকে হত্যা করার জন্যে আর্মি পাঠায়— সে সময় ও জেলার ছিল। সে আমাকে জেল থেকে বের করে তার বাসায় নিয়ে গিয়ে রাখে। যে কারণে আজ আমি বেঁচে আছি। ওই অপরাধে তার কী হয়েছিল তা তো বুঝতেই পারছ। বুঝলাম উনি তাঁর পরিবারকে ওই টাকা পাঠাতে বলছেন।
সাংবাদিক হিসেবে তথ্য জোগাড় করতে গিয়ে এই টাকা পাঠানোর লম্বা লিস্ট দেখেছি ৩২ নম্বারে। ৬৯ থেকে ৭৫-এর পরে অবধি যারা নিহত বা আহত হয়েছে, তাদের ভেতর যে পরিবারগুলো অসহায়— তাদের জন্য নানা ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা জোগাড় করে শেখ হাসিনা ওই পরিবারগুলোকে মানি অর্ডার করার জন্য প্রতিমাসে টাকা দিতেন। সে সময়ে এসব টাকা জোগাড়ে কত কষ্ট ছিল তা আজকে যে প্রজন্ম রাতারাতি জমিদারের নাতি হয়ে রাজনীতি করে— তার ঠিক বুঝবে না। তারা বুঝবে না দেশের জন্য রাজনীতি করা কাকে বলে।
সে সময়ে আওয়ামী লীগের অনেক জেলা প্রোগ্রামে বের হতে ৫’শ টাকার অভাবে শেখ হাসিনা-সহ বড় নেতাদের কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। যদি ওই টাকা সময়মতো না আসত। নেতারা ও শেখ হাসিনা নিজে নানাভাবে জোগাড় করে— হয়তো সকাল ৮টার বদলে বেলা এগারোটায় এমনকি পরদিন রওনা দিতেন।
আশির দশকের শেষের দিকে স্থপতি মাযহারুল ইসলামের বাড়িতে গেছি সম্ভবত বিদেশি কোনো ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। এ সময়ে সেখানে মেজর জেনারেল মাজেদুল হক (বিএনপির মন্ত্রী ছিলেন) ও তাঁর স্ত্রী। এর ভেতর তোফায়েল আহমেদ ঢুকলেন। তাকে দেখেই সবাই উঠে দাঁড়ালেন। যদিও সকলে তাঁর থেকে বয়সে বড়। তোফায়েল আহমেদ বসেই মাজেদুল হকের স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ভাবী কেমন আছেন। মাজেদুল হকের স্ত্রী একটু রাগত স্বরে বললেন, কেমন আছি ওকে জিজ্ঞেস করো? ওর দলের ছেলেরা মেয়েদের ওড়না ধরে টানাটানি করে কী কাজটা করল?
তোফায়েল আহমেদও একটু গম্ভীর মুখে বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে এটা মানায় না। এরপরে আমি দূরের সোফায় গিয়ে ওই ভদ্রলোকের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করছি, আর মাঝে মাঝে চোখ পড়ছে এদিকে। মনে হলো গোটা সময়টা মাজেদুল হক যেন কেমন গুটিয়ে বসে আছেন। মনের ভেতর একটু খটকা লাগে।
যাহোক সাক্ষাৎকার নিয়ে বের হয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছি। তীব্র রোদ। হঠাৎ দেখি পাশে একটি গাড়ি থেমে গেল। গাড়ির গ্লাস নামিয়ে তোফায়েল আহমেদ আমাকে ডেকে বললেন, এই তুমি কোন দিকে যাবে? আমার গন্তব্য বলতেই বললেন, ওঠ, তোমাকে নামিয়ে দিয়ে যাই। গাড়িতে নানান কথার ভেতর এক পর্যায়ে তাকে বলি, ভাই একটা বিষয় আমার চোখে একটু অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। উনি বললেন, কী বলতো। আমি বলি, মেজর জেনারেল মাজেদুল হক আপনার সঙ্গে যেভাবে কথা বললেন, তাতে ওনাকে বড় বেশি সংকুচিত মনে হলো? কারণ, কী? উনি বললেন, না এটা তোমার চোখের ভুল। মাজেদ ভাইয়ের স্ত্রী অর্থাৎ ভাবী অবশ্য বিএনপি করেন না। উনি আওয়ামী লীগ বা প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থক। তাছাড়া মাজেদ ভাইকে তো ৭২ সালে আমিই বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। পাকিস্তান ফেরত আর্মি হলেও ওসমানী সাহেবের সঙ্গে ওনার কী একটা সমস্যা ছিল— যে কারণে উনি আর আর্মিতে ফেরত যেতে পারছিলেন না। প্রায় প্রতিদিন আমার বাসায় আসতেন। যাহোক একদিন আমিই তাকে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যাই। বঙ্গবন্ধু তাকে দেখেই বলেন, ওসমানী সাহেবের তো কিছু সমস্যা আছে। আচ্ছা তুমি যাও, আমি দেখছি। এরপরে তো তার চাকরি হয়ে যায়।
রাজনীতিবিদ হিসেবে সবার জন্য কিছু করা এটা তাঁর সহজাত ছিল। কিন্তু নিজের অবস্থান ও মর্যাদার প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। যেমন এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি একটা হরতাল থেকে গ্রেফতার হয়েছিলেন, তার থেকে ছাড়া পাওয়ার পরের দিন ভোরে তার বাসায় গেছি, জেলখানার অবস্থার ওপর একটা নিউজের জন্য- তার কাছ থেকে কিছু তথ্য নিতে। গিয়ে দেখি জামায়াত নেতা কামরুজ্জামান ও আরেকজন সম্ভবত কাদের মোল্লা তার সামনের সোফায় বসে। কামরুজ্জামান বলছেন, তোফায়েল সাহেব, আপনারা তো তিন জোট করেছেন, আমাদেরকেও নিয়ে চার জোট করেন। সকলের দাবি তো একটাই— কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন। আমাদের দাবিও তো তাই।
তোফায়েল আহমেদ খুব সহজ গলায় বললেন, দেখুন কামরুজ্জামান সাহেব, আপনারা যত আন্দোলন করুন না কেন, যত মানুষ আপনাদের পক্ষে আসুক না কেন, ১৯৭১ সালে আপনারা যা করেছেন, তারপরে এই যে আপনার সঙ্গে কথা বলছি, বাসায় আসছেন— এ পর্যন্তই থাকেন। আপনি আপনার বিবেকের কাছে প্রশ্ন করেন, এর বেশি আশা করতে পারেন কিনা? এই যা করছি এটাই কি বেশি নয়?
সাংবাদিক তোয়াব খান ও এম আর আখতার মুকুল দুজনেই জিয়াউর রহমানের সঙ্গে কাজ করেছেন। নব্বইয়ের দশকে এসে দুজনের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে জানতে পারি, প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে জিয়াউর রহমান শুধু একজন আওয়ামী লীগ নেতাকে রাতে গোপনে তাঁর অফিসে বা অন্য কোথাও দেখা করার জন্য আনতে পারেননি- তিনি তোফায়েল আহমেদ। আর্মির শক্তি বাদ দিয়ে প্রাক্তন আওয়ামী লীগ নেতা যিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সব থেকে বেশি স্নেহধন্য হয়েও খোন্দকার মোশতাক হয়ে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগ দেন— সেই ওবায়দুর রহমানকে দিয়েও চেষ্টা করেও জিয়াউর রহমান সফল হননি।
যে সময়ে এ তথ্য পাই তখন ওবায়দুর রহমানকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি তাঁর আসাদ গেটের বাসায় বসেই বেশি সময় কাটান। একদিন দুপুরে কাজের ফাঁকে অফিস থেকে বের হয়ে তাঁর কাছে যাই। এর আগেও বহুবার গেছি। অনেক সত্য তিনি বলেছেন এর আগেও।
সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। সেদিন তাঁর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, আসলে কী এটা সত্য— জিয়াউর রহমানের ডাকে তোফায়েল আহমেদ কি কোনোদিন কোনো গোপন বৈঠক তাঁর সঙ্গে করেননি? ওবায়দুর রহমান হেসে অনেকটা আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ওটা একটা বরিশাইল্ল্যা। ঘাড় তেড়া। ওকে ম্যানেজ করা যায়নি।
সব তথ্য যে সাংবাদিকদের কাজে লাগে তা নয়। তবে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা সাংবাদিকদের একটা নেশা। তাই ওবায়দুর রহমানের কাছে সত্যতা যাচাইয়ের পরে মনে করি এবার তোফায়েল আহমেদের কাছে যাওয়া যায়।
তখন আওয়ামী লীগ ২১ বছর পরে ক্ষমতায় এসেছে, তোফায়েল আহমেদ মন্ত্রী। আমি সরকারবিরোধী একটি কাগজে কাজ করি। তারপরেও ফোন করে তাঁর কাছে সময় চাইতে তিনি সময় দেন। সময়টা ছিল ‘লাঞ্চ টাইম’। ঢুকতেই তাঁর সঙ্গে লাঞ্চ করতে বলেন। এবং বলেন, তোমার লেখা সরকারের সমালোচনাগুলো পড়ি। আরও সমালোচনা করো। বললাম, আপনাদের ভালো কাজগুলোর তো প্রশংসা করি। তিনি কথাটা কানে নিলেন না।
তারপরে বললেন, তুমি তো নিশ্চয়ই কোনো খবরের জন্য এসেছ। খেতে খেতেই বলো। আমি সমস্যার মধ্যে আছি। ব্যবসায়ীদের সামলানো অনেক কঠিন। আমি বলি, বর্তমানের কোনো খবর নয় ভাই, একটি তথ্যের সত্যতা জানতে এসেছিলাম। বলে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার গোপনে দেখা না করার বিষয়টি সত্য কিনা এবং কেন তিনি করেননি- জানতে চাই।
তিনি বলেন, বিষয়টি সত্য। জিয়া অনেক পথ নিয়েছেন। কিন্তু তুমি তো বোঝ ক’বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছি। আর জেল এবং রাজনীতি এ দুটো যে একসঙ্গে জোড়া তা তো বঙ্গবন্ধুকে দেখে শিখেছি। জীবনের গোটা যৌবনটাই তো বঙ্গবন্ধু জেলে কাটিয়ে দিয়েছিলেন। সে তুলনায় আমরা তো অনেক ভালো অবস্থার মধ্যে রাজনীতি করে গেলাম।
বুঝলাম, ওই দেখা না করার কারণে ওনাকে যদি জেলে যেতে হতো বা আরও কিছু হতো তার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন।
তখন ওনার কাছে প্রশ্ন করি, কিন্তু রাতে গোপনে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করলে দোষ কী ছিল? তিনি বলেন, দেখ রাজনীতি কোনো ষড়যন্ত্র নয়। রাজনীতির যা কিছু হবে সব পাবলিকের কাছে ওপেন থাকবে। আমাদের দলের সঙ্গে বৈঠকের জন্যে যতবার উনি ডাকুক না কেন, দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অবশ্যই যেতাম। কিন্তু রাতের অন্ধকারে তো কোনো রাজনীতি হয় না।
তোফায়েল আহমেদ অনেকদিন নির্বাক ছিলেন। আজ ১ জুন, ২০২৬ মারা গেছেন। তিনি যখন মারা গেছেন সে সময়ে তাদের সৃষ্ট দেশের রাজনীতিকে ষড়যন্ত্রকারী ইউনূস পুরোপুরিই রাতের অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে গেছে। তুলে দিয়ে গেছে বিদেশীদের হাতে।
তাই তোফায়েল আহমেদদের এই দেশ সৃষ্টি সফল হবে যদি সাহসী, সৎ ও ভদ্র তরুণরা আবার রাজনীতিকে রাতের অন্ধকার থেকে বের করে আনতে পারে।
লেখকঃ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 

















