যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় কোম্পানির শক্তিশালী মুনাফা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের নতুন করে আশাবাদী করে তুলেছে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট মুনাফার হার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোয় বাজারের বর্তমান উচ্চ মূল্যায়নকে অনেকেই এখন আরও গ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন। বিশেষ করে প্রযুক্তি খাতের প্রবৃদ্ধি এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সামনে মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার এবং প্রযুক্তি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে এই ইতিবাচক প্রবণতা কতদিন টিকবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
করপোরেট মুনাফায় নতুন রেকর্ড
চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকে অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোর গড় নিট মুনাফার হার দাঁড়িয়েছে ১৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ১০০ ডলার আয়ের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ১৫ ডলার নিট মুনাফা করতে সক্ষম হয়েছে। এটি এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিট মুনাফার হার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এর আগের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা মাত্র এক প্রান্তিক আগেই গড়ে উঠেছিল। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে করপোরেট মুনাফার এমন উল্লম্ফন বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।
শুধু প্রযুক্তি নয়, অন্য খাতও শক্তিশালী
এই প্রবৃদ্ধি শুধু প্রযুক্তি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। আর্থিক সেবা, শিল্প উৎপাদনসহ একাধিক খাতও তাদের গত পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় বেশি মুনাফা অর্জন করেছে।
এতে ধারণা করা হচ্ছে, বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ কিংবা মূল্যস্ফীতির মতো ঝুঁকির মধ্যেও বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষমতা অর্জন করেছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তির প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তি করপোরেট উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে চিপ উৎপাদনকারী ও প্রযুক্তি অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল মুনাফা করছে।
তবে একই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল বিনিয়োগ করায় কিছু বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সব প্রতিষ্ঠানের লাভের চিত্র এক রকম নয়।
![]()
শেয়ারবাজারে ইতিবাচক বার্তা
করপোরেট আয় দীর্ঘদিন ধরেই শেয়ারবাজারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০-ভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয় বৃদ্ধির হার পৌঁছেছে ২৯ শতাংশে, যা ২০২১ সালের শেষ প্রান্তিকের পর সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, দ্বিতীয় প্রান্তিকেও কোম্পানিগুলোর মুনাফা শক্তিশালী থাকবে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং প্রযুক্তি অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে।
দাম বাড়িয়ে মুনাফা ধরে রাখার চেষ্টা
কিছু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দাম বাড়ানোর পথ বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে স্মৃতি সংরক্ষণ ও তথ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তির যন্ত্রাংশের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তা পণ্যের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে, যাতে মুনাফার হার বজায় থাকে।
বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে নিট মুনাফার হার কিছুটা কমে ১৪ শতাংশে নামতে পারে। তবে সেটিও গত বছরের একই সময় এবং পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় বেশি থাকবে।
সামনের বড় ঝুঁকি কোথায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান মুনাফার বড় অংশ প্রযুক্তি খাত থেকে আসছে। ফলে এই খাতে চাহিদা কমে গেলে বা মূল্য নির্ধারণের সক্ষমতা দুর্বল হলে করপোরেট আয় দ্রুত কমে যেতে পারে।
এদিকে শেয়ারের মূল্যায়ন এখনও তুলনামূলকভাবে উচ্চ। পাশাপাশি উচ্চ সুদের হার ও কঠোর আর্থিক পরিবেশ ব্যবসার ঋণ ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে মুনাফার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান অব্যাহত থাকায় বছরের শেষ দিকে সুদের হার আরও বাড়তে পারে বলে বাজারে ধারণা তৈরি হয়েছে। এতে করপোরেট খাতের জন্য অর্থায়নের ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শক্তিশালী করপোরেট আয় বিনিয়োগকারীদের স্বস্তি দিলেও, এই প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে প্রযুক্তি খাতের ধারাবাহিকতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক নীতির দিকেই এখন সবচেয়ে বেশি নজর থাকবে।
করপোরেট মুনাফার রেকর্ডে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে আস্থা বেড়েছে। তবে উচ্চ সুদের হার, মূল্যস্ফীতি ও প্রযুক্তি খাতের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















