দেশের ব্যাংকিং খাত ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে এক গভীর সংকটের মুখে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ শ্রেণিকৃত ঋণ ও প্রভিশনিং প্রতিবেদনে দেখা গেছে, খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে গেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু ব্যাংকিং খাতের জন্য নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের সতর্কসংকেত।
প্রথম প্রান্তিকে রেকর্ড ঋণ শ্রেণিকরণ
বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ তিন মাসের ব্যবধানে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকায়। দেশের মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ এখন শ্রেণিকৃত বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো যে ঋণ বিতরণ করেছে তার প্রায় প্রতি তিন টাকার মধ্যে এক টাকা গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছে।
শুধু খেলাপি ঋণ বা নন-পারফর্মিং লোনের (এনপিএল) পরিমাণই মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া ঋণের ৩০ দশমিক ৯২ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ২৯ দশমিক ৯২ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।
সমস্যাগ্রস্ত ঋণের বেশিরভাগই ‘মন্দ ঋণ’
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মোট সমস্যাগ্রস্ত ঋণের ৯৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ বা ৫ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক ঋণ’ শ্রেণিতে পড়েছে। ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। ফলে ব্যাংকগুলোর মূলধনের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
এদিকে বিশেষ নজরদারির আওতায় থাকা এসএমএ ঋণের পরিমাণও দ্রুত বাড়ছে। তিন মাসে এই ঋণ ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এটি ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রভিশন ঘাটতি দুই লাখ কোটির বেশি
খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর যে পরিমাণ সংরক্ষণ বা প্রভিশন রাখার কথা, তার তুলনায় বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ৪ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা প্রভিশন থাকা প্রয়োজন হলেও ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা।
ফলে খাতে মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এই ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি ব্যাংকগুলোর মুনাফা, মূলধন সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ঋণমানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে সংকট সবচেয়ে গভীর
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে পরিস্থিতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। এসব ব্যাংকের মোট ঋণের ৪৫ দশমিক ৮৫ শতাংশই শ্রেণিকৃত। ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার ঋণপোর্টফোলিওর মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা সমস্যাগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৪৫ দশমিক ২১ শতাংশ।
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও চাপ বাড়ছে। প্রথম প্রান্তিকে তাদের শ্রেণিকৃত ঋণের হার ২৮ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩০ দশমিক ১১ শতাংশে পৌঁছেছে। মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ। বিপরীতে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। তাদের শ্রেণিকৃত ঋণের হার মাত্র ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং খেলাপি ঋণের হার ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কসংকেত
অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশেষজ্ঞ এম. মাসরুর রিয়াজের মতে, দেশের মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অকার্যকর বা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে আটকে থাকায় নতুন শিল্প, অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাতে অর্থায়নের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার, কার্যকর ঋণ পুনরুদ্ধার উদ্যোগ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে তারল্য সংকট, মূলধন ক্ষয় এবং আমানতকারীদের আস্থার সংকট দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের রেকর্ড বৃদ্ধি, শ্রেণিকৃত ঋণ ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রভিশন ঘাটতি ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সংকট নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















