বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং জাতীয় রাজনীতির অন্যতম অগ্রনায়ক তোফায়েল আহমেদের দ্বিতীয় জানাজা মঙ্গলবার ভোলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জানাজায় জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ অংশ নেন। জনতার ব্যাপক উপস্থিতিতে পুরো এলাকা শোক ও শ্রদ্ধার আবহে পরিণত হয়।
এর আগে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনারের মাধ্যমে বর্ষীয়ান এই নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে তাঁর মরদেহ ভোলার বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হেলিপ্যাডে পৌঁছায়। পরে ফ্রিজিং ভ্যানে করে মরদেহ নেওয়া হয় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে, যেখানে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জানাজা।

মরদেহ ভোলায় পৌঁছানোর পর হেলিপ্যাড ও জানাজার মাঠে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী, স্বজন এবং সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা যায়। অনেকেই শেষবারের মতো প্রিয় নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেন। জানাজা শেষে দক্ষিণ দীঘলদি ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের পাশে তাঁকে দাফনের কথা রয়েছে।
ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতৃত্বে
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়েছিল ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ব্রজমোহন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন এবং ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতৃত্বে পরিণত হন।
শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফাকে ছাত্রসমাজের ১১ দফার সঙ্গে যুক্ত করে আন্দোলনকে বেগবান করার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণাও তাঁর হাত ধরেই আসে।
মুক্তিযুদ্ধ ও রাষ্ট্রগঠনের সহযোদ্ধা
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিব বাহিনীর চার আঞ্চলিক অধিনায়কের একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ রাষ্ট্রগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি একাধিকবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। জীবদ্দশায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ৯টিতে বিজয়ী হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি।
মানুষের শ্রদ্ধায় শেষ বিদায়
ইতিহাসের বরপুত্র তোফায়েল আহমেদের দ্বিতীয় জানাজায় ভোলায় নেমেছিল মানুষের ঢল। নানা আলোচনা ও প্রতিকূলতার আবহের মধ্যেও হাজারো মানুষ প্রমাণ করেছেন, জননেতার প্রতি সাধারণ মানুষের ভালোবাসা কোনো বাধা মানে না। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষ শেষবারের মতো তাঁদের প্রিয় নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে জানাজার মাঠে সমবেত হন।
তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ভোলার মাটির অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক সন্তান, যার জীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণআন্দোলন এবং জাতীয় রাজনীতির ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর প্রতি মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি শুধু একজন রাজনীতিকের প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















