ভারতের প্রভাবশালী মিডিয়া এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি এ বছরই দেশে ফিরবেন। তাঁর এই দেশে ফেরার ঘোষণা আন্তর্জাতিক প্রায় সব বড় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এই খবর প্রকাশিত হবার পরে যতদূর সম্ভব খোঁজখবর নিয়ে যা জানা যাচ্ছে, তাতে জুলাই ও আগস্ট মাসে তিনি ফিরছেন না। বাস্তবে আগস্ট মাস নিয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার এক ধরনের সুপারস্টিশন বা অন্ধ বিশ্বাস কাজ করে। এটা আওয়ামী লীগের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আছে। যেমন আওয়ামী লীগ ও তাঁদের নেতা শেখ হাসিনা আগস্ট মাসটিকে কালো মাস বা অপয়া মাস মনে করেন। কারণ, ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান হয়েছিল, ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সেনা সদস্যরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করে, ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাকে গ্রেনেড হামলা করে প্রকাশ্যে হত্যা চেষ্টা করা হয়, প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী যেখানে আইভি রহমানসহ ২৪ জন মানুষ মারা যায়। আবার ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ড. ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইন অনুযায়ী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানো হয়।
ঠিক তেমনি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও আওয়ামী লীগ মনে করে জোড় সাল ছাড়া তারা নির্বাচনে জয়ী হতে পারে না। ১৯৫৪ সাল থেকে তাঁদের যাবতীয় নির্বাচনী বিজয় জোড় সালে। নির্বাচন নিয়ে ঠিক এ রকম নয়, তবে একটা সুপারস্টিশন খুব একটা পারলৌকিক জগতে বিশ্বাসী না, বরং অনেক বেশি আধুনিক নেতা হয়েও মিসেস ইন্দিরা গান্ধীরও ছিল। ইতিহাসে খুব একটা প্রমাণিত না হলেও অটোম্যান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মেহমুদেরও, রোমান বীর জুলিয়াস সিজারেরও এ ধরনের কিছু সুপারস্টিশন ছিল।
তাই যতদূর খোঁজখবর নিয়ে জানা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বর শুরুর পরে যে কোনো সময়ে শেখ হাসিনা আসবেন। তবে কোনো মতেই ডিসেম্বর অবধি অপেক্ষা করবেন না। এটা স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগের রাজনীতি যারা দীর্ঘদিন লক্ষ্য করেছেন, তাঁরা সকলেই জানেন, ডিসেম্বর থেকে মার্চ অবধি মাসগুলো বাস্তবে আওয়ামী লীগেরই। কারণ, এই সময়টা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের সময়। তাই দেখা যায়, এ সময় একটা ভিন্ন আবহাওয়া বাংলাদেশে তৈরি হয়। আর এই ডিসেম্বরের টেম্পোটা তৈরি হওয়া শুরু করে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে। সাদা চোখে দেখলে বলা যায়, এসব কারণে হয়তো শেখ হাসিনা তাঁর প্রত্যাবর্তনের সময়টা আগস্টের পরে নিয়ে যাচ্ছেন।
তবে শেখ হাসিনার মতো রাজনীতিবিদ, যিনি ৪৫ বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম স্তম্ভ। ২১ বছর এ দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এবং তিনিই পৃথিবীতে একমাত্র রাষ্ট্রনায়ক, যে তাঁর দেশে যখন তাঁর বিরুদ্ধে একটি মেটিকুলাস ডিজাইনের ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছে, সে সময়ে নিজ দেশের সিকিউরিটি ও সামরিক বিমান ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। তাই তাঁর দেশে ফেরাকে খুব সাদামাটা বিষয় ভাবার সুযোগ কম। যেমন প্রখ্যাত আইনজীবী মহসিন রশীদ একটি টকশোতে বলেছেন, “তিনি তো আপনার আমার মতো প্লেনের টিকিট কেটে এসে বিমানবন্দরে নামবেন না। তিনি যেমন একটি সামরিক বিমানে গেছেন, তেমনি একটি ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে আসবেন। এবং তার উদাহরণ এই দক্ষিণ এশিয়ায় আছে, নেওয়াজ শরীফের জন্য বিমানবন্দরে কোর্ট বসে তাঁকে মুক্ত মানুষ হিসেবে প্রবেশ করার সুযোগ তৈরি করে দেয়।” মহসিন রশীদের এই বক্তব্য মূলত একটি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সমঝোতা ও দেশের রাজনৈতিক অবস্থানের কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার—নেওয়াজ শরীফের থেকেও শেখ হাসিনা অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থায় দেশত্যাগ করেছিলেন, এবং তাঁর রাজনৈতিক আশ্রয়ও অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ। যে দেশটিতে তিনি বর্তমানে “রাজনৈতিক আশ্রয়” নিয়ে আছেন, সে দেশের শুধু সরকার তাঁকে আশ্রয় দেয়নি, তাঁকে আশ্রয় দিয়েছে রাষ্ট্র—অর্থাৎ রাষ্ট্রের সকল দলের জনপ্রতিনিধিরা পার্লামেন্টের মাধ্যমে তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন। তাই প্রখ্যাত আইনজীবী মহসিন রশীদের বক্তব্যের সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের স্ট্যাটাস ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের মর্যাদা মিলিয়েও কিছু চিন্তার অবকাশ থেকে যায়।
অন্যদিকে প্রখ্যাত সাংবাদিক, বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান সাবির মুস্তফা (যিনি অনেকটা ফরিদ জাকারিয়ার মতো ভাগ্যবান, কারণ তাঁর পিতাও বিখ্যাত ও শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক ছিলেন) একটি টকশোতে বলেছেন, তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনার ফেরার দিন বিমানবন্দরে বিপুল মানুষের উপস্থিতি ঠেকানোর জন্য সরকার ওই দিন ঢাকায় কারফিউ দেবে। তা ছাড়া তিনি আরও বলেছেন, শেখ হাসিনা ফিরলে তাঁকে হজম করা এই সরকারের পক্ষে কষ্টকর।
অন্যদিকে, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার বিচার করার বা শাস্তি দেওয়ার অবস্থানে নেই। তাছাড়া রুমিন ফারহানা আরও বলেছেন, ৫২ ভাগ মানুষকে বাদ দিয়ে সরকারের চলা সম্ভব নয়। এই ৫২ ভাগ মানুষ বলতে তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থক বা শেখ হাসিনার সমর্থককেই পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত করেছেন।
বাস্তবে শেখ হাসিনাও তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যাই ঘটুক তিনি ফিরবেন। আর এই “যাই ঘটুক” বলতে তিনি কী বোঝাচ্ছেন, তার যতটুকু খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে তিনি জেলে যাওয়া, এমনকি বুক পেতে গুলি নিয়েও দেশে ফিরতে রাজি। এবং এ ইঙ্গিতও তিনি দিয়েছেন তাঁর সাক্ষাৎকারেও। তিনি বলেছেন, “এই দেশের মাটিতে তাঁর বাবার রক্ত মিশে আছে, তাঁর বাবার নেতৃত্বে যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সেই মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্ত মিশে আছে—তাই সেখানেই তিনি ফিরতে চান।” অর্থাৎ সর্বোচ্চ রক্তের ইঙ্গিত তিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে দিয়েছেন—এমনকি ২১ আগস্টের কথাও উল্লেখ করেছেন।
এখন প্রশ্ন আসে, তিনি সাহস কোথা থেকে পাচ্ছেন, আর সাবির মুস্তফাও বা কেন বলছেন, সরকার তাঁকে হজম করতে পারবে না, রুমিন ফারহানা কেন বলছেন, সরকার তাঁর বিচার করার অবস্থানে নেই?
বাস্তবে এই অবস্থানটি তৈরি করে দিয়েছে ইউনূস ১২ ফেব্রুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন করে। যে নির্বাচনের ভেতর দিয়ে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগ মনে করেছে তাঁদের বিজয় হয়েছে। কারণ, এই নির্বাচনের আগে একটি তথাকথিত আওয়ামী লীগ বা তৃণমূল আওয়ামী লীগ গড়ার চেষ্টা ইউনূস সরকারসহ আরও কয়েকটি মহল মিলে করেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগাররা জেল, জুলুম, মৃত্যু মেনে নিয়েও শেখ হাসিনার বাইরে যায়নি। এরপরে চিহ্নিত আওয়ামী লীগার বা চৌদ্দ দলীয় জোটের চিহ্নিত ব্যক্তিদের দিয়ে আওয়ামী লীগার হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করানোর একটা চেষ্টা হয়। সে কাজেও কোনো প্রকৃত আওয়ামী লীগারকে পাওয়া যায়নি। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগারদের কাছে ১/১১ থেকে বেঈমান হিসেবে চিহ্নিত ও আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মেহেরপুরের এক সাবেক এমপি কিছু অর্থ ব্যয় করেছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড় করাতে। কিন্তু সে সব প্রার্থীর বেশিভাগই মাঠে নামেনি। কারণ, শেখ হাসিনা ততক্ষণে সোশ্যাল ফোরামের মাধ্যমে ও বিদেশি পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিয়ে তাঁর লোকদের ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার নির্দেশ দেন। তাই ওই স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও অনেকে তখন শেখ হাসিনার নির্দেশ মানেন।
অন্যদিকে জি. এম. কাদের তাঁর জাতীয় পার্টিকে নিয়ে অতীতের মতো এবারও নানামুখী চাপে নির্বাচনে যোগ দেন। কিন্তু তিনিও ওইভাবে নির্বাচন করেননি। যার ফলে নির্বাচনটি মূলত হয়েছে একটি গ্রুপের মধ্যেই ভাগাভাগি করে। কারণ, জামায়াত, বিএনপি, এনসিপি মূলত যারা “ন্যাচারাল অ্যালাই” দীর্ঘদিন ধরে। এরপরে বাংলাদেশ সম্পর্কে মূলত কোনো ধারণা ও জ্ঞান নেই, এমন কিছু ভারতীয় সাংবাদিক একটা ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চেয়েছিল—এ নির্বাচনে হিন্দুরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। বাস্তবে সে ন্যারেটিভও টেকেনি।
সবশেষে জি. এম. কাদেরের একটি তথ্যমূলক নির্বাচনী বিশ্লেষণ, যা ভারত-বাংলাদেশের মিডিয়ায় ছাপা হয়েছে, সেখানে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ১৩ ভাগ লোক ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোট দিয়েছে। অন্যদিকে রুমিন ফারহানা বলছেন, ৫২ ভাগ লোককে বাদ দিয়ে সরকার চালানো সম্ভব নয়। যার ফলে নির্বাচনটি যেমন মূলত একটি গ্রুপের মধ্যে ভাগাভাগি করে হয়েছে, তেমনি নির্বাচনটি ত্রুটিপূর্ণ। এ ধরনের নির্বাচনের ভেতর দিয়ে আসা সরকার সব দেশেই সব সময়ই দুর্বল থাকে।
সাবির মুস্তফা হয়তো সঠিক, তবে বর্তমান সরকার ঘিরে শুভচিন্তা থেকে বলা যায় শেখ হাসিনার ফেরার দিনে সাবির মুস্তফা যে কারফিউয়ের আশঙ্কা করছেন, ওই পদক্ষেপে বর্তমান সরকার যাবে না। কারণ, কারফিউ দিলেই যে কোনো সরকার একটি সূক্ষ্ম সুতোর ওপর দাঁড়িয়ে যায়। তখন ব্যালান্সটা দ্রুত যে কোনো দিকেই চলে যায়। আর বাংলাদেশের কারফিউয়ের ইতিহাস কোনো সরকারের জন্য সুখকর নয়। আয়ুব খান, এরশাদ, ইয়াজউদ্দিন ও শেখ হাসিনা কারফিউ দিয়েছিলেন। সব ক্ষেত্রেই ফল সরকারের বিপক্ষেই গেছে।
এজন্য শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও তাঁর পরবর্তী সময়ের দেশের রাজনীতির প্রতিটি পৃষ্ঠার জন্য অপেক্ষারই সময় এখন।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 


















