দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক বিপর্যয়ের সঙ্গে লড়াই করার পর ভেনেজুয়েলা যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা দেখছিল, ঠিক তখনই জোড়া শক্তিশালী ভূমিকম্প সেই সম্ভাবনাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। প্রাণহানি, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং নতুন করে হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ায় দেশটির সামনে এখন আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
সরকারকে একই সঙ্গে উদ্ধারকাজ, পুনর্বাসন এবং অর্থনীতিকে সচল রাখার লড়াই চালাতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে থেকেই দুর্বল অর্থনীতির ওপর এই দুর্যোগের চাপ দীর্ঘমেয়াদে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
পুনর্গঠনের সামনে বিশাল বাধা
সর্বশেষ সরকারি হিসাবে, ভূমিকম্পে অন্তত ১ হাজার ৪৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৩ হাজার ২০০ জনের বেশি। প্রায় ১ হাজার ৪০০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি হাসপাতাল রয়েছে। একের পর এক পরাঘাতে অনেক মানুষ এখনও ঘরের বাইরে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন।

ভাঙা সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো এবং রাজধানীর কাছের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহও স্বাভাবিক হয়নি।
অর্থনীতিতে নতুন ধাক্কা
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভূমিকম্পে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি থেকে হাজার হাজার কোটি ডলারের সমান হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পুনর্গঠন ব্যয় বহন করা সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।
এর আগে দেশটি তেলের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়িয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে এগোচ্ছিল। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও বাড়ছিল। কিন্তু এই দুর্যোগ সেই অগ্রযাত্রাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
তবে একটি স্বস্তির খবর হলো, দেশের গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার এবং কয়েকটি বড় জ্বালানি প্রকল্প এখনও সচল রয়েছে। ফলে তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, যা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে।

উদ্ধারে এগিয়ে সাধারণ মানুষ
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে বহু জায়গায় সাধারণ মানুষই উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে জীবিতদের খুঁজে বের করার কাজে স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
উপকূলীয় একটি শহরের ছোট মুদি দোকান মালিক জানান, বিদ্যুৎ ও পানি না থাকায় এবং কর্মীদের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তিনি সাময়িকভাবে ব্যবসা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছেন।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই সরবরাহ ব্যবস্থার বড় অংশ পরিচালনা করে। তাই এসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত সচল না হলে স্থানীয় অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে আরও বেশি সময় লাগবে।
সহায়তার প্রত্যাশা বাড়ছে

ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছে ভেনেজুয়েলা। তবে দেশটির আগের অর্থনৈতিক ও ঋণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে দ্রুত বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা পাওয়া সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মনে করছেন, পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে আরও কার্যকর উদ্যোগ না নিলে জনঅসন্তোষ বাড়তে পারে।
সংকটের ইতিহাস আরও দীর্ঘ
একসময় তেলসমৃদ্ধ ভেনেজুয়েলা লাতিন আমেরিকার অন্যতম সমৃদ্ধ অর্থনীতি ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংকট দেশটিকে গভীর বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।
এ বছরের শুরুতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক সংকেত দেখা দিলেও সাম্প্রতিক ভূমিকম্প সেই আশাকে আবারও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এখন ভেনেজুয়েলার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন করা এবং একই সঙ্গে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের গতি ধরে রাখা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















