ইউরোপের শীর্ষ ক্লাব প্রতিযোগিতায় প্যারিস সাঁ-জার্মাঁর টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের আনন্দ ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক উদযাপনের জন্ম দিলেও সেই উৎসব দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন এলাকায় দাঙ্গা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
শনিবার রাতে শিরোপা জয়ের পর হাজারো সমর্থক রাস্তায় নেমে আসে। গাড়ির হর্ন, আতশবাজি এবং দলীয় পতাকা নিয়ে উৎসব শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আইফেল টাওয়ার ও শঁজেলিজে এলাকার আশপাশে একাধিক গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং বিভিন্ন দোকানে ভাঙচুর চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
শতাধিক আহত, শত শত গ্রেপ্তার
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহান্তের সহিংসতায় ২০০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। একই সময়ে দেশজুড়ে প্রায় ৮৯০ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কর্তৃপক্ষের দাবি, কিছু সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী ফুটবল ম্যাচকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তাদের মতে, অধিকাংশ সমর্থক শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপন করলেও একটি ছোট অংশ পরিস্থিতিকে সহিংস করে তোলে।
ম্যাক্রোঁর কঠোর বার্তা
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এ ধরনের দৃশ্যকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না। তিনি জানান, খেলাধুলার আনন্দ কখনোই সহিংসতার কারণ হতে পারে না এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পিএসজি দলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ফ্রান্সে এমন ঘটনা আর দেখতে চায় না সরকার এবং অপরাধীদের প্রতি কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
বিশ্বকাপের আগে বাড়ছে উদ্বেগ
ফ্রান্সে বড় ধরনের জনসমাগম ও উদযাপনকে ঘিরে সহিংসতার ঘটনা নতুন নয়। গত বছরও একই ক্লাবের শিরোপা জয়ের পর দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তখন শত শত গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক করা হয়েছিল।
এ মাসেই বিশ্বকাপ আয়োজন ঘনিয়ে আসায় নতুন এই সহিংসতা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
বিরোধীদের আক্রমণ
চরম ডানপন্থী রাজনৈতিক নেতা জর্দান বারদেলা ঘটনাকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেন, দেশের বিভিন্ন শহরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা সাধারণ আইনশৃঙ্খলা সমস্যার চেয়েও গুরুতর। তার মতে, রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়ায় এমন ঘটনা বারবার ঘটছে।
আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে বারদেলা আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকে প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি পুলিশ সদস্য বৃদ্ধি এবং কঠোর নিরাপত্তা নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
কেন বারবার ঘটছে এমন সহিংসতা
বিশ্লেষকদের মতে, কিছু তরুণ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অসন্তোষ, হতাশা এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর প্রবণতা থেকে বড় জনসমাগমকে সুযোগ হিসেবে দেখছে। ফুটবল ম্যাচ কিংবা জাতীয় উদযাপনের মতো অনুষ্ঠানে বিপুল জনসমাগম থাকায় তারা সহজে ভিড়ের মধ্যে মিশে যেতে পারে।
ফরাসি পর্যবেক্ষকদের মতে, একবার এমন সংস্কৃতি গড়ে উঠলে তা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ফুটবল মাঠের সাফল্য এখন শুধু ক্রীড়া নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















