দ্রুত বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া জনসংখ্যা, পুনর্বাসন সেবার বাড়তি চাহিদা এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার—এই তিন বাস্তবতাকে সামনে রেখে বিদেশি স্টার্টআপগুলোর কাছে নতুন সম্ভাবনার বাজার হয়ে উঠছে জাপান। বিশেষ করে স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, পুনর্বাসন এবং নারীদের স্বাস্থ্যসেবাভিত্তিক উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশটিতে ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
পুনর্বাসন প্রযুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাভিত্তিক স্টার্টআপ গ্রাভিট্রেক্স এমন একটি হাঁটা-সহায়ক যন্ত্র তৈরি করেছে, যা স্ট্রোক বা গুরুতর অসুস্থতার পর রোগীদের হাঁটার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করে। যন্ত্রটির বিশেষত্ব হলো এতে ব্যাটারি, মোটর বা জটিল ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা নেই। পুরো ব্যবস্থাটি যান্ত্রিক হওয়ায় এটি তুলনামূলকভাবে সহজ, কম খরচের এবং ব্যবহারবান্ধব।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কিরা বার্নস বলেন, জাপানের জনমিতিক বাস্তবতা শুরু থেকেই তাদের কাছে আকর্ষণীয় ছিল। দেশটিতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পুনর্বাসন সেবার চাহিদাও বাড়ছে, যা তাদের প্রযুক্তির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
জাপানে প্রবেশের প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে গ্রাভিট্রেক্স ‘পিচ টু টোকিও’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আঞ্চলিক বিজয়ী হয় এবং পরে ‘জাপান প্রাইজ’ অর্জন করে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি জাপানের বিভিন্ন স্টার্টআপ হাবে এক বছরের কর্মক্ষেত্র ব্যবহারের সুযোগ পায়। সফরের সময় তারা দেশটির পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যৎ অংশীদারিত্বের সম্ভাবনাও খুঁজেছে।
কঠোর নিয়ম থাকলেও বাজার আকর্ষণীয়
চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতে জাপানে প্রবেশ করতে হলে কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মুখোমুখি হতে হয়। তবে গ্রাভিট্রেক্সের মতে, জাপানের বাজারে যে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা রয়েছে, তা এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রমের যথেষ্ট কারণ।
নারীস্বাস্থ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার
যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি স্টার্টআপ অ্যামিলিসও জাপানে কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের প্রশাসনিক কাজ ডিজিটাল করার পাশাপাশি চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি প্রধান ইয়াসমিন বাবা জানান, সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের একজনের ডিম্বাণু সংরক্ষণের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই এই উদ্যোগের সূচনা। সেই অভিজ্ঞতায় তারা উপলব্ধি করেন যে নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা ও বৈচিত্র্যময় তথ্যের অভাব রয়েছে। একই ধরনের ওষুধ প্রয়োগের পরও রোগীদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভিন্ন হওয়ার মতো বিষয়গুলো আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

অ্যামিলিসের সফটওয়্যার চিকিৎসকদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে জমা হওয়া তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্লেষণের উপযোগী মানসম্মত ডেটায় রূপান্তরিত হয়। এর মাধ্যমে এন্ডোমেট্রিওসিস বা জরায়ুর ফাইব্রয়েডের মতো রোগ দ্রুত ও আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠানটি বড় স্ক্যানিং সেবা প্রদানকারীদের সঙ্গে কাজ করছে এবং এআইভিত্তিক রোগ নির্ণয় প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। মধ্যপ্রাচ্যেও তারা কার্যক্রম শুরু করছে। আগামী দেড় বছরের মধ্যে জাপানের বাজারে প্রবেশের লক্ষ্য রয়েছে তাদের।
স্থিতিশীল পরিবেশ বিদেশি উদ্যোক্তাদের আকর্ষণ করছে
‘পিচ টু টোকিও’ আয়োজনকারী ভেঞ্চার ক্যাফে গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা টিম রোয়ের মতে, জাপান শুধু নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষার উপযোগী বাজারই নয়, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কারণেও বিদেশি স্টার্টআপগুলোর কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে নীতিগত অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে জাপানকে অনেক উদ্যোক্তা একটি স্থিতিশীল গন্তব্য হিসেবে দেখছেন। তুলনামূলকভাবে কম জীবনযাত্রার ব্যয়ও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
তবে বিদেশি স্টার্টআপ আরও বেশি আকৃষ্ট করতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা এবং সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন। তার মতে, শুধু সুযোগের কথা বললেই হবে না, আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তাদের জন্য সমন্বিত ও কার্যকর পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।
জাপানে বিদেশি স্টার্টআপের নতুন সুযোগ
জাপানের বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তির চাহিদাকে কেন্দ্র করে বিদেশি স্টার্টআপগুলোর বিনিয়োগ ও বাজার সম্প্রসারণের আগ্রহ বাড়ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















