আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে দেশের ভ্যাট ও কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সরকারের লক্ষ্য রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং কর-ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে অর্থনীতির বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক খাতকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের একাংশের আশঙ্কা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতার সময়ে নতুন এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এই বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যও রেকর্ড উচ্চতায় নেওয়া হচ্ছে।
ভ্যাট নিবন্ধনের সীমা কমছে
এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে বছরে ৩০ লাখ টাকা টার্নওভার হলে যে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, তা কমিয়ে ২০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হচ্ছে। ফলে দৈনিক গড়ে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো বিক্রি করা ছোট ব্যবসাগুলোকেও ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে।
রাজস্ব কর্তৃপক্ষের মতে, ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক ব্যবসা এখনও ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থাকলেও আগামী এক বছরে তা ২০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যবসার জন্য বাধ্যতামূলক হতে পারে বিআইএন
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা, জমি বা যানবাহন নিবন্ধন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির সংযোগ গ্রহণ এবং মার্চেন্ট মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব চালুর ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।
একই সঙ্গে বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মোবাইল আর্থিক সেবাকে ই-ভ্যাট ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ব্যবসায়িক লেনদেন ও ভ্যাট পরিশোধের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
ফিরছে সহজীকৃত ভ্যাট ব্যবস্থা
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন নামে ফিরছে পুরোনো ‘প্যাকেজ ভ্যাট’। এবার এর নাম প্রস্তাব করা হয়েছে ‘সুনির্দিষ্ট ভ্যাট’। এই ব্যবস্থায় জটিল হিসাবরক্ষণ বা মাসিক রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। নির্ধারিত অঙ্কের ভ্যাট জমা দিলেই সেটি রিটার্ন হিসেবে গণ্য হবে।
এনবিআর পরীক্ষামূলকভাবে বছরে মাত্র এক হাজার টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাট চালুর বিষয়ও বিবেচনা করছে। ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক টার্নওভার থাকা ব্যবসাগুলো এই সুবিধার আওতায় আসতে পারে। তবে ব্যবসায়ী মহলের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই হার ধীরে ধীরে বাড়ানো হতে পারে।

যেসব পণ্যের দাম বাড়তে পারে
রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে কয়েকটি পণ্যে বিদ্যমান ভ্যাট সুবিধা প্রত্যাহারের চিন্তা করছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের আসবাবপত্র, প্লাস্টিকের তৈজসপত্র, ফ্রিজ এবং এয়ার কন্ডিশনার।
বর্তমানে এসব পণ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট থাকলেও তা বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হতে পারে। ব্যবসায়ীদের মতে, এতে একটি ফ্রিজের দাম ২ থেকে ৩ হাজার টাকা এবং একটি এসির দাম ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
নির্মাণ খাতেও বাড়তে পারে চাপ
এমএস রড ও অন্যান্য স্টিলজাত পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট কর বাড়ানোর চিন্তাও করছে এনবিআর। যদিও সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এতে প্রতি টনে অতিরিক্ত ব্যয় খুব সীমিত থাকবে। কিন্তু উদ্যোক্তাদের মতে, চাহিদা সংকটে থাকা নির্মাণ খাতের ওপর এটি নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
কিছু পরিবেশবান্ধব পণ্যে স্বস্তি
অন্যদিকে সুপারির খোল, হোগলা পাতা এবং মাটির তৈরি বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব পণ্যে বর্তমানে থাকা ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের চিন্তাও রয়েছে। উদ্যোক্তাদের আশা, এতে পরিবেশবান্ধব শিল্পে বিনিয়োগ বাড়তে পারে এবং নতুন বাজার তৈরি হবে।
রাজস্ব বনাম জনস্বস্তি
চলতি অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে শুধু ভ্যাট থেকেই ২ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকার বেশি আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। আর এনবিআরের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব বৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও একই সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মূল্যস্ফীতির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ ভ্যাট এমন একটি কর, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর। ফলে নতুন বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এবং জনগণের স্বস্তির প্রত্যাশার মধ্যে সরকার কতটা ভারসাম্য রাখতে পারে, সেটিই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















