মানুষের শরীরের ভেতরে কী ঘটছে, তা জানতে এতদিন চিকিৎসকদের ভরসা ছিল নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও জটিল প্রক্রিয়ার ওপর। তবে এখন এমন এক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চলছে, যা গিলে খাওয়া যাবে এবং সেটিই শরীরের ভেতর থেকে সরাসরি তথ্য পাঠাবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি রোগ শনাক্তকরণ, ওষুধ সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
অন্ত্রের ভেতরের তথ্য জানাবে ক্ষুদ্র ক্যাপসুল
বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের গবেষকেরা এমন একটি ক্ষুদ্র ক্যাপসুল তৈরি করেছেন, যা মানুষের পরিপাকতন্ত্রের ভেতর দিয়ে চলার সময় নিয়মিত রাসায়নিক তথ্য সংগ্রহ করে। এই ক্যাপসুল প্রতি ২০ সেকেন্ডে একটি করে পরিমাপ নিয়ে বাইরে থাকা গ্রহণযন্ত্রে তথ্য পাঠায়। এর মাধ্যমে অন্ত্রে প্রদাহ, টিস্যুর ক্ষতি কিংবা রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে।
গবেষকেরা বর্তমানে অন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ ও কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ওপর এই প্রযুক্তি পরীক্ষা করছেন। তাদের আশা, ভবিষ্যতে এটি রোগ নির্ণয়কে আরও সহজ ও কম কষ্টদায়ক করে তুলবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তি
মানুষের অন্ত্রে অসংখ্য অণুজীব বাস করে, যাদের কার্যকলাপ শরীরের স্বাস্থ্যের নানা সংকেত বহন করে। কিন্তু এই তথ্য সংগ্রহ করা সবসময় সহজ নয়। বর্তমানে ব্যবহৃত এন্ডোস্কোপি বা কোলনোস্কোপির মতো পদ্ধতি অনেকের জন্য অস্বস্তিকর এবং ব্যয়বহুল। নতুন ধরনের গিলতে পারা যন্ত্রগুলো অন্ত্রের ভেতরের গ্যাস, অম্লতা, প্রদাহজনিত পরিবর্তন এবং ব্যাকটেরিয়ার কার্যকলাপ সম্পর্কে সরাসরি তথ্য দিতে পারে।
কিছু গবেষণায় এমন ক্যাপসুলও তৈরি হয়েছে, যা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত করতে পারে। বিশেষ করে পাকস্থলীর আলসার ও কিছু ধরনের ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত জীবাণু শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

রোগ শনাক্তের পাশাপাশি চিকিৎসাও
গবেষকদের লক্ষ্য শুধু রোগ শনাক্ত করা নয়, একই সঙ্গে রোগের অবস্থান নির্ধারণ করে সেখানে সরাসরি ওষুধ পৌঁছে দেওয়া। এতে শরীরের অন্য অংশে অপ্রয়োজনীয় ওষুধের প্রভাব কমবে এবং চিকিৎসা আরও কার্যকর হতে পারে। কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এমন ক্যাপসুল তৈরির কাজ চলছে, যা অন্ত্রের নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ প্রয়োগ করতে সক্ষম হবে।
খাবার থেকেই তৈরি হচ্ছে ব্যাটারি
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিদ্যুৎ সরবরাহ। প্রচলিত ব্যাটারি শরীরের জন্য সবসময় উপযোগী নয়। তাই ইতালির গবেষকেরা খাদ্য উপাদান ব্যবহার করে ভক্ষণযোগ্য ব্যাটারি তৈরি করেছেন। এতে ভিটামিন, সামুদ্রিক শৈবাল, মৌমাছির মোম এবং অন্যান্য খাদ্যনিরাপদ উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। পরে তারা খাদ্য উপযোগী ট্রানজিস্টরও তৈরি করতে সক্ষম হন, যা ইলেকট্রনিক সার্কিটের মৌলিক অংশ হিসেবে কাজ করে।
সামনে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ
যদিও প্রযুক্তিটি আশাব্যঞ্জক, তবু এখনও অনেক বাধা রয়ে গেছে। ভক্ষণযোগ্য ব্যাটারির শক্তি সীমিত, খাদ্যভিত্তিক ইলেকট্রনিক উপাদান তুলনামূলক ধীর এবং শরীরের ভেতর থেকে বেতার সংকেত পাঠানোও সহজ নয়। এছাড়া একই যন্ত্র যদি খাদ্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক যন্ত্র এবং ওষুধ সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে, তাহলে নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের বিষয়টিও জটিল হয়ে ওঠে।
তবু বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, আগামী দিনের চিকিৎসাবিজ্ঞানে অন্ত্রের ভেতর থেকে সরাসরি তথ্য পাওয়ার যুগ খুব বেশি দূরে নয়। একসময় হয়তো শরীরের ভেতর কী ঘটছে, তা জানতে শুধু একটি ছোট ক্যাপসুল গিলেই যথেষ্ট হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















