মেক্সিকোর ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ এবং মাদকচক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার তদন্ত নতুন মোড় নিয়েছে। দেশটির একাধিক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নীরবে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিজেদের দলের অন্য নেতাদের সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে জানা গেছে। এতে মেক্সিকোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যেমন নতুন চাপে পড়েছে, তেমনি দুই দেশের সম্পর্কেও উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তদন্তের জালে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগপত্রে মেক্সিকোর বর্তমান ও সাবেক ১০ জন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শক্তিশালী মাদকচক্রের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর পর থেকেই ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন গভর্নর, আইনপ্রণেতা ও অন্যান্য জনপ্রতিনিধি নিজেদের অবস্থান নিরাপদ রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে সহযোগিতার পথ খুঁজছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
জানা গেছে, অন্তত এক ডজন নির্বাচিত প্রতিনিধি তদন্তকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যেই তথ্য বিনিময় নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। অনেকের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে তদন্তের লক্ষ্যবস্তু তাঁরাও হতে পারেন। তাই আগেভাগেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করছেন।

রাজনৈতিক সংকটে প্রেসিডেন্ট
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের এসব তদন্তের সমালোচনা করে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, এটি মেক্সিকোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। তিনি বলেছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রমাণ ছাড়া বিদেশি চাপের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, মেক্সিকোর নিজস্ব আইনগত প্রক্রিয়ায় অভিযোগগুলোর তদন্ত করা হবে।
তবে এই অবস্থান তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও বাণিজ্য সহযোগিতা বজায় রাখার চাপ, অন্যদিকে নিজের রাজনৈতিক দলের ঐক্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে তাঁকে।
দলের ভেতরে ফাটলের ইঙ্গিত
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের ভেতরের কিছু নেতা যদি নিজেদের স্বার্থে বিদেশি তদন্তে সহযোগিতা করেন, তাহলে সেটি ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির স্পষ্ট ইঙ্গিত। প্রকাশ্যে নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন থাকলেও পর্দার আড়ালে অনেকেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের ধারণা, এই প্রবণতা বাড়তে থাকলে আরও সাক্ষী সামনে আসতে পারেন এবং নতুন নতুন অভিযোগও প্রকাশ্যে আসতে পারে। এতে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
সীমান্ত, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে চাপ
যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। একই সময়ে দুই দেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনায় রয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাদকচক্র দমনে সহযোগিতাও দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ অবস্থায় দুর্নীতি তদন্ত এবং রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে মাদকচক্রবিরোধী অভিযানে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থানের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

তদন্তের আওতায় ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন প্রভাবশালী গভর্নরের নামও এসেছে বলে জানা গেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট সবাই দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধেও অতীতে ওঠা অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁরাও সব ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে মেক্সিকোর রাজনীতিতে আগামী মাসগুলোতে দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত, দলীয় বিভাজন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয়ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















