প্রতিদিন ভোরে শহর জেগে ওঠার আগেই আরেকটি শহরের জন্ম হয়। সেটি মানচিত্রে আঁকা নয়, কোনো প্রশাসনিক নথিতে নিবন্ধিতও নয়। এই শহরের বাসিন্দারা এক এলাকায় থাকেন, অন্য এলাকায় কাজ করেন, কোথাও পড়াশোনা করেন, আবার অন্য কোথাও কেনাকাটা বা সেবা গ্রহণ করেন। তাদের জীবন প্রতিদিন বিভিন্ন সীমানা অতিক্রম করে চলে। অথচ নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতাকে এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
দীর্ঘদিন ধরে নগর পরিচালনার ধারণা গড়ে উঠেছে স্থায়ী ঠিকানা ও প্রশাসনিক সীমারেখার ওপর। একজন নাগরিক কোথায় নিবন্ধিত, কোন জেলায় তার বাসা, কোন কর্তৃপক্ষ তার এলাকার দায়িত্বে—এসবই ছিল পরিকল্পনার মূল ভিত্তি। কিন্তু আধুনিক মহানগর জীবনের প্রকৃতি বদলে গেছে। মানুষের কর্মস্থল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বাজার এবং সামাজিক সম্পর্ক এখন আর একই প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এই পরিবর্তন শুধু জনসংখ্যা বৃদ্ধির গল্প নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের গল্প। একসময় নগরায়ণ বলতে বোঝাত গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর। এখন বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। কেউ শহরতলিতে বসবাস করেন, শহরের কেন্দ্রে কাজ করেন, পাশের পৌরসভায় সেবা নেন এবং একই সঙ্গে দূরের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেন। কিন্তু সরকারি পরিকল্পনা এখনও মূলত ধরে নেয় মানুষ যেখানে ঘুমায়, সেখানেই তার জীবন সীমাবদ্ধ।
সমস্যা এখানেই। কারণ দিনের বেলায় শহরের প্রকৃত ব্যবহারকারীদের সংখ্যা রাতের পরিসংখ্যানের সঙ্গে মেলে না। রাতে একটি এলাকার জনসংখ্যা যত, সকালে তা সম্পূর্ণ বদলে যায়। হাজার হাজার মানুষ অন্য এলাকায় গিয়ে রাস্তা, পরিবহন, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং জনপরিসর ব্যবহার করেন। ফলে কাগজে-কলমে যে শহর দেখা যায়, বাস্তবে তার চেহারা সম্পূর্ণ আলাদা।
এই অমিলের সবচেয়ে বড় মূল্য মানুষকে দিতে হয় সময়ের মাধ্যমে।
আজকের মহানগরগুলোর বড় সংকট শুধু যানজট নয়, বরং সময়ের দারিদ্র্য। যখন একজন কর্মজীবী মানুষ প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা যাতায়াতে ব্যয় করেন, তখন তিনি শুধু পথেই সময় হারান না। হারান ঘুম, বিশ্রাম, পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ, সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার মুহূর্ত এবং নিজের ব্যক্তিগত উন্নয়নের সম্ভাবনা। অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি সময়ের বৈষম্যও তখন সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হয়ে ওঠে।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার করেন পছন্দের কারণে নয়, প্রয়োজনের তাগিদে। যখন গণপরিবহন সহজলভ্য নয়, বাসস্ট্যান্ড দূরে, সংযোগ ব্যবস্থা দুর্বল কিংবা যাতায়াত অনির্ভরযোগ্য, তখন ব্যক্তিগত যানবাহনই একমাত্র বাস্তব সমাধান হয়ে দাঁড়ায়।
ফলে যানজটকে কেবল সড়ক ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। নগর পরিচালনার ব্যর্থতার খরচ শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের ওপরই বর্তায়। জ্বালানি ব্যয়, পার্কিং খরচ, যাত্রার ঝুঁকি, মানসিক চাপ এবং হারিয়ে যাওয়া সময়—সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের অদৃশ্য কর, যা প্রতিদিন কোটি মানুষ পরিশোধ করছে।
এ কারণেই পরিবহন নীতিতে কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। পরিবেশবান্ধব গাড়ি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু গাড়ির জ্বালানি বদলালেই নগর সমস্যার সমাধান হয় না। বৈদ্যুতিক গাড়িতে ভরা যানজটও যানজটই থাকে। সড়কের সীমিত জায়গা, দীর্ঘ যাত্রা এবং সময়ের অপচয় তখনও একই রকম থেকে যায়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কীভাবে আরও বেশি মানুষকে দক্ষ গণপরিবহনের আওতায় আনা যায়। কারণ গণপরিবহন শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার মাধ্যম নয়; এটি নাগরিক জীবনে সমান অংশগ্রহণের একটি মৌলিক অবকাঠামো। যদি মানুষের দৈনন্দিন জীবন প্রশাসনিক সীমানা অতিক্রম করে পরিচালিত হয়, তবে তাদের চলাচলের অধিকারও স্থানীয় সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বা রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের ওপর নির্ভর করতে পারে না।
একই যুক্তি আবাসন নীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কোনো বাড়ির দাম কম হলেই সেটিকে প্রকৃত অর্থে সাশ্রয়ী বলা যায় না, যদি সেই বাড়িতে বসবাসকারী মানুষকে প্রতিদিন দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যাতায়াতের মাধ্যমে তার মূল্য শোধ করতে হয়। একইভাবে, রেলস্টেশনের পাশে কিছু ভবন নির্মাণ করলেই কোনো প্রকল্পকে গণপরিবহনকেন্দ্রিক উন্নয়ন বলা যায় না, যদি আশপাশের এলাকাগুলো এখনও বিচ্ছিন্ন ও ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
নগর পরিকল্পনার মূল প্রশ্ন তাই নতুন করে ভাবতে হবে। কত কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ করা হলো, সেটিই একমাত্র সূচক নয়। বরং দেখতে হবে মানুষের কোন কোন দৈনন্দিন যাত্রা ব্যক্তিগত যানবাহন ছাড়াই সম্ভব করা যায়। কতগুলো বাড়ি নির্মিত হয়েছে, সেটিও যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই বাড়িগুলো কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে সংযুক্ত।
প্রতিদিন সকালে যে অদৃশ্য শহর আমাদের সামনে হাজির হয়, সেটিই ভবিষ্যতের নগর বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রা ইতোমধ্যে প্রশাসনিক সীমারেখাকে অতিক্রম করেছে। এখন দেখার বিষয়, নীতিনির্ধারণও কি সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে, নাকি এখনও শুধু মানুষের রাতের ঠিকানাকেই শহরের একমাত্র পরিচয় হিসেবে বিবেচনা করবে।
সুর্যো আদি রখমাওয়ান 









