০২:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬

ধর্ম যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে

ধর্ম মানবসভ্যতার অন্যতম শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি। সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার, দানশীলতা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার মতো অসংখ্য ইতিবাচক মূল্যবোধের পেছনে ধর্মীয় অনুপ্রেরণা কাজ করেছে। যুগে যুগে অসংখ্য সাধক, সংস্কারক ও সাধারণ বিশ্বাসী তাঁদের জীবন দিয়ে সমাজকে বদলে দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি বাস্তবতাও সমানভাবে স্পষ্ট—ধর্মকে বহুবার রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন ও সংরক্ষণের কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

সমস্যা ধর্মে নয়, বরং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারে। যখন ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের বিবেককে জাগ্রত করার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তখন ধর্ম তার নৈতিক শক্তি হারাতে শুরু করে। রাষ্ট্রক্ষমতার সমালোচক হওয়ার বদলে যদি ধর্ম ক্ষমতাবানদের রক্ষাকবচে পরিণত হয়, তাহলে বিশ্বাসের জায়গায় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ প্রাধান্য পায়।

এই বাস্তবতা কোনো নির্দিষ্ট যুগ বা ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে শাসকরা ধর্মকে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের জন্য ব্যবহার করেছেন। বাইবেলের বর্ণনায় দেখা যায়, ইসরায়েলের রাজা জেরোবোয়াম আশঙ্কা করেছিলেন যে জনগণ যদি জেরুজালেমে উপাসনা চালিয়ে যায়, তবে তাদের রাজনৈতিক আনুগত্যও আগের রাজবংশের প্রতিই থেকে যাবে। সেই আশঙ্কা থেকে তিনি বিকল্প উপাসনাকেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং ধর্মীয় সংস্কারের আড়ালে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। ধর্মীয় সিদ্ধান্ত সেখানে মূলত রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়।

Religion is a Repeating Chapter in the History of Politics -  CounterPunch.org

যিশু খ্রিস্টের সময়েও ধর্ম ও রাজনীতির এই জটিল সম্পর্ক স্পষ্ট ছিল। ধর্মীয় নেতৃত্বের একটি অংশ তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে কেবল আধ্যাত্মিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেনি; তারা আশঙ্কা করেছিল, এর ফলে বিদ্যমান রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং রোমান শাসকদের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। ফলে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করা হলেও প্রকৃত উদ্বেগ ছিল ক্ষমতার কাঠামো রক্ষা করা।

ইউরোপের ইতিহাসে এই প্রবণতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের চার্চ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে। রোমের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে তিনি নিজেকে নতুন চার্চের সর্বোচ্চ প্রধান ঘোষণা করেন। একটি দেশের ধর্মীয় কাঠামো রাজনৈতিক প্রয়োজনের কারণে বদলে যায়।

একইভাবে মধ্যযুগীয় ইনকুইজিশনের ইতিহাস দেখায়, মতাদর্শগত ঐক্য রক্ষার নামে রাষ্ট্রক্ষমতা ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব একত্রে কাজ করেছে। বিচার, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, জোরপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদ এমনকি নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে ধর্মীয় শুদ্ধতা প্রতিষ্ঠার যুক্তিতে। সেখানে নৈতিক যুক্তির চেয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা বড় হয়ে উঠেছিল।

ইউরোপের দীর্ঘ ধর্মীয় যুদ্ধও একই শিক্ষা দেয়। ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের সংঘাত কেবল ধর্মতাত্ত্বিক মতপার্থক্যের ফল ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রাজবংশীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভূরাজনৈতিক হিসাব এবং রাষ্ট্রক্ষমতার লড়াই। ধর্মীয় পরিচয় বহু ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষমতা ও সম্পদের আকর্ষণ থেকে সব সময় মুক্ত থাকতে পারেনি। রেনেসাঁ যুগে চার্চের অভ্যন্তরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ে ভ্যাটিকান ব্যাংককে ঘিরে আর্থিক বিতর্কও দেখিয়েছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও মানবিক দুর্বলতার ঊর্ধ্বে নয়।

এসব ঘটনার অর্থ এই নয় যে ধর্ম বা ধর্মবিশ্বাস ব্যর্থ। বরং এগুলো মনে করিয়ে দেয়, মানুষের তৈরি যেকোনো প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার প্রলোভনে পথভ্রষ্ট হতে পারে। ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক আচরণ এক বিষয় নয়।

Opinion | The Day Christian Fundamentalism Was Born - The New York Times

খ্রিস্টধর্মের বাইরেও বিশ্বের নানা সভ্যতায় একই ধারা দেখা যায়। বিভিন্ন শাসক নিজেদের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেওয়া কিংবা বিরোধী মত দমনে ঈশ্বরের নামে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। ইতিহাস বলছে, যখন ধর্মীয় বেদি ও রাজনৈতিক সিংহাসনের দূরত্ব কমে আসে, তখন ধর্ম স্বাধীন নৈতিক কণ্ঠস্বর হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।

এই অভিজ্ঞতা থেকে আধুনিক গণতন্ত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করেছে—রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব বজায় রাখা। এর অর্থ ধর্মকে জনজীবন থেকে নির্বাসিত করা নয়। বরং ধর্মীয় সম্প্রদায় দুর্নীতি, অন্যায়, মানবাধিকার কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে অবশ্যই মত প্রকাশ করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের নৈতিক দায়িত্বও রয়েছে। কিন্তু সেই ভূমিকা রাজনৈতিক সংগঠনের বিকল্প হয়ে উঠলে সমস্যার সূচনা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে, কোনো রাজনীতিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তাঁর সমর্থনে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বড় সমাবেশ সংগঠিত করা হচ্ছে। আইনগত প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই হওয়ার আগেই বিষয়টি বিশ্বাসের প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়। এতে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। আদালত ও তদন্ত সংস্থার কাজ তখন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চাপের মধ্যে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।

এটি কোনো একক ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমস্যা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট, ইভানজেলিক্যাল কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠনও বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনী রাজনীতি, দলীয় সমর্থন বা প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। চরিত্র বদলেছে, কিন্তু ধারা একই থেকেছে।

ইতিহাসের মহান ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের দিকে তাকালে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। হিব্রু নবীরা রাজাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। যিশু ধর্মীয় ভণ্ডামি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের সমালোচনা করেছেন। বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের নৈতিক নেতারা সাধারণত ক্ষমতার সঙ্গী না হয়ে ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই ধর্মের সর্বোচ্চ শক্তি ক্ষমতার পাশে দাঁড়ানো নয়, বরং ক্ষমতাকে ন্যায়ের সামনে দাঁড় করানো।

Right to freedom of religion - iPleaders

রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথক অবস্থান গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতি। এটি ধর্মবিরোধী নয়; বরং উভয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা রক্ষার উপায়। রাষ্ট্র যেন মানুষের বিশ্বাস নির্ধারণ করতে না পারে, আবার ধর্মীয় কর্তৃত্বও যেন আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বিকল্পে পরিণত না হয়।

একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার অনুসারীর সংখ্যা নয়, বরং সত্য ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে নিজের মানুষদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার সাহস। যদি কোনো ব্যক্তি কেবল একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ার কারণে অন্যায়ের অভিযোগ থেকে রাজনৈতিক সুরক্ষা পায়, তাহলে ধর্ম ধীরে ধীরে তার নৈতিক অবস্থান হারায়। তখন সত্যের প্রতি আনুগত্যের জায়গায় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অন্ধ আনুগত্য স্থান নেয়।

ধর্ম যখন দলীয় রাজনীতির যন্ত্রে পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় উভয় পক্ষই। রাজনীতি অযৌক্তিক ধর্মীয় বৈধতার আবরণ পায়, আর ধর্ম সাময়িক রাজনৈতিক প্রভাবের বিনিময়ে তার দীর্ঘমেয়াদি নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বিসর্জন দেয়।

ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে, এই পথের শেষপ্রান্তে থাকে বিভাজন, প্রতিষ্ঠানগত অবক্ষয় এবং সামাজিক অবিশ্বাস। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়াই আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

জনপ্রিয় সংবাদ

ধর্ম যখন রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে

০২:১৮:০১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

ধর্ম মানবসভ্যতার অন্যতম শক্তিশালী নৈতিক ভিত্তি। সহমর্মিতা, ন্যায়বিচার, দানশীলতা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার মতো অসংখ্য ইতিবাচক মূল্যবোধের পেছনে ধর্মীয় অনুপ্রেরণা কাজ করেছে। যুগে যুগে অসংখ্য সাধক, সংস্কারক ও সাধারণ বিশ্বাসী তাঁদের জীবন দিয়ে সমাজকে বদলে দিয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি বাস্তবতাও সমানভাবে স্পষ্ট—ধর্মকে বহুবার রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন ও সংরক্ষণের কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

সমস্যা ধর্মে নয়, বরং ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারে। যখন ধর্মীয় বিশ্বাস মানুষের বিবেককে জাগ্রত করার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়, তখন ধর্ম তার নৈতিক শক্তি হারাতে শুরু করে। রাষ্ট্রক্ষমতার সমালোচক হওয়ার বদলে যদি ধর্ম ক্ষমতাবানদের রক্ষাকবচে পরিণত হয়, তাহলে বিশ্বাসের জায়গায় প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ প্রাধান্য পায়।

এই বাস্তবতা কোনো নির্দিষ্ট যুগ বা ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে শাসকরা ধর্মকে নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের জন্য ব্যবহার করেছেন। বাইবেলের বর্ণনায় দেখা যায়, ইসরায়েলের রাজা জেরোবোয়াম আশঙ্কা করেছিলেন যে জনগণ যদি জেরুজালেমে উপাসনা চালিয়ে যায়, তবে তাদের রাজনৈতিক আনুগত্যও আগের রাজবংশের প্রতিই থেকে যাবে। সেই আশঙ্কা থেকে তিনি বিকল্প উপাসনাকেন্দ্র গড়ে তোলেন এবং ধর্মীয় সংস্কারের আড়ালে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। ধর্মীয় সিদ্ধান্ত সেখানে মূলত রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়।

Religion is a Repeating Chapter in the History of Politics -  CounterPunch.org

যিশু খ্রিস্টের সময়েও ধর্ম ও রাজনীতির এই জটিল সম্পর্ক স্পষ্ট ছিল। ধর্মীয় নেতৃত্বের একটি অংশ তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তাকে কেবল আধ্যাত্মিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেনি; তারা আশঙ্কা করেছিল, এর ফলে বিদ্যমান রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং রোমান শাসকদের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। ফলে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করা হলেও প্রকৃত উদ্বেগ ছিল ক্ষমতার কাঠামো রক্ষা করা।

ইউরোপের ইতিহাসে এই প্রবণতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের চার্চ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে। রোমের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে তিনি নিজেকে নতুন চার্চের সর্বোচ্চ প্রধান ঘোষণা করেন। একটি দেশের ধর্মীয় কাঠামো রাজনৈতিক প্রয়োজনের কারণে বদলে যায়।

একইভাবে মধ্যযুগীয় ইনকুইজিশনের ইতিহাস দেখায়, মতাদর্শগত ঐক্য রক্ষার নামে রাষ্ট্রক্ষমতা ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব একত্রে কাজ করেছে। বিচার, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, জোরপূর্বক জিজ্ঞাসাবাদ এমনকি নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে ধর্মীয় শুদ্ধতা প্রতিষ্ঠার যুক্তিতে। সেখানে নৈতিক যুক্তির চেয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা বড় হয়ে উঠেছিল।

ইউরোপের দীর্ঘ ধর্মীয় যুদ্ধও একই শিক্ষা দেয়। ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের সংঘাত কেবল ধর্মতাত্ত্বিক মতপার্থক্যের ফল ছিল না; এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রাজবংশীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভূরাজনৈতিক হিসাব এবং রাষ্ট্রক্ষমতার লড়াই। ধর্মীয় পরিচয় বহু ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষমতা ও সম্পদের আকর্ষণ থেকে সব সময় মুক্ত থাকতে পারেনি। রেনেসাঁ যুগে চার্চের অভ্যন্তরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তী সময়ে ভ্যাটিকান ব্যাংককে ঘিরে আর্থিক বিতর্কও দেখিয়েছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও মানবিক দুর্বলতার ঊর্ধ্বে নয়।

এসব ঘটনার অর্থ এই নয় যে ধর্ম বা ধর্মবিশ্বাস ব্যর্থ। বরং এগুলো মনে করিয়ে দেয়, মানুষের তৈরি যেকোনো প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার প্রলোভনে পথভ্রষ্ট হতে পারে। ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক আচরণ এক বিষয় নয়।

Opinion | The Day Christian Fundamentalism Was Born - The New York Times

খ্রিস্টধর্মের বাইরেও বিশ্বের নানা সভ্যতায় একই ধারা দেখা যায়। বিভিন্ন শাসক নিজেদের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেওয়া কিংবা বিরোধী মত দমনে ঈশ্বরের নামে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। ইতিহাস বলছে, যখন ধর্মীয় বেদি ও রাজনৈতিক সিংহাসনের দূরত্ব কমে আসে, তখন ধর্ম স্বাধীন নৈতিক কণ্ঠস্বর হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।

এই অভিজ্ঞতা থেকে আধুনিক গণতন্ত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গ্রহণ করেছে—রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব বজায় রাখা। এর অর্থ ধর্মকে জনজীবন থেকে নির্বাসিত করা নয়। বরং ধর্মীয় সম্প্রদায় দুর্নীতি, অন্যায়, মানবাধিকার কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে অবশ্যই মত প্রকাশ করতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের নৈতিক দায়িত্বও রয়েছে। কিন্তু সেই ভূমিকা রাজনৈতিক সংগঠনের বিকল্প হয়ে উঠলে সমস্যার সূচনা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে, কোনো রাজনীতিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তাঁর সমর্থনে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বড় সমাবেশ সংগঠিত করা হচ্ছে। আইনগত প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই হওয়ার আগেই বিষয়টি বিশ্বাসের প্রশ্নে রূপান্তরিত হয়। এতে বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। আদালত ও তদন্ত সংস্থার কাজ তখন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চাপের মধ্যে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।

এটি কোনো একক ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমস্যা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট, ইভানজেলিক্যাল কিংবা অন্যান্য ধর্মীয় সংগঠনও বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনী রাজনীতি, দলীয় সমর্থন বা প্রশাসনিক ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। চরিত্র বদলেছে, কিন্তু ধারা একই থেকেছে।

ইতিহাসের মহান ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের দিকে তাকালে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। হিব্রু নবীরা রাজাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। যিশু ধর্মীয় ভণ্ডামি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের সমালোচনা করেছেন। বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের নৈতিক নেতারা সাধারণত ক্ষমতার সঙ্গী না হয়ে ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন। এ কারণেই ধর্মের সর্বোচ্চ শক্তি ক্ষমতার পাশে দাঁড়ানো নয়, বরং ক্ষমতাকে ন্যায়ের সামনে দাঁড় করানো।

Right to freedom of religion - iPleaders

রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথক অবস্থান গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতি। এটি ধর্মবিরোধী নয়; বরং উভয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা রক্ষার উপায়। রাষ্ট্র যেন মানুষের বিশ্বাস নির্ধারণ করতে না পারে, আবার ধর্মীয় কর্তৃত্বও যেন আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বিকল্পে পরিণত না হয়।

একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার অনুসারীর সংখ্যা নয়, বরং সত্য ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে নিজের মানুষদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার সাহস। যদি কোনো ব্যক্তি কেবল একই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ার কারণে অন্যায়ের অভিযোগ থেকে রাজনৈতিক সুরক্ষা পায়, তাহলে ধর্ম ধীরে ধীরে তার নৈতিক অবস্থান হারায়। তখন সত্যের প্রতি আনুগত্যের জায়গায় প্রতিষ্ঠানের প্রতি অন্ধ আনুগত্য স্থান নেয়।

ধর্ম যখন দলীয় রাজনীতির যন্ত্রে পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় উভয় পক্ষই। রাজনীতি অযৌক্তিক ধর্মীয় বৈধতার আবরণ পায়, আর ধর্ম সাময়িক রাজনৈতিক প্রভাবের বিনিময়ে তার দীর্ঘমেয়াদি নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বিসর্জন দেয়।

ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে, এই পথের শেষপ্রান্তে থাকে বিভাজন, প্রতিষ্ঠানগত অবক্ষয় এবং সামাজিক অবিশ্বাস। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়াই আজকের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।