এক দশক পর মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরেছিলেন যশোরের তরুণ প্রবাসী আরিফুল ইসলাম। পরিবারের সদস্যদের কাছে এটি ছিল আনন্দ আর পুনর্মিলনের মুহূর্ত। কিন্তু সেই আনন্দঘন প্রত্যাবর্তন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রূপ নেয় হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিতে। ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন, আর গুরুতর আহত হয়েছে দুই শিশু।
সোমবার রাতে বাংলাদেশে ফেরেন ৩০ বছর বয়সী আরিফুল ইসলাম। জীবিকার সন্ধানে তিনি গত ১০ বছর মালয়েশিয়ায় ছিলেন। দেশে ফেরার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান তার মা নূরজাহান বেগম, ছোট ভাই রাকিব হোসেন, বোন আয়েশা খাতুন এবং দুই শিশু আত্মীয়—ভাগনে আশরাফুল ও ভাগনি তাশফিয়া।
বিমানবন্দর থেকে সবাই একটি ব্যক্তিগত গাড়িতে করে নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
ফেরার আনন্দে শোকের ছায়া
মঙ্গলবার ভোর প্রায় ৪টার দিকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মালিগ্রাম এলাকায় ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে তাদের বহনকারী গাড়িটি গ্যাস সিলিন্ডারবোঝাই একটি দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
নিহতদের মধ্যে রয়েছেন প্রবাসী আরিফুল ইসলাম, তার ছোট ভাই রাকিব হোসেন (২০), মা নূরজাহান বেগম (৫৫), বোন আয়েশা খাতুন (৩৫) এবং ব্যক্তিগত গাড়ির চালক জাহিদ হোসেন (৩৫)। জাহিদ যশোরের মনিরামপুর উপজেলার চালুহাটি গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।
অন্যদিকে আয়েশা খাতুনের দুই সন্তান আশরাফুল (৮) ও তাশফিয়া (৩) গুরুতর আহত হয়। বর্তমানে তারা ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
উদ্ধার অভিযান ও চিকিৎসা
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশ। উদ্ধারকর্মীরা আহতদের উদ্ধার করে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা চারজনকে মৃত ঘোষণা করেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় আরিফুল ইসলাম এবং দুই শিশুকে পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পথে আরিফুলের মৃত্যু হয়।
স্বজনদের আহাজারি
এই দুর্ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো পরিবারে। আরিফুলের ভগ্নিপতি ইলিয়াস হোসেন বলেন, দীর্ঘ ১০ বছর পর পরিবারের সবাই অনেক আশা নিয়ে তাকে আনতে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাড়ি ফেরার আগেই সেই আনন্দ মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়।
আইনি প্রক্রিয়া চলছে
শিবচর হাইওয়ে থানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পর চারটি মরদেহ প্রথমে উদ্ধার করে থানায় রাখা হয়। পরে হাসপাতাল থেকে আরিফুল ইসলামের মরদেহও উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্রাকটি জব্দ করেছে। আইনি কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
প্রবাসীর দেশে ফেরা ট্র্যাজেডি
প্রবাসজীবনের ১০ বছর শেষে দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে নতুন করে পথচলা শুরু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন আরিফুল ইসলাম। কিন্তু বাড়ি ফেরার সেই পথই হয়ে উঠল তার এবং পরিবারের চার সদস্যের জীবনের শেষ যাত্রা। একটি আনন্দঘন প্রত্যাবর্তন মুহূর্তেই পরিণত হলো এক পরিবারের গভীর শোকগাঁথায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















