একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা শুধু তার অস্ত্রভাণ্ডার, সামরিক বাজেট কিংবা যুদ্ধঘোষণার ভাষণে নির্ভর করে না। সেই নিরাপত্তার প্রকৃত ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে সেইসব মানুষদের কাঁধে, যারা নিজেদের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে দেশের জন্য যুদ্ধ করেন। কিন্তু যখন বারবার একই ধরনের হামলায় সেনাসদস্যদের প্রাণহানি ঘটে, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশল, গোয়েন্দা সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার—সবকিছুকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বহু বছর ধরে চলমান সশস্ত্র বিদ্রোহ আবারও প্রমাণ করেছে যে এই সংঘাতকে অতীতের সমস্যা ভেবে অবহেলা করার সুযোগ নেই। বোকো হারাম এবং ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স (আইএসডব্লিউএপি) এখনও এমন সক্ষমতা ধরে রেখেছে, যা সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের হামলা চালাতে এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদেরও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখায়, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো শুধু টিকে নেই, বরং নিজেদের কৌশলও বদলাচ্ছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একাধিক সামরিক কর্মকর্তা ও সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন। একটি হামলায় পুরো একটি সামরিক ঘাঁটি আক্রান্ত হয়েছে, প্রাণ হারিয়েছেন ব্রিগেড কমান্ডারসহ বহু সেনা। অন্য ঘটনায় একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ভাগ্য এখনও অনিশ্চিত, কারণ তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি এবং তাঁর দেহও উদ্ধার হয়নি। আবার অন্য এক অভিযানে কর্নেল পদমর্যাদার কর্মকর্তাসহ কয়েকজন সেনা অতর্কিত হামলায় নিহত হন। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ, যেখানে নেতৃত্বস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে আঘাত হানার কৌশল স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতা সেনাবাহিনীর মনোবলের ওপর যেমন প্রভাব ফেলতে পারে, তেমনি সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও গভীর করে। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে যদি অভিজ্ঞ কমান্ডাররাই ধারাবাহিকভাবে প্রাণ হারান, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—রাষ্ট্র কি যথেষ্ট প্রস্তুত? বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা মূল্যায়নে কোথাও কি ঘাটতি রয়েছে? নাকি সংঘাতের প্রকৃতি বদলে গেলেও প্রতিরোধের কৌশল আগের জায়গাতেই আটকে আছে?
রাষ্ট্রপ্রধান নিহত সেনাসদস্যদের জাতির বীর হিসেবে সম্মান জানিয়েছেন এবং বাহিনীকে সাহস ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এই সম্মান অবশ্যই প্রাপ্য। কিন্তু শুধু প্রশংসা বা আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জানিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যে পরিবারটি এক মুহূর্তে তার উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়েছে, তাদের জীবনের বাস্তবতা অনেক বেশি কঠিন। শোকের পাশাপাশি তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, বয়স্ক বাবা-মায়ের চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাতের মতো অসংখ্য সংকট।
তাই শহীদ সেনাদের প্রতি প্রকৃত সম্মান প্রকাশের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাঁদের পরিবারের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো। ক্ষতিপূরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন এবং সামাজিক নিরাপত্তা—এসবকে সাময়িক সহানুভূতির বিষয় হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের স্থায়ী দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যারা দেশের নিরাপত্তার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের পরিবার যেন ভবিষ্যতে অবহেলার শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধা।

অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি শুধু সামরিক প্রতিক্রিয়া দিয়েই মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর অর্থায়ন, অস্ত্র সরবরাহ, লজিস্টিক সহায়তা এবং গোপন নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে সেগুলো ভেঙে দেওয়া অপরিহার্য। যারা সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে এবং যারা অর্থ, আশ্রয় বা অন্য কোনোভাবে এই সহিংসতাকে টিকিয়ে রাখে—দুই পক্ষই একই অপরাধচক্রের অংশ। সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষকদের বিচারের আওতায় না আনলে কেবল মাঠপর্যায়ে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য অর্জন করা কঠিন।
একই সঙ্গে চলমান সংঘাত নিয়ে জাতীয় বিতর্কেও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব উঠেছে। কিন্তু আলোচনার প্রশ্ন তখনই অর্থবহ হতে পারে, যখন তা রাষ্ট্রের অবস্থানকে দুর্বল না করে এবং সহিংসতাকে পুরস্কৃত করার বার্তা না দেয়। বিশ্বের বহু দেশ দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। তাদের অভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, কার্যকর গোয়েন্দা তৎপরতা, উন্নত সামরিক সক্ষমতা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ—সব মিলিয়েই টেকসই সমাধানের পথ তৈরি হয়।
প্রতিটি কফিন কেবল একজন সেনার মৃত্যু নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি এবং একটি জাতির জন্য সতর্কবার্তা। তাই নতুন করে শোক প্রকাশের আগে জরুরি হলো সেই কারণগুলো দূর করা, যেগুলো এমন প্রাণহানিকে বারবার অনিবার্য করে তুলছে।
যারা দেশের নিরাপত্তার জন্য জীবন দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতা চিরস্থায়ী থাকবে। কিন্তু সেই কৃতজ্ঞতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন রাষ্ট্র তাদের পরিবারের দায়িত্ব নেবে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করবে এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর, সুসংগঠিত ও দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। নিহত বীরদের স্মৃতির প্রতি সেটিই হবে সবচেয়ে যথার্থ সম্মান।
আলজাজিরাহ সম্পাদকীয় বোর্ড 


















