১২:১৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬
হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণার হুমকি ট্রাম্পের দশম বার্ষিকীর দোরগোড়ায় ব্ল্যাকপিঙ্ক, তবু হতাশ ভক্তরা তাইওয়ানে ‘মেবি হ্যাপি এন্ডিং’-এর সাফল্য, ৯৭.৫ শতাংশ দর্শক উপস্থিতি আট বছর পর সিউলে ফিরছেন অঙ্গবাদক দম্পতি অলিভিয়ার লাত্রি ও লি শিন-ইয়ং কোরিয়ার শাস্ত্রীয় সংগীতে নতুন প্রজন্মের ঝলক, অভিষেক কনসার্টে মঞ্চ মাতাবেন তরুণ প্রতিভারা মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে চমক, দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শেয়ারে ধসের আবহে ভারতীয় পুঁজিবাজারে ফিরছেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চীনের পণ্য ঘুরপথে আমেরিকায়, বছরে হারাচ্ছে হাজার কোটি ডলার: হোয়াইট হাউস ভারতের ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি নিয়ে নতুন প্রশ্ন, বাড়ছে গাড়ির মালিকদের উদ্বেগ তাইওয়ানের সামরিক মহড়ায় নতুন বার্তা, চীনের অবরোধ মোকাবিলায় বাস্তব প্রস্তুতি জোরদার

বাঙালি জাতির শোক দিবস ও ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বাঙালি জাতির শোক দিবস। আর একজনও যদি বাঙালিত্বকে ধারণ করেন তিনি এ শোক দিবস পালন করবেন। তাই কোনো বাঙালি যদি এই শোক দিবস পালন না করে সে কোনো মতেই বাঙালি নয়। কারণ, ১৯৭৫ সালের পনেরো আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার অর্থ শুধু এই নয় যে বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা। বাংলাদেশের সংবিধান হত্যা করে পাকিস্তানি অনুকরণের সংবিধান তৈরি করা। তার থেকেও বড় হলো ১৯৭৫ সালের পনেরো আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ভেতর দিয়ে বাঙালি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে হত্যা করার কাজটি শুরু করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামক মানুষটি মূলত তার জীবনের ২২ বছরের বেশি সময়ের সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিকে পৃথিবীর বুকে তার নিজস্ব সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্যে, বিকশিত করার জন্যে, ঐতিহ্যভিত্তিক সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেবার জন্যে- সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক একটি রাষ্ট্র বাংলার অর্ধেক ভূখণ্ডে সৃষ্টি করেছিলেন। যে রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে বাঙালি একদিন সত্যি অর্থে নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়ে একটি বিকশিত বাঙালি জাতি হয়ে উঠতে পারতো। এবং ভবিষ্যতে বাঙালির আরো বিস্তার হতে পারতো। নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর দাঁড়ানো জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র আর কনসেপচুয়াল জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য হলো- একটি হাজার বছরের ঐতিহ্য বা নিজস্ব ভূমির ওপর দাঁড়ানো অন্যটি একটি মতবাদের ওপর দাঁড়ানো। যেমন কমিউনিজম একটি মতবাদ। এই মতবাদের ওপর ভিত্তি করে বিশাল শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে উঠেছিলো। এক পর্যায়ে তা শেষ হয়ে গেছে। ধর্মীয় আদর্শগুলোও মতবাদ। তাই তার বিস্তার ঘটে কিন্তু শিকড় তৈরি হয় না। সংস্কৃতি কোনো মতবাদ নয়, ভূখণ্ডের হাজার হাজার বছরের কর্ষণ বা ভাঙাগড়া থেকে কৃষ্টি বা সংস্কৃতি। এ ভূমিজাত। তাই একমাত্র সংস্কৃতিরই শিকড় থাকে ভূমিতে।

এই ভূমিজাত বাঙালি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে ৪০ হাজার বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা একটি সংস্কৃতির আচরণে আবৃত নরগোষ্ঠীর জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি রাষ্ট্র তৈরি করেননি, তিনি তাদেরকে বাঙালি জাতি নামে একসূত্রে বেঁধেছিলেন- তাই তিনি বাঙালির জাতির পিতা। এ কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে যে কোনো বাঙালি- পৃথিবীর যেকোনো ভূখণ্ডে বসেই স্মরণ করতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ | শিরোনাম | বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা  (বাসস)

দুর্ভাগ্য হলো ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কোনো বিচ্ছিন্ন আততায়ী হত্যা করেনি। এ হত্যাকাণ্ড ছিলো সংস্কৃতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রটি যাতে গড়ে না ওঠে, বিকশিত না হয় তার ওপর একটি সুপরিকল্পিত আঘাত। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা শুধু একটি ক্ষমতার পটপরিবর্তন নয়, একটি রাজনৈতিক পট পরিবর্তন নয়, বাস্তবে এ ছিলো পৃথিবীতে আপন সংস্কৃতিতে বিকশিত হওয়া একটি নরগোষ্ঠীর নিজস্ব রাষ্ট্রে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের পথে যাত্রাকে স্তব্ধ করে দেওয়া। এ কারণে, যদি কেউ বাঙালি হন, পনেরো আগস্ট তার জন্য শুধু শোক দিবস নয়, একটি কালো দিবসও।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে ও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি সৃষ্টির ভেতর দিয়ে কি বাঙালি সংস্কৃতিভিত্তিক জাতি ও রাষ্ট্র গঠিত হবার কাজটি শেষ হয়েছিলো ? মোটেই নয়। শুরু হয়েছিলো মাত্র। পৃথিবীতে যে কোনো পরিবর্তনের বা বিবর্তনের শুরুটাই সব থেকে বড়। আর যখন শুরু হয় তখন তার পরিপূর্ণতা থাকে না। সর্বোপরি সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র একটি জীবন্ত বা চলমান বিষয়- এ কোন রাজনৈতিক মতবাদ ও ধর্মীয় মতবাদের মতো নির্ধারিত বিষয় নয়। রাজনৈতিক মতবাদ, ধর্মীয় মতবাদ এগুলো রবীন্দ্রনাথের অচলায়তনের মতো। সেখানেও সবকিছু ঠিকঠাক মতো চলে, অভাব শুধু- নতুন আলো আসে না, নতুন প্রাণের সৃষ্টি হয় না। নতুন আলো আসার জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়। অন্যদিকে, সংস্কৃতিতে প্রতিদিন সূর্য ওঠে, প্রতিদিন সে নতুন অঙ্কুরের মতো নতুন সূর্যের আলোয় স্নান করে নিজেকে পাতা বা কুড়িতে পরিণত করার জন্যে আলোর দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। তাই সংস্কৃতি নির্ভর মানুষের প্রকৃতিই হলো মাথাকে প্রতি মুহূর্তে উঁচু করা। আর মতবাদ নির্ভর মানুষের প্রকৃতি হলো অচলায়তনের নিয়ম অনুযায়ী মাথা নত করা।

এ কারণে মতবাদ নির্ভর রাষ্ট্রগুলো আধুনিক রাষ্ট্র হলেও অতীতের যে কোনো সাম্রাজ্যের থেকে তার চরিত্রের কোনো পার্থক্য থাকে না। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বাংলাদেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান কি সেই পার্থক্য তৈরি করতে পেরেছিলেন। না। পারেননি। সে সময়ও তিনি পাননি। আর তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনা কাল বা জীবন দীর্ঘ হলেও যে পার্থক্যটা সুস্পষ্ট হতো তাও নয়। কারণ, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে ওই নরগোষ্ঠীকে একটি দীর্ঘ পথ পরিক্রমার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। অনেকটা বিবর্তনবাদের ভেতর দিয়ে আধুনিক মানুষ হয়ে উঠার মতো। মানুষকে প্রাকৃতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ হয়ে উঠতে যেমন লক্ষ লক্ষ বছর সময় লেগেছে। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র হয়ে উঠতেও তেমনি কয়েক শত বছরের প্রয়োজন।

ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর জীবনী

সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গড়ে ওঠার শুরুতে তারও সবটুকু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ থাকে না। বাংলাদেশেরও ছিলো না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সেক্যুলারইজম এগুলো ছিলো আবার তার সঙ্গে ছিলো হাজার বছর ধরে রাজার রাষ্ট্রের স্বার্থে সৃষ্ট বা রাষ্ট্র তৈরির স্বার্থে সৃষ্ট ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রথাগত ঈশ্বরভিত্তিক ধর্মীয় আচরণ। কিন্তু মৌলিক পার্থক্যটা ছিলো বাংলাদেশের সৃষ্টি ও মুক্তিসংগ্রামের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্বে ছিলো সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের পথে যাত্রা। যে কারণে রাষ্ট্র সৃষ্টির নেতৃত্বে, সংগ্রামে, যুদ্ধে এবং পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনায় এই সকল মত ও আচরণের মানুষ ছিলো। এর প্রভাবও ছিলো। তাই অন্য আচরণ বা মতবাদ সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব না মেনে চললে সেখানে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের দ্রুত কম শক্তিমান হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। কারণ সমাজতন্ত্র, প্রথাগত ধর্মীয় আচরণভিত্তিক শক্তি যতটা যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে তার থেকে অন্ধ বিশ্বাসের ওপর অনেক বেশি দাঁড়িয়ে। তাই এদের যে কোনো মুহূর্তে সাংস্কৃতিক জাতীয়বাদের পক্ষ থেকে সরে যাবার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে সেক্যুলারইজম মূলত সব সংস্কৃতিরই অংশ। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ বিকশিত হলে সেখানে আর আলাদা করে সেক্যুলারইজমের পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজন পড়ে না।

অন্যদিকে পৃথিবীতে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের সহায়ক রাষ্ট্রও কম। তার ওপরে বঙ্গবন্ধুর সময়ে পৃথিবী জুড়ে প্রথাগত ধর্মীয় অন্ধত্বের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের নামেও অন্ধত্ব’র সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিলো। তাই নেতা বঙ্গবন্ধু ও তার নেতৃত্বে তৈরি বাঙালি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রটির টিকে থাকার পারিপার্শ্বিকতাও কম ছিলো। ওই সময়ে দুই পরাশক্তির পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক খেলার বাইরে এটাও ছিলো বড় একটা সমস্যা। যে কারণে ১৯৭২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে সৈয়দ মুজতবা আলীকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি নির্ভর করছে ভারত ও পাকিস্তান কতটা সেক্যুলার হতে পারবে তার ওপর। বাস্তবতা সকলেই জানে- ১৯৪৬ থেকে ১৯৭২ এর ভেতর এই উপমহাদেশ আর কতটুকুই বা সেক্যুলার হতে পেরেছিলো! তবুও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্র ও ইন্দিরা গান্ধীর সেক্যুলার গণতন্ত্রের পথে যাত্রাকে এগিয়ে নেবার জন্য ওই সময়ে এই দুই নেতা কিন্তু বুঝেছিলেন, এই উপমহাদেশ জুড়ে অন্তত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এ কারণে দুই নেতার প্রথম চেষ্টা ছিলো- যেন সামরিক বাহিনীর আধিপত্য না আসে রাজনীতিতে। কারণ, দুই পরাশক্তির ওই বিশ্বে একদিকে যেমন সমাজতান্ত্রিক মতবাদ ছিলো- অন্যদিকে অপর পরাশক্তি রাজনৈতিক শক্তির বিপরীতে সামরিক শক্তিকে তখন দেশে দেশে রাজনীতিতে নিয়ে এসেছে এবং রাজনৈতিক নেতাদের বিপরীতে অনেক সামরিক নেতাকে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছে। এ কারণে রাজনীতিতে সমাজতান্ত্রিক মতবাদ আসাতে যেমন রাজনীতির ও রাষ্ট্রের একটা স্বাভাবিক কালচার নষ্ট হয়েছে। তেমনি সামরিক বাহিনী বিভিন্ন দেশে রাজনীতিতে আসায় ওই সব দেশের রাজনীতির স্বাভাবিক কালচারের সঙ্গে সামরিক কালচার বা ভিন্ন ধরনের কালচার যোগ হয়েছে। যা রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর, আরো বেশি ক্ষতিকর একটি ঐতিহ্য নির্ভর, সংস্কৃতি ও বোধভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের জন্য। ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র ১০ বছরের ভেতর পাকিস্তানে সরাসরি সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসে। তাই পাকিস্তানের রাজনীতিতে ততদিনে সামরিক কালচার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে যে বাংলাদেশ হয়েছে- সেখানে পাকিস্তানি ওই সামরিক কালচার রাজনীতিতে এবং সাধারণ মানুষের মগজের একটি অংশ দখল করে আছে। একারণে, বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও সেখানে সামরিক বাহিনীর রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ছিলো অনেকগুলো বড় সম্ভাব্য বিষয়ের একটি। যে কারণে ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফরে এলে ইন্দিরা-মুজিবের একান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিলো পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভূট্টোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার বিষয়টি। দুজনেই একমত হয়েছিলেন, ভূট্টোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখলে, পাকিস্তানে গণতন্ত্র থাকলে- বাংলাদেশে সামরিক শাসন ফিরে আসার আশঙ্কা কমে যাবে। যার ফলই ১৯৭৩-এ সিমলা চুক্তিতে ইন্দিরা গান্ধীর উদার হওয়া ও বঙ্গবন্ধুর নীরব সমর্থন। পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের ফেরত নিয়ে ভূট্টোকে সেনাবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটা সুযোগ তৈরি করে দেয়া।

১১ বছর পর জুলফিকার আলী ভুট্টো হত্যা মামলার শুনানি পুনরায় শুরু

কিন্তু দ্রুত ভূট্টো তার অবস্থান বদলাতে থাকেন। ইন্দিরা গান্ধী সিমলা চুক্তির কয়েক মাস পরেই তা বুঝতে পারেন, ভূট্টোর বাংলাদেশ সফরের পরেই বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন। কিন্তু ততদিনে  রাজনীতির মাঠে ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু দুজনেই আগের আধিপত্য অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছেন। যার ফলে সেই ভূট্টোই হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার সামরিক বাহিনী ফিরিয়ে আনার ও বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করানোর অন্যতম আন্তর্জাতিক কুশীলব। কিন্তু ভূট্টো জানতেন না ইন্দিরা গান্ধী এবং বঙ্গবন্ধু তাকে যা বলেছিলেন সেটাই সত্য প্রমাণিত হবে। ওই শক্তি ভূট্টোকেও ক্ষমা করবে না। তাঁর মেয়েকেও প্রাণ দিতে হয়েছে।

তাই দেখা যায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর হত্যার ভেতর দিয়ে যেমন আবার ধর্মীয় আচরণভিত্তিক জাতীয়তাবাদ যা মূলত ধর্মের মোড়ক এবং সামরিক ও বেসামরিক অস্ত্রের মাধ্যমে সৃষ্ট—সেটাই আবার ফিরে আসে রাষ্ট্র ক্ষমতায়। পাকিস্তানে ভূট্টো নিজে ক্ষমতায় থেকেই ওই পথে যাত্রা করে। অন্যদিকে ভারতেও সেক্যুলারইজম দুর্বল হতে শুরু করে। আর বঙ্গবন্ধু তো বলেছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ টিকে থাকা নির্ভর করবে উপমহাদেশের অন্য দুই দেশে সেক্যুলারইজম কতটা শক্তিশালী হয় তার ওপর। কিন্তু সেখানে শক্তিশালীর বদলে দুর্বল হতে থাকে। তার ফলে ১৯৭৫-এর পর থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশে অনেকগুলো নদীর একটি হয়ে যায়। এবং ১৯৯১-এ দেখা যায়, শুধু আওয়ামী লীগ নয় বাংলাদেশের বামদলগুলোও ধর্মীয় আচরণকে রাজনীতির অঙ্গ করে নিয়েছে। এমনকি ১৯৯১ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যা দিবসটি পালনও চলে যায় অনেকটা ধর্মীয় আচরণের মধ্যে- সেখানে রাজনীতি পিছে পড়ে যায়, সংস্কৃতি ফিকে হয়ে যায়। এ কারণে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় ফিরলেও সংস্কৃতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মূল স্রোত করা রাষ্ট্র ও সমাজে আর সম্ভব হয়নি। তাছাড়া ততদিনে শুধু উপমহাদেশে নয় পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় আচরণের রাজনীতির দোর্দণ্ড প্রতাপ শুরু হয়েছে। এবং সংস্কৃতিভিত্তিক রাজনীতির নানান আপোস চোখে পড়তে থাকে। এই পরিবেশে বসে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট অবধি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেও বাঙালি সংস্কৃতিকে বেগবান করা হয়নি রাষ্ট্রীয়ভাবে। অন্যদিকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির আনুকূল্য ছাড়া ষাটের দশকে বাংলাদেশে যারা বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন, সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদের পথ তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন ওই মাপের সংস্কৃতজন অর্থাৎ ৪০ ও ৫০ দশকের সেই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবীদের মতো নির্লোভ ও জ্ঞানীজন ততদিনে বাংলাদেশ থেকে প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। তাই রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরেও বাঙালি সংস্কৃতির নদীটি বেগবান করার কাজটি কেউই করেনি। সকলে সরকারের আনুকূল্যের জন্যে ব্যস্ত ছিলো।

Sayed Farooq-ur-Rahman - Wikipedia

এই দুর্বলতার সুযোগটিই নিয়েছে ১৯৭৫-এর পনেরো আগস্টের কর্নেল ফারুক-রশীদ গোষ্ঠীর মতো ২০২৪-এর ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইন গোষ্ঠী। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সময় ও তারিখটি ছাড়া অন্য কোনো পার্থক্য নেই। যার ফলে এবারের পনের আগস্ট যখন এসেছে সে সময়ে, সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান তো আছেই এর সঙ্গে রক্তে কেনা বাংলা ভাষাটিও আজ নষ্ট। অশ্লীলতাই এখন সম্মানিত।

তাই এবারের পনের আগস্টে বাঙালি জাতির জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতায় আর কত বার কত দ্রুত পরিবর্তন হবে তার থেকেও অনেক গুরুত্বপূ হতে হবে, বাঙালি সংস্কৃতিকে বাঁচানো ও বেগবান করা। নইলে ভবিষ্যতের ইতিহাসে বাঙালিকে ডোডো পাখির মতই খুঁজতে হবে। আর একমাত্র বাঙালি সংস্কৃতির মাধ্যমেই বার বার আগস্টের এই ষড়যন্ত্রের পথকে বন্ধ করা যাবে- অন্য কোনো পথে নয়। অন্য কারও বাহুর শক্তিতেও নয়।

EXCLUSIVE: Bangladesh's high growth under ousted PM Hasina was 'fake', Yunus  says | Reuters

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The present World.

জনপ্রিয় সংবাদ

হরমুজ প্রণালীকে মার্কিন ভূখণ্ড ঘোষণার হুমকি ট্রাম্পের

বাঙালি জাতির শোক দিবস ও ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৫ আগস্ট ২০২৪

১১:০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ বাঙালি জাতির শোক দিবস। আর একজনও যদি বাঙালিত্বকে ধারণ করেন তিনি এ শোক দিবস পালন করবেন। তাই কোনো বাঙালি যদি এই শোক দিবস পালন না করে সে কোনো মতেই বাঙালি নয়। কারণ, ১৯৭৫ সালের পনেরো আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার অর্থ শুধু এই নয় যে বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা। বাংলাদেশের সংবিধান হত্যা করে পাকিস্তানি অনুকরণের সংবিধান তৈরি করা। তার থেকেও বড় হলো ১৯৭৫ সালের পনেরো আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার ভেতর দিয়ে বাঙালি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে হত্যা করার কাজটি শুরু করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামক মানুষটি মূলত তার জীবনের ২২ বছরের বেশি সময়ের সংগ্রামের ভেতর দিয়ে বাঙালি জাতিকে পৃথিবীর বুকে তার নিজস্ব সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্যে, বিকশিত করার জন্যে, ঐতিহ্যভিত্তিক সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেবার জন্যে- সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক একটি রাষ্ট্র বাংলার অর্ধেক ভূখণ্ডে সৃষ্টি করেছিলেন। যে রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে বাঙালি একদিন সত্যি অর্থে নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়ে একটি বিকশিত বাঙালি জাতি হয়ে উঠতে পারতো। এবং ভবিষ্যতে বাঙালির আরো বিস্তার হতে পারতো। নিজস্ব সংস্কৃতির ওপর দাঁড়ানো জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র আর কনসেপচুয়াল জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য হলো- একটি হাজার বছরের ঐতিহ্য বা নিজস্ব ভূমির ওপর দাঁড়ানো অন্যটি একটি মতবাদের ওপর দাঁড়ানো। যেমন কমিউনিজম একটি মতবাদ। এই মতবাদের ওপর ভিত্তি করে বিশাল শক্তিশালী সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে উঠেছিলো। এক পর্যায়ে তা শেষ হয়ে গেছে। ধর্মীয় আদর্শগুলোও মতবাদ। তাই তার বিস্তার ঘটে কিন্তু শিকড় তৈরি হয় না। সংস্কৃতি কোনো মতবাদ নয়, ভূখণ্ডের হাজার হাজার বছরের কর্ষণ বা ভাঙাগড়া থেকে কৃষ্টি বা সংস্কৃতি। এ ভূমিজাত। তাই একমাত্র সংস্কৃতিরই শিকড় থাকে ভূমিতে।

এই ভূমিজাত বাঙালি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে ভিত্তি করে ৪০ হাজার বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা একটি সংস্কৃতির আচরণে আবৃত নরগোষ্ঠীর জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি রাষ্ট্র তৈরি করেননি, তিনি তাদেরকে বাঙালি জাতি নামে একসূত্রে বেঁধেছিলেন- তাই তিনি বাঙালির জাতির পিতা। এ কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে যে কোনো বাঙালি- পৃথিবীর যেকোনো ভূখণ্ডে বসেই স্মরণ করতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ | শিরোনাম | বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা  (বাসস)

দুর্ভাগ্য হলো ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কোনো বিচ্ছিন্ন আততায়ী হত্যা করেনি। এ হত্যাকাণ্ড ছিলো সংস্কৃতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রটি যাতে গড়ে না ওঠে, বিকশিত না হয় তার ওপর একটি সুপরিকল্পিত আঘাত। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা শুধু একটি ক্ষমতার পটপরিবর্তন নয়, একটি রাজনৈতিক পট পরিবর্তন নয়, বাস্তবে এ ছিলো পৃথিবীতে আপন সংস্কৃতিতে বিকশিত হওয়া একটি নরগোষ্ঠীর নিজস্ব রাষ্ট্রে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের পথে যাত্রাকে স্তব্ধ করে দেওয়া। এ কারণে, যদি কেউ বাঙালি হন, পনেরো আগস্ট তার জন্য শুধু শোক দিবস নয়, একটি কালো দিবসও।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে ও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি সৃষ্টির ভেতর দিয়ে কি বাঙালি সংস্কৃতিভিত্তিক জাতি ও রাষ্ট্র গঠিত হবার কাজটি শেষ হয়েছিলো ? মোটেই নয়। শুরু হয়েছিলো মাত্র। পৃথিবীতে যে কোনো পরিবর্তনের বা বিবর্তনের শুরুটাই সব থেকে বড়। আর যখন শুরু হয় তখন তার পরিপূর্ণতা থাকে না। সর্বোপরি সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র একটি জীবন্ত বা চলমান বিষয়- এ কোন রাজনৈতিক মতবাদ ও ধর্মীয় মতবাদের মতো নির্ধারিত বিষয় নয়। রাজনৈতিক মতবাদ, ধর্মীয় মতবাদ এগুলো রবীন্দ্রনাথের অচলায়তনের মতো। সেখানেও সবকিছু ঠিকঠাক মতো চলে, অভাব শুধু- নতুন আলো আসে না, নতুন প্রাণের সৃষ্টি হয় না। নতুন আলো আসার জানালা বন্ধ করে রাখতে হয়। অন্যদিকে, সংস্কৃতিতে প্রতিদিন সূর্য ওঠে, প্রতিদিন সে নতুন অঙ্কুরের মতো নতুন সূর্যের আলোয় স্নান করে নিজেকে পাতা বা কুড়িতে পরিণত করার জন্যে আলোর দিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। তাই সংস্কৃতি নির্ভর মানুষের প্রকৃতিই হলো মাথাকে প্রতি মুহূর্তে উঁচু করা। আর মতবাদ নির্ভর মানুষের প্রকৃতি হলো অচলায়তনের নিয়ম অনুযায়ী মাথা নত করা।

এ কারণে মতবাদ নির্ভর রাষ্ট্রগুলো আধুনিক রাষ্ট্র হলেও অতীতের যে কোনো সাম্রাজ্যের থেকে তার চরিত্রের কোনো পার্থক্য থাকে না। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বাংলাদেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান কি সেই পার্থক্য তৈরি করতে পেরেছিলেন। না। পারেননি। সে সময়ও তিনি পাননি। আর তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনা কাল বা জীবন দীর্ঘ হলেও যে পার্থক্যটা সুস্পষ্ট হতো তাও নয়। কারণ, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে ওই নরগোষ্ঠীকে একটি দীর্ঘ পথ পরিক্রমার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। অনেকটা বিবর্তনবাদের ভেতর দিয়ে আধুনিক মানুষ হয়ে উঠার মতো। মানুষকে প্রাকৃতিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষ হয়ে উঠতে যেমন লক্ষ লক্ষ বছর সময় লেগেছে। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র হয়ে উঠতেও তেমনি কয়েক শত বছরের প্রয়োজন।

ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর জীবনী

সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গড়ে ওঠার শুরুতে তারও সবটুকু সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ থাকে না। বাংলাদেশেরও ছিলো না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, সেক্যুলারইজম এগুলো ছিলো আবার তার সঙ্গে ছিলো হাজার বছর ধরে রাজার রাষ্ট্রের স্বার্থে সৃষ্ট বা রাষ্ট্র তৈরির স্বার্থে সৃষ্ট ভিন্ন ভিন্ন ধরনের প্রথাগত ঈশ্বরভিত্তিক ধর্মীয় আচরণ। কিন্তু মৌলিক পার্থক্যটা ছিলো বাংলাদেশের সৃষ্টি ও মুক্তিসংগ্রামের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্বে ছিলো সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের পথে যাত্রা। যে কারণে রাষ্ট্র সৃষ্টির নেতৃত্বে, সংগ্রামে, যুদ্ধে এবং পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনায় এই সকল মত ও আচরণের মানুষ ছিলো। এর প্রভাবও ছিলো। তাই অন্য আচরণ বা মতবাদ সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব না মেনে চললে সেখানে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের দ্রুত কম শক্তিমান হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। কারণ সমাজতন্ত্র, প্রথাগত ধর্মীয় আচরণভিত্তিক শক্তি যতটা যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে তার থেকে অন্ধ বিশ্বাসের ওপর অনেক বেশি দাঁড়িয়ে। তাই এদের যে কোনো মুহূর্তে সাংস্কৃতিক জাতীয়বাদের পক্ষ থেকে সরে যাবার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে সেক্যুলারইজম মূলত সব সংস্কৃতিরই অংশ। সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ বিকশিত হলে সেখানে আর আলাদা করে সেক্যুলারইজমের পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজন পড়ে না।

অন্যদিকে পৃথিবীতে সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের সহায়ক রাষ্ট্রও কম। তার ওপরে বঙ্গবন্ধুর সময়ে পৃথিবী জুড়ে প্রথাগত ধর্মীয় অন্ধত্বের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের নামেও অন্ধত্ব’র সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিলো। তাই নেতা বঙ্গবন্ধু ও তার নেতৃত্বে তৈরি বাঙালি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রটির টিকে থাকার পারিপার্শ্বিকতাও কম ছিলো। ওই সময়ে দুই পরাশক্তির পৃথিবীর ভূ-রাজনৈতিক খেলার বাইরে এটাও ছিলো বড় একটা সমস্যা। যে কারণে ১৯৭২ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে সৈয়দ মুজতবা আলীকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সব থেকে বেশি নির্ভর করছে ভারত ও পাকিস্তান কতটা সেক্যুলার হতে পারবে তার ওপর। বাস্তবতা সকলেই জানে- ১৯৪৬ থেকে ১৯৭২ এর ভেতর এই উপমহাদেশ আর কতটুকুই বা সেক্যুলার হতে পেরেছিলো! তবুও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্র ও ইন্দিরা গান্ধীর সেক্যুলার গণতন্ত্রের পথে যাত্রাকে এগিয়ে নেবার জন্য ওই সময়ে এই দুই নেতা কিন্তু বুঝেছিলেন, এই উপমহাদেশ জুড়ে অন্তত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এ কারণে দুই নেতার প্রথম চেষ্টা ছিলো- যেন সামরিক বাহিনীর আধিপত্য না আসে রাজনীতিতে। কারণ, দুই পরাশক্তির ওই বিশ্বে একদিকে যেমন সমাজতান্ত্রিক মতবাদ ছিলো- অন্যদিকে অপর পরাশক্তি রাজনৈতিক শক্তির বিপরীতে সামরিক শক্তিকে তখন দেশে দেশে রাজনীতিতে নিয়ে এসেছে এবং রাজনৈতিক নেতাদের বিপরীতে অনেক সামরিক নেতাকে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছে। এ কারণে রাজনীতিতে সমাজতান্ত্রিক মতবাদ আসাতে যেমন রাজনীতির ও রাষ্ট্রের একটা স্বাভাবিক কালচার নষ্ট হয়েছে। তেমনি সামরিক বাহিনী বিভিন্ন দেশে রাজনীতিতে আসায় ওই সব দেশের রাজনীতির স্বাভাবিক কালচারের সঙ্গে সামরিক কালচার বা ভিন্ন ধরনের কালচার যোগ হয়েছে। যা রাজনীতির জন্য ক্ষতিকর, আরো বেশি ক্ষতিকর একটি ঐতিহ্য নির্ভর, সংস্কৃতি ও বোধভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের জন্য। ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র ১০ বছরের ভেতর পাকিস্তানে সরাসরি সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসে। তাই পাকিস্তানের রাজনীতিতে ততদিনে সামরিক কালচার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে যে বাংলাদেশ হয়েছে- সেখানে পাকিস্তানি ওই সামরিক কালচার রাজনীতিতে এবং সাধারণ মানুষের মগজের একটি অংশ দখল করে আছে। একারণে, বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও, সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও সেখানে সামরিক বাহিনীর রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ ছিলো অনেকগুলো বড় সম্ভাব্য বিষয়ের একটি। যে কারণে ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফরে এলে ইন্দিরা-মুজিবের একান্ত আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি ছিলো পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভূট্টোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার বিষয়টি। দুজনেই একমত হয়েছিলেন, ভূট্টোকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখলে, পাকিস্তানে গণতন্ত্র থাকলে- বাংলাদেশে সামরিক শাসন ফিরে আসার আশঙ্কা কমে যাবে। যার ফলই ১৯৭৩-এ সিমলা চুক্তিতে ইন্দিরা গান্ধীর উদার হওয়া ও বঙ্গবন্ধুর নীরব সমর্থন। পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের ফেরত নিয়ে ভূট্টোকে সেনাবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটা সুযোগ তৈরি করে দেয়া।

১১ বছর পর জুলফিকার আলী ভুট্টো হত্যা মামলার শুনানি পুনরায় শুরু

কিন্তু দ্রুত ভূট্টো তার অবস্থান বদলাতে থাকেন। ইন্দিরা গান্ধী সিমলা চুক্তির কয়েক মাস পরেই তা বুঝতে পারেন, ভূট্টোর বাংলাদেশ সফরের পরেই বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন। কিন্তু ততদিনে  রাজনীতির মাঠে ইন্দিরা গান্ধী ও বঙ্গবন্ধু দুজনেই আগের আধিপত্য অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছেন। যার ফলে সেই ভূট্টোই হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার সামরিক বাহিনী ফিরিয়ে আনার ও বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করানোর অন্যতম আন্তর্জাতিক কুশীলব। কিন্তু ভূট্টো জানতেন না ইন্দিরা গান্ধী এবং বঙ্গবন্ধু তাকে যা বলেছিলেন সেটাই সত্য প্রমাণিত হবে। ওই শক্তি ভূট্টোকেও ক্ষমা করবে না। তাঁর মেয়েকেও প্রাণ দিতে হয়েছে।

তাই দেখা যায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর হত্যার ভেতর দিয়ে যেমন আবার ধর্মীয় আচরণভিত্তিক জাতীয়তাবাদ যা মূলত ধর্মের মোড়ক এবং সামরিক ও বেসামরিক অস্ত্রের মাধ্যমে সৃষ্ট—সেটাই আবার ফিরে আসে রাষ্ট্র ক্ষমতায়। পাকিস্তানে ভূট্টো নিজে ক্ষমতায় থেকেই ওই পথে যাত্রা করে। অন্যদিকে ভারতেও সেক্যুলারইজম দুর্বল হতে শুরু করে। আর বঙ্গবন্ধু তো বলেছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ টিকে থাকা নির্ভর করবে উপমহাদেশের অন্য দুই দেশে সেক্যুলারইজম কতটা শক্তিশালী হয় তার ওপর। কিন্তু সেখানে শক্তিশালীর বদলে দুর্বল হতে থাকে। তার ফলে ১৯৭৫-এর পর থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশে অনেকগুলো নদীর একটি হয়ে যায়। এবং ১৯৯১-এ দেখা যায়, শুধু আওয়ামী লীগ নয় বাংলাদেশের বামদলগুলোও ধর্মীয় আচরণকে রাজনীতির অঙ্গ করে নিয়েছে। এমনকি ১৯৯১ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু হত্যা দিবসটি পালনও চলে যায় অনেকটা ধর্মীয় আচরণের মধ্যে- সেখানে রাজনীতি পিছে পড়ে যায়, সংস্কৃতি ফিকে হয়ে যায়। এ কারণে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় ফিরলেও সংস্কৃতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মূল স্রোত করা রাষ্ট্র ও সমাজে আর সম্ভব হয়নি। তাছাড়া ততদিনে শুধু উপমহাদেশে নয় পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় আচরণের রাজনীতির দোর্দণ্ড প্রতাপ শুরু হয়েছে। এবং সংস্কৃতিভিত্তিক রাজনীতির নানান আপোস চোখে পড়তে থাকে। এই পরিবেশে বসে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট অবধি বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেও বাঙালি সংস্কৃতিকে বেগবান করা হয়নি রাষ্ট্রীয়ভাবে। অন্যদিকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির আনুকূল্য ছাড়া ষাটের দশকে বাংলাদেশে যারা বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন, সংস্কৃতিভিত্তিক জাতীয়তাবাদের পথ তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন ওই মাপের সংস্কৃতজন অর্থাৎ ৪০ ও ৫০ দশকের সেই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবীদের মতো নির্লোভ ও জ্ঞানীজন ততদিনে বাংলাদেশ থেকে প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। তাই রাষ্ট্র ক্ষমতার বাইরেও বাঙালি সংস্কৃতির নদীটি বেগবান করার কাজটি কেউই করেনি। সকলে সরকারের আনুকূল্যের জন্যে ব্যস্ত ছিলো।

Sayed Farooq-ur-Rahman - Wikipedia

এই দুর্বলতার সুযোগটিই নিয়েছে ১৯৭৫-এর পনেরো আগস্টের কর্নেল ফারুক-রশীদ গোষ্ঠীর মতো ২০২৪-এর ইউনূসের মেটিকুলাস ডিজাইন গোষ্ঠী। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সময় ও তারিখটি ছাড়া অন্য কোনো পার্থক্য নেই। যার ফলে এবারের পনের আগস্ট যখন এসেছে সে সময়ে, সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠান তো আছেই এর সঙ্গে রক্তে কেনা বাংলা ভাষাটিও আজ নষ্ট। অশ্লীলতাই এখন সম্মানিত।

তাই এবারের পনের আগস্টে বাঙালি জাতির জন্য রাষ্ট্র ক্ষমতায় আর কত বার কত দ্রুত পরিবর্তন হবে তার থেকেও অনেক গুরুত্বপূ হতে হবে, বাঙালি সংস্কৃতিকে বাঁচানো ও বেগবান করা। নইলে ভবিষ্যতের ইতিহাসে বাঙালিকে ডোডো পাখির মতই খুঁজতে হবে। আর একমাত্র বাঙালি সংস্কৃতির মাধ্যমেই বার বার আগস্টের এই ষড়যন্ত্রের পথকে বন্ধ করা যাবে- অন্য কোনো পথে নয়। অন্য কারও বাহুর শক্তিতেও নয়।

EXCLUSIVE: Bangladesh's high growth under ousted PM Hasina was 'fake', Yunus  says | Reuters

লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The present World.