০৭:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
আট বছর পর বিরল রোগের সন্ধান, সন্তানের জন্য নতুন লড়াই শুরু মায়ের ডেঙ্গুতে আরও এক প্রাণহানি, একদিনে হাসপাতালে ভর্তি ৩৫০ জন বেন নেভিসে ফেলে রাখা গাঁজা খেয়ে অসুস্থ! পাহাড় থেকে উদ্ধার কালো ল্যাব্রাডর, সুস্থ হলো পরদিন স্পেনের দাবানলে খাদে আটকে দগ্ধ ব্রিটিশ দম্পতি উদ্ধার, প্রাণহানি বেড়ে ১২ ন্যাটোকে বেশি খরচ করাতে সফলতা, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাব ক্ষয়ের সূচনা? কনর ম্যাকগ্রেগরের বহুল প্রতীক্ষিত ইউএফসি প্রত্যাবর্তন শেষ মাত্র ৬৯ সেকেন্ডে, হাঁটুর চোটে থামল লড়াই শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন! ট্রাম্পের ক্রিপ্টো আয়ে চমক, এক বছরে দেড় বিলিয়ন ডলারের বেশি উপার্জনের তথ্য বিশ্বকাপ ২০২৬: সুইজারল্যান্ডকে হারিয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা, অপেক্ষায় ইংল্যান্ডের মহারণ ক্ষমতাচ্যুত হবার পরে শেখ হাসিনার প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচি

ক্ষমতাচ্যুত হবার পরে শেখ হাসিনার প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচি

ক্ষমতাচ্যুত হবার প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি সময়ে এসে শেখ হাসিনা তাঁর দেশে ফেরার যে কর্মসূচি দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি। যে কোনো রাজনীতিকের রাজনৈতিক কর্মসূচি নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। সমাজবিজ্ঞানের কোনো কিছুতেই দুই যোগ দুই সমান চার বলার সুযোগ নেই। যেহেতু এর প্রতিটি উপাদান মানুষ ও সমাজের মধ্যে নিহিত এবং প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়। তাই অন্য কেউ শেখ হাসিনার ফেরার কর্মসূচিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি নাও বলতে পারেন। তবে নানান বিচার-বিশ্লেষণে ও অতীতের আওয়ামী লীগের বিপর্যয় বা ক্ষমতাচ্যুত হবার পরের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কর্মসূচি সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি। যাদের কাছে তিনি ও তাঁর দল পরাজিত হয়েছে তাদের প্রতি শেখ হাসিনা এই রাজনৈতিক কর্মসূচি ছুড়ে দিলেন।

এখন প্রথমে যে প্রশ্নগুলো আসবে, শেখ হাসিনা কেন রাজনৈতিক কর্মসূচি দিলেন? কেন তিনি প্রায় দুই বছর সময় নিলেন এই কর্মসূচি দিতে? জনগণের মাধ্যমে, জনগণের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলের যে কোনো কারণেই রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটুক না কেন, তার জন্য দুই বছর সময় খুব বেশি সময় নয়। বরং এটা প্রয়োজন হয়। নেতা বা বিশেষজ্ঞ শ্রেণি হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে বা দ্রুত বুঝতে পারে বিপর্যয়ের কারণ। কিন্তু রাজনৈতিক দলের মূল প্রাণশক্তি অর্থাৎ সাধারণ কর্মী; তাদের কাছে বিপর্যয়ের মূল কারণটি স্পষ্ট হবার জন্য সময় দেবার প্রয়োজন পড়ে।

এছাড়া আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দল যা একেবারেই জনগণের ভেতর থেকে গড়ে উঠেছে, প্রাসাদে বা সামরিক ছাউনিতে নয়—তাদেরকে সব ধরনের বিপর্যয়কে রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে মেনে নিতে হয়।

স্বাধীনতার পরে ২০২৪-এর আগে আওয়ামী লীগ বড় বিপর্যয়ে পড়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট- সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করায়। দৃশ্যত সেটা একটি সামরিক অভ্যুত্থান ছিল। সেনাসদস্যদের কয়েকজন দেশের সংবিধানের বাইরে এসে এবং সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ওই কাজ করেছিল। ১৯৭৫-এ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনেও একটা মেটিকুলাস ডিজাইন নিশ্চয়ই ছিল। সে প্রসঙ্গ এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। তবে আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরা ওই ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ থেকেই নিজেরা নানান গোপন স্থানে বসে আলোচনা করা শুরু করেন- আসলে তাদের পরাজয়ের কারণটি কী? এটাও ইতিহাসের এক বিস্তারিত অধ্যায়। তবে সেদিনও দ্রুত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বড় অংশ সিদ্ধান্ত নেয়, ১৫ আগষ্ট, ১৯৭৫ যা ঘটেছে সেটা তাদের রাজনৈতিক পরাজয়। এবং রাজনৈতিক পথেই তাদের ভবিষ্যৎ তাদেরকেই তৈরি করতে হবে।

পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করল বিএনপি-জামায়াত

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরও ওই মেটিকুলাস ডিজাইনের একটার পর একটা পৃষ্ঠা সামনে আসে। তা বেশ একটু সময় নেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের মতো একটি জনগণ থেকে সৃষ্ট দলের কর্মীদের একটা বড় সান্ত্বনা ছিল—তারা সামরিক চক্র কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। তাই বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী চার নেতা হারানোর বিশাল বেদনা থাকলেও তাদের একটা গর্ব শুরু থেকেই ছিল—জনগণ তাদের ক্ষমতাচ্যুত করেনি।

কিন্তু ২০২৪-এর আগস্টে ইউনূস ক্ষমতা দখল করে আমেরিকা যাবার পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কর্মীরা অনেক বেশি অপমানিত ও হতভম্ব ছিল এই ভেবে যে জনগণ তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। কিন্তু ইউনূস যখন ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের মঞ্চে বক্তব্য দিয়ে ফাঁস করে দিলেন, ২০২৪-এ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার কাজটি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত কোনো অভ্যুত্থান বা গণ-অভ্যুত্থান নয়—বরং ইউনূসের ভাষায় এটা একটা “আমেজিং মেটিকুলাস ডিজাইন”-এর ফল। এবং সেদিন তিনি ওই মেটিকুলাস ডিজাইনের একজন মাস্টারমাইন্ডকে পরিচয় করিয়ে দেন। এর পরে তিনিসহ একের পর এক মাস্টারমাইন্ডরা তাদের কাজের ভেতর দিয়ে মানুষের কাছে চিহ্নিত হয়ে যায়।

এর আগে অবশ্য ব্রিগেডিয়ার সাখওয়াত কিছু সত্য বলাতে তাঁকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া; তারপরে সোশ্যাল ফোরামে একের পর এক জুলাইয়ের রাজপথে বিভিন্ন ধরনের জঙ্গীদের ভিডিও প্রকাশ হওয়া, পাবনায় বিএনপি নেতার গর্বভরা বক্তব্য—যে তাঁর নেতৃত্বে যদি ওইভাবে পুলিশ হত্যা না হতো তাহলে শেখ হাসিনার সরকার পতন ঘটানো যেত না। ঠিক তেমনিভাবে জুলাইয়ের এক সমন্বয়কের টেলিভিশনের পর্দায় মেট্রোরেল ধ্বংসের দাবি, আরও অনেকের পুলিশ হত্যার দাবি—এবং সকলেরই একই বক্তব্য—এই সন্ত্রাসী কাজগুলো তারা না করলে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হতো না। সর্বশেষ বিএনপির এমপি, এক সময়ের বিশিষ্ট ছাত্রনেত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নিলুফার মনি, টেলিভিশন টকশোতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনে যারা মারা গিয়েছে তারা পুলিশের গুলিতে নয়, এমনকি মিছিলের পাশের জন হঠাৎ গুলি খেয়ে পড়ে যাচ্ছে অথচ বুঝতে পারছে না কোথা থেকে কে গুলি করল। ওই বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেছেন, বাস্তবে ৫ আগস্ট ছিল একটি রক্তপাতহীন সামরিক ক্যু, এবং এই সামরিক ক্যু না হলে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানো যেত না।

এই যাবতীয় বিষয়গুলো দেশের মানুষের মতো আওয়ামী লীগ কর্মীদেরও চোখের সামনে আসার পরে তারা পরাজিত হলেও আর অপমানিত নেই—কারণ তারা অন্তত নিজের মনকে বোঝাতে পেরেছে- জনগণ তাদের ক্ষমতাচ্যুত করেনি। আর তাদের কোনো তত্ত্ব নিয়ে বুঝতে হচ্ছে না, তথ্যের মাধ্যমেই তারা বুঝতে পারছে। তথ্যগুলোর একাংশ আসছে তাদের প্রতিপক্ষের কাছ থেকে। অন্যদিকে আরও তথ্য পাচ্ছে অডিও ও ভিজুয়াল মাধ্যমে। তাই এসব তথ্যে কোনোমতেই অসত্য হবার সুযোগ নেই।

Why did metro rail bearing pad fall off?

এখন প্রশ্ন আসে, ১৯৭৫ ও ২০২৪—দুইবারই মেটিকুলাস ডিজাইন বা ষড়যন্ত্র এবং ১৯৭৫-এ সামরিক বাহিনীর কতিপয় সদস্য জড়িত থাকা, ২০২৪কে নিয়ে নিলুফার মনি সামরিক বাহিনীর দিকে আঙুল তুলছেন তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিকোণ থেকে। কিন্তু এরপরেও ১৯৭৫-এর এবং ২০২৪-এর পরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কেন তাদের পরাজয়কে রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে ধরে নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির পথ নেয়।

বাস্তবে কোনো জনগণের রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে একটি পেশার সব মানুষ জড়িত থাকে না। যে কারণে ১৯৭৫-এ সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য সরাসরি জড়িয়ে গেলেও আওয়ামী লীগ তৎকালীন সেনাপ্রধান বা সেনাবাহিনীকে কখনও দায়ী করেনি। তারা সব সময়ে বলেছে, বিপথগামী কয়েক সেনাসদস্যের হাতে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতা নিহত হন। ঠিক তেমনি এবার ইউনূস, তাঁর কিছু মাস্টারমাইন্ড, এমনকি কোনো কোনো সম্পাদকও স্বীকার করছেন তারা এই মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশীদার। কিন্তু আওয়ামী লীগের মতো বা যে কোনো দেশের জনগণের ভেতর দিয়ে আসা কোনো রাজনৈতিক দল কখনও কোনো পেশার সমগ্র মানুষকে দায়ী করবে না। এমনকি নিলুফার মনির মতো শিক্ষিত রাজনীতিবিদ দায়িত্ব নিয়ে ২০২৪-এর ৫ আগস্টকে রক্তপাতহীন সামরিক ক্যু বললেও—আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বা তাদের মূল নেতা শেখ হাসিনা কখনই সেনাবাহিনীর দিকে আঙুল তুলছেন না। বরং এ সব কথার উত্তর তিনি রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক লাইনে বলেছেন, “দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে কিছু ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে।” তাঁর এই ভুল-ভ্রান্তির সীমারেখা তিনি যেখানেই টানুন না কেন, আওয়ামী লীগের মতো এই ধরনের দীর্ঘ পথ চলায় অভিজ্ঞ জনগণের দলগুলো সারা পৃথিবীতেই তাদের ক্ষমতাচ্যুত হওয়াটা নিজস্ব ব্যর্থতা বা ভুলের ফলে ঘটে যাওয়া ঘটনা হিসেবে ধরে নিয়ে পরবর্তী অধ্যায় শুরু করে।

কারণ, রাজনীতির সামনের দিকে জনগণ ও রাজনৈতিক দর্শন থাকে আর পেছনের দিকে ষড়যন্ত্র, গুপ্ত ঘাতক, বুলেট, গ্রেনেড, বোমা—এগুলো থাকবেই। চিলির আলেন্দে যেমন সেনাসদস্যদের হাতে নিহত হবার অনেক আগেই বলেছিলেন, একটি বুলেট তাকে তাড়া করে ফিরছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও ১৯৭৩ সালে বলেছিলেন, “হয়তো আমার মৃত্যু আলেন্দের মতো হবে।” আর শেখ হাসিনার দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময়ের রাজনীতিতে গ্রেনেড, বুলেট, বোমা তো কম তাঁর পিছে ছোটেনি। আর এ বুলেট, গ্রেনেডে নিহতদের নামের তালিকাও তো পৃথিবীতে দীর্ঘ—মোহনদাস গান্ধী, কেনেডি, ইন্দিরা গান্ধী, একিউনো, গামাল আব্দুল নাসের, বেনজির ভুট্টো, গাদ্দাফি প্রমুখ তো রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ নাটক ও উপন্যাসের মাধ্যমে চিত্রিত করে গেছেন কীভাবে ষড়যন্ত্রে রাষ্ট্রক্ষমতা ও যোগ্য রাষ্ট্রনেতাদের বিরুদ্ধে পুরোহিত থেকে শুরু করে তথাকথিত দেবতাকে ব্যবহার করা হয়। রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতার এই পেছন দিকের অন্ধকার থেকে আসা শত্রুগুলোকে মোকাবিলা করাও রাজনীতির ও রাষ্ট্রনায়কদের দায়িত্ব। এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে না পারাও রাজনৈতিক ব্যর্থতা বা পরাজয়।

তারেক রহমান ও ড. ইউনূসের লন্ডন বৈঠক: নির্বাচনের সময় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

তাই ২০২৪ এ পরাজয়ের পরে আওয়ামী লীগ যে ১৯৭৫-এর থেকে এবার দ্রুততার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে তা স্পষ্ট হয়ে যায় শেখ হাসিনার জীবনে বেঁচে যাবার পরে। ইউনূস ও তাঁর মাস্টারমাইন্ডদের অনেকের কথায় দ্রুতই পরিষ্কার হতে থাকে তাদের “৫ আগস্ট”  শতভাগ সফল হয়নি—শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হওয়ায়। কারণ, ১৯৭৫-এর মতো ২০২৪-এ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা যায়নি। অর্থাৎ ২১ আগস্ট ২০০৪-এ যেমন তারা ব্যর্থ হয়েছিল, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ব্যর্থ হয় আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে।

এ কারণে ইউনূস ও তাঁর মেটিকুলাস ডিজাইনের পার্টরা দ্রুতই বুঝতে পারে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ দ্রুতই রাজনৈতিক কর্মসূচি ছুড়ে দেবে। সাধারণত আওয়ামী লীগের মতো বড় ও জনসমর্থিত কোনো রাজনৈতিক দলের এ ধরনের কর্মসূচি কোনো অনির্বাচিত ও জনসমর্থনহীন সরকার মোকাবিলা করতে পারে না। যে কারণে ইউনূস ও তাঁর সহযোগীরা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবিলা করার জন্য তারা “সংস্কার”-এর নামে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা থেকে তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার গঠনের জন্য নির্বাচনের পথে যায়।

প্রকৃত নির্বাচনের পথে তাদের প্রথম বাধা হতো আওয়ামী লীগ। কারণ, শেখ হাসিনা যেখানেই থাকুন না কেন, আওয়ামী লীগকে স্বাভাবিকভাবে নির্বাচন করতে দিলে, নির্বাচনের মাঠ ও ফল শুধু নয় আরও অনেক কিছু বদলে যেত। তাই তারা রাষ্ট্রক্ষমতাকে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে রাখার জন্য আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে নির্বাহী আদেশে দূরে রাখে। এবং সরকারকে বৈধতা ও জনভিত্তি দেওয়ার জন্য তৃণমূল আওয়ামী লীগ গড়ার একটা চেষ্টা ও জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করার পথ নেয়। এখানে ইউনূসের বড় সাফল্য পারস্পরিক কূটনীতিতে তিনি যাদের জয় করতে পারেননি—তাঁর এই নির্বাচনী খেলায় তিনি তাদেরও জয় করতে সমর্থ হন। কিন্তু আওয়ামী লীগকে ভেঙে তৃণমূল আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো নামের আওয়ামী লীগ গড়তে সবাই মিলে চেষ্টা করেও সফল হয়নি। তার ফলে নির্বাচন যা হয়েছে এবং তার ভেতর দিয়ে যে সরকার হয়েছে—তার সবকিছু এখন দেশবাসী ও পৃথিবীর কাছে পরিষ্কার।

তারপরেও ইউনূস লাভবান হয়েছে নির্বাচনটি করাতে পেরে। কারণ আজ পর্যন্ত সে ক্ষমতায় থাকলে তাকেই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের এই রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবিলা করতে হতো।

শেখ হাসিনা এক লাইনে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচিটি দিয়েছেন—তিনি ও তাঁর দলের নেতাকর্মী যারা দেশে ও বিদেশে পলাতক ও সাজাপ্রাপ্ত আছেন, সকলে বিচার বিভাগের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। কিন্তু খুব সাদা চোখে দেখলেও তাঁর এই রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে অনেক বার্তা আছে।

যেমন তাঁর এই রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে তাঁকে কোনোভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে—তার প্রতি কোনো অন্যায় হয়েছে কিনা তারও কোনো দায় তিনি কাউকে দিচ্ছেন না। তিনি বিচারবিভাগকে সম্মান করে আত্মসমর্পণ করতে চাচ্ছেন। বিচার বিভাগের প্রতি এই সম্মান দেখানোর মাধ্যমে তিনি দেশবাসী ও পৃথিবীকে এ বার্তাটিই দিলেন, তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইউনূস মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে রাষ্ট্রে ও সমাজে যে প্রতিহিংসা চালু করে। ইউনূস নিজে ভাষণ দিয়ে গ্রামে গ্রামে তার পাশের বাড়ির ভিন্নমতের মানুষকে নির্মূল করার নির্দেশনাও দেয়। যার ফলে বিচার বিভাগ, প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী সমাজ, পুলিশ এমনকি সেনাবাহিনীর সদস্যও মব ভায়োলেন্সের শিকার হন। এবং এই ধারা এখনও চলছে। তথাকথিত নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সরকারকে একটি রাজনৈতিক সরকারের রূপ দিলেও তারাও এ ধারা থামাতে পারছে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারাও “ইউনূস-২” হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তারেক রহমান

এমন সময়ে শেখ হাসিনা তাঁর নেতাকর্মীদের নিয়ে বিচার বিভাগের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাওয়ার কর্মসূচী- মূলত দেশকে মব ভায়োলেন্স থেকে বের করে স্থিতিশীলতা আনার একটা রাজনৈতিক কর্মসূচি। এবং এই স্থিতিশীলতা আনার বলটি তিনি সরকারের কোর্টেই ছুড়ে দিয়েছেন। রয়টার্সের ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিপুল উন্নতি করলেও তাঁর আমলে রাষ্ট্রের কিছু প্রতিষ্ঠানকে তিনি দুর্বল করে ফেলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রয়টার্সের অভিযোগের সত্যতাও আছে। শেখ হাসিনাও সেখানে বলেছেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় কিছু ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে। একথা বলার ভেতর দিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের অভিযোগগুলো স্বীকার করে নিয়ে তিনি সেই রাজনৈতিক কর্মসূচি সরকারের কোর্টে ছুড়ে দিলেন—যা মূলত ইউনূস রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলেছে, সেটাকে দেশের স্বার্থে ফিরিয়ে আনার এক দৃঢ় সহযোগিতার অঙ্গীকার। নিরাপদ অবস্থান থেকে মৃত্যুর মুখোমুখি এসে দাঁড়ানোর তাঁর এই রাজনৈতিক কর্মসূচির ফলে তাঁর ব্যক্তি জীবনে যাই ঘটুক না কেন, তিনি দেশপ্রেমের উঁচু বেদীতেই এসে দাঁড়িয়েছেন—আর সরকারের দিকে ছুড়ে দিয়েছেন দেশের স্থিতিশীলতা আনার পথ তৈরি করার হাতটি। তিনি কোনো অসাংবিধানিক শব্দ তাঁর কর্মসূচিতে উচ্চারণ করেননি। সরকারের পক্ষ থেকেও এখনও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো কথা বলার সময় আসেনি। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ রাষ্ট্রীয়ভাবে নয়, একটি অনুষ্ঠানের বক্তব্যে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে প্রকাশ্যে ফাঁসি কার্যকর করা হবে। প্রকাশ্যে ফাঁসি কার্যকর করা আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রে “বর্বরতা” বা মব হিসেবেই চিহ্নিত হয়। তাঁর এ কথা নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের কথা নয়। শ্যামার বাবা ও মা দুজনেই খাঁটি বাঙালি ছিলেন। তাই বাঙালির অন্যতম আদিবাসীদের দেবী শ্যামা (যার অপর নাম কালী) নামেই তাঁর নাম রেখেছেন। দেবী ‘শ্যামা’র গলায় রক্তাক্ত নরমুণ্ডের মালা আছে, হাতে নরহত্যার রক্তমাখা খড়গ আছে, কিন্তু শিবের বুকে পা পড়তেই শ্যাম জিভে কামড় দিয়ে লজ্জা পেয়েছেন। শিব অর্থ সত্য ও সুন্দর—তা সকল বাংলাভাষী মাত্রই জানেন। শ্যামা ওবায়েদ মুখে যাই বলুন, তাকেও শেষ পর্যন্ত সত্যের ওপর পা রাখতে হবে।

কারণ, শেখ হাসিনা রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়েছেন—ষড়যন্ত্রের কর্মসূচি নয়। আর রাজনৈতিক পথ সব সময়ই সত্য ও সুন্দর দিয়ে তৈরি পথেই চলে। রাজনীতির মধ্যে ষড়যন্ত্রকারীরা ঢুকে যায়, হত্যাকারীরা ঢুকে যায়, তাই রাজনীতির নামে একটি অসুন্দর গোষ্ঠীকেও দেখা যায় সব দেশে।

যাহোক, ক্ষমতাচ্যুত হবার দুই বছরের কাছাকাছি সময়ে এসে শেখ হাসিনা প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়েছেন—এবং যা তিনি পালন করা শুরু করবেন ডিসেম্বর নাগাদ। তা এখনও একটা দীর্ঘ পথ। আর এই দীর্ঘ পথ যে একেবারে নিস্তরঙ্গ থাকবে তাও নয়। তাই এখন সময়টা প্রতি মুহূর্তে শুরুর আগের শুরু দেখার।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World

জনপ্রিয় সংবাদ

আট বছর পর বিরল রোগের সন্ধান, সন্তানের জন্য নতুন লড়াই শুরু মায়ের

ক্ষমতাচ্যুত হবার পরে শেখ হাসিনার প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচি

০৬:৪৪:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

ক্ষমতাচ্যুত হবার প্রায় দুই বছরের কাছাকাছি সময়ে এসে শেখ হাসিনা তাঁর দেশে ফেরার যে কর্মসূচি দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি। যে কোনো রাজনীতিকের রাজনৈতিক কর্মসূচি নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। সমাজবিজ্ঞানের কোনো কিছুতেই দুই যোগ দুই সমান চার বলার সুযোগ নেই। যেহেতু এর প্রতিটি উপাদান মানুষ ও সমাজের মধ্যে নিহিত এবং প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়। তাই অন্য কেউ শেখ হাসিনার ফেরার কর্মসূচিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি নাও বলতে পারেন। তবে নানান বিচার-বিশ্লেষণে ও অতীতের আওয়ামী লীগের বিপর্যয় বা ক্ষমতাচ্যুত হবার পরের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করলে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার কর্মসূচি সম্পূর্ণ একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি। যাদের কাছে তিনি ও তাঁর দল পরাজিত হয়েছে তাদের প্রতি শেখ হাসিনা এই রাজনৈতিক কর্মসূচি ছুড়ে দিলেন।

এখন প্রথমে যে প্রশ্নগুলো আসবে, শেখ হাসিনা কেন রাজনৈতিক কর্মসূচি দিলেন? কেন তিনি প্রায় দুই বছর সময় নিলেন এই কর্মসূচি দিতে? জনগণের মাধ্যমে, জনগণের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলের যে কোনো কারণেই রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটুক না কেন, তার জন্য দুই বছর সময় খুব বেশি সময় নয়। বরং এটা প্রয়োজন হয়। নেতা বা বিশেষজ্ঞ শ্রেণি হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে বা দ্রুত বুঝতে পারে বিপর্যয়ের কারণ। কিন্তু রাজনৈতিক দলের মূল প্রাণশক্তি অর্থাৎ সাধারণ কর্মী; তাদের কাছে বিপর্যয়ের মূল কারণটি স্পষ্ট হবার জন্য সময় দেবার প্রয়োজন পড়ে।

এছাড়া আওয়ামী লীগের মতো রাজনৈতিক দল যা একেবারেই জনগণের ভেতর থেকে গড়ে উঠেছে, প্রাসাদে বা সামরিক ছাউনিতে নয়—তাদেরকে সব ধরনের বিপর্যয়কে রাজনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে মেনে নিতে হয়।

স্বাধীনতার পরে ২০২৪-এর আগে আওয়ামী লীগ বড় বিপর্যয়ে পড়েছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট- সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করায়। দৃশ্যত সেটা একটি সামরিক অভ্যুত্থান ছিল। সেনাসদস্যদের কয়েকজন দেশের সংবিধানের বাইরে এসে এবং সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ওই কাজ করেছিল। ১৯৭৫-এ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনেও একটা মেটিকুলাস ডিজাইন নিশ্চয়ই ছিল। সে প্রসঙ্গ এখানে প্রাসঙ্গিক নয়। তবে আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরা ওই ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ থেকেই নিজেরা নানান গোপন স্থানে বসে আলোচনা করা শুরু করেন- আসলে তাদের পরাজয়ের কারণটি কী? এটাও ইতিহাসের এক বিস্তারিত অধ্যায়। তবে সেদিনও দ্রুত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বড় অংশ সিদ্ধান্ত নেয়, ১৫ আগষ্ট, ১৯৭৫ যা ঘটেছে সেটা তাদের রাজনৈতিক পরাজয়। এবং রাজনৈতিক পথেই তাদের ভবিষ্যৎ তাদেরকেই তৈরি করতে হবে।

পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করল বিএনপি-জামায়াত

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরও ওই মেটিকুলাস ডিজাইনের একটার পর একটা পৃষ্ঠা সামনে আসে। তা বেশ একটু সময় নেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের মতো একটি জনগণ থেকে সৃষ্ট দলের কর্মীদের একটা বড় সান্ত্বনা ছিল—তারা সামরিক চক্র কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। তাই বঙ্গবন্ধুসহ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী চার নেতা হারানোর বিশাল বেদনা থাকলেও তাদের একটা গর্ব শুরু থেকেই ছিল—জনগণ তাদের ক্ষমতাচ্যুত করেনি।

কিন্তু ২০২৪-এর আগস্টে ইউনূস ক্ষমতা দখল করে আমেরিকা যাবার পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কর্মীরা অনেক বেশি অপমানিত ও হতভম্ব ছিল এই ভেবে যে জনগণ তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। কিন্তু ইউনূস যখন ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের মঞ্চে বক্তব্য দিয়ে ফাঁস করে দিলেন, ২০২৪-এ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার কাজটি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত কোনো অভ্যুত্থান বা গণ-অভ্যুত্থান নয়—বরং ইউনূসের ভাষায় এটা একটা “আমেজিং মেটিকুলাস ডিজাইন”-এর ফল। এবং সেদিন তিনি ওই মেটিকুলাস ডিজাইনের একজন মাস্টারমাইন্ডকে পরিচয় করিয়ে দেন। এর পরে তিনিসহ একের পর এক মাস্টারমাইন্ডরা তাদের কাজের ভেতর দিয়ে মানুষের কাছে চিহ্নিত হয়ে যায়।

এর আগে অবশ্য ব্রিগেডিয়ার সাখওয়াত কিছু সত্য বলাতে তাঁকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া; তারপরে সোশ্যাল ফোরামে একের পর এক জুলাইয়ের রাজপথে বিভিন্ন ধরনের জঙ্গীদের ভিডিও প্রকাশ হওয়া, পাবনায় বিএনপি নেতার গর্বভরা বক্তব্য—যে তাঁর নেতৃত্বে যদি ওইভাবে পুলিশ হত্যা না হতো তাহলে শেখ হাসিনার সরকার পতন ঘটানো যেত না। ঠিক তেমনিভাবে জুলাইয়ের এক সমন্বয়কের টেলিভিশনের পর্দায় মেট্রোরেল ধ্বংসের দাবি, আরও অনেকের পুলিশ হত্যার দাবি—এবং সকলেরই একই বক্তব্য—এই সন্ত্রাসী কাজগুলো তারা না করলে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হতো না। সর্বশেষ বিএনপির এমপি, এক সময়ের বিশিষ্ট ছাত্রনেত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নিলুফার মনি, টেলিভিশন টকশোতে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনে যারা মারা গিয়েছে তারা পুলিশের গুলিতে নয়, এমনকি মিছিলের পাশের জন হঠাৎ গুলি খেয়ে পড়ে যাচ্ছে অথচ বুঝতে পারছে না কোথা থেকে কে গুলি করল। ওই বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেছেন, বাস্তবে ৫ আগস্ট ছিল একটি রক্তপাতহীন সামরিক ক্যু, এবং এই সামরিক ক্যু না হলে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানো যেত না।

এই যাবতীয় বিষয়গুলো দেশের মানুষের মতো আওয়ামী লীগ কর্মীদেরও চোখের সামনে আসার পরে তারা পরাজিত হলেও আর অপমানিত নেই—কারণ তারা অন্তত নিজের মনকে বোঝাতে পেরেছে- জনগণ তাদের ক্ষমতাচ্যুত করেনি। আর তাদের কোনো তত্ত্ব নিয়ে বুঝতে হচ্ছে না, তথ্যের মাধ্যমেই তারা বুঝতে পারছে। তথ্যগুলোর একাংশ আসছে তাদের প্রতিপক্ষের কাছ থেকে। অন্যদিকে আরও তথ্য পাচ্ছে অডিও ও ভিজুয়াল মাধ্যমে। তাই এসব তথ্যে কোনোমতেই অসত্য হবার সুযোগ নেই।

Why did metro rail bearing pad fall off?

এখন প্রশ্ন আসে, ১৯৭৫ ও ২০২৪—দুইবারই মেটিকুলাস ডিজাইন বা ষড়যন্ত্র এবং ১৯৭৫-এ সামরিক বাহিনীর কতিপয় সদস্য জড়িত থাকা, ২০২৪কে নিয়ে নিলুফার মনি সামরিক বাহিনীর দিকে আঙুল তুলছেন তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিকোণ থেকে। কিন্তু এরপরেও ১৯৭৫-এর এবং ২০২৪-এর পরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কেন তাদের পরাজয়কে রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে ধরে নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির পথ নেয়।

বাস্তবে কোনো জনগণের রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে একটি পেশার সব মানুষ জড়িত থাকে না। যে কারণে ১৯৭৫-এ সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্য সরাসরি জড়িয়ে গেলেও আওয়ামী লীগ তৎকালীন সেনাপ্রধান বা সেনাবাহিনীকে কখনও দায়ী করেনি। তারা সব সময়ে বলেছে, বিপথগামী কয়েক সেনাসদস্যের হাতে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতা নিহত হন। ঠিক তেমনি এবার ইউনূস, তাঁর কিছু মাস্টারমাইন্ড, এমনকি কোনো কোনো সম্পাদকও স্বীকার করছেন তারা এই মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশীদার। কিন্তু আওয়ামী লীগের মতো বা যে কোনো দেশের জনগণের ভেতর দিয়ে আসা কোনো রাজনৈতিক দল কখনও কোনো পেশার সমগ্র মানুষকে দায়ী করবে না। এমনকি নিলুফার মনির মতো শিক্ষিত রাজনীতিবিদ দায়িত্ব নিয়ে ২০২৪-এর ৫ আগস্টকে রক্তপাতহীন সামরিক ক্যু বললেও—আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব বা তাদের মূল নেতা শেখ হাসিনা কখনই সেনাবাহিনীর দিকে আঙুল তুলছেন না। বরং এ সব কথার উত্তর তিনি রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এক লাইনে বলেছেন, “দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে কিছু ভুল-ভ্রান্তি হতে পারে।” তাঁর এই ভুল-ভ্রান্তির সীমারেখা তিনি যেখানেই টানুন না কেন, আওয়ামী লীগের মতো এই ধরনের দীর্ঘ পথ চলায় অভিজ্ঞ জনগণের দলগুলো সারা পৃথিবীতেই তাদের ক্ষমতাচ্যুত হওয়াটা নিজস্ব ব্যর্থতা বা ভুলের ফলে ঘটে যাওয়া ঘটনা হিসেবে ধরে নিয়ে পরবর্তী অধ্যায় শুরু করে।

কারণ, রাজনীতির সামনের দিকে জনগণ ও রাজনৈতিক দর্শন থাকে আর পেছনের দিকে ষড়যন্ত্র, গুপ্ত ঘাতক, বুলেট, গ্রেনেড, বোমা—এগুলো থাকবেই। চিলির আলেন্দে যেমন সেনাসদস্যদের হাতে নিহত হবার অনেক আগেই বলেছিলেন, একটি বুলেট তাকে তাড়া করে ফিরছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও ১৯৭৩ সালে বলেছিলেন, “হয়তো আমার মৃত্যু আলেন্দের মতো হবে।” আর শেখ হাসিনার দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময়ের রাজনীতিতে গ্রেনেড, বুলেট, বোমা তো কম তাঁর পিছে ছোটেনি। আর এ বুলেট, গ্রেনেডে নিহতদের নামের তালিকাও তো পৃথিবীতে দীর্ঘ—মোহনদাস গান্ধী, কেনেডি, ইন্দিরা গান্ধী, একিউনো, গামাল আব্দুল নাসের, বেনজির ভুট্টো, গাদ্দাফি প্রমুখ তো রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ নাটক ও উপন্যাসের মাধ্যমে চিত্রিত করে গেছেন কীভাবে ষড়যন্ত্রে রাষ্ট্রক্ষমতা ও যোগ্য রাষ্ট্রনেতাদের বিরুদ্ধে পুরোহিত থেকে শুরু করে তথাকথিত দেবতাকে ব্যবহার করা হয়। রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতার এই পেছন দিকের অন্ধকার থেকে আসা শত্রুগুলোকে মোকাবিলা করাও রাজনীতির ও রাষ্ট্রনায়কদের দায়িত্ব। এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে না পারাও রাজনৈতিক ব্যর্থতা বা পরাজয়।

তারেক রহমান ও ড. ইউনূসের লন্ডন বৈঠক: নির্বাচনের সময় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা

তাই ২০২৪ এ পরাজয়ের পরে আওয়ামী লীগ যে ১৯৭৫-এর থেকে এবার দ্রুততার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে তা স্পষ্ট হয়ে যায় শেখ হাসিনার জীবনে বেঁচে যাবার পরে। ইউনূস ও তাঁর মাস্টারমাইন্ডদের অনেকের কথায় দ্রুতই পরিষ্কার হতে থাকে তাদের “৫ আগস্ট”  শতভাগ সফল হয়নি—শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হওয়ায়। কারণ, ১৯৭৫-এর মতো ২০২৪-এ আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করা যায়নি। অর্থাৎ ২১ আগস্ট ২০০৪-এ যেমন তারা ব্যর্থ হয়েছিল, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট ব্যর্থ হয় আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে।

এ কারণে ইউনূস ও তাঁর মেটিকুলাস ডিজাইনের পার্টরা দ্রুতই বুঝতে পারে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ দ্রুতই রাজনৈতিক কর্মসূচি ছুড়ে দেবে। সাধারণত আওয়ামী লীগের মতো বড় ও জনসমর্থিত কোনো রাজনৈতিক দলের এ ধরনের কর্মসূচি কোনো অনির্বাচিত ও জনসমর্থনহীন সরকার মোকাবিলা করতে পারে না। যে কারণে ইউনূস ও তাঁর সহযোগীরা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবিলা করার জন্য তারা “সংস্কার”-এর নামে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা থেকে তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার গঠনের জন্য নির্বাচনের পথে যায়।

প্রকৃত নির্বাচনের পথে তাদের প্রথম বাধা হতো আওয়ামী লীগ। কারণ, শেখ হাসিনা যেখানেই থাকুন না কেন, আওয়ামী লীগকে স্বাভাবিকভাবে নির্বাচন করতে দিলে, নির্বাচনের মাঠ ও ফল শুধু নয় আরও অনেক কিছু বদলে যেত। তাই তারা রাষ্ট্রক্ষমতাকে একটি গোষ্ঠীর মধ্যে রাখার জন্য আওয়ামী লীগকে নির্বাচন থেকে নির্বাহী আদেশে দূরে রাখে। এবং সরকারকে বৈধতা ও জনভিত্তি দেওয়ার জন্য তৃণমূল আওয়ামী লীগ গড়ার একটা চেষ্টা ও জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করার পথ নেয়। এখানে ইউনূসের বড় সাফল্য পারস্পরিক কূটনীতিতে তিনি যাদের জয় করতে পারেননি—তাঁর এই নির্বাচনী খেলায় তিনি তাদেরও জয় করতে সমর্থ হন। কিন্তু আওয়ামী লীগকে ভেঙে তৃণমূল আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো নামের আওয়ামী লীগ গড়তে সবাই মিলে চেষ্টা করেও সফল হয়নি। তার ফলে নির্বাচন যা হয়েছে এবং তার ভেতর দিয়ে যে সরকার হয়েছে—তার সবকিছু এখন দেশবাসী ও পৃথিবীর কাছে পরিষ্কার।

তারপরেও ইউনূস লাভবান হয়েছে নির্বাচনটি করাতে পেরে। কারণ আজ পর্যন্ত সে ক্ষমতায় থাকলে তাকেই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের এই রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবিলা করতে হতো।

শেখ হাসিনা এক লাইনে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচিটি দিয়েছেন—তিনি ও তাঁর দলের নেতাকর্মী যারা দেশে ও বিদেশে পলাতক ও সাজাপ্রাপ্ত আছেন, সকলে বিচার বিভাগের কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। কিন্তু খুব সাদা চোখে দেখলেও তাঁর এই রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে অনেক বার্তা আছে।

যেমন তাঁর এই রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে তাঁকে কোনোভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে—তার প্রতি কোনো অন্যায় হয়েছে কিনা তারও কোনো দায় তিনি কাউকে দিচ্ছেন না। তিনি বিচারবিভাগকে সম্মান করে আত্মসমর্পণ করতে চাচ্ছেন। বিচার বিভাগের প্রতি এই সম্মান দেখানোর মাধ্যমে তিনি দেশবাসী ও পৃথিবীকে এ বার্তাটিই দিলেন, তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে ইউনূস মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে রাষ্ট্রে ও সমাজে যে প্রতিহিংসা চালু করে। ইউনূস নিজে ভাষণ দিয়ে গ্রামে গ্রামে তার পাশের বাড়ির ভিন্নমতের মানুষকে নির্মূল করার নির্দেশনাও দেয়। যার ফলে বিচার বিভাগ, প্রশাসন, শিক্ষা বিভাগ, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী সমাজ, পুলিশ এমনকি সেনাবাহিনীর সদস্যও মব ভায়োলেন্সের শিকার হন। এবং এই ধারা এখনও চলছে। তথাকথিত নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সরকারকে একটি রাজনৈতিক সরকারের রূপ দিলেও তারাও এ ধারা থামাতে পারছে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারাও “ইউনূস-২” হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তারেক রহমান

এমন সময়ে শেখ হাসিনা তাঁর নেতাকর্মীদের নিয়ে বিচার বিভাগের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাওয়ার কর্মসূচী- মূলত দেশকে মব ভায়োলেন্স থেকে বের করে স্থিতিশীলতা আনার একটা রাজনৈতিক কর্মসূচি। এবং এই স্থিতিশীলতা আনার বলটি তিনি সরকারের কোর্টেই ছুড়ে দিয়েছেন। রয়টার্সের ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বিপুল উন্নতি করলেও তাঁর আমলে রাষ্ট্রের কিছু প্রতিষ্ঠানকে তিনি দুর্বল করে ফেলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রয়টার্সের অভিযোগের সত্যতাও আছে। শেখ হাসিনাও সেখানে বলেছেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় কিছু ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে। একথা বলার ভেতর দিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের অভিযোগগুলো স্বীকার করে নিয়ে তিনি সেই রাজনৈতিক কর্মসূচি সরকারের কোর্টে ছুড়ে দিলেন—যা মূলত ইউনূস রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলেছে, সেটাকে দেশের স্বার্থে ফিরিয়ে আনার এক দৃঢ় সহযোগিতার অঙ্গীকার। নিরাপদ অবস্থান থেকে মৃত্যুর মুখোমুখি এসে দাঁড়ানোর তাঁর এই রাজনৈতিক কর্মসূচির ফলে তাঁর ব্যক্তি জীবনে যাই ঘটুক না কেন, তিনি দেশপ্রেমের উঁচু বেদীতেই এসে দাঁড়িয়েছেন—আর সরকারের দিকে ছুড়ে দিয়েছেন দেশের স্থিতিশীলতা আনার পথ তৈরি করার হাতটি। তিনি কোনো অসাংবিধানিক শব্দ তাঁর কর্মসূচিতে উচ্চারণ করেননি। সরকারের পক্ষ থেকেও এখনও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো কথা বলার সময় আসেনি। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ রাষ্ট্রীয়ভাবে নয়, একটি অনুষ্ঠানের বক্তব্যে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে এনে প্রকাশ্যে ফাঁসি কার্যকর করা হবে। প্রকাশ্যে ফাঁসি কার্যকর করা আধুনিক সাংবিধানিক রাষ্ট্রে “বর্বরতা” বা মব হিসেবেই চিহ্নিত হয়। তাঁর এ কথা নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের কথা নয়। শ্যামার বাবা ও মা দুজনেই খাঁটি বাঙালি ছিলেন। তাই বাঙালির অন্যতম আদিবাসীদের দেবী শ্যামা (যার অপর নাম কালী) নামেই তাঁর নাম রেখেছেন। দেবী ‘শ্যামা’র গলায় রক্তাক্ত নরমুণ্ডের মালা আছে, হাতে নরহত্যার রক্তমাখা খড়গ আছে, কিন্তু শিবের বুকে পা পড়তেই শ্যাম জিভে কামড় দিয়ে লজ্জা পেয়েছেন। শিব অর্থ সত্য ও সুন্দর—তা সকল বাংলাভাষী মাত্রই জানেন। শ্যামা ওবায়েদ মুখে যাই বলুন, তাকেও শেষ পর্যন্ত সত্যের ওপর পা রাখতে হবে।

কারণ, শেখ হাসিনা রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়েছেন—ষড়যন্ত্রের কর্মসূচি নয়। আর রাজনৈতিক পথ সব সময়ই সত্য ও সুন্দর দিয়ে তৈরি পথেই চলে। রাজনীতির মধ্যে ষড়যন্ত্রকারীরা ঢুকে যায়, হত্যাকারীরা ঢুকে যায়, তাই রাজনীতির নামে একটি অসুন্দর গোষ্ঠীকেও দেখা যায় সব দেশে।

যাহোক, ক্ষমতাচ্যুত হবার দুই বছরের কাছাকাছি সময়ে এসে শেখ হাসিনা প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়েছেন—এবং যা তিনি পালন করা শুরু করবেন ডিসেম্বর নাগাদ। তা এখনও একটা দীর্ঘ পথ। আর এই দীর্ঘ পথ যে একেবারে নিস্তরঙ্গ থাকবে তাও নয়। তাই এখন সময়টা প্রতি মুহূর্তে শুরুর আগের শুরু দেখার।

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World