বিশ্বকাপের মূল পর্বে চীনের জাতীয় ফুটবল দল নেই। ২০০২ সালের পর টানা দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশটি বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি। তবু ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে চীনে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তা আগের যেকোনো আসরকে ছাড়িয়ে গেছে। কোটি কোটি দর্শকের আগ্রহ, প্রযুক্তি, পণ্য উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড প্রচারণার মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজেদের উপস্থিতি অন্যভাবে জানান দিচ্ছে চীন।
বিশ্বকাপে মাঠে না থাকলেও দর্শকসংখ্যা ও বাণিজ্যিক সম্পৃক্ততার দিক থেকে চীন এবারও বড় একটি শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।
বিশ্বকাপে দর্শক আগ্রহের রেকর্ড
সোশ্যাল ফুটবল সামিটের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, চীনে ফুটবলভক্তের সংখ্যা প্রায় ২৮ কোটি ৯০ লাখ। সেই বিশাল দর্শকগোষ্ঠী এবারও গভীর রাতের ম্যাচ দেখতে টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভিড় জমিয়েছে।
১২ জুন থেকে ৮ জুলাই পর্যন্ত গ্রুপপর্ব ও নকআউট পর্ব চলাকালে ভোর ২টা থেকে ৬টার মধ্যে সিসিটিভির ক্রীড়া চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ হাজার ৭০১ শতাংশ বেড়েছে।
এছাড়া চীনের জনপ্রিয় অ্যাপ রেডনোট সিসিটিভির অনুমোদন নিয়ে সব ম্যাচ, রিপ্লে ও হাইলাইট বিনামূল্যে সম্প্রচার করছে। চীনা গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রচারস্বত্ব পেতে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৭০ কোটি ইউয়ান বিনিয়োগ করেছে।
মাঠে নেই দল, তবু আছে চীনের উপস্থিতি
বিশ্বকাপে খেলোয়াড় না থাকলেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনের অংশগ্রহণ ছিল দৃশ্যমান।
রেফারি মা নিং ইকুয়েডর ও কুরাসাওর মধ্যকার গ্রুপপর্বের ম্যাচ পরিচালনা করে আলোচনায় আসেন। ২৪ বছর পর কোনো চীনা রেফারি বিশ্বকাপের ম্যাচে দায়িত্ব পালন করলেন।
অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম পাইকারি বাজার ইইউ শহরে খেলোয়াড়দের সফট টয়, স্মারক ও নানা ধরনের বিশ্বকাপ পণ্য উৎপাদনে ব্যস্ত সময় কাটছে।
চীনা গণমাধ্যম জানায়, অ্যাডিডাসের উচ্চপ্রযুক্তির ট্রিয়োন্ডা ম্যাচ বল গুয়াংডং প্রদেশে তৈরি হয়েছে। যদিও অন্য কিছু প্রতিবেদনে পাকিস্তানের সরবরাহকারীর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ২০২২ বিশ্বকাপে প্রশিক্ষণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের বল পাকিস্তানে এবং সেন্সরযুক্ত ম্যাচ বল চীনে তৈরি হওয়ার তথ্য রয়টার্স প্রকাশ করেছিল।

তারকাদের ঘিরে ব্র্যান্ডের কৌশল
বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বিদেশি তারকাদের ঘিরেও চীনা কোম্পানিগুলো বড় ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছে।
নরওয়ের স্ট্রাইকার এরলিং হালান্ড চীনা ভেষজ পানীয় ব্র্যান্ড ওয়াংলাওজির বিজ্ঞাপনে মান্দারিন ভাষায় কথা বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।
একই সঙ্গে গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি নির্মাতা মাইডিয়ার বিজ্ঞাপনেও দেখা যায় তাকে। সেখানে তিনি ওয়াশিং মেশিন কাঁধে নিয়ে ব্যায়াম করছেন এবং ফ্রিজ ব্যবহার করে স্কোয়াট করছেন।
ইউরোপে ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী মাইডিয়া জানিয়েছে, তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে মাত্র সাত দিনে তারা ফ্রান্সে দুই লাখ এয়ার কন্ডিশনার সরবরাহ করেছে।
প্রযুক্তি ও সরবরাহে চীনের গুরুত্ব
বিশ্বকাপে ব্যবহৃত প্রযুক্তিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চীন।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান লেনোভো অফসাইড নির্ধারণে ব্যবহৃত খেলোয়াড়দের ত্রিমাত্রিক অবতার তৈরির প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। পাশাপাশি রেফারিদের শরীরে থাকা ক্যামেরার কাঁপুনি কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্থিতিশীলতা প্রযুক্তিও দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে পুমা, যেখানে চীনের আন্টা সংখ্যালঘু মালিক, প্রায় এক ডজন দলের জার্সি ও বুট সরবরাহ করেছে। আর লি নিংয়ের জুতা পরে খেলতে দেখা গেছে কেপ ভার্দের উইলি সেমেদোকে।
স্পন্সরশিপে বদলেছে চীনের কৌশল
বিশ্বকাপে চীনা প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এখন আগের তুলনায় ভিন্ন ধরনের। বড় অঙ্কের স্পন্সরশিপের পরিবর্তে সরবরাহকারী ও প্রযুক্তি অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে তারা।
বর্তমানে ফিফার ১৬টি অফিসিয়াল স্পন্সরের মধ্যে চীনের মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে—লেনোভো, চায়না মেংনিউ ডেইরি এবং হিসেন্স। জুন মাসে প্রকাশিত হুয়াচুয়াং সিকিউরিটিজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।
অন্যদিকে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ছয়টি চীনা প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৪০ কোটি ডলার ব্যয় করেছিল। এখন বিজ্ঞাপন ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো চীনের চেয়ে এগিয়ে।

এদিকে আর্থিক সংকটে পড়া ডালিয়ান ওয়ান্ডা গ্রুপ নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় ২০২৪ সালে ফিফা তাদের স্পন্সরশিপ অধিকার বাতিল করে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে জানানো হয়।
ভবিষ্যৎ বিশ্বকাপ ও চীনের সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে রেকর্ড ৪৮টি দল। ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ২০৩০ বিশ্বকাপে দলসংখ্যা ৬৪-এ উন্নীত করার সম্ভাবনাও বিবেচনার কথা বলেছেন।
এতে চীনের জন্য বিশ্বকাপে ওঠার পথ কিছুটা সহজ হতে পারে। তবে দেশটির পুরুষ জাতীয় দলের বর্তমান মান নিয়ে সংশয়ও রয়েছে।
চীনের বিশ্লেষক দং লু সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বর্তমান অবস্থায় চীনা সমর্থকদের জন্য বিশ্বকাপ দর্শক হিসেবেই উপভোগ করাই কম কষ্টের। তার মতে, দল অংশ নিলে হতাশা ও বিব্রতকর পরিস্থিতিই আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বকাপে চীনের অনুপস্থিতি মাঠের ফলাফলে স্পষ্ট হলেও দর্শক, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে দেশটির সক্রিয় উপস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে—বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে প্রভাব বিস্তারের জন্য মাঠে নামাই একমাত্র পথ নয়।
চীনের দল না থাকলেও ২০২৬ বিশ্বকাপে দর্শক, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও ব্র্যান্ড প্রচারণায় দেশটির শক্তিশালী উপস্থিতি নতুন বাস্তবতা তুলে ধরছে।
লোরেটা চেন 


















