আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে সামরিক জোট মানেই ছিল লিখিত প্রতিরক্ষা চুক্তি, অভিন্ন কৌশল এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব দ্রুত এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে আনুষ্ঠানিক জোটের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠছে অনানুষ্ঠানিক কৌশলগত সমন্বয়। চীন, রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
এই চার দেশকে একসময় শুধু যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে তাদের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তারা এখন শুধু অভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে না; বরং সামরিক প্রযুক্তি, অস্ত্র উৎপাদন, গোয়েন্দা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সমন্বয় এবং কূটনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে একে অপরের সক্ষমতা বাড়িয়ে তুলছে। ফলে কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট না থাকলেও তাদের সম্মিলিত প্রভাব বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
অনেক বিশ্লেষক এখনও মনে করেন, এই সম্পর্ককে অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। তাদের যুক্তি, চার দেশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস রয়েছে, আঞ্চলিক স্বার্থের সংঘাত রয়েছে এবং তাদের মধ্যে ন্যাটোর মতো কোনো বহুপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও নেই। তাই এটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অক্ষশক্তির সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ নেই।
কিন্তু এই যুক্তির মধ্যেই একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কারণ বর্তমান বিশ্বের নিরাপত্তা বাস্তবতা আর বিংশ শতাব্দীর জোট রাজনীতির মতো নয়। এখন সহযোগিতার কার্যকারিতা নির্ধারিত হয় কত দ্রুত প্রযুক্তি বিনিময় হচ্ছে, কত সহজে নিষেধাজ্ঞা এড়ানো যাচ্ছে, কত দক্ষতার সঙ্গে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে এবং কতটা সমন্বিতভাবে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন করা যাচ্ছে—এসব বিষয় দিয়ে।
এই পরিবর্তনের সূচনা মূলত ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ রাশিয়াকে নতুন অংশীদারের দিকে ঠেলে দেয়। মস্কো অস্ত্র, গোলাবারুদ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য যেসব দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল উত্তর কোরিয়া, ইরান এবং চীন।
উত্তর কোরিয়া প্রথমদিকে সতর্ক থাকলেও পরে রাশিয়ার অন্যতম প্রধান সামরিক সরবরাহকারীতে পরিণত হয়। গোলাবারুদ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের বিনিময়ে পিয়ংইয়ং পায় উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, উপগ্রহ কর্মসূচিতে সহায়তা এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ। ধীরে ধীরে এই সম্পর্ক কেবল লেনদেনভিত্তিক সহযোগিতার সীমা অতিক্রম করে কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপ নেয়।
ইরানের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। শুরুতে ড্রোন সরবরাহ করলেও পরে ক্ষেপণাস্ত্র, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং যৌথ অস্ত্র উৎপাদনের দিকে দুই দেশের সম্পর্ক বিস্তৃত হয়। যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজন তাদের সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
চীনের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। বেইজিং সরাসরি অস্ত্র পাঠানোর পথে না হাঁটলেও রাশিয়ার সামরিক শিল্পকে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় শিল্প উপাদান, যন্ত্রাংশ, মাইক্রোইলেকট্রনিকস এবং অন্যান্য দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। এর ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়া তার প্রতিরক্ষা উৎপাদন পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। একই সময়ে দুই দেশের মধ্যে যৌথ নৌ-মহড়া, বিমান টহল এবং সামরিক প্রশিক্ষণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়াও তার অংশীদারদের উন্নত সামরিক প্রযুক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন, মহাকাশ সক্ষমতা এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা জ্ঞান ভাগ করে নিচ্ছে। এই প্রযুক্তি বিনিময় ভবিষ্যতে শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
![]()
সহযোগিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমিয়ে আনার যৌথ প্রচেষ্টা। বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, ছায়া বাণিজ্য নেটওয়ার্ক এবং নতুন সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলে তারা অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প কূটনৈতিক পরিসর তৈরিরও চেষ্টা চলছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সবচেয়ে আলোচিত সামরিক জোটগুলিও বাস্তবে অনেক সময় ধারণার তুলনায় দুর্বল ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অক্ষশক্তির দেশগুলোর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যৌথ সামরিক পরিকল্পনা ছিল না। জার্মানি, জাপান ও ইতালির মধ্যে সমন্বয়ও ছিল সীমিত। একইভাবে শীতল যুদ্ধের সূচনায় গড়ে ওঠা চীন-সোভিয়েত জোটও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়।
আজকের পরিস্থিতির পার্থক্য এখানেই। বর্তমান সহযোগিতা কোনো একক বহুপাক্ষিক চুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বরং একাধিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মিলেই এমন একটি নমনীয় কাঠামো তৈরি করেছে, যা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সহজে অস্বীকার করা যায় এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তনও করা সম্ভব। এই নমনীয়তাই তাদের বড় শক্তি।
অবশ্য চার দেশের মধ্যে মতবিরোধ নেই, এমন নয়। পারস্পরিক সন্দেহ, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এবং স্বার্থের পার্থক্য এখনও বিদ্যমান। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সেই কারণে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের জন্য একাধিক নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। একটি অঞ্চলের সংঘাত সহজেই অন্য অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। প্রযুক্তি ও সামরিক জ্ঞান বিনিময় প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাও আগের তুলনায় সীমিত হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে একাধিক অঞ্চলে একযোগে সংকট মোকাবিলার চ্যালেঞ্জও বাড়বে।
বাস্তবতা হলো, এই সহযোগিতাকে ভেঙে দেওয়া সহজ নয়। তবে এর কার্যকারিতা কমিয়ে আনা সম্ভব। কঠোর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা, অবৈধ প্রযুক্তি স্থানান্তর নজরদারিতে রাখা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বাড়ানো, মিত্রদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা এবং তৃতীয় দেশগুলোর মাধ্যমে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি—এসব উদ্যোগ এই নেটওয়ার্কের বিস্তার সীমিত করতে পারে।
সবচেয়ে বড় ভুল হবে এই সম্পর্ককে কেবল একটি অসম্পূর্ণ বা দুর্বল জোট হিসেবে দেখা। কারণ একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতে শক্তির সংজ্ঞাই বদলে গেছে। আনুষ্ঠানিক সামরিক চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রযুক্তি, অর্থনীতি, শিল্প সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের ধারাবাহিকতা।
বিশ্ব যখন ক্রমশ আরও অস্থির হয়ে উঠছে এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে, তখন চীন, রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার এই ক্রমবর্ধমান সমন্বয়কে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এটি হয়তো অতীতের অক্ষশক্তির মতো কোনো ঘোষিত সামরিক জোট নয়, কিন্তু কার্যকারিতা ও কৌশলগত প্রভাবের দিক থেকে এটি আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাগুলোর একটি।
থমাস রাইট 



















