ভারতের সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম শুধু একজন রাজনীতিক নন। যাঁরা তাঁর লেখা নিয়মিত পড়েন এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁরা সবাই স্বীকার করবেন—বর্তমান রাজনৈতিক অবক্ষয় ও দিকপরিবর্তনের এই সময়ে তিনি একজন গভীর দৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তক। চিদাম্বরম উদার চিন্তার একজন রাজনৈতিক চিন্তক। আর উদার চিন্তার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তাঁর চিন্তাকে কোনো গণ্ডির মধ্যে বা তথাকথিত মৌলবাদী বিশ্বাসে আটকে রাখতে হয় না। তাই তাঁর পক্ষে বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষভাবে দেখা সম্ভব হয়।
পি চিদাম্বরম ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় ‘অ্যাক্রস দ্য আইল’ শিরোনামে গত বারো বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে একটি নিয়মিত কলাম লিখে আসছেন। ২৮ জুন ২০২৬, প্রকাশিত হয়েছে তাঁর শেষ কলাম। এরপর থেকে অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে তিনি এই নিয়মিত কলাম আর লিখবেন না। তবে মাঝে মাঝে তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে পারে বলে জানিয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
তবে তাঁর শেষ এই কলামটি কোনো অর্থেই শুধু একটি মতামত নিবন্ধ নয়। এর পরিসর মতামতধর্মী লেখার সীমা ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের একটি বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছে। তিনি ‘ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে যে পাঁচটি প্রবণতা’ শিরোনামে ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়েই লিখেছেন। কিন্তু মনোযোগ দিয়ে পড়লে বোঝা যায়, বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের এই টালমাটাল সময়ে পৃথিবী কোথায় যাচ্ছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে এ লেখা তারই একটি চিত্র।
কোনো লেখাই অন্য ভাষায় অনূদিত হলে তার কিছুটা অঙ্গহানি ঘটে। এখানেও তা হয়েছে। তবু লেখাটির সারকথা এখানে তুলে ধরা হলো।– ( সম্পাদকীয় বিভাগ )
ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে যে পাঁচটি প্রবণতা

পি চিদাম্বরম
অর্থনৈতিক ক্ষমতার বণ্টন ক্রমশ একচেটিয়া ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পক্ষে ঝুঁকে পড়বে। পুঁজি ও শ্রমের মধ্যে ভারসাম্য আরও বেশি পুঁজির অনুকূলে সরে যাবে।
আমি বহু বছর ধরে ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করে আসছি। অনেক সময় যা গভীর ও স্থায়ী প্রবাহ বলে মনে হয়, তা আসলে সাময়িক মেঘও হতে পারে। সাময়িক মেঘ যেমন এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি এনে দিতে পারে, তেমনি তা কোনো অঞ্চলের স্থায়ী জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য নয়।
১৯৪৭ সাল ছিল এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। স্বাধীনতার পর নানা দৃশ্যমান প্রভাব ও প্রবণতা দেখা গেলেও, তাদের অনেকই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আবার এমন অনেক সূচনাপর্বের পরিবর্তন ছিল, যেগুলো অধিকাংশ মানুষের নজর এড়িয়ে গেলেও পরে স্থায়ী রূপ নিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মহাত্মা গান্ধীর প্রায় দেবতুল্য মর্যাদা এবং শত শত নিবেদিতপ্রাণ গান্ধীবাদী থাকা সত্ত্বেও গান্ধীয় জীবনধারা, সত্যাগ্রহ, চরকা, অহিংসা এবং অসহযোগ আন্দোলন তাঁর মৃত্যুর পর কয়েক দশকের বেশি টেকেনি। অন্যদিকে, খুব কম মানুষই ভারতের দ্রুত নগরায়নের পূর্বাভাস দিতে পেরেছিলেন। জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্ব আরও কম মানুষ উপলব্ধি করেছিলেন। আর মানুষ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জটিল সম্পর্ক যে ভবিষ্যতে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা বুঝেছিলেন আরও অল্পসংখ্যক মানুষ।
একটি প্রচলিত উক্তি আছে—“ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা সবচেয়ে কঠিন কাজ।” এই উক্তিটি নোবেলজয়ী নিলস বোর এবং কিংবদন্তি বেসবল খেলোয়াড় যোগি বেরার সঙ্গে যুক্ত। তবুও আমি সেই কঠিন কাজেরই চেষ্টা করছি। আমার পর্যবেক্ষণে এমন পাঁচটি প্রবণতা রয়েছে, যেগুলো আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। এর কয়েকটি আমাকে উদ্বিগ্ন করে, তবুও এগুলো আপাতদৃষ্টিতে অনিবার্য বলেই মনে হচ্ছে।
গণতন্ত্রের অবক্ষয়
গণতন্ত্র হলো জনগণের সরকার। মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং তাদের নানা মৌলিক অধিকার রয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক সরকার সেই অধিকারগুলোকে সম্মান করে এবং সেগুলো রক্ষার জন্য স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান—যেমন ফ্রিডম হাউস, ভি-ডেম ইনস্টিটিউট এবং রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স—বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে দেশগুলোকে ‘স্বাধীন’ বা ‘অস্বাধীন’ হিসেবে মূল্যায়ন করে।
ক্রমশ আরও বেশি দেশের স্কোর কমছে। ভারতের স্কোর ২০০৫ সালে ছিল ৭৭; এখন তা নেমে এসেছে ৬৩ থেকে ৬৭-এর মধ্যে। ভবিষ্যতে ভারত হয়তো কেবল একটি ‘নির্বাচনী গণতন্ত্রে’ পরিণত হবে, যেখানে নির্বাচন আগের তুলনায় কম স্বাধীন ও কম নিরপেক্ষ হবে। তবে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি, উন্নত অবকাঠামো এবং বিদ্যমান সামাজিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ না করার বিনিময়ে সাধারণ মানুষ এই অবনতিকে হয়তো গুরুত্ব দেবে না। চীনের স্কোর বহু বছর ধরে ১০০-এর মধ্যে ৯-এ স্থির রয়েছে। তবুও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, সেখানকার মানুষ সন্তুষ্ট। ভারতও হয়তো সেই পথেই এগোতে পারে।
একচেটিয়া ব্যবসা বনাম উদ্যোক্তা
ভারতের অর্থনীতির বহু খাত ইতোমধ্যেই কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমান পরিবহন, টেলিযোগাযোগ, সিমেন্ট, ইস্পাত, বিদ্যুৎ, ওষুধ, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা উৎপাদন, খনিশিল্প এবং খুচরা বাণিজ্য। ভবিষ্যতে আরও অনেক খাত একই পথে যেতে পারে। ছোট ব্যবসা এবং ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই) প্রায় বিলুপ্তির মুখে পড়তে পারে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাজও ক্রমশ সংকুচিত হতে পারে।
অর্থনৈতিক ক্ষমতার বণ্টন ক্রমেই একচেটিয়া ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর দিকে ঝুঁকে পড়বে। পুঁজি ও শ্রমের মধ্যে ভারসাম্য আরও বেশি পুঁজির অনুকূলে সরে যাবে। আয়ের বড় অংশ ধনী ও অতিধনীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হবে। আয়-বৈষম্য আরও বাড়বে এবং সমাজ ক্রমশ কম সমতাভিত্তিক হয়ে উঠবে।
পরিচয়ের বিদায়
ভারতের অধিকাংশ বড় শহর এখন বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু সংস্কৃতি ও বহু খাদ্যাভ্যাসের মিলনস্থল। ছোট শহরগুলোও ধীরে ধীরে একই পথে হাঁটছে। নগরায়ন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রসারের ফলে এই প্রবণতা আরও বিস্তৃত হবে।
একসময় ‘নিজের গ্রাম’ বা ‘নিজের শহর’ বলে যে পরিচয় ছিল, তা যৌথ পরিবারের মতোই ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে। অধিকাংশ মানুষের চারপাশে থাকবে অপরিচিত মানুষ। বন্ধুদের পরিধি ছোট হবে এবং সম্পর্ক গড়ে উঠবে প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগের মাধ্যমে। মানুষের কথোপকথনও যন্ত্রের মধ্যস্থতায় পরিচালিত হবে। আবেগের পরিবর্তে লেনদেনই মানবসম্পর্কের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। যৌন সম্পর্ক টিকে থাকবে, কারণ প্রজননের বাইরেও তার সামাজিক ও ব্যক্তিগত গুরুত্ব রয়েছে।
সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ বনাম আতঙ্কে থাকা সংখ্যালঘু
বিজ্ঞান ও ছদ্মবিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যেতে পারে। দ্য হিন্দু পত্রিকায় ২৩ জুন ২০২৬ প্রকাশিত এক নিবন্ধে ভাসুদেবন মুকুন্ত যেমন লিখেছেন, শিক্ষাব্যবস্থা পুরাণকে বিজ্ঞান, পৌরাণিক কাহিনিকে ইতিহাস, ধর্মীয় আচারকে প্রযুক্তি এবং যাচাইযোগ্যতার প্রতি প্রকাশ্য অবজ্ঞাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। আরও বেশি আইআইটিকে পৌরাণিক কাহিনি, পুনর্জন্ম এবং বৈদিক জীববিজ্ঞান নিয়ে ‘গবেষণা’ করতে উৎসাহিত করা হতে পারে।
সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে মন্দির পুনর্নির্মাণ এবং হিন্দু উৎসব উদযাপন। অনেক শহরে মাংসের দোকান নিষিদ্ধ হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের অনুসরণে আরও কয়েকটি রাজ্য মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি থেকে ডিম বাদ দিতে পারে। আরও বেশি রাজ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হতে পারে। হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
ক্রমশ আরও বেশি শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক কেবল একটি ভাষা—হিন্দি—বলতে ও লিখতে পারবে। এর ফলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সঙ্গে ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার মাধ্যমে সংযোগের আরও অনেক জানালা বন্ধ হয়ে যেতে পারে—অন্তত যতদিন না হিন্দি সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে। ধর্মীয়, ভাষাগত এবং জাতিগত সংখ্যালঘুরা ভয়ের মধ্যে বসবাস করতে পারে, এই আশঙ্কায় যে ঐতিহাসিকভাবে বহুত্ববাদী এই দেশে ভবিষ্যতে তাদের সন্তানদের জন্য আদৌ কোনো জায়গা থাকবে কি না।
অতিধনী বনাম দরিদ্র জনসমষ্টি
উপরে বর্ণিত প্রবণতাগুলোর প্রভাব ভারতের ১৪৪ কোটিরও বেশি মানুষের ওপর গভীরভাবে পড়বে। জনসংখ্যা একসময় প্রায় ১৬৭ কোটিতে পৌঁছে স্থিতিশীল হবে এবং পরে কমতে শুরু করতে পারে। যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, ভারত অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে, কারণ ভারতীয়রা খাদ্য উৎপাদন করবে, শিল্পপণ্য তৈরি করবে এবং সেগুলো ভোগ কিংবা রপ্তানি করবে।
ধনী ও অতিধনীর সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু একই সঙ্গে কোটি কোটি মানুষ সমাজের নিচের স্তরেই রয়ে যাবে। তাদের ভোগক্ষমতা কম থাকবে, জীবনযাত্রার মান ধীরগতিতে উন্নত হবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফলও তারা তুলনামূলকভাবে কম পাবে। এর পাশাপাশি, যদি নানা অজুহাতে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ভারতের অগ্রযাত্রায় অংশগ্রহণ থেকে বাইরে রাখা হয়, তাহলে তাদের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। ভারত ক্রমশ কম সমতাভিত্তিক, আরও বিভক্ত এবং আরও ক্ষুব্ধ একটি সমাজে পরিণত হতে পারে।
আপনি এই পাঁচটি প্রবণতার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। নতুন কিছু যোগ করতে পারেন বা কিছু বাদও দিতে পারেন। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করা কঠিন—দেশ যে পথে এগোচ্ছে এবং আজ যে প্রবণতাগুলো স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, সেগুলোই ভবিষ্যতে বিশ্বের বুকে ভারতের অবস্থান নির্ধারণ করবে।
সম্পাদকীয় বিভাগ 



















