ভূখণ্ড দখল করে সাম্রাজ্য গড়ার যুগ অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের ধরন বদলে গেছে মৌলিকভাবে। এখন সামরিক শক্তি, অর্থনীতি, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তি, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব—এসবের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে আধুনিক সাম্রাজ্য। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এমনই যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্র কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নয়; বরং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট স্বার্থের একটি পরস্পরসংযুক্ত কাঠামো।
আধুনিক সাম্রাজ্যের নতুন সংজ্ঞা
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আধুনিক সাম্রাজ্যকে ঊনবিংশ শতাব্দীর উপনিবেশিক শাসনের সঙ্গে তুলনা করলে ভুল হবে। বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশ কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নয়, বরং এমন একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ তৈরি করে প্রভাব বিস্তার করে, যেখানে অন্য দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতদের সহযোগিতা করাই লাভজনক হয়ে ওঠে।
ফলে বহু দেশ ও প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করলেও সেই সম্পর্কের নিয়ম-কানুন নির্ধারণের ক্ষমতা মূলত ওয়াশিংটনের হাতেই থেকে যায়।
ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়?
এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির কেন্দ্র শুধু হোয়াইট হাউস বা কংগ্রেস নয়। বরং প্রতিরক্ষা দপ্তর, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, প্রযুক্তি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক সংস্থা এবং বহুজাতিক করপোরেশন—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামোই বৈশ্বিক ক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করেছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। একইভাবে বৈশ্বিক ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থায়ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ভূমিকা বহাল রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই দেশটির প্রভাব এখনো গভীর।
সংকটের সময়ই প্রকাশ পায় প্রকৃত ক্ষমতা
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, বৈশ্বিক সংকট দেখা দিলে বোঝা যায় আসল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কার হাতে। অতীতে আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থার পরিবর্তন থেকে শুরু করে বৈশ্বিক মেধাস্বত্ব নীতির বিস্তার—বড় বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রই নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে।
তবে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, একটি দেশের নীতি সব সময় এককভাবে নির্ধারিত হয় না। রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্বার্থগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তির টানাপোড়েনের ফলেই নীতিনির্ধারণের চূড়ান্ত রূপ তৈরি হয়।

নতুন প্রশাসন ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা
সাম্প্রতিক মার্কিন প্রশাসনের নীতি নিয়ে বিশ্লেষণে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শিল্পনীতি, শুল্কব্যবস্থা, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে দীর্ঘমেয়াদে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের নিজের শক্তির ভিত্তিকেই দুর্বল করতে পারে।
বিশ্লেষকের মতে, একটি সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে শুধু সামরিক ক্ষমতা যথেষ্ট নয়; সহযোগিতার পরিবেশও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যদি সেই আস্থা দুর্বল হয়, তবে বৈশ্বিক নেতৃত্বও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
বিলিয়নিয়ার অর্থনীতি বনাম রাষ্ট্রের স্বার্থ
লেখায় আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের বড় ধনকুবেরদের স্বার্থ সব সময় রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে এক নয়। শ্রমবাজারে নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও নমনীয় করা এবং নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার প্রবণতা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
এতে করপোরেট খাত লাভবান হলেও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আয়ের বৈষম্য আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
চীনের উত্থান, কিন্তু পূর্ণ বিকল্প নয়
বিশ্ব রাজনীতিতে চীনের দ্রুত উত্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, অন্তত এখনই যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৈশ্বিক প্রভাববলয় গড়ে তোলার অবস্থানে নেই বেইজিং।
উৎপাদন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও কিছু উচ্চপ্রযুক্তি খাতে চীন এগিয়ে থাকলেও আর্থিক খাতের দুর্বলতা, জনসংখ্যাগত সংকট এবং বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতা দেশটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। তাই ভবিষ্যতের বিশ্ব হয়তো একক আধিপত্যের পরিবর্তে আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থার দিকে এগোতে পারে।
নেতৃত্বই নির্ধারণ করবে আগামী বিশ্বের পথ
বিশ্লেষণের শেষাংশে বলা হয়েছে, ইতিহাসে প্রতিটি বৈশ্বিক পরিবর্তনের সময় নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক আন্দোলন এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব একসঙ্গে কাজ করলে বড় ধরনের সংঘাত ছাড়াও নতুন আন্তর্জাতিক ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব।
বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনো প্রবল হলেও চীনের উত্থান, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, জ্বালানি পরিবর্তন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন আগামী দিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে আরও জটিল ও বহুস্তরীয় করে তুলছে। সেই বাস্তবতায় ক্ষমতার সংজ্ঞাও আর আগের মতো নেই; এখন তা নির্ধারিত হচ্ছে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জ্ঞান এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের সমন্বয়ে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















