যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ এখনও স্পষ্ট। বহু ভবন ভেঙে পড়ে আছে, কোথাও চলছে ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ, আবার কোথাও নতুন করে দোকানের শাটার উঠছে। লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের দাহিয়া এলাকায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবন ফিরতে শুরু করেছে। দীর্ঘ সংঘাত, বারবার পালিয়ে যাওয়া এবং অনিশ্চয়তার পর বাসিন্দারা আবার নিজেদের ঘর, ব্যবসা ও পরিচিত জীবনে ফিরতে চাইছেন। তাদের সবচেয়ে বড় আশা, এবার যেন যুদ্ধবিরতি টিকে থাকে।
ফের জমে উঠছে জনজীবন
কয়েক মাস আগেও যে এলাকাজুড়ে ছিল আতঙ্ক, এখন সেখানে আবার যানজট দেখা যাচ্ছে। বেকারিতে রুটি তৈরি হচ্ছে, ক্যাফেগুলোতে ভিড় বাড়ছে, পরিবার ও বন্ধুরা রাত পর্যন্ত আড্ডায় সময় কাটাচ্ছেন। যুদ্ধের কারণে থমকে যাওয়া ব্যবসা-বাণিজ্যও ধীরে ধীরে সচল হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, মানুষ শুধু নিজের বাড়িতে ফিরছেন না, বরং স্বাভাবিক জীবনও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। অনেকেই বিশ্বাস করেন, সব প্রতিকূলতার পরও দাহিয়াই তাদের প্রকৃত ঠিকানা।
বারবার পালিয়ে আবার ফিরে আসা
গত কয়েক মাসে এই এলাকার মানুষকে একাধিকবার বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয়েছে। রাতের অন্ধকারে হামলার আশঙ্কায় পরিবারগুলো তড়িঘড়ি করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ অন্য শহরে, আবার কেউ নিজের গাড়িতেই অস্থায়ীভাবে দিন কাটিয়েছেন।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেই মানুষ আবার ঘরে ফিরেছেন। কিন্তু নতুন করে হামলা শুরু হওয়ায় অনেককে আবারও এলাকা ছাড়তে হয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির পর আবারও ধীরে ধীরে মানুষ ফিরতে শুরু করেছেন, যদিও মাঝেমধ্যে নতুন হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
ব্যবসায় বড় ধাক্কা
সংঘাতে শুধু বাড়িঘর নয়, স্থানীয় অর্থনীতিও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ভেঙে গেছে কাচের সামনের অংশ, নষ্ট হয়েছে পণ্য। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ থাকায় বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে পণ্য আমদানিতেও বিঘ্ন ঘটায় ব্যবসা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবু অনেকেই নতুন করে দোকান খুলেছেন। তাদের বিশ্বাস, ধীরে ধীরে ক্রেতা ফিরলে ব্যবসাও আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।
ধর্মীয় আচারেও ফিরেছে প্রাণ
দাহিয়ার মানুষের কাছে আশুরা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি তাদের ঐক্য ও মানসিক শক্তিরও প্রতীক। যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে হলেও এ বছর অনেক পরিবার আশুরার সময় নিজ এলাকায় ফিরতে পেরে স্বস্তি প্রকাশ করেছে।
এলাকার বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছাসেবকেরা পথচারীদের পানি ও কফি বিতরণ করছেন। বড় বড় পাত্রে ঐতিহ্যবাহী খাবার রান্না করে প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। সন্ধ্যার পর বিভিন্ন স্থানে প্রার্থনা, ধর্মীয় আলোচনা ও স্মরণানুষ্ঠানে মানুষের অংশগ্রহণও বেড়েছে।
অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি
সবাই অবশ্য এখনও ফিরে আসতে পারেননি। অনেক বাড়ি এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে সেখানে বসবাস সম্ভব নয়। আবার বয়স্ক অনেক মানুষও স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফিরে আসতে চাইছেন না।
এদিকে এলাকাজুড়ে এখনও মাঝে মাঝে নজরদারি ড্রোনের শব্দ শোনা যায়, যা বাসিন্দাদের মনে যুদ্ধের স্মৃতি আবারও ফিরিয়ে আনে। তবুও মানুষ দৈনন্দিন জীবন থামিয়ে রাখতে রাজি নন। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ চলছে, ফলের দোকানে আবার পণ্য সাজানো হচ্ছে, রাস্তায় মোটরসাইকেল ও গাড়ির ভিড় বাড়ছে।
দাহিয়ার বাসিন্দাদের ভাষায়, যুদ্ধ তাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু আশা হারিয়ে ফেললে জীবনও থেমে যাবে। তাই ক্ষতচিহ্ন নিয়েই তারা নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছেন এবং শান্তির স্থায়ী পথের অপেক্ষায় রয়েছেন।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও বৈরুতের দাহিয়ায় ফিরছে জনজীবন। যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে বাসিন্দাদের সংগ্রাম ও শান্তির প্রত্যাশার গল্প।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















