০৮:৩৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬
চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে গুলি: পাঁচলাইশে যুবক নিহত, তদন্তে নেমেছে পুলিশ আপনার অতীতই কি বার্ধক্যে চোখ ভিজিয়ে দেয়? স্মৃতি, আবেগ আর জীবনের শেষ অধ্যায়ের নীরব ভাষা ১৭ দিন পর সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে উধাও ৩ যুবক, তাদের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা রেমিট্যান্সে ছন্দপতন, জুনে আট মাসের সর্বনিম্ন প্রবাসী আয় বিজয়ের ভক্তের হাতে ‘অপহরণের’ অভিজ্ঞতা জানালেন ছেলে জেসন সঞ্জয় জাপানের বার্ধক্যই বিদেশি স্টার্টআপের নতুন সুযোগ, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে বাড়ছে আগ্রহ তামিলনাড়ুতে সরকার ভাঙার চেষ্টার অভিযোগ, টিভিকে বিধায়ককে ৩৫ কোটি রুপির প্রস্তাবের দাবি খামেনির জানাজায় ভারতের বিজেপি ও কংগ্রেস নেতাদের আমন্ত্রণ, দিল্লির প্রতিনিধিদলও যাচ্ছে ইরানে ভারতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি, সেনা সদস্যদের মৃত্যুর তথ্য গোপনের অভিযোগে তীব্র বিতর্ক পাকিস্তানে জুনে কমেছে সন্ত্রাসী হামলা, তবু উচ্চপ্রোফাইল হামলার উদ্বেগ কাটেনি

আপন আপন দেশ, এক হৃদয়ের টান: জাপানের ‘লিটল ব্রাজিল’-এ বিশ্বকাপ ঘিরে আবেগের লড়াই

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জাপান ও ব্রাজিল মুখোমুখি হওয়ার আগেই জাপানের ছোট্ট শহর ওইজুমিতে তৈরি হয়েছিল এক ভিন্ন আবহ। এই শহরকে অনেকে ‘লিটল ব্রাজিল’ নামে চেনেন। এখানে বসবাসকারী হাজারো ব্রাজিলীয় বংশোদ্ভূত মানুষের কাছে ম্যাচটি ছিল শুধু ফুটবলের নয়, বরং দুই দেশের প্রতি ভালোবাসা আর পরিচয়ের এক আবেগঘন পরীক্ষা।

ম্যাচের আগে আয়োজিত এক ব্রাজিলীয় সাংস্কৃতিক উৎসবে সাম্বার তালে তালে নেচে, ব্রাজিলের পতাকা হাতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে শিশু থেকে বড়—সবাই। জাপানেই জন্ম নেওয়া ব্রাজিলীয় বংশোদ্ভূত অনেক শিশুর মতোই ৯ বছর বয়সী কার্লোস এদুয়ার্দোও ব্রাজিলের জয়ের স্বপ্ন দেখছিল। তার কথায়, সে জাপানে বড় হলেও হৃদয় পড়ে আছে ব্রাজিলে। তাই ভোররাতে উঠে পরিবারের সঙ্গে ম্যাচ দেখার পরিকল্পনাও করেছিল সে।

দুই দেশের ইতিহাসে গড়া এক সম্পর্ক

টোকিওর উত্তরে অবস্থিত ওইজুমি শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জন ব্রাজিলীয় বাসিন্দা রয়েছেন। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে মানুষের যাতায়াত ও অভিবাসনের ইতিহাস থেকেই গড়ে উঠেছে এই অনন্য জনপদ।

এখানে এমন স্কুল রয়েছে যেখানে পর্তুগিজ ও জাপানি—দুই ভাষায় পড়ানো হয়। গির্জার পাশেই রয়েছে শিন্তো উপাসনালয়। আবার রাস্তায় একসঙ্গে মিশে যায় ব্রাজিলীয় খাবারের সুবাস ও জাপানি রান্নার ঘ্রাণ। ফলে ওইজুমি শুধু একটি শহর নয়, বরং দুই সংস্কৃতির মিলনস্থল।

অভিবাসনের দীর্ঘ পথচলা

দুই দেশের সম্পর্কের সূচনা আরও আগে। ১৯০৮ সালে প্রায় ৮০০ জাপানি শ্রমিক কফির বাগানে কাজ করতে ব্রাজিলে পাড়ি জমান। সে সময় জাপানে ছিল দারিদ্র্য ও জনসংখ্যার চাপ। পরে পরিস্থিতি বদলায়। শিল্প ও নির্মাণ খাতে শ্রমিকের চাহিদা বাড়ায় জাপান বিদেশে থাকা জাপানি বংশোদ্ভূতদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায়।

বর্তমানে জাপানে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার ব্রাজিলীয় বাস করেন। অন্যদিকে ব্রাজিলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাপানি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী রয়েছে, যার সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ।

In Japan's 'Little Brazil,' a World Cup Showdown Tests Loyalties - The New  York Times

ফুটবলের ম্যাচ, পরিচয়েরও পরীক্ষা

ম্যাচের দিন ওইজুমির মানুষের মনে ছিল দ্বৈত অনুভূতি। একদিকে জন্মভূমি বা বসবাসের দেশ জাপান, অন্যদিকে পূর্বপুরুষের দেশ ব্রাজিল। এই দ্বন্দ্ব অনেকের মধ্যেই দেখা যায়।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাপানে বসবাসকারী এক ব্রাজিলীয় শ্রমিক জানান, তিনি ব্রাজিলকেই সমর্থন করেছেন। তবে তার বিশ্বাস, এই ম্যাচ দুই দেশের মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে এবং একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং বন্ধু হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি করবে।

স্থানীয় এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দর্শকদের মধ্যে ম্যাচের ফল নিয়ে মতামত নেওয়া হলে অধিকাংশই ব্রাজিলের জয়ের পক্ষে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে অনেকেই এগিয়ে রেখেছিলেন, যদিও জাপানও দুর্দান্ত লড়াই করে নকআউট পর্বে পৌঁছেছিল।

নিরপেক্ষ থাকার বার্তা

বিশ্বকাপের উন্মাদনার মাঝেও ওইজুমি শহর প্রশাসন ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। শহরজুড়ে এমন পোস্টার টাঙানো হয়, যেখানে দুই দেশের জার্সির সমন্বয়ে তৈরি পোশাক পরে সবাইকে জাপান ও ব্রাজিল—উভয় দলকেই সমর্থন করার আহ্বান জানানো হয়।

এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল প্রতিযোগিতার মধ্যেও দুই দেশের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বার্তা তুলে ধরা।

খেলার ফলের চেয়ে বড় সম্পর্ক

শেষ পর্যন্ত নাটকীয় লড়াইয়ে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তের গোলে ব্রাজিল জয় তুলে নিয়ে পরের পর্বে উঠে যায়। তবে ওইজুমির মানুষের কাছে ম্যাচের ফলই ছিল শেষ কথা নয়।

ব্রাজিল ও জাপান—দুই দেশের শিকড় বহন করা অনেক পরিবারের বিশ্বাস, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু দুই দেশের মানুষের মধ্যে যে সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন তৈরি হয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড় অর্জন। ফুটবলের উত্তেজনা একদিন থেমে গেলেও সেই সম্পর্ক ভবিষ্যতেও একইভাবে অটুট থাকবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে গুলি: পাঁচলাইশে যুবক নিহত, তদন্তে নেমেছে পুলিশ

আপন আপন দেশ, এক হৃদয়ের টান: জাপানের ‘লিটল ব্রাজিল’-এ বিশ্বকাপ ঘিরে আবেগের লড়াই

০৭:০৯:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জাপান ও ব্রাজিল মুখোমুখি হওয়ার আগেই জাপানের ছোট্ট শহর ওইজুমিতে তৈরি হয়েছিল এক ভিন্ন আবহ। এই শহরকে অনেকে ‘লিটল ব্রাজিল’ নামে চেনেন। এখানে বসবাসকারী হাজারো ব্রাজিলীয় বংশোদ্ভূত মানুষের কাছে ম্যাচটি ছিল শুধু ফুটবলের নয়, বরং দুই দেশের প্রতি ভালোবাসা আর পরিচয়ের এক আবেগঘন পরীক্ষা।

ম্যাচের আগে আয়োজিত এক ব্রাজিলীয় সাংস্কৃতিক উৎসবে সাম্বার তালে তালে নেচে, ব্রাজিলের পতাকা হাতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে শিশু থেকে বড়—সবাই। জাপানেই জন্ম নেওয়া ব্রাজিলীয় বংশোদ্ভূত অনেক শিশুর মতোই ৯ বছর বয়সী কার্লোস এদুয়ার্দোও ব্রাজিলের জয়ের স্বপ্ন দেখছিল। তার কথায়, সে জাপানে বড় হলেও হৃদয় পড়ে আছে ব্রাজিলে। তাই ভোররাতে উঠে পরিবারের সঙ্গে ম্যাচ দেখার পরিকল্পনাও করেছিল সে।

দুই দেশের ইতিহাসে গড়া এক সম্পর্ক

টোকিওর উত্তরে অবস্থিত ওইজুমি শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জন ব্রাজিলীয় বাসিন্দা রয়েছেন। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দুই দেশের মধ্যে মানুষের যাতায়াত ও অভিবাসনের ইতিহাস থেকেই গড়ে উঠেছে এই অনন্য জনপদ।

এখানে এমন স্কুল রয়েছে যেখানে পর্তুগিজ ও জাপানি—দুই ভাষায় পড়ানো হয়। গির্জার পাশেই রয়েছে শিন্তো উপাসনালয়। আবার রাস্তায় একসঙ্গে মিশে যায় ব্রাজিলীয় খাবারের সুবাস ও জাপানি রান্নার ঘ্রাণ। ফলে ওইজুমি শুধু একটি শহর নয়, বরং দুই সংস্কৃতির মিলনস্থল।

অভিবাসনের দীর্ঘ পথচলা

দুই দেশের সম্পর্কের সূচনা আরও আগে। ১৯০৮ সালে প্রায় ৮০০ জাপানি শ্রমিক কফির বাগানে কাজ করতে ব্রাজিলে পাড়ি জমান। সে সময় জাপানে ছিল দারিদ্র্য ও জনসংখ্যার চাপ। পরে পরিস্থিতি বদলায়। শিল্প ও নির্মাণ খাতে শ্রমিকের চাহিদা বাড়ায় জাপান বিদেশে থাকা জাপানি বংশোদ্ভূতদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায়।

বর্তমানে জাপানে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার ব্রাজিলীয় বাস করেন। অন্যদিকে ব্রাজিলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাপানি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠী রয়েছে, যার সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ।

In Japan's 'Little Brazil,' a World Cup Showdown Tests Loyalties - The New  York Times

ফুটবলের ম্যাচ, পরিচয়েরও পরীক্ষা

ম্যাচের দিন ওইজুমির মানুষের মনে ছিল দ্বৈত অনুভূতি। একদিকে জন্মভূমি বা বসবাসের দেশ জাপান, অন্যদিকে পূর্বপুরুষের দেশ ব্রাজিল। এই দ্বন্দ্ব অনেকের মধ্যেই দেখা যায়।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাপানে বসবাসকারী এক ব্রাজিলীয় শ্রমিক জানান, তিনি ব্রাজিলকেই সমর্থন করেছেন। তবে তার বিশ্বাস, এই ম্যাচ দুই দেশের মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসবে এবং একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং বন্ধু হিসেবে দেখার সুযোগ তৈরি করবে।

স্থানীয় এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে দর্শকদের মধ্যে ম্যাচের ফল নিয়ে মতামত নেওয়া হলে অধিকাংশই ব্রাজিলের জয়ের পক্ষে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে অনেকেই এগিয়ে রেখেছিলেন, যদিও জাপানও দুর্দান্ত লড়াই করে নকআউট পর্বে পৌঁছেছিল।

নিরপেক্ষ থাকার বার্তা

বিশ্বকাপের উন্মাদনার মাঝেও ওইজুমি শহর প্রশাসন ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। শহরজুড়ে এমন পোস্টার টাঙানো হয়, যেখানে দুই দেশের জার্সির সমন্বয়ে তৈরি পোশাক পরে সবাইকে জাপান ও ব্রাজিল—উভয় দলকেই সমর্থন করার আহ্বান জানানো হয়।

এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল প্রতিযোগিতার মধ্যেও দুই দেশের বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বার্তা তুলে ধরা।

খেলার ফলের চেয়ে বড় সম্পর্ক

শেষ পর্যন্ত নাটকীয় লড়াইয়ে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তের গোলে ব্রাজিল জয় তুলে নিয়ে পরের পর্বে উঠে যায়। তবে ওইজুমির মানুষের কাছে ম্যাচের ফলই ছিল শেষ কথা নয়।

ব্রাজিল ও জাপান—দুই দেশের শিকড় বহন করা অনেক পরিবারের বিশ্বাস, বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু দুই দেশের মানুষের মধ্যে যে সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন তৈরি হয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বড় অর্জন। ফুটবলের উত্তেজনা একদিন থেমে গেলেও সেই সম্পর্ক ভবিষ্যতেও একইভাবে অটুট থাকবে।