০৮:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
লন্ডনের বাগানে বার্লিন প্রাচীর, সরাতে হতে পারে ঐতিহাসিক স্থাপনা বিচারকের আসনে নয়, সহকারীর ভূমিকাতেই থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: প্রধান বিচারপতির সতর্কবার্তা পশ্চিমবঙ্গে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির খসড়া পর্যালোচনায় উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন হান কাংয়ের লেখনীতে জীবন, সহিংসতা ও মানবতার গভীর অনুসন্ধান হাজার বছরের বায়ো ট্যাপেস্ট্রি যাচ্ছে ব্রিটেনে, ইতিহাসের অনন্য নিদর্শন ঘিরে নতুন অধ্যায় কঙ্গোতে ইবোলা চিকিৎসায় নতুন আশার আলো, শুরু হলো যুগান্তকারী ওষুধ পরীক্ষা ডেকলান রাইসের অসুস্থতা নিয়ে বড় তথ্য, নরওয়ে ম্যাচের আগে তিন দিন বিছানায় ছিলেন ইংল্যান্ড তারকা জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা নিয়ে ওমর আবদুল্লাহর তীব্র ক্ষোভ, কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ আট বছর পর বিরল রোগের সন্ধান, সন্তানের জন্য নতুন লড়াই শুরু মায়ের ডেঙ্গুতে আরও এক প্রাণহানি, একদিনে হাসপাতালে ভর্তি ৩৫০ জন

ন্যাটোকে বেশি খরচ করাতে সফলতা, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাব ক্ষয়ের সূচনা?

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি অভিযোগ প্রায় সর্বসম্মত ছিল—ন্যাটোর নিরাপত্তা ব্যয়ের বড় অংশ বহন করে ওয়াশিংটন, অথচ ইউরোপীয় মিত্ররা তুলনামূলকভাবে কম অবদান রাখে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযোগকে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ ও সংঘাতপূর্ণভাবে সামনে আনেন। তাঁর ভাষা ও পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না: ইউরোপ প্রতিরক্ষায় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। অনেকের কাছে এটি ট্রাম্পের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য।

কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক সাফল্য সব সময় দীর্ঘমেয়াদি লাভের সমার্থক নয়। বরং এমনও হতে পারে, যে পরিবর্তনকে আজ বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেটিই ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব কমিয়ে দেওয়ার সূচনা হয়ে দাঁড়াবে।

অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ইউরোপ যদি নিজের নিরাপত্তার জন্য বেশি ব্যয় করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় কমে আসবে। বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউরোপের প্রতিরক্ষা বাজেট কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেও যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক ব্যয় আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। কারণ আমেরিকার প্রতিরক্ষা কৌশল কেবল ন্যাটোকে ঘিরে নয়; এটি একটি বৈশ্বিক শক্তির ভূমিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

রাশিয়াকে প্রতিরোধ, চীনের উত্থান মোকাবিলা, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, পারমাণবিক সক্ষমতা, মহাকাশে প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোন প্রযুক্তিতে আধিপত্য—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অঙ্গীকার বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। ফলে ইউরোপ নিজের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ালেও ওয়াশিংটনের সামরিক দায়বদ্ধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।

European Union Outlines Plan to Reduce Dependence on American Tech - The  New York Times

বরং পরিবর্তনটি ঘটছে অন্য জায়গায়। ইউরোপ যত বেশি আত্মনির্ভর হবে, তত কম নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর। এই পরিবর্তনের কৌশলগত গুরুত্ব অর্থনৈতিক হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র শুধু ন্যাটোর সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য ছিল না; সে ছিল পুরো জোটের কেন্দ্রীয় শক্তি। ইউরোপজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি শুধু রাশিয়াকে ঠেকানোর জন্য নয়, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযানে ইউরোপীয় অবকাঠামো ও আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল বড় কৌশলগত সুবিধা।

কিন্তু যদি ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ওয়াশিংটন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য অংশীদার নয়, তাহলে সেই সহযোগিতার ধরনও বদলে যাবে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সামরিক বা কূটনৈতিক উদ্যোগে ইউরোপ আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন নাও দিতে পারে।

এ পরিবর্তন শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক অবরোধ কিংবা ভূরাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ইউরোপ এখন ক্রমেই স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করছে। রাশিয়ার সম্পদ জব্দ রাখা, আর্থিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয়ে ইউরোপের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো সময় রাশিয়া, ইরান বা চীনকে ঘিরে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে চায়, ইউরোপের সমর্থন আর নিশ্চিত ধরে নেওয়া যাবে না।

অস্ত্রবাজারেও একই ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। বহু বছর ধরে ইউরোপীয় দেশগুলো শুধু অস্ত্রের মানের কারণে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল হিসেবেও মার্কিন অস্ত্র কিনেছে। একই ধরনের সামরিক প্রযুক্তি যৌথ অভিযানকে সহজ করেছে এবং নিরাপত্তা জোটকে আরও কার্যকর করেছে।

The good, the bad and the ugly — Inside Europe's race to supplant US  defense enablers

কিন্তু এখন ইউরোপে ক্রমেই এমন আলোচনা জোরালো হচ্ছে যে, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মার্কিন নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। যদি কোনো ভবিষ্যৎ মার্কিন প্রশাসন সফটওয়্যার আপডেট, খুচরা যন্ত্রাংশ বা প্রযুক্তিগত সহায়তাকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে ইউরোপের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। ফলে ইউরোপ নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রশিল্পের ওপর নয়; আরও গভীরভাবে আঘাত করতে পারে তার বৈশ্বিক কৌশলগত অবস্থানে। কারণ অস্ত্র বিক্রি কেবল ব্যবসা নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক আস্থার সম্পর্কও তৈরি করে।

তবে ইউরোপের অভ্যন্তরেও নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর কথা বলা সহজ, কিন্তু সেই ব্যয় বহনের সক্ষমতা সব দেশের সমান নয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ইউরোপীয় দেশ দ্রুত এগোতে পারবে না। তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বড় আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে জার্মানির, এবং বার্লিন ইতোমধ্যেই সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পথে হাঁটছে।

জার্মানির এই পরিবর্তন বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে যৌক্তিক হলেও ইউরোপের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে। একটি দেশ যদি প্রতিবেশীদের তুলনায় অনেক বেশি সামরিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কারণে অন্যদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির অসম বণ্টন সব সময় নতুন হিসাব-নিকাশের জন্ম দেয়।

Great Responsibilities and New Global Power | The National WWII Museum |  New Orleans

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল এই ধরনের প্রতিযোগিতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার নিচে থেকে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে আর ঐতিহ্যগত শক্তির ভারসাম্যের রাজনীতিতে ফিরতে হয়নি। ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রশমিত হয়েছে, ছোট রাষ্ট্রগুলোও তুলনামূলক নিরাপদ বোধ করেছে এবং একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠেছে।

আজ সেই কাঠামো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। ইউরোপের অধিক আত্মনির্ভরতা প্রথম দৃষ্টিতে ন্যায়সংগত ও প্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে যদি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব, কৌশলগত নেতৃত্ব এবং পারস্পরিক আস্থা ক্ষয়ে যায়, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে সফল নিরাপত্তা ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।

অতএব প্রশ্নটি কেবল কে কত টাকা ব্যয় করছে, সেটি নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা স্থাপত্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে। হয়তো একসময় যুক্তরাষ্ট্র উপলব্ধি করবে, পুরোনো ন্যাটো নিখুঁত ছিল না, কিন্তু সেটিই এমন একটি জোট ছিল যা শুধু ইউরোপকে নয়, আমেরিকার বৈশ্বিক নেতৃত্বকেও কয়েক দশক ধরে টিকিয়ে রেখেছিল।

জনপ্রিয় সংবাদ

লন্ডনের বাগানে বার্লিন প্রাচীর, সরাতে হতে পারে ঐতিহাসিক স্থাপনা

ন্যাটোকে বেশি খরচ করাতে সফলতা, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাব ক্ষয়ের সূচনা?

০৭:১০:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি অভিযোগ প্রায় সর্বসম্মত ছিল—ন্যাটোর নিরাপত্তা ব্যয়ের বড় অংশ বহন করে ওয়াশিংটন, অথচ ইউরোপীয় মিত্ররা তুলনামূলকভাবে কম অবদান রাখে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযোগকে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ ও সংঘাতপূর্ণভাবে সামনে আনেন। তাঁর ভাষা ও পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না: ইউরোপ প্রতিরক্ষায় ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। অনেকের কাছে এটি ট্রাম্পের অন্যতম বড় কূটনৈতিক সাফল্য।

কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাৎক্ষণিক সাফল্য সব সময় দীর্ঘমেয়াদি লাভের সমার্থক নয়। বরং এমনও হতে পারে, যে পরিবর্তনকে আজ বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেটিই ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব কমিয়ে দেওয়ার সূচনা হয়ে দাঁড়াবে।

অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, ইউরোপ যদি নিজের নিরাপত্তার জন্য বেশি ব্যয় করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ব্যয় কমে আসবে। বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউরোপের প্রতিরক্ষা বাজেট কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেও যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক ব্যয় আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। কারণ আমেরিকার প্রতিরক্ষা কৌশল কেবল ন্যাটোকে ঘিরে নয়; এটি একটি বৈশ্বিক শক্তির ভূমিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

রাশিয়াকে প্রতিরোধ, চীনের উত্থান মোকাবিলা, মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, পারমাণবিক সক্ষমতা, মহাকাশে প্রতিযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ড্রোন প্রযুক্তিতে আধিপত্য—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অঙ্গীকার বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। ফলে ইউরোপ নিজের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ালেও ওয়াশিংটনের সামরিক দায়বদ্ধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।

European Union Outlines Plan to Reduce Dependence on American Tech - The  New York Times

বরং পরিবর্তনটি ঘটছে অন্য জায়গায়। ইউরোপ যত বেশি আত্মনির্ভর হবে, তত কম নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর। এই পরিবর্তনের কৌশলগত গুরুত্ব অর্থনৈতিক হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র শুধু ন্যাটোর সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য ছিল না; সে ছিল পুরো জোটের কেন্দ্রীয় শক্তি। ইউরোপজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি শুধু রাশিয়াকে ঠেকানোর জন্য নয়, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযানে ইউরোপীয় অবকাঠামো ও আকাশপথ ব্যবহারের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল বড় কৌশলগত সুবিধা।

কিন্তু যদি ইউরোপের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ওয়াশিংটন আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য অংশীদার নয়, তাহলে সেই সহযোগিতার ধরনও বদলে যাবে। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি সামরিক বা কূটনৈতিক উদ্যোগে ইউরোপ আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন নাও দিতে পারে।

এ পরিবর্তন শুধু নিরাপত্তা সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। নিষেধাজ্ঞা, আর্থিক অবরোধ কিংবা ভূরাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ইউরোপ এখন ক্রমেই স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করছে। রাশিয়ার সম্পদ জব্দ রাখা, আর্থিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ—এসব বিষয়ে ইউরোপের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো সময় রাশিয়া, ইরান বা চীনকে ঘিরে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে চায়, ইউরোপের সমর্থন আর নিশ্চিত ধরে নেওয়া যাবে না।

অস্ত্রবাজারেও একই ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। বহু বছর ধরে ইউরোপীয় দেশগুলো শুধু অস্ত্রের মানের কারণে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশল হিসেবেও মার্কিন অস্ত্র কিনেছে। একই ধরনের সামরিক প্রযুক্তি যৌথ অভিযানকে সহজ করেছে এবং নিরাপত্তা জোটকে আরও কার্যকর করেছে।

The good, the bad and the ugly — Inside Europe's race to supplant US  defense enablers

কিন্তু এখন ইউরোপে ক্রমেই এমন আলোচনা জোরালো হচ্ছে যে, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মার্কিন নির্ভরতা ঝুঁকিপূর্ণ। যদি কোনো ভবিষ্যৎ মার্কিন প্রশাসন সফটওয়্যার আপডেট, খুচরা যন্ত্রাংশ বা প্রযুক্তিগত সহায়তাকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে ইউরোপের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। ফলে ইউরোপ নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

এর প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রশিল্পের ওপর নয়; আরও গভীরভাবে আঘাত করতে পারে তার বৈশ্বিক কৌশলগত অবস্থানে। কারণ অস্ত্র বিক্রি কেবল ব্যবসা নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সহযোগিতা, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা এবং রাজনৈতিক আস্থার সম্পর্কও তৈরি করে।

তবে ইউরোপের অভ্যন্তরেও নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে। প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর কথা বলা সহজ, কিন্তু সেই ব্যয় বহনের সক্ষমতা সব দেশের সমান নয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ইউরোপীয় দেশ দ্রুত এগোতে পারবে না। তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বড় আর্থিক সক্ষমতা রয়েছে জার্মানির, এবং বার্লিন ইতোমধ্যেই সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পথে হাঁটছে।

জার্মানির এই পরিবর্তন বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে যৌক্তিক হলেও ইউরোপের ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে। একটি দেশ যদি প্রতিবেশীদের তুলনায় অনেক বেশি সামরিক শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কারণে অন্যদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তির অসম বণ্টন সব সময় নতুন হিসাব-নিকাশের জন্ম দেয়।

Great Responsibilities and New Global Power | The National WWII Museum |  New Orleans

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল এই ধরনের প্রতিযোগিতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার নিচে থেকে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে আর ঐতিহ্যগত শক্তির ভারসাম্যের রাজনীতিতে ফিরতে হয়নি। ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রশমিত হয়েছে, ছোট রাষ্ট্রগুলোও তুলনামূলক নিরাপদ বোধ করেছে এবং একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে উঠেছে।

আজ সেই কাঠামো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। ইউরোপের অধিক আত্মনির্ভরতা প্রথম দৃষ্টিতে ন্যায়সংগত ও প্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে যদি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাব, কৌশলগত নেতৃত্ব এবং পারস্পরিক আস্থা ক্ষয়ে যায়, তাহলে বিশ্বের সবচেয়ে সফল নিরাপত্তা ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়বে।

অতএব প্রশ্নটি কেবল কে কত টাকা ব্যয় করছে, সেটি নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কে ভবিষ্যতের নিরাপত্তা স্থাপত্যের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে। হয়তো একসময় যুক্তরাষ্ট্র উপলব্ধি করবে, পুরোনো ন্যাটো নিখুঁত ছিল না, কিন্তু সেটিই এমন একটি জোট ছিল যা শুধু ইউরোপকে নয়, আমেরিকার বৈশ্বিক নেতৃত্বকেও কয়েক দশক ধরে টিকিয়ে রেখেছিল।