বাংলাদেশের রহস্যময় গেরিলা স্ট্রিট আর্টিস্ট HOBEKI?-এর বহুল আলোচিত চরিত্র ‘সুবোধ’ এবার প্রথমবারের মতো দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের সিকিমে দেখা দিয়েছে। ৩০ জুন সিকিমের রাংপো-গ্যাংটক সড়কের মাজিতার নালা ব্রিজের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে আঁকা বিশালাকৃতির এই স্টেনসিল গ্রাফিতি ইতোমধ্যেই শিল্পপ্রেমী ও দর্শকদের দৃষ্টি কেড়েছে।
প্রায় ২০ ফুট বাই ১২ ফুট আকারের এই শিল্পকর্মে শিল্পীর স্বাক্ষর HOBEKI? স্পষ্টভাবে রয়েছে। আর্ট এজেন্সি ARTCON জানিয়েছে, শিল্পকর্মটি এখনও অক্ষত রয়েছে এবং HOBEKI?-এর ইনস্টাগ্রাম পেজ ও ARTCON-এর নথিভুক্ত তথ্যের মাধ্যমে এর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
সীমান্তের প্রান্তে নতুন ‘সুবোধ’
রাংপোকে সিকিমের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত করা হয়। পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত ও তিস্তা-রাংপো নদী করিডরের এই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান শিল্পকর্মটিকে শুধু একটি গ্রাফিতি নয়, বরং সীমান্ত, যাতায়াত এবং চলাচলকে ঘিরে একটি প্রতীকী বার্তায় পরিণত করেছে।
নতুন শিল্পকর্মে দেখা যায়, খালি গায়ে, এলোমেলো চুল ও ছেঁড়া জিন্স পরা সুবোধ কাঁটাতারের সঙ্গে বাঁধা একটি দোলনায় শুয়ে আছে। তার ডান হাতে একটি তার কাটার যন্ত্র, আর বাঁ হাত ঝুলে আছে নিচে রাখা পানিভর্তি একটি বালতির দিকে। প্রথম দেখায় দৃশ্যটি যেন দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এক ভ্রমণকারীর বিশ্রাম, কিন্তু প্রতিটি উপাদানই ভিন্ন অর্থের ইঙ্গিত বহন করে।
দীর্ঘদিনের প্রতীকী চরিত্র
বাংলাদেশের সমসাময়িক স্ট্রিট আর্টে সুবোধ দীর্ঘদিন ধরেই একটি পরিচিত প্রতীক। আগের বিভিন্ন শিল্পকর্মে তাকে ছেঁড়া জিন্স পরা এক তরুণ হিসেবে দেখা গেছে, যে কখনও একটি খাঁচাবন্দি উজ্জ্বল সূর্য নিয়ে দৌড়াচ্ছে। সেই সব কাজের সঙ্গে ছিল পালিয়ে যাওয়ার আহ্বানধর্মী বার্তা, যা সময়, সমাজ ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
শিল্পসমালোচকদের কাছে এই সিরিজ অভিবাসন, হতাশা, সেন্সরশিপ, সামাজিক অস্থিরতা এবং জনমানসের উদ্বেগের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে।

ঢাকার পর এবার সিকিম
চলতি বছরের ৭ মার্চ ঢাকার আগারগাঁও পুরোনো বিমানবন্দর এলাকায় HOBEKI?-এর ‘স্টপ ওয়ার’ সিরিজের অংশ হিসেবে সুবোধের আরেকটি কাজ প্রকাশিত হয়। তবে পরে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারের ১১ নম্বর গেটসংলগ্ন দেয়ালের একটি অংশ ভেঙে ফেলার সময় সেই ম্যুরালটিও মুছে যায়।
এ ঘটনায় শিল্পপ্রেমীদের একাংশ এটিকে জনপরিসরের শিল্পের বেদনাদায়ক বিলুপ্তি হিসেবে দেখলেও, অন্যদের মতে এটি ছিল অবকাঠামোগত কাজের অংশ। ফলে ঢাকার সেই শিল্পকর্মটি জনশিল্পের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে ওঠে।
নতুন শিল্পকর্মের ভিন্ন বার্তা
ARTCON-এর প্রতিষ্ঠাতা এআরকে রীপনের ভাষ্য, আগের সুবোধকে সবসময় ভয়, তাড়া কিংবা অনিশ্চয়তার মধ্যে চলতে দেখা গেলেও এবার সে আর পালাচ্ছে না, বরং গন্তব্যে পৌঁছেছে।
তার মতে, সীমান্ত পেরিয়ে থাকা এই সুবোধ ভয়ের শরণার্থী নয়; বরং এক প্রতীকী ভ্রমণকারী। আতঙ্কে পালিয়ে নয়, আত্মবিশ্বাস নিয়ে সে বিশ্রাম নিচ্ছে। শিল্পকর্মটি স্বাধীনতা, সীমান্ত অতিক্রম, আশা, কূটনীতি, মানুষে-মানুষে সংযোগ, প্রতিবাদ এবং সীমারেখা অতিক্রমের ভাবনাকে একসঙ্গে ধারণ করেছে।
সময়ের সঙ্গে মিলেই প্রতীকী তাৎপর্য
শিল্পকর্মটির প্রকাশের সময়ও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর ২০২৬ সালের ২৮ জুন বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারত আবার পর্যটক ভিসার আবেদন গ্রহণ শুরু করে। বাংলাদেশের পাঁচটি ভিসা কেন্দ্রের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এই সেবা পুনরায় চালু করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল দুই দেশের জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ আরও জোরদার করা।
এর মাত্র দুই দিন পর ভারতের মাটিতে সুবোধের আবির্ভাবকে ARTCON প্রতীকীভাবে নতুন অর্থে দেখছে। এআরকে রীপনের ভাষায়, এটি বাস্তব ভ্রমণের দাবি নয়; বরং এমন একটি শিল্পিত ইঙ্গিত, যেখানে সুবোধ যেন নতুন ভিসা ব্যবস্থার পর ভারতের মাটিতে পৌঁছানো বাংলাদেশের প্রথম প্রতীকী পর্যটক।
সিকিমে ‘সুবোধ’-এর নতুন শিল্পকর্ম সীমান্ত, চলাচল, স্বাধীনতা এবং মানবিক সংযোগ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে, যা সমসাময়িক স্ট্রিট আর্টের আলোচনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে উঠতে পারে।
সিকিমে সুবোধের আবির্ভাব, সীমান্ত পেরিয়ে HOBEKI?-এর নতুন শিল্পকর্মে স্বাধীনতা, ভ্রমণ ও মানবিক সংযোগের প্রতীকী বার্তা উঠে এসেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















