সাংবাদিক শাহেদ কামাল ৪ জুলাই ৮৬ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুর খবর খুব যে গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে তা নয়। তাছাড়া কোথায় যেন তাঁর সাংবাদিক পরিচয়কে ছাপিয়ে উঠছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করার বিষয়টি। এর মূল কারণ বোঝা যাচ্ছে, তিনি খণ্ডকালীন শিক্ষক হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে তাঁর অনেক প্রিয় ছাত্রছাত্রী সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দিয়েছেন। এবং তারা সম্মানিত অবস্থানে আছেন এ পেশায় ও সমাজে।
কিন্তু আমরা যারা পেশায় ঢুকে শাহেদ কামাল ভাইকে একজন সিনিয়র হিসেবে দেখে আসছি। তাঁর কাছে নানাভাবে যাবার সুযোগ হয়েছে। আমাদের কাছে তিনি একজন ভিন্নমাত্রার সাংবাদিক।
সাংবাদিক হিসেবে এতটা বছর পার করে এসে এখন উপলব্ধি করি, সাংবাদিক পেশাটির সব থেকে বড় বিষয় হচ্ছে সাংবাদিকের মনোজাগতিক অবস্থান। বাংলা সাংবাদিকতায় সাংবাদিক (সম্পাদক) জহুর হোসেন চৌধুরি, গৌর কিশোর ঘোষের লেখার সঙ্গে আমরা তরুণ বেলা থেকে পরিচিত। তাঁদের কাছে যাবার সুযোগ হয়নি। কিন্তু এ দুজনেরই লেখায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠতো ইহ-জাগতিকতা বা বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তা-চেতনাকেই তারা তাদের মনোজগত ও চিন্তা-চেতনার ভেতর গেঁথে নিয়েছিলেন।
গৌর কিশোর ঘোষ কিছুটা মার্কসবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর ইহ-জাগতিকতার সঙ্গে একটি শ্রেণী সংগ্রাম জড়িয়ে ছিল। আর জহুর হোসেন চৌধুরির ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল আইনস্টাইন ও মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সঙ্গে। তাই তিনি ছিলেন আরও বেশি মুক্তমনা।
এই মানবেন্দ্রনাথ রায়ের ধারার আমরা যাকে খুব কাছ থেকে পেয়েছি, যার কাছে বারবার যেতে পেরেছি—তিনি আবুজাফর শামসুদ্দিন। বাংলা উপন্যাসে, প্রবন্ধে ও বাংলা সাংবাদিকতায় তাঁর অবস্থান এখনও নির্ধারিত হয়নি। এবং খুব শীঘ্র হবার কোনো সুযোগও নেই। কারণ, তাঁর মনোজগত ছিল শতভাগ ইহ-জাগতিক। এবং একটি সমাজে মধ্যবিত্তের বিকাশ ও শ্রেণীর পরিবর্তন কীভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে শিক্ষাসহ নানান উপাদানের মাধ্যমে গড়ে ওঠে সেগুলো তাঁর উপন্যাস অনেক সহজ করে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে। তাই তিনি সহজে উচ্চারণ করেছেন, পাকিস্তান নামক একটি পশ্চাদপদ কনসেপ্ট ও ধর্মের নামে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভূত কোনো মতেই তাঁর ঘাড়ে চাপানো যাবে না।
তাঁর সময়ে বসেই তিনি বারবার বলে গেছেন, মনোজগত থেকে ইহ-জাগতিকতা চলে গেলে বিজ্ঞানের জায়গাগুলো পুরাণ দখল করে নেবে। আর কোনো মানুষের চিন্তার জগতে যদি বিজ্ঞানের স্থানটি পুরাণ দখল করে নেয় তাহলে ওই মানুষ জীবিত থাকলেও সে মূলত জাগতিকভাবে মৃত।

সাংবাদিকতা যেহেতু রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। তাই প্রকৃত রাষ্ট্রকে যেমন ইহ-জাগতিক চিন্তার হতে হয়—কোনো রাষ্ট্রে বিজ্ঞানের জায়গা পুরাণ দখল করতে শুরু করলে ওই রাষ্ট্রের এক ধরনের ক্ষয় শুরু হয়। এ কারণে রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্র পরিচালকদের সব সময়ই ইহ-জাগতিক হতে হয়। তা নাহলে তাদের হাত ধরে কোনো আধুনিক বা উন্নত রাষ্ট্র তৈরির সম্ভাবনা কমে যায়। রাষ্ট্রের চুতুর্থ স্তম্ভের প্রতিনিধি সাংবাদিককেও তাই ইহ-জাগতিক হতে হয়, পশ্চাদপদ মন নিয়ে, বিজ্ঞানের জায়গায় পুরাণকে বসিয়ে সাংবাদিক হওয়া যায় না।
একজন মানুষকে ইহ-জাগতিক হতে হলে তাকে জাঁ পল সার্তের কথা অনুযায়ী অনেকগুলো জাগতিক জ্ঞানের জগতে ডুব দেবার অধিকারী হতে হয়। এবং সেই সব ভূবন দিয়ে তার একটা লাইফস্টাইল তৈরি করতে হয়।
সাংবাদিক শাহেদ কামালকে আমরা ভাই বলেই সম্বোধন করতাম। তাঁর একটা নিজস্ব আধুনিক লাইফস্টাইল ছিল। এবং এটা তাঁর নিজের ও পরিবারের সাহায্যে তৈরি। জন্মগতভাবে তিনি অবশ্য সৌভাগ্যবান। রুপোর চামচ, সোনার চামচ মুখে নিয়ে প্রতিদিন শত শত সন্তান জন্মায়—কিন্তু কবি সুফিয়া কামালের গর্ভে জন্মানোর সুযোগ পায় মাত্র কয়েকজন। কবি সুফিয়া কামালকে শাহেদ কামাল শুধুমাত্র মা হিসেবে পাননি, তাঁকে ধারণ করার মতো আধুনিকতাকেও তিনি নিজের জীবনে নিয়েছিলেন। আর এটা সম্ভব হয়েছিল জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি নিজের জন্য অনেকগুলো জগত তৈরি করতে পেরেছিলেন।
তাঁর কর্মক্ষেত্র বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় তরুণ সাংবাদিক হিসেবে বহু সময় কাটিয়েছি তাঁর সঙ্গে। তাঁর বাইসাইকেলটি এই লেখার মুহূর্তে যেন চোখের সামনে ভাসছে। সে সময় পিটিআই, অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ঢাকা ব্যুরো চিফরাও তাদের কাজের ফাঁকে একটা বড় সময় কাটাতেন তাঁর টেবিলের সামনে। বিশেষ করে পিটিআই-এর অচিন রায়, অল ইন্ডিয়া রেডিও’র মুখার্জী বাবু সকলে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। বন্ধু ছিলেন নিয়মিত ঢাকা কভার করতে আসা ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একজন বিখ্যাত সাংবাদিক (এ মুহূর্তে তাঁর নাম মনে করতে পারছি না)। এদের সঙ্গে আড্ডার সময়ে বা কোনো কোনো দিন রয়টার্সের কপির অসঙ্গতি নিয়ে বা কোনো নিউজ নিয়ে ওই ঘটনার পরবর্তী কী হতে পারে—এসব বিষয়ে তাঁর আলোচনা শুনতাম। তখনও আমাদের মাথার ভেতর জিও-পলিটিক্সের গুরুত্ব ঢোকেনি, গুরুত্ব ঢোকেনি কালচারের নিম্নগামিতার ভয়াবহতা নিয়ে।
সম্ভবত ৮৮ বা ৮৯-এর দিকে হবে, তখন টেলিভিশনে বিভিন্ন কবিদের কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান ছিল। আর টেলিভিশন বলতে বিটিভি। তখনও পৃথিবী উন্মুক্ত হয়নি। ওই সময়ে একদিন সন্ধ্যার পরে ওই ধরনের একটি কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে এক তরুণ কবি দেশাত্মবোধক একটি কবিতা পড়ছেন—তার প্রতিটি লাইনের শেষে মাটির কাছে আছি/ পাখির কাছে আছি/ এ ধরনের আর কী?
যখন কবিতাটি পড়া হচ্ছিল সে সময়ে শাহেদ কামাল ভাই মাথা নিচু করে গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাঁর কাজ করে চলেছিলেন। কবিতাটা শেষ হতেই তিনি মাথা উঁচু না করে শুধু ওই কবির সুর নকল করেই বললেন, “হাসপাতালের বেডে আছি”।
এ মুহূর্তে শুধুমাত্র বাঙালি সংস্কৃতি নয়, উপমহাদেশীয় সংস্কৃতি নয়—বিশ্ব আধুনিক সংস্কৃতি যখন হাসপাতালের আইসিইউতে, তাকে বাঁচানোর ওইভাবে কেউ নেই—সে সময়েই চলে গেলেন সাংবাদিক শাহেদ কামাল—যিনি ৮৯, ৯০-এর দিকেই বুঝেছিলেন, আধুনিক মানুষের ধর্ম “সংস্কৃতির” অবস্থান হাসপাতালের বেডে চলে গেছে।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 


















