চীনের উত্থান নিয়ে এখন আর তেমন বিতর্ক নেই। বিশ্ব উৎপাদন ব্যবস্থার কেন্দ্র, উচ্চপ্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় দ্রুত অগ্রগতি, অবকাঠামো নির্মাণে বিস্ময়কর সক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি—সব মিলিয়ে দেশটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ফলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুও বদলে গেছে। একসময় প্রশ্ন ছিল, চীন আদৌ বিশ্বশক্তি হতে পারবে কি না; এখন প্রশ্ন হলো, সেই শক্তির পরিণতি কী হবে।
কিন্তু এই আলোচনায় একটি মৌলিক বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষমতা যত বড়ই হোক, তার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নির্ভর করে সে নিজেকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করে এবং নাগরিকদের সামনে কী ধরনের জাতীয় পরিচয় নির্মাণ করে তার ওপর। এই দৃষ্টিকোণ থেকে চীনের বর্তমান অবস্থান এক গভীর বৈপরীত্যের জন্ম দিয়েছে। বাইরে থেকে আত্মবিশ্বাসী মনে হলেও ভেতরে রাষ্ট্রটি যেন এখনও নিজের পরিচয় নিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হতে পারেনি।
চীনের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। দর্শন, সাহিত্য, চিকিৎসাবিজ্ঞান, ধর্মীয় চিন্তা ও শিল্পকলায় তার অবদান মানবসভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে চীনের আত্মপরিচয় তুলনামূলকভাবে নতুন। দীর্ঘকাল ধরে অঞ্চলটি একটি সভ্যতার কেন্দ্র ছিল, বর্তমান অর্থে একটি একক জাতিরাষ্ট্র নয়। বিভিন্ন রাজবংশের অধীনে ভূখণ্ডের বিস্তার ও সংকোচন ঘটেছে, শাসক বদলেছে, রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় ইতিহাসের এই বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে একক রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে নিয়ে আসা সহজ ছিল না।
এই জটিলতার প্রতিফলন আজও দেখা যায়। বর্তমান চীনের মানচিত্রে এমন বহু অঞ্চল রয়েছে, যেগুলোর ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয় মূল ভূখণ্ডের হান জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে না। রাষ্ট্র অবশ্য এই বৈচিত্র্যকে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে। সরকারি ভাষ্যে সব জনগোষ্ঠী একই জাতীয় পরিবারের অংশ। কিন্তু বাস্তবে এই বহুত্বকে পরিচালনা করতে গিয়ে কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, নজরদারি এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ক্রমশ বেড়েছে।
এখানেই চীনের পরিচয়-সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রকাশ পায়। আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র সাধারণত নিজের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ককে ভয় পায় না। ভিন্নমত বা বিকল্প ব্যাখ্যাও তার অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে না। কিন্তু যখন ইতিহাস, সীমান্ত বা জাতীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলাই রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে, তখন বোঝা যায় রাষ্ট্র এখনও নিজের বয়ানকে অটল বলে বিশ্বাস করতে পারছে না।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে এই জাতীয় পরিচয়কে আরও সুসংহত করার চেষ্টা হয়েছে। কমিউনিস্ট বিপ্লবের উত্তরাধিকার এবং প্রাচীন চীনা ঐতিহ্যের নির্বাচিত অংশকে একত্র করে একটি নতুন রাষ্ট্র-আখ্যান নির্মাণ করা হয়েছে। আনুগত্য, শৃঙ্খলা, জাতীয় গৌরব এবং ঐক্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই প্রচেষ্টা রাজনৈতিকভাবে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এটি কি চীনের বহুবর্ণ ইতিহাসকে ধারণ করতে সক্ষম?
রাষ্ট্রের ইতিহাস যত দীর্ঘ, তার অভিজ্ঞতাও তত বৈচিত্র্যময়। সেই ইতিহাসে যেমন সাম্রাজ্যের বিস্তার রয়েছে, তেমনি রয়েছে সংকোচন; যেমন সাংস্কৃতিক বিনিময় রয়েছে, তেমনি রয়েছে সংঘাত। আধুনিক রাষ্ট্র যদি এই জটিলতাকে সরলীকরণ করে একটি একমাত্রিক কাহিনিতে রূপ দিতে চায়, তবে তা ভবিষ্যতে নতুন দ্বন্দ্বের জন্ম দিতে পারে।
বিশ শতকের চীন ছিল বিপ্লব, গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অভিযান এবং ব্যাপক সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাস। পরবর্তী কয়েক দশকে অর্থনৈতিক সংস্কার দেশটিকে এক অভূতপূর্ব উন্নয়নের পথে নিয়ে যায়। কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসে, শিল্পায়ন ও নগরায়ণ নতুন বাস্তবতা তৈরি করে। এই সাফল্য চীনা রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়িয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অগ্রগতি রাজনৈতিক প্রশ্নকে চিরদিনের জন্য চাপা দিতে পারে না।
বিশ্বের ইতিহাস বলে, সমৃদ্ধি অনেক সময় রাজনৈতিক অসন্তোষকে সাময়িকভাবে প্রশমিত করে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি মন্থর হলে, সামাজিক বৈষম্য বাড়লে অথবা ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা কমে গেলে রাষ্ট্রকে নতুন ধরনের বৈধতার সন্ধান করতে হয়। তখন কেবল অর্থনৈতিক অর্জনের গল্প যথেষ্ট থাকে না; প্রয়োজন হয় এমন একটি জাতীয় ধারণা, যেখানে বিভিন্ন পরিচয় ও অভিজ্ঞতার মানুষের জন্যও সমান জায়গা থাকে।
চীনের ক্ষেত্রেও সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। দেশটি কি কেবল অর্থনৈতিক সাফল্য ও কেন্দ্রীভূত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবে, নাকি তাকে আরও বিস্তৃত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রচিন্তার দিকে এগোতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু চীনের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজকের বিশ্ব অর্থনীতি, সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই চীনের ভূমিকা অপরিহার্য।
আরও একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। চীনের প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে। একসময় দেশটিকে মূলত অর্থনৈতিক সুযোগের উৎস হিসেবে দেখা হতো। এখন একই সঙ্গে তাকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগী এবং ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। ফলে চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব আর কেবল তার সীমান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা বিশ্বব্যাপী প্রতিফলিত হয়।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত এটিই—চীনের ভবিষ্যৎ পরিচয় কী হবে? একটি আত্মবিশ্বাসী বহুজাতিক সভ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র, নাকি এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো, যার স্থায়িত্ব ক্রমশ কঠোর নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে?
চীনের অর্থনৈতিক শক্তি নিয়ে সন্দেহের খুব কম কারণ আছে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, কেবল সম্পদ, প্রযুক্তি বা সামরিক ক্ষমতা কোনো রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করে না। টেকসই শক্তির ভিত্তি গড়ে ওঠে তখনই, যখন রাষ্ট্র তার ইতিহাসকে আড়াল না করে গ্রহণ করে, বৈচিত্র্যকে হুমকি নয় বরং সম্পদ হিসেবে দেখে এবং নাগরিকদের কাছে এমন একটি ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি দেয়, যেখানে পরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য বলপ্রয়োগের চেয়ে আস্থা ও অংশগ্রহণ বেশি কার্যকর।
চীনের সামনে আজ সেই পথ বেছে নেওয়ারই চ্যালেঞ্জ। তার ভবিষ্যৎ শুধু অর্থনীতির গতিপথে নির্ধারিত হবে না; নির্ধারিত হবে সে নিজের অতীতের সঙ্গে কী ধরনের সমঝোতা করে এবং সেই ইতিহাসের ভিত্তিতে কেমন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায়।
ইয়ান জনসন 



















