১০:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬
সাংবাদিক শাহেদ কামাল যিনি ৯০-এর দশকে বুঝেছিলেন বাঙালির সংস্কৃতি হাসপাতালের বেডে সরকারি অর্থের প্রকৃত ঠিকানা: ট্রেজারি সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর কাবুলে পানির সংকট নিয়ে জাতিসংঘের সতর্কতা, শহরের ভবিষ্যৎ উন্নয়নও ঝুঁকিতে ‘দ্য ওডিসি’ প্রচারে দেবী-প্রেরণার সাজে জেনডায়া, ফ্যাশনে চরিত্রের ভাষা কঙ্গোয় ইবোলা চিকিৎসায় প্রথম ট্রায়াল শুরু, ১৪০০ জন আক্রান্ত অং সান সু চির সঙ্গে দেখা করতে দিল না মিয়ানমার জান্তা থাই বিমানসেবিকার মাধ্যমে হেরোইন পাচার, উৎস মিয়ানমার সন্দেহ পঁচিশ বছর পর তাইওয়ান সেনায় ফিরল কমিউনিস্ট বিরোধী শিক্ষা আমির খানের ব্যক্তিগত আয়োজনে বিয়ে, গৌরী স্প্রাটের সঙ্গে নতুন অধ্যায় এআই এখনো বাস্তব পৃথিবী বোঝে না, গবেষকদের নতুন সতর্কবার্তা

সরকারি অর্থের প্রকৃত ঠিকানা: ট্রেজারি সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর

  • Dr. Irfan Ahmed Chatha
  • ১০:০০:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
  • 2

কোনো রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি হলো—জনগণের অর্থ জনগণের কোষাগারেই থাকবে। সংবিধানও সাধারণত সেই নীতিকেই প্রতিষ্ঠা করে। কর, ঋণ, সরকারি আয় কিংবা ঋণ পরিশোধ থেকে প্রাপ্ত অর্থ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের একীভূত তহবিলের অংশ হওয়ার কথা। কিন্তু সংবিধানের এই সরল নীতি বাস্তব প্রশাসনে এসে বহুস্তরীয় জটিলতায় আটকে যায়। কারণ সরকারি অর্থ বাস্তবে একটি মাত্র হিসাব বা কোষাগারে থাকে না; তা ছড়িয়ে থাকে মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন বিশেষ তহবিলের হাতে।

এই বাস্তবতা থেকেই ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট (টিএসএ) বা একীভূত সরকারি নগদ ব্যবস্থাপনার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উদ্দেশ্য একটাই—রাষ্ট্র যেন যেকোনো সময় জানতে পারে, তার মোট নগদ সম্পদ কোথায় রয়েছে এবং সেই অর্থ সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এই সংস্কার যতটা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক, বাস্তবে তা কার্যকর করা ততটাই কঠিন।

সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব কেবল জমা রাখা অর্থের ভাণ্ডার নয়। অনেক সংস্থা এই অর্থকে দৈনন্দিন পরিচালনা, জরুরি ব্যয় কিংবা বিনিয়োগ আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিও এসব সরকারি আমানতের ওপর নির্ভর করে তারল্য বজায় রাখে। ফলে এসব অর্থ কেন্দ্রীয় ট্রেজারিতে নিয়ে আসার উদ্যোগ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাধীনতা, ব্যাংকিং খাতের তারল্য এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার পুরো কাঠামোকেই প্রভাবিত করে।

এই কারণেই টিএসএ বাস্তবায়ন কেবল একটি নির্দেশনা জারি করলেই সম্পন্ন হয় না। এর জন্য দরকার নির্ভরযোগ্য অর্থপ্রদান ব্যবস্থা, উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি, নগদ প্রবাহের সঠিক পূর্বাভাস এবং এমন একটি কাঠামো, যাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিশ্চিত থাকে যে প্রয়োজনে তারা দ্রুত নিজেদের অর্থ ব্যবহার করতে পারবে।

IMG-20260217-WA0001

এই সংস্কারের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা। বহু দেশে দেখা যায়, সরকারের একদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে অলস অবস্থায় পড়ে থাকে, অন্যদিকে একই সরকার চলতি ব্যয় মেটাতে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজের অর্থ ব্যবহার না করে বাইরে থেকে ব্যয়বহুল ঋণ নিচ্ছে, আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারি আমানত ব্যবহার করে লাভ করছে। এই বৈপরীত্য দূর করাই টিএসএর অন্যতম লক্ষ্য।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরে বলছে, আধুনিক নগদ ব্যবস্থাপনার জন্য টিএসএ অপরিহার্য। বিশ্বব্যাংকও মনে করে, সরকারি অর্থ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলে ঋণ ব্যয় বাড়ে, আর্থিক স্বচ্ছতা কমে এবং সরকারের প্রকৃত নগদ অবস্থার সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না। ফলে কার্যকর অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও ব্যাহত হয়।

তবে বাস্তবতা হলো, এই সংস্কারের বিরোধিতার পেছনে সব সময় অযৌক্তিকতা থাকে না। অনেক স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা তাদের ব্যাংক আমানত থেকে সুদ আয় করে নিজেদের পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশ মেটায়। সেই অর্থ কেন্দ্রীয় কোষাগারে চলে গেলে তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে—প্রয়োজনে কি দ্রুত অর্থ ফেরত পাবে? বর্তমান আয়ের বিকল্প কী হবে? তাদের আর্থিক স্বাধীনতা কতটা বজায় থাকবে?

এসব প্রশ্নই ব্যাখ্যা করে কেন বিশ্বের বহু দেশেই টিএসএ বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। প্রকৃত বাধা প্রযুক্তিগত নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক। বছরের পর বছর ধরে নিজস্ব হিসাব পরিচালনায় অভ্যস্ত সংস্থাগুলো সহজে সেই নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চায় না। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিও বিপুল সরকারি আমানত হারাতে অনাগ্রহী।

নাইজেরিয়ার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। দেশটি ধাপে ধাপে শত শত সরকারি দপ্তরকে টিএসএর আওতায় এনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে সক্ষম হয়। সরকারি নগদ প্রবাহের ওপর নজরদারি বাড়ে এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হয়। কিন্তু একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিপুল সরকারি আমানত কমে যাওয়ায় তারল্য সংকটও তৈরি হয়। অর্থাৎ সংস্কার সফল হলেও তার মূল্য ছিল বাস্তব।

আইএমএফের কাছে নতুন করে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক গবেষণাও দেখায়, টিএসএ ব্যবস্থাপনা গ্রহণকারী দেশগুলো সাধারণত কম ঋণ নেয় এবং ঋণের সুদের চাপও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কারণ সরকার যখন নিজের সব নগদ সম্পদের সমন্বিত চিত্র দেখতে পারে, তখন অপ্রয়োজনীয় স্বল্পমেয়াদি ঋণের প্রয়োজনও কমে যায়। এটি কেবল হিসাবরক্ষণ নয়; সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করে তোলার একটি উপায়।

তবে আধুনিক টিএসএ মানেই সব ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে একটি মাত্র কেন্দ্রীয় হিসাবে অর্থ জমা করা নয়। বর্তমানে অনেক দেশ এমন ব্যবস্থা অনুসরণ করে, যেখানে সরকারি সংস্থাগুলো তাদের দৈনন্দিন লেনদেনের হিসাব বজায় রাখে, কিন্তু দিনের শেষে উদ্বৃত্ত অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেন্দ্রীয় ট্রেজারি হিসাবে স্থানান্তরিত হয়। এতে পরিচালন স্বাধীনতা বজায় থাকে, আবার অলস নগদও একীভূতভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয়।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ টিএসএকে অনেক সময় ভুলভাবে এমন একটি উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেন অর্থ মন্ত্রণালয় সব প্রতিষ্ঠানের অর্থ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে। বাস্তবে লক্ষ্যটি ভিন্ন। ব্যয় করার সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীভূত করা নয়; বরং নগদ অর্থের ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত করা।

পাকিস্তানের মতো দেশে এ কাজ আরও কঠিন। সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ, জাতীয় সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য আর্থিক দায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাও পুরোপুরি সমন্বিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য বিলম্বে আসে, দায়িত্বের ক্ষেত্রও পরস্পরের সঙ্গে ওভারল্যাপ করে। ফলে ট্রেজারি সংস্কার এখানে বৃহত্তর আর্থিক সংস্কারেরই একটি অংশ।

Dollar nears Tk 123 as war keeps markets on edge | The Daily Star

আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো সক্ষমতা। কার্যকর টিএসএর জন্য দরকার সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা, দক্ষ জনবল, নির্ভুল নগদ প্রবাহ পূর্বাভাস এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়। আইন প্রণয়নের চেয়ে এই বাস্তব সক্ষমতা গড়ে তোলাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

তাই এই সংস্কারকে যান্ত্রিকভাবে নয়, বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে এগিয়ে নিতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান আমানতের সুদ হারাবে, তাদের জন্য বিকল্প প্রণোদনা বা ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। বড় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোকে ধাপে ধাপে অন্তর্ভুক্ত করা, উন্নত নগদ পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দ্রুত অর্থপ্রদানের নিশ্চয়তা দেওয়াও সমান জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, বিতর্কটি টিএসএর পক্ষে না বিপক্ষে—এখানে আটকে থাকা উচিত নয়। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, কীভাবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, যা সরকারি অর্থকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনা করবে, কিন্তু একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যৌক্তিক পরিচালন চাহিদাকেও সম্মান জানাবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে গৃহীত আর্থিক ব্যবস্থাপনা আইন ও ট্রেজারি সংস্কার সেই ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে। একই ধরনের উদ্যোগ প্রাদেশিক পর্যায়েও বিস্তৃত হলে সরকারি নগদ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হতে পারে। কারণ প্রদেশগুলোর কাছেও এখন উল্লেখযোগ্য আর্থিক সম্পদ রয়েছে, যা কার্যকরভাবে সমন্বিত হলে সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা আরও উন্নত হবে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—শুধু আইন পাস করলেই ট্রেজারি সংস্কার সফল হয় না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সমন্বয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আস্থা অর্জন। টিএসএ কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, আবার এটি কেবল হিসাবরক্ষণের পরিবর্তনও নয়। এটি এমন একটি কাঠামো, যা নিশ্চিত করতে পারে যে জনগণের অর্থ সত্যিই জনগণের কোষাগারের আওতায় রয়েছে এবং রাষ্ট্র সেই অর্থ সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে সক্ষম।

জনপ্রিয় সংবাদ

সাংবাদিক শাহেদ কামাল যিনি ৯০-এর দশকে বুঝেছিলেন বাঙালির সংস্কৃতি হাসপাতালের বেডে

সরকারি অর্থের প্রকৃত ঠিকানা: ট্রেজারি সংস্কারের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর

১০:০০:২১ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

কোনো রাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি হলো—জনগণের অর্থ জনগণের কোষাগারেই থাকবে। সংবিধানও সাধারণত সেই নীতিকেই প্রতিষ্ঠা করে। কর, ঋণ, সরকারি আয় কিংবা ঋণ পরিশোধ থেকে প্রাপ্ত অর্থ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের একীভূত তহবিলের অংশ হওয়ার কথা। কিন্তু সংবিধানের এই সরল নীতি বাস্তব প্রশাসনে এসে বহুস্তরীয় জটিলতায় আটকে যায়। কারণ সরকারি অর্থ বাস্তবে একটি মাত্র হিসাব বা কোষাগারে থাকে না; তা ছড়িয়ে থাকে মন্ত্রণালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন বিশেষ তহবিলের হাতে।

এই বাস্তবতা থেকেই ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট (টিএসএ) বা একীভূত সরকারি নগদ ব্যবস্থাপনার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উদ্দেশ্য একটাই—রাষ্ট্র যেন যেকোনো সময় জানতে পারে, তার মোট নগদ সম্পদ কোথায় রয়েছে এবং সেই অর্থ সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এই সংস্কার যতটা অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক, বাস্তবে তা কার্যকর করা ততটাই কঠিন।

সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব কেবল জমা রাখা অর্থের ভাণ্ডার নয়। অনেক সংস্থা এই অর্থকে দৈনন্দিন পরিচালনা, জরুরি ব্যয় কিংবা বিনিয়োগ আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিও এসব সরকারি আমানতের ওপর নির্ভর করে তারল্য বজায় রাখে। ফলে এসব অর্থ কেন্দ্রীয় ট্রেজারিতে নিয়ে আসার উদ্যোগ কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাধীনতা, ব্যাংকিং খাতের তারল্য এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার পুরো কাঠামোকেই প্রভাবিত করে।

এই কারণেই টিএসএ বাস্তবায়ন কেবল একটি নির্দেশনা জারি করলেই সম্পন্ন হয় না। এর জন্য দরকার নির্ভরযোগ্য অর্থপ্রদান ব্যবস্থা, উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি, নগদ প্রবাহের সঠিক পূর্বাভাস এবং এমন একটি কাঠামো, যাতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিশ্চিত থাকে যে প্রয়োজনে তারা দ্রুত নিজেদের অর্থ ব্যবহার করতে পারবে।

IMG-20260217-WA0001

এই সংস্কারের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা। বহু দেশে দেখা যায়, সরকারের একদিকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাবে অলস অবস্থায় পড়ে থাকে, অন্যদিকে একই সরকার চলতি ব্যয় মেটাতে উচ্চ সুদে ঋণ গ্রহণ করে। অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজের অর্থ ব্যবহার না করে বাইরে থেকে ব্যয়বহুল ঋণ নিচ্ছে, আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারি আমানত ব্যবহার করে লাভ করছে। এই বৈপরীত্য দূর করাই টিএসএর অন্যতম লক্ষ্য।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরে বলছে, আধুনিক নগদ ব্যবস্থাপনার জন্য টিএসএ অপরিহার্য। বিশ্বব্যাংকও মনে করে, সরকারি অর্থ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলে ঋণ ব্যয় বাড়ে, আর্থিক স্বচ্ছতা কমে এবং সরকারের প্রকৃত নগদ অবস্থার সঠিক চিত্র পাওয়া যায় না। ফলে কার্যকর অর্থনৈতিক পরিকল্পনাও ব্যাহত হয়।

তবে বাস্তবতা হলো, এই সংস্কারের বিরোধিতার পেছনে সব সময় অযৌক্তিকতা থাকে না। অনেক স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা তাদের ব্যাংক আমানত থেকে সুদ আয় করে নিজেদের পরিচালন ব্যয়ের একটি অংশ মেটায়। সেই অর্থ কেন্দ্রীয় কোষাগারে চলে গেলে তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে—প্রয়োজনে কি দ্রুত অর্থ ফেরত পাবে? বর্তমান আয়ের বিকল্প কী হবে? তাদের আর্থিক স্বাধীনতা কতটা বজায় থাকবে?

এসব প্রশ্নই ব্যাখ্যা করে কেন বিশ্বের বহু দেশেই টিএসএ বাস্তবায়ন দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। প্রকৃত বাধা প্রযুক্তিগত নয়; বরং প্রাতিষ্ঠানিক। বছরের পর বছর ধরে নিজস্ব হিসাব পরিচালনায় অভ্যস্ত সংস্থাগুলো সহজে সেই নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে চায় না। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিও বিপুল সরকারি আমানত হারাতে অনাগ্রহী।

নাইজেরিয়ার অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। দেশটি ধাপে ধাপে শত শত সরকারি দপ্তরকে টিএসএর আওতায় এনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে সক্ষম হয়। সরকারি নগদ প্রবাহের ওপর নজরদারি বাড়ে এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হয়। কিন্তু একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিপুল সরকারি আমানত কমে যাওয়ায় তারল্য সংকটও তৈরি হয়। অর্থাৎ সংস্কার সফল হলেও তার মূল্য ছিল বাস্তব।

আইএমএফের কাছে নতুন করে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক গবেষণাও দেখায়, টিএসএ ব্যবস্থাপনা গ্রহণকারী দেশগুলো সাধারণত কম ঋণ নেয় এবং ঋণের সুদের চাপও তুলনামূলকভাবে কম থাকে। কারণ সরকার যখন নিজের সব নগদ সম্পদের সমন্বিত চিত্র দেখতে পারে, তখন অপ্রয়োজনীয় স্বল্পমেয়াদি ঋণের প্রয়োজনও কমে যায়। এটি কেবল হিসাবরক্ষণ নয়; সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করে তোলার একটি উপায়।

তবে আধুনিক টিএসএ মানেই সব ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে একটি মাত্র কেন্দ্রীয় হিসাবে অর্থ জমা করা নয়। বর্তমানে অনেক দেশ এমন ব্যবস্থা অনুসরণ করে, যেখানে সরকারি সংস্থাগুলো তাদের দৈনন্দিন লেনদেনের হিসাব বজায় রাখে, কিন্তু দিনের শেষে উদ্বৃত্ত অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেন্দ্রীয় ট্রেজারি হিসাবে স্থানান্তরিত হয়। এতে পরিচালন স্বাধীনতা বজায় থাকে, আবার অলস নগদও একীভূতভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয়।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ টিএসএকে অনেক সময় ভুলভাবে এমন একটি উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেন অর্থ মন্ত্রণালয় সব প্রতিষ্ঠানের অর্থ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে। বাস্তবে লক্ষ্যটি ভিন্ন। ব্যয় করার সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীভূত করা নয়; বরং নগদ অর্থের ব্যবস্থাপনাকে সমন্বিত করা।

পাকিস্তানের মতো দেশে এ কাজ আরও কঠিন। সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ, জাতীয় সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য আর্থিক দায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভক্ত। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাও পুরোপুরি সমন্বিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য বিলম্বে আসে, দায়িত্বের ক্ষেত্রও পরস্পরের সঙ্গে ওভারল্যাপ করে। ফলে ট্রেজারি সংস্কার এখানে বৃহত্তর আর্থিক সংস্কারেরই একটি অংশ।

Dollar nears Tk 123 as war keeps markets on edge | The Daily Star

আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো সক্ষমতা। কার্যকর টিএসএর জন্য দরকার সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা, দক্ষ জনবল, নির্ভুল নগদ প্রবাহ পূর্বাভাস এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়। আইন প্রণয়নের চেয়ে এই বাস্তব সক্ষমতা গড়ে তোলাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

তাই এই সংস্কারকে যান্ত্রিকভাবে নয়, বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে এগিয়ে নিতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান আমানতের সুদ হারাবে, তাদের জন্য বিকল্প প্রণোদনা বা ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। বড় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোকে ধাপে ধাপে অন্তর্ভুক্ত করা, উন্নত নগদ পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দ্রুত অর্থপ্রদানের নিশ্চয়তা দেওয়াও সমান জরুরি।

সবচেয়ে বড় কথা, বিতর্কটি টিএসএর পক্ষে না বিপক্ষে—এখানে আটকে থাকা উচিত নয়। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, কীভাবে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, যা সরকারি অর্থকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনা করবে, কিন্তু একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যৌক্তিক পরিচালন চাহিদাকেও সম্মান জানাবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে গৃহীত আর্থিক ব্যবস্থাপনা আইন ও ট্রেজারি সংস্কার সেই ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে। একই ধরনের উদ্যোগ প্রাদেশিক পর্যায়েও বিস্তৃত হলে সরকারি নগদ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হতে পারে। কারণ প্রদেশগুলোর কাছেও এখন উল্লেখযোগ্য আর্থিক সম্পদ রয়েছে, যা কার্যকরভাবে সমন্বিত হলে সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা আরও উন্নত হবে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—শুধু আইন পাস করলেই ট্রেজারি সংস্কার সফল হয় না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সমন্বয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আস্থা অর্জন। টিএসএ কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, আবার এটি কেবল হিসাবরক্ষণের পরিবর্তনও নয়। এটি এমন একটি কাঠামো, যা নিশ্চিত করতে পারে যে জনগণের অর্থ সত্যিই জনগণের কোষাগারের আওতায় রয়েছে এবং রাষ্ট্র সেই অর্থ সর্বোচ্চ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে সক্ষম।