০২:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

আগষ্টের পরে যে কোন সময়ে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও পরবর্তী রাজনীতি

ভারতের প্রভাবশালী মিডিয়া এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেনতিনি এ বছরই দেশে ফিরবেন। তাঁর এই দেশে ফেরার ঘোষণা আন্তর্জাতিক প্রায় সব বড় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

এই খবর প্রকাশিত হবার পরে যতদূর সম্ভব খোঁজখবর নিয়ে যা জানা যাচ্ছেতাতে জুলাই ও আগস্ট মাসে তিনি ফিরছেন না। বাস্তবে আগস্ট মাস নিয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার এক ধরনের সুপারস্টিশন  বা অন্ধ বিশ্বাস কাজ করে। এটা আওয়ামী লীগের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আছে। যেমন আওয়ামী লীগ ও তাঁদের নেতা শেখ হাসিনা আগস্ট মাসটিকে কালো মাস বা অপয়া মাস মনে করেন। কারণ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান হয়েছিল১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেনা সদস্যরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করে২০০৪ সালে ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলা করে প্রকাশ্যে হত্যা চেষ্টা করা হয়প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী যেখানে আইভি রহমানসহ ২৪ জন মানুষ মারা যায়। আবার ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ড. ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইন অনুযায়ী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানো হয়।

ঠিক তেমনি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ মনে করে জোড় সাল ছাড়া তারা নির্বাচনে জয়ী হতে পারে না। ১৯৫৪ সাল থেকে তাঁদের যাবতীয় নির্বাচনী বিজয় জোড় সালে। নির্বাচন নিয়ে ঠিক এ রকম নয়তবে একটা সুপারস্টিশন খুব একটা পারলৌকিক জগতে বিশ্বাসী নাবরং অনেক বেশি আধুনিক নেতা হয়েও মিসেস ইন্দিরা গান্ধীরও ছিল। ইতিহাসে খুব একটা প্রমাণিত না হলেও অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মেহমুদেরওরোমান বীর জুলিয়াস সিজারেরও এ ধরনের কিছু সুপারস্টিশন ছিল।

তাই যতদূর খোঁজখবর নিয়ে জানা যাচ্ছেসেপ্টেম্বর শুরুর পরে যে কোনো সময়ে শেখ হাসিনা আসবেন। তবে কোনো মতেই ডিসেম্বর অবধি অপেক্ষা করবেন না। এটা স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগের রাজনীতি যারা দীর্ঘদিন লক্ষ্য করেছেনতাঁরা সকলেই জানেনডিসেম্বর থেকে মার্চ অবধি মাসগুলো বাস্তবে আওয়ামী লীগেরই। কারণএই সময়টা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের সময়। তাই দেখা যায়এ সময় একটা ভিন্ন আবহাওয়া বাংলাদেশে তৈরি হয়। আর এই ডিসেম্বরের টেম্পোটা তৈরি হওয়া শুরু করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে। সাদা চোখে দেখলে বলা যায়এসব কারণে হয়তো শেখ হাসিনা তাঁর প্রত্যাবর্তনের সময়টা আগস্টের পরে নিয়ে যাচ্ছেন।

তবে শেখ হাসিনার মতো রাজনীতিবিদযিনি ৪৫ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম স্তম্ভ। ২১ বছর এ দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এবং তিনিই পৃথিবীতে একমাত্র রাষ্ট্রনায়কযে তাঁর দেশে যখন তাঁর বিরুদ্ধে একটি মেটিকুলাস ডিজাইনের ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছেসে সময়ে নিজ দেশের সিকিউরিটি ও সামরিক বিমান ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। তাই তাঁর দেশে ফেরাকে খুব সাদামাটা বিষয় ভাবার সুযোগ কম। যেমন প্রখ্যাত আইনজীবী মহসিন রশীদ একটি টকশোতে বলেছেন, “তিনি তো আপনার আমার মতো প্লেনের টিকিট কেটে এসে বিমানবন্দরে নামবেন না। তিনি যেমন একটি সামরিক বিমানে গেছেনতেমনি একটি ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে আসবেন। এবং তার উদাহরণ এই দক্ষিণ এশিয়ায় আছেনেওয়াজ শরীফের জন্য বিমানবন্দরে কোর্ট বসে তাঁকে মুক্ত মানুষ হিসেবে প্রবেশ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়।” মহসিন রশীদের এই বক্তব্য মূলত একটি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সমঝোতা ও দেশের রাজনৈতিক অবস্থানের কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকারনেওয়াজ শরীফের থেকেও শেখ হাসিনা অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থায় দেশত্যাগ করেছিলেনএবং তাঁর রাজনৈতিক আশ্রয়ও অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। যে দেশটিতে তিনি বর্তমানে রাজনৈতিক আশ্রয়” নিয়ে আছেনসে দেশের শুধু সরকার তাঁকে আশ্রয় দেয়নিতাঁকে আশ্রয় দিয়েছে রাষ্ট্রঅর্থাৎ রাষ্ট্রের সকল দলের জনপ্রতিনিধিরা পার্লামেন্টের মাধ্যমে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন। তাই প্রখ্যাত আইনজীবী মহসিন রশীদের বক্তব্যের সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের স্ট্যাটাস ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের মর্যাদা মিলিয়েও কিছু চিন্তার অবকাশ থেকে যায়।

অন্যদিকে প্রখ্যাত সাংবাদিকবিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান সাবির মুস্তফা (যিনি অনেকটা ফরিদ জাকারিয়ার মতো ভাগ্যবানকারণ তাঁর পিতাও বিখ্যাত ও শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক ছিলেন) একটি টকশোতে বলেছেনতিনি মনে করেনশেখ হাসিনার ফেরার দিন বিমানবন্দরে বিপুল মানুষের উপস্থিতি ঠেকানোর জন্য সরকার ওই দিন ঢাকায় কারফিউ দেবে। তা ছাড়া তিনি আরও বলেছেনশেখ হাসিনা ফিরলে তাঁকে হজম করা এই সরকারের পক্ষে কষ্টকর।

অন্যদিকেস্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেনবর্তমান সরকার শেখ হাসিনার বিচার করার বা শাস্তি দেওয়ার অবস্থানে নেই। তাছাড়া রুমিন ফারহানা আরও বলেছেন৫২ ভাগ মানুষকে বাদ দিয়ে সরকারের চলা সম্ভব নয়। এই ৫২ ভাগ মানুষ বলতে তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থক বা শেখ হাসিনার সমর্থককেই পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত করেছেন।

বাস্তবে শেখ হাসিনাও তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেনযাই ঘটুক তিনি ফিরবেন। আর এই যাই ঘটুক” বলতে তিনি কী বোঝাচ্ছেনতার যতটুকু খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছেতাতে তিনি জেলে যাওয়াএমনকি বুক পেতে গুলি নিয়েও দেশে ফিরতে রাজি। এবং এ ইঙ্গিতও তিনি দিয়েছেন তাঁর সাক্ষাৎকারে। তিনি বলেছেন, “এই দেশের মাটিতে তাঁর বাবার রক্ত মিশে আছেতাঁর বাবার নেতৃত্বে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেই মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্ত মিশে আছেতাই সেখানেই তিনি ফিরতে চান।” অর্থাৎ সর্বোচ্চ রক্তের ইঙ্গিত তিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে দিয়েছেনএমনকি ২১ আগস্টের কথাও উল্লেখ করেছেন।

এখন প্রশ্ন আসেতিনি সাহস কোথা থেকে পাচ্ছেনআর সাবির মুস্তফাও বা কেন বলছেনসরকার তাঁকে হজম করতে পারবে নারুমিন ফারহানা কেন বলছেনসরকার তাঁর বিচার করার অবস্থানে নেই?

বাস্তবে এই অবস্থানটি তৈরি করে দিয়েছে ইউনূস ১২ ফেব্রুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন করে। যে নির্বাচনের ভেতর দিয়ে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ মনে করেছে তাঁদের বিজয় হয়েছে। কারণএই নির্বাচনের আগে একটি তথাকথিত আওয়ামী লীগ বা তৃণমূল আওয়ামী লীগ গড়ার চেষ্টা ইউনূস সরকারসহ আরও কয়েকটি মহল মিলে করেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগাররা জেলজুলুমমৃত্যু মেনে নিয়েও শেখ হাসিনার বাইরে যায়নি। এরপরে চিহ্নিত আওয়ামী লীগার বা চৌদ্দ দলীয় জোটের চিহ্নিত ব্যক্তিদের দিয়ে আওয়ামী লীগার হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করানোর একটা চেষ্টা হয়। সে কাজেও কোনো প্রকৃত আওয়ামী লীগারকে পাওয়া যায়নি। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগারদের কাছে ১/১১ থেকে বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত ও আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মেহেরপুরের এক সাবেক এমপি কিছু অর্থ ব্যয় করেছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করাতে। কিন্তু সে সব প্রার্থীর বেশিভাগই মাঠে নামেনি। কারণশেখ হাসিনা ততক্ষণে সোশ্যাল ফোরামের মাধ্যমে ও বিদেশি পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে তাঁর লোকদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাই ওই স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও অনেকে তখন শেখ হাসিনার নির্দেশ মানেন।

অন্যদিকে জি. এম. কাদের তাঁর জাতীয় পার্টিকে নিয়ে অতীতের মতো এবারও নানামুখী চাপে নির্বাচনে যোগ দেন। কিন্তু তিনিও ওইভাবে নির্বাচন করেননি। যার ফলে নির্বাচনটি মূলত হয়েছে একটি গ্রুপের মধ্যেই ভাগাভাগি করে। কারণজামায়াতবিএনপিএনসিপি মূলত  যারা ন্যাচারাল অ্যালাই” দীর্ঘদিন ধরে। এরপরে বাংলাদেশ সম্পর্কে মূলত কোনো ধারণা ও জ্ঞান নেইএমন কিছু ভারতীয় সাংবাদিক একটা ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চেয়েছিলএ নির্বাচনে হিন্দুরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। বাস্তবে সে ন্যারেটিভও টেকেনি।

সবশেষে জি. এম. কাদেরের একটি তথ্যমূলক নির্বাচনী বিশ্লেষণযা ভারত-বাংলাদেশের মিডিয়ায় ছাপা হয়েছেসেখানে দেখা যায়সর্বোচ্চ ১৩ ভাগ লোক ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিয়েছে। অন্যদিকে রুমিন ফারহানা বলছেন৫২ ভাগ লোককে বাদ দিয়ে সরকার চালানো সম্ভব নয়। যার ফলে নির্বাচনটি যেমন মূলত একটি গ্রুপের মধ্যে ভাগাভাগি করে হয়েছেতেমনি নির্বাচনটি ত্রুটিপূর্ণ। এ ধরনের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আসা সরকার সব দেশেই সব সময়ই দুর্বল থাকে।

সাবির মুস্তফা হয়তো সঠিকতবে বর্তমান সরকার ঘিরে শুভচিন্তা থেকে বলা যায় শেখ হাসিনার ফেরার দিনে সাবির মুস্তফা যে কারফিউয়ের আশঙ্কা করছেনওই পদক্ষেপে বর্তমান সরকার যাবে না। কারণকারফিউ দিলেই যে কোনো সরকার একটি সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে যায়। তখন ব্যালান্সটা দ্রুত যে কোনো দিকেই চলে যায়। আর বাংলাদেশের কারফিউয়ের ইতিহাস কোনো সরকারের জন্য সুখকর নয়। আয়ুব খানএরশাদইয়াজউদ্দিন ও শেখ হাসিনা কারফিউ দিয়েছিলেন। সব ক্ষেত্রেই ফল সরকারের বিপক্ষেই গেছে।

এজন্য শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও তাঁর পরবর্তী সময়ের দেশের রাজনীতির প্রতিটি পৃষ্ঠার জন্য অপেক্ষারই সময় এখন।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World

জনপ্রিয় সংবাদ

আগষ্টের পরে যে কোন সময়ে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও পরবর্তী রাজনীতি

০২:০৫:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

ভারতের প্রভাবশালী মিডিয়া এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেনতিনি এ বছরই দেশে ফিরবেন। তাঁর এই দেশে ফেরার ঘোষণা আন্তর্জাতিক প্রায় সব বড় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

এই খবর প্রকাশিত হবার পরে যতদূর সম্ভব খোঁজখবর নিয়ে যা জানা যাচ্ছেতাতে জুলাই ও আগস্ট মাসে তিনি ফিরছেন না। বাস্তবে আগস্ট মাস নিয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার এক ধরনের সুপারস্টিশন  বা অন্ধ বিশ্বাস কাজ করে। এটা আওয়ামী লীগের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আছে। যেমন আওয়ামী লীগ ও তাঁদের নেতা শেখ হাসিনা আগস্ট মাসটিকে কালো মাস বা অপয়া মাস মনে করেন। কারণ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান হয়েছিল১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেনা সদস্যরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করে২০০৪ সালে ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলা করে প্রকাশ্যে হত্যা চেষ্টা করা হয়প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী যেখানে আইভি রহমানসহ ২৪ জন মানুষ মারা যায়। আবার ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ড. ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইন অনুযায়ী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানো হয়।

ঠিক তেমনি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ মনে করে জোড় সাল ছাড়া তারা নির্বাচনে জয়ী হতে পারে না। ১৯৫৪ সাল থেকে তাঁদের যাবতীয় নির্বাচনী বিজয় জোড় সালে। নির্বাচন নিয়ে ঠিক এ রকম নয়তবে একটা সুপারস্টিশন খুব একটা পারলৌকিক জগতে বিশ্বাসী নাবরং অনেক বেশি আধুনিক নেতা হয়েও মিসেস ইন্দিরা গান্ধীরও ছিল। ইতিহাসে খুব একটা প্রমাণিত না হলেও অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মেহমুদেরওরোমান বীর জুলিয়াস সিজারেরও এ ধরনের কিছু সুপারস্টিশন ছিল।

তাই যতদূর খোঁজখবর নিয়ে জানা যাচ্ছেসেপ্টেম্বর শুরুর পরে যে কোনো সময়ে শেখ হাসিনা আসবেন। তবে কোনো মতেই ডিসেম্বর অবধি অপেক্ষা করবেন না। এটা স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগের রাজনীতি যারা দীর্ঘদিন লক্ষ্য করেছেনতাঁরা সকলেই জানেনডিসেম্বর থেকে মার্চ অবধি মাসগুলো বাস্তবে আওয়ামী লীগেরই। কারণএই সময়টা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের সময়। তাই দেখা যায়এ সময় একটা ভিন্ন আবহাওয়া বাংলাদেশে তৈরি হয়। আর এই ডিসেম্বরের টেম্পোটা তৈরি হওয়া শুরু করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে। সাদা চোখে দেখলে বলা যায়এসব কারণে হয়তো শেখ হাসিনা তাঁর প্রত্যাবর্তনের সময়টা আগস্টের পরে নিয়ে যাচ্ছেন।

তবে শেখ হাসিনার মতো রাজনীতিবিদযিনি ৪৫ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম স্তম্ভ। ২১ বছর এ দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এবং তিনিই পৃথিবীতে একমাত্র রাষ্ট্রনায়কযে তাঁর দেশে যখন তাঁর বিরুদ্ধে একটি মেটিকুলাস ডিজাইনের ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছেসে সময়ে নিজ দেশের সিকিউরিটি ও সামরিক বিমান ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। তাই তাঁর দেশে ফেরাকে খুব সাদামাটা বিষয় ভাবার সুযোগ কম। যেমন প্রখ্যাত আইনজীবী মহসিন রশীদ একটি টকশোতে বলেছেন, “তিনি তো আপনার আমার মতো প্লেনের টিকিট কেটে এসে বিমানবন্দরে নামবেন না। তিনি যেমন একটি সামরিক বিমানে গেছেনতেমনি একটি ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে আসবেন। এবং তার উদাহরণ এই দক্ষিণ এশিয়ায় আছেনেওয়াজ শরীফের জন্য বিমানবন্দরে কোর্ট বসে তাঁকে মুক্ত মানুষ হিসেবে প্রবেশ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়।” মহসিন রশীদের এই বক্তব্য মূলত একটি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সমঝোতা ও দেশের রাজনৈতিক অবস্থানের কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকারনেওয়াজ শরীফের থেকেও শেখ হাসিনা অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থায় দেশত্যাগ করেছিলেনএবং তাঁর রাজনৈতিক আশ্রয়ও অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। যে দেশটিতে তিনি বর্তমানে রাজনৈতিক আশ্রয়” নিয়ে আছেনসে দেশের শুধু সরকার তাঁকে আশ্রয় দেয়নিতাঁকে আশ্রয় দিয়েছে রাষ্ট্রঅর্থাৎ রাষ্ট্রের সকল দলের জনপ্রতিনিধিরা পার্লামেন্টের মাধ্যমে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন। তাই প্রখ্যাত আইনজীবী মহসিন রশীদের বক্তব্যের সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের স্ট্যাটাস ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের মর্যাদা মিলিয়েও কিছু চিন্তার অবকাশ থেকে যায়।

অন্যদিকে প্রখ্যাত সাংবাদিকবিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান সাবির মুস্তফা (যিনি অনেকটা ফরিদ জাকারিয়ার মতো ভাগ্যবানকারণ তাঁর পিতাও বিখ্যাত ও শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক ছিলেন) একটি টকশোতে বলেছেনতিনি মনে করেনশেখ হাসিনার ফেরার দিন বিমানবন্দরে বিপুল মানুষের উপস্থিতি ঠেকানোর জন্য সরকার ওই দিন ঢাকায় কারফিউ দেবে। তা ছাড়া তিনি আরও বলেছেনশেখ হাসিনা ফিরলে তাঁকে হজম করা এই সরকারের পক্ষে কষ্টকর।

অন্যদিকেস্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেনবর্তমান সরকার শেখ হাসিনার বিচার করার বা শাস্তি দেওয়ার অবস্থানে নেই। তাছাড়া রুমিন ফারহানা আরও বলেছেন৫২ ভাগ মানুষকে বাদ দিয়ে সরকারের চলা সম্ভব নয়। এই ৫২ ভাগ মানুষ বলতে তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থক বা শেখ হাসিনার সমর্থককেই পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত করেছেন।

বাস্তবে শেখ হাসিনাও তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেনযাই ঘটুক তিনি ফিরবেন। আর এই যাই ঘটুক” বলতে তিনি কী বোঝাচ্ছেনতার যতটুকু খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছেতাতে তিনি জেলে যাওয়াএমনকি বুক পেতে গুলি নিয়েও দেশে ফিরতে রাজি। এবং এ ইঙ্গিতও তিনি দিয়েছেন তাঁর সাক্ষাৎকারে। তিনি বলেছেন, “এই দেশের মাটিতে তাঁর বাবার রক্ত মিশে আছেতাঁর বাবার নেতৃত্বে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেই মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্ত মিশে আছেতাই সেখানেই তিনি ফিরতে চান।” অর্থাৎ সর্বোচ্চ রক্তের ইঙ্গিত তিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে দিয়েছেনএমনকি ২১ আগস্টের কথাও উল্লেখ করেছেন।

এখন প্রশ্ন আসেতিনি সাহস কোথা থেকে পাচ্ছেনআর সাবির মুস্তফাও বা কেন বলছেনসরকার তাঁকে হজম করতে পারবে নারুমিন ফারহানা কেন বলছেনসরকার তাঁর বিচার করার অবস্থানে নেই?

বাস্তবে এই অবস্থানটি তৈরি করে দিয়েছে ইউনূস ১২ ফেব্রুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন করে। যে নির্বাচনের ভেতর দিয়ে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ মনে করেছে তাঁদের বিজয় হয়েছে। কারণএই নির্বাচনের আগে একটি তথাকথিত আওয়ামী লীগ বা তৃণমূল আওয়ামী লীগ গড়ার চেষ্টা ইউনূস সরকারসহ আরও কয়েকটি মহল মিলে করেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগাররা জেলজুলুমমৃত্যু মেনে নিয়েও শেখ হাসিনার বাইরে যায়নি। এরপরে চিহ্নিত আওয়ামী লীগার বা চৌদ্দ দলীয় জোটের চিহ্নিত ব্যক্তিদের দিয়ে আওয়ামী লীগার হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করানোর একটা চেষ্টা হয়। সে কাজেও কোনো প্রকৃত আওয়ামী লীগারকে পাওয়া যায়নি। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগারদের কাছে ১/১১ থেকে বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত ও আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মেহেরপুরের এক সাবেক এমপি কিছু অর্থ ব্যয় করেছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করাতে। কিন্তু সে সব প্রার্থীর বেশিভাগই মাঠে নামেনি। কারণশেখ হাসিনা ততক্ষণে সোশ্যাল ফোরামের মাধ্যমে ও বিদেশি পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে তাঁর লোকদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাই ওই স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও অনেকে তখন শেখ হাসিনার নির্দেশ মানেন।

অন্যদিকে জি. এম. কাদের তাঁর জাতীয় পার্টিকে নিয়ে অতীতের মতো এবারও নানামুখী চাপে নির্বাচনে যোগ দেন। কিন্তু তিনিও ওইভাবে নির্বাচন করেননি। যার ফলে নির্বাচনটি মূলত হয়েছে একটি গ্রুপের মধ্যেই ভাগাভাগি করে। কারণজামায়াতবিএনপিএনসিপি মূলত  যারা ন্যাচারাল অ্যালাই” দীর্ঘদিন ধরে। এরপরে বাংলাদেশ সম্পর্কে মূলত কোনো ধারণা ও জ্ঞান নেইএমন কিছু ভারতীয় সাংবাদিক একটা ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চেয়েছিলএ নির্বাচনে হিন্দুরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। বাস্তবে সে ন্যারেটিভও টেকেনি।

সবশেষে জি. এম. কাদেরের একটি তথ্যমূলক নির্বাচনী বিশ্লেষণযা ভারত-বাংলাদেশের মিডিয়ায় ছাপা হয়েছেসেখানে দেখা যায়সর্বোচ্চ ১৩ ভাগ লোক ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিয়েছে। অন্যদিকে রুমিন ফারহানা বলছেন৫২ ভাগ লোককে বাদ দিয়ে সরকার চালানো সম্ভব নয়। যার ফলে নির্বাচনটি যেমন মূলত একটি গ্রুপের মধ্যে ভাগাভাগি করে হয়েছেতেমনি নির্বাচনটি ত্রুটিপূর্ণ। এ ধরনের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আসা সরকার সব দেশেই সব সময়ই দুর্বল থাকে।

সাবির মুস্তফা হয়তো সঠিকতবে বর্তমান সরকার ঘিরে শুভচিন্তা থেকে বলা যায় শেখ হাসিনার ফেরার দিনে সাবির মুস্তফা যে কারফিউয়ের আশঙ্কা করছেনওই পদক্ষেপে বর্তমান সরকার যাবে না। কারণকারফিউ দিলেই যে কোনো সরকার একটি সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে যায়। তখন ব্যালান্সটা দ্রুত যে কোনো দিকেই চলে যায়। আর বাংলাদেশের কারফিউয়ের ইতিহাস কোনো সরকারের জন্য সুখকর নয়। আয়ুব খানএরশাদইয়াজউদ্দিন ও শেখ হাসিনা কারফিউ দিয়েছিলেন। সব ক্ষেত্রেই ফল সরকারের বিপক্ষেই গেছে।

এজন্য শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও তাঁর পরবর্তী সময়ের দেশের রাজনীতির প্রতিটি পৃষ্ঠার জন্য অপেক্ষারই সময় এখন।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিকসম্পাদকসারাক্ষণ, The Present World