ভারতের ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে নিহত সেনা সদস্যদের তথ্য গোপনের অভিযোগ ঘিরে দেশটির রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী দল কংগ্রেস প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের পদত্যাগ দাবি করেছে এবং অভিযোগ করেছে, তিনি সংসদে সেনা হতাহতের বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন।
বিতর্কের সূত্রপাত হয় ২৬ জুন ভারত সরকার সংঘাতে নিহত ছয়জন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার পর। ‘অপারেশন সিন্দুর’ নামে পরিচিত ওই সামরিক অভিযানে নিহতদের নাম জাতীয় যুদ্ধ স্মৃতিসৌধের ‘রোল অব অনার’-এ যুক্ত করা হয়। এটিই ওই সংঘাতে সামরিক হতাহতের প্রথম সরকারি স্বীকৃতি।
বিরোধীদের অভিযোগ
কংগ্রেসের প্রাক্তন সেনাসদস্যবিষয়ক বিভাগের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল রোহিত চৌধুরী এবং অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার অনুমা আচার্য এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, সরকার দীর্ঘ ১৩ মাস নিহত সেনাদের তথ্য গোপন রেখেছে।
রোহিত চৌধুরী বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে পদ থেকে অপসারণ করা উচিত এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদেরও এ বিষয়ে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। তাঁর দাবি, সংসদে যখন বলা হয়েছিল যে সংঘাতে কোনো সেনা সদস্যের প্রাণহানি ঘটেনি, তখন ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা সেই বক্তব্যকে সমর্থন করেছিলেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শাসক দল নির্বাচনী রাজনীতিতে সশস্ত্র বাহিনীর নাম ব্যবহার করেছে এবং নিহত সেনাদের তথ্য প্রকাশে অযৌক্তিক বিলম্ব করেছে।
সংসদে বিশেষ অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
কংগ্রেসের সংসদ সদস্য কে. সি. ভেনুগোপাল প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে লোকসভায় বিশেষ অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উত্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, পাঁচজন সেনাবাহিনীর সদস্য এবং একজন বিমানবাহিনীর সদস্যের মৃত্যুর তথ্য সংসদে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।
ভেনুগোপাল বলেন, কোনো মন্ত্রী সংসদকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করলে তা সংসদের বিশেষ অধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ কারণেই তিনি লোকসভার স্পিকারের কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছেন।

সরকারের জবাব
ভারত সরকার বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের দাবি, নিহত সেনা সদস্যদের যথাসময়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মান জানানো হয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে দাবি করা হচ্ছে রাজনাথ সিং সংঘাতে কোনো ভারতীয় সেনা নিহত হননি—এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা বিভ্রান্তিকর। মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, তাঁর বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল সে সময় ছড়িয়ে পড়া একটি নির্দিষ্ট গুজবের জবাব দেওয়া, যেখানে দাবি করা হচ্ছিল ভারতীয় বিমানবাহিনীর পাইলটরা নিহত হয়েছেন।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে কাশ্মীরের পেহেলগামে প্রাণঘাতী হামলার পর ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। পাকিস্তান সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
এরপর দুই দেশের মধ্যে দ্রুত উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ভারত একাধিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যার জবাবে পাকিস্তানও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। ৬ মে রাতে ভারত পাকিস্তানে বিমান হামলা চালায়। পাকিস্তান জানায়, পাল্টা অভিযানে তারা একাধিক ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।
পরবর্তী কয়েক দিনে উভয় দেশ একে অপরের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়। শেষ পর্যন্ত ১০ মে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুই দেশ।
ভারতে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাত ঘিরে নিহত সেনাদের তথ্য প্রকাশকে কেন্দ্র করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংকে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















